Skip to main content

Full text of "Kabiguru"

See other formats


ঘর লেখক আহা বই এ 


৯ ॥ বাংল ছন্দে মহলসহ্হ্ 
২ । ব্রবাীস্ছ্বনাঘথের “মানসী, 
৩৩1 আধুনিক সাভিত্তশিজ্জপা 


হপরি ও 2০ 


(রবীন্দ্র-কাব্যের.মূলসুত্র ) 


্রীঘমূল্যন মুখোগাখ্যায়, এম্-এ, পি-আর্-এস্‌ 


কলিকাতা যোগমাধা দেবশ কলেজের ইংরাজণ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক 
ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালযের স্নাতকোত্তর বিভাগের উপাধ্যায় 





£ স্ক়ুর হেব গজ * কমিকাডা 


প্রথম প্রকাশ--রাস পহর্পিমা ১৩৬৮ 


প্রচ্ছদ 
নিমাই নন্দশ 


প্রইমশিকামতগ মরি টির 


মিত্রা বহায়ম্্হবিতিজজ্লন্তল মকেভ 
& শঙ্কর ঘোষ বেন | কলিকাতা ৬ 


মুদ্ধক আীসৌরেন্দ্রনাথ মিত্র” এমএ 
বোধি প্রেস 1 ৬ শশ্কর ঘোষ লেন । কম্িিকাতা ৬ 


সুচাপত্র 


প্রস্তাবনা_+ন্বর্গের চক্রান্ত” ( কথিকা ) 
কবিগুরু 
কবিগুরু 
রবীন্দ্রকাব্যের মর্্মবাণী 
রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধারা 
রবীন্দ্রনাথের সাধন। 
রবীন্দ্রকাব্যে পর্ব ও যুগ-বিভাগ 
রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ 
যুগসন্ধ্যা__ 
১ম পর্ব্ব (সন্ধ্যাসঙগীত ) 
প্রথম যুগ 


২য় পর্র্ব (প্রভাতসঙ্গীত, ছবি ও গান )... 


৩য় »* (কড়ি ও কোমল ) 

৪র্থ » (মানসী ) 
দ্বিতীয় যুগ__ 

৫ম পর্ব ( সোনার তরী ) 

৬ষ্ঠ », ( চিত্রা, চৈতালি ) 


৭ম ১», ( কল্পনা_-কথা ও কাহিনী ) ** 


তৃতীয় যুগ : 
৮ম প্র (ক্ষণিকা ) 
৯ম ৯ (নৈবেষ্ঠ ) 
১০ম »১ ( উৎসর্গ, স্মরণ, শিশু ) 


৮০১---৯১৯ 
৭১৬১----১৯১০ 
০১৭---১৯০০ 

১০৯---১৯০৪ 
১০৫---৯১০ 
১১১---১৩২ 
১৯১৫--১২৪৩ 
১২১--১২৬ 
১২৭---১৩২ 


চতুর্থ যুগ__ 
১১শ পর্ধব (খেয়া ) 


» ( গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য, তালি) 
১৩শ » (বলাকা, পলাতকা, শিশু ভোলানাথ) 


পঞ্চম যুগ 
১৪শ পর্ব ( পূরবী ) 

১৫শ » ( মহুয়া__পরিশেষ ) 
১৬শ » ( পুনশ্চ শ্যামলী ) 
অন্তিম যুগ 


ংল] ছান্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও সিদ্ধি 


নির্ঘণ্ট 


১৭শা ৯ ( 


॥০ 


প্রান্তিক সানাই ) 
শ ১) ( রোগশয্যায়__শেষলেখা ) 


পরিশিষ্ট 


পৃষ্ঠ 


৬৩৩---১৬৩ 
১৩৯--১৪৩ 
১৪৪-_-১৫১ 
১৫২--১৬৩ 
১৬৪--১৮৫ 
১৭২--১৭৪ 
১৭৫--১৭৯ 
১৮০---১৮৫ 
১৮৬--১৯৫ 
১৯০---১৯২ 
১০১৩---১৪৯৫ 


১৯৬--২১৪ 
২১০৫--*৬ 


গ্রস্তাবন! 


“জের চক্রান্ত” 
( কথিকা ) 


“বর্গের চক্রান্ত” স্বর হয়েছে । 

পিতামহ ব্রহ্মার কাছে পৌছেচে আর্ত ধরিত্রীর ক্রন্দন-_- 

হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্থী, নিত্য নিঠুর দ্য 

সেখানে লেগেই আছে । মর্থ্যের উদ্ধার যে কি করে হবে, তা কেউ 
ভেবে স্থির কর্তে পাচ্ছেন না। | 

যুগে যুগে বিষণ ভূভার হরণের জন্য অবতীর্ণ হন, কিন্তু এবার তিনি 
আর যেতে রাজী নন। তিনি বলে পাঠিয়েছেন যে মানবের উদ্ধারের 
চেষ্ট] পণ্ুশ্রম মাত্র । পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য এবং মানবের মুক্তির 
জন্য তিনি বারে বারে চেষ্টা করেছেন, ছুষ্কৃতকারীদের বিনাশ ক'রে 
ধর্মরাজ্য স্থাপন ক'রে দিয়েছেন, আদর্শ মানবের চরিত্র লোকের 
সাম্নে তুলে ধরেছেন । মানব তার পুজা করেছে এবং এখনও করে, 
কিন্তু তার মহৎ আদর্শের অন্থসরণ করে নি। এই সে দিনও তিনি 
শাক্যমুনিরূপে গিয়ে ত্যাগ ও প্রেমের বাণী প্রচার করে এসেছেন । 
কিন্তু শাক্যমুনির ভক্তরা তার বাণী পালন করে নি, করেছে তার 
নখদস্তের পুজা, আর হিংঅ জ্তর মত পরস্পরকে করেছে নখদস্তাঘাত। 
তাই তিনি স্থির করেছেন যে কাল পূর্ণ না হ'লে তিনি আর মর্ত্যে 
যাবেন না* এবং যখন যাবেন তখন বর্তমান নরজাতির উৎসাদন ক'রে 
আসবেন । 
ঘ-_-১ 


কবিগুরু 


ধূর্জাটি ত অনত্ত কাল ধরে ধ্যানমগ্ন। মহামায়ার রহস্তাভেদ কি 
আজও হ'ল না? যা হোক, তাকে খবর দেওয়া বুথা। ধ্যানভঙের 
পর তিনি যদি এই সব অনাচারের সংবাদ পান, তা হ'লে তার তৃতীয় 
নয়নের ন্প্ত বহ্ছি হয়ত আবার ভুলে উঠবে এবং ব্রহ্মার স্কুমার স্যৃ্টি 
-নর- হয়ত মারের মতনই অবিলম্বে ধ্বংস হবে । কিংবা আপন 
ভুলে এমন প্রলয় নাচন আরম্ভ কর্বেবন যে ব্রহ্মার জটিল স্থষ্টির সমস্ত 
বধনই খুলে যাবে। 

তবে, উপায় কি? 

৯৫ মি মর এ 

ব্যথিত স্বর্গে সেই নিবর্বাক সভাগৃহে ব্রহ্মার করুণ নয়ন ছুইটি 
সন্ধ্যাতারার মত ফুটিয়া রহিল । 

অন্তরালে দেবী ভারতীর নয়ন হইতে ছু'ফৌট! অশ্রু যেন বাল্সীকির 
দুটি শ্লোকের মতই ঝরিয়া পড়িল। 


(২) 


এমন সময় রক্তভাল লাজনভ্রশিরে একজন অগ্রসর হইয়া ব্রহ্মার 
চরণে একটি খেত শতদল রাখিয়া প্রণাম করিল । 

সভাস্থ সকলে চাহিয়া দেখিল, সে দেবী ভারতীর মালঞ্চের 
মালাকর। সকলে বলিত যে ভারতীর বিশেষ অন্নগ্রহ ও প্রসাদ সে 
লাভ করিয়াছিল। ন্বর্গে সে নবাগত। পুরে সে ছিল অলকার 
অধিবাসী, নটরাজের ভক্ত । মহাকালের নৃত্যের তালে সে পাইয়াছিল 
মুক্তির মন্ত্র । তাহার প্রিয়ার সহিত একাসনে বলিয়া! একমনে নটরাজের 
পুজা করিত, ধূর্জটির মুখের পানে পার্ধতীর হাসি দেখিয়া সে "থয 
হইত । একদা দোলফাগুনের চাদের আলোয় স্বাধিক1পপ্রমণ্ড হওয়ায় 


স্বর্গের চক্রাস্ত ৩. 


সে শাপেনাস্তংগমিতমহিমা হইয়া বর্ষকাল পৃথিবীতে বিরহ যাপন 
করিয়াছিল। সেই সময়ে সে দেখিয়াছিল ধরণীর অতুল সৌন্দর্য্য, 
আর অনুভব করিয়াছিল মানবহদয়ের অনন্ত মাধুর্য ! সমুদয় মানবের 
সৌন্দর্য্যে ডুবিয়া তাহার হৃদয় অক্ষয় স্থন্দর হইয়াছিল। নিজে 
বিরহের ক্লেশ ভোগ করিবার সময় বিডশ্বিত মানবের প্রতি তাহার 
গভীর সহান্ৃভৃতির উদ্রেক হইয়াছিল । অনেক সময় অদ্ধরাত্রি অনিদ্র“ 
নয়ান থাকিয়৷ সে ভাবিত- মানুষকে 


কে দিয়াছে হেন শাপ, কেন ব্যবধান ? 
কেন উদ্দে চেয়ে কাদে রুদ্ধ মনোরথ ? 
কেন প্রেম আপনার নাহি পায় পথ ? 


পরে পুণ্যফলে তাহার গতি হয় ব্রহ্মলোকে | মানবের প্রতি. 
তাহার * অপরিসীম সহানুভূতি দেখিয়া মহবি বাল্মীকি তাহার বীণাযন্ত্ 
তাহাকে দান করিয়াছিলেন । সঙ্গীত ও কাব্যে তাহার অতুল অধিকার 
জন্মিয়াছিল, স্বুরসভাতলে উর্বশী তাহারই ছন্দের তালে নৃত্য করিত ॥ 


(৩) 

ব্রহ্মা স্মিতমুখে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন__-বৎস, কি চাও ? 

সে বলিল,_প্রভূ, আমাকে অক্ষম মানবের সেবার অধিকার 
দিন। 

ব্রহ্মা জিজ্ঞাসা করিলেন”_তোমার উপকরণ কি কি? 

সে বলিল,_ প্রভু, শুধু এই ছিন্নতন্ত্রী বীণা, আর আমার যাত্রা" 
সহচরীর দেওয়া এই' অল্লান মাধবীমঞ্জরীর রাখি । 

একটু ভাবিয়া ব্রহ্মা বলিলেন,__যাও, বৎস, তোমার পন্থা জয়যুক্ত 


৪ কবিগুরু 


হউক । মানবের মুক্তির যথার্থ সন্ধান তুমিই পাইয়াছ। রবির হ্যায় 
দীপ্তি হইবে তোমার প্রতিভার ও ইন্দ্রের হ্যায় গৌরব হইবে তোমার 
জীবনের ৷ বিশ্ব-ভারতীর বাণী তোমার কণ্ঠে ধ্বনিত হইবে । অশীতি- 
বর্ষকাল এই বাণী মর্ত্যে প্রচার করিয়া রাখি-পুণিমার দিনে আবার 
এখানে ফিরিয়। আসিবে । 


কবিগুরু 


কবিগুরঃ 
(১) 


আমাদের দেশে মহাপুরুষ অনেক জন্মিয়াছেন, তাহাদের স্মৃতি দেশ 
যত্বে রক্ষা করিয়া রাখিয়াছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্মরণে শিক্ষিত বাঙ্গালী 
হৃদয়ে হৃদয়ে যে স্পন্দন অনুভব করেন, তাহা অন্য কোন মহাপুরুষের 
স্মৃতিতে করেন কি না সন্দেহ । অবশ্য কোন কোন দিক্‌ দিয়া রবীন্দ্র 
নাথের অপেক্ষা মহত্তর পুরুষের আবির্ভাব যে আধুনিক কালেও 
বঙ্গদেশে হয় 'নাই তাহা নহে। তাহারা আমাদের নমস্ত, তাহাদের 
কাছে আমরা খণী, তাহাদের দান দেশকে উন্নত বা সম্দ্ধ করিয়াছে, 
তাহাদের ধী ও চরিত্রের গৌরব দেশের মুখ উজ্জল করিয়াছে । কিন্ত 
তবুও স্বীকার করিতে হয় যে, রবীন্দ্রনাথের স্বৃতি আমাদের মর্মে ও 
রক্তে যে দোলা আনিয়া দেয়, যে পুলকের আভাস মনে সঞ্চার করে, 
তাহা বোধ হয় আর কাহারও ম্মৃতিতে আমরা অন্নুভব করি না। 
অন্যান্য মহাপুরুষদের আমরা ভক্তি করি, রবীন্দ্রনাথকে আমরা সকল 
হৃদয় দিয়া ভালবাসি, রবীন্দ্রনাথের জন্মতিথি আমাদের কাছে শুধু 
তাহার স্মতিপূজার দিন নয়, তাহা আমাদের অস্তরাত্মার উৎসবের 
দিন। 

রবীন্দ্রনাথের স্মরণ মাত্রে আমাদের যে এই পুলকমিশ্র হৃৎস্পন্দন 
হয়_এ কি শুধু তাহার কবিত্বের জন্য ? এইজন্যই কি সরন্বতী পুজার 
হ্যায় নগরে - নগরে পল্লীতে পল্লীতে রবীন্দ্রস্বৃতিপূজার ভিড় জমিয়া 
উঠে? মহাকবি ত আরও অনেক জন্মিয়াছেন । 91781598799876 
জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, কিস্তু তাহার জন্মদিনে কি ইংরেজ-হাদয়ে 


৮ কবিগুরু 


এমন হিল্লোল বহিয়া যায়? এমন কি সমগ্র ভারতের মুগ্ধ গ্রীতির অর্থ্য 
যে মহাকবি দ্বিসহত্র বৎসর ধরিয়া পাইয়া আসিয়াছেন, সেই কবিকুল- 
শিরোমণি কালিদাসের স্মবৃতিও আমাদের মনে প্রাণে এমন তরঙ্গ 


তুলিতে পারে না। 


(২) 


রবীন্দ্রনাথ যে আমাদের মনে এমন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার 
করিয়াছেন, তাহার কারণ রবীক্দ্রনাথ মাত্র কবি ছিলেন না । ইংরাজ 
সমালোচকেরা যাহাকে 47006787099” অর্থাৎ রসাত্মক বাক্য 
মাত্র বলিয়াছেন, তাহাতেই রবীন্দ্রনাথ সীমাবদ্ধ ছিলেন না| 97780:98- 
79879, কালিদাস-__ইহারা অবশ্যই মহাকবি । তাহাদের চেয়ে রবীন্দ্র- 
নাথ বড় কবি কিনা সে তর্ক নিক্ষল ও নিম্য়োজন | তবে এ কথ! 
ঠিক যে, শুধু কবি হিসাবেই: রবীন্দ্রনাথকে দেখিলে তাহার মহত্ব ঠিক 
অন্থধাবন করা যাইবে না। “তোমার কীত্তির চেয়ে তৃমি যে মহং”__ 
একথা আমরা রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহেই বলিতে পারি । 

অবশ্য কবি হিসাবে রবীন্দ্রনাথের এই্বর্ধ্য ছিল অপর্য্যাপ্ত | কাব্য- 
ছন্দ এবং আন্ষগিক অন্যান্ত আঙ্গিকের উপর অভূতপুর্্ব আয়ন্তি, 
কবিকল্পনার বৈভব, ধ্বনির অপরূপ হিল্লোল, অলঙ্কারের দীপ্তি, অপ্ুর্ব্ব 
বৈচিত্র্য ও ব্যঞ্জনা, ভাষার ছটা, ভাবের প্রাচুর্য, প্রসার ও গভীরতা, 
এই সমস্ত উপকরণের সম্পূর্ণ স্ুসমঞ্জস সৌধম্য এবং ভাস্বর রসলোক 
স্ষ্টির ক্ষমতা-_-এ সমস্তের দিক্‌ দিয়া রবীন্দ্রনাথ অতুলনীয় । তাহার 
কাব্যকে লক্ষ্য করিয়া বল! হইয়াছে “বাঙ্গালী আজ গানের রাজা” 
সে কথ! কিছুমাত্র অতুযুক্তি নহে । বাঙ্গলা ভাষার রন্ধে রন্ধে যে এত 
সর বাজিতে পারে, তাহা রবীন্দ্রনাথের পুর্বে কে ভাবিতে পারিত ? 


কবিগুরু ৯ 


তাহার আজিকের মধ্যে যদি কোন দোষ থাকে, তাহা সম্পদের আতি- 
শয্য- _রাজোচিত অতিদাক্ষিণ্য | কিন্তু কোন দেশে বা যুগে কোন 
কবিই এত বহুল পরিমাণে, এত বিচিত্র রকমের উৎকৃষ্ট কাব্য ৬০ 
বৎসর ধরিয়া সদাসব্ধবদ! স্থষ্টি করেন নাই । যদি “সরম্বতীর বরপুত্র' 
কাহাকেও বলিতে হয়, তবে রবীন্দ্রনাথই সেই অভিধার শ্রেঠ অধিকারী । 

তবুও একথা মানিতে হইবে যে, শুধু কবি বলিয়াই রবীন্দ্রনাথ 
আমাদের প্রীতি ও ভক্তির পাত্র নহেন» রবীন্দ্রনাথ আরও অনেক 
কিছু । সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি ওপন্যাসিক, গল্পলেখক, নাট্যকার, 
নিবন্ধকার ; রাষ্ত্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে তিনি সংস্কারক, প্রচারক, 
শিক্ষাব্রতী, রাষ্ট্রধিদ্‌, জননায়ক ; তিনি গায়ক, সঙ্গীতজ্ঞ, স্থরঅষ্টাঃ নৃত্য- 
শিল্পবিৎ, অভিনেতা এবং চিত্রকর ; তিনি জগৎবিখ্যাত বক্তা, পণ্ডিত, 
দার্শনিক, জ্ঞানী ও মনীষী । তিনি আজীবন কন্মী; রাষ্ট্র ও জাতির 
উন্নয়ন ও গঠনমূলক সব্র্ববিধ আন্দোলন ও প্রচেষ্টার সহিত যেমন তিনি 
বিজড়িত ছিলেন, আবার তেমনি অতি ক্ষুদ্র গ্রামের উন্নতি ও' গ্রাম- 
বাসীর সেবাতেও তিনি উৎস্থষ্ট ছিলেন। সব্্বদেশের মনীষীদের সহিত 
যেমন তিনি চিন্তা ও ভাবের সংযোগ রক্ষা করিতেন, তেমনি আবার 
সামান্য পরিচারক ও দর্শনার্থী কিশোর-কিশোরীর মনোভাব হদয়ঙ্গম 
করিয়া তাহাদের তৃপ্তি বিধানে যত্ববান্‌ ছিলেন। “অজত্র সহত্রবিধ 
চরিতার্থতায়' আত্মপ্রকাশ করিবার জন্য তাহার জীবনআোত বহু ধারায় 
প্রবাহিত হইত । তাহার মহত্বের পরিচয় শুধু কবিত্বে নয়, সংসারের 
কর্মপ্রবাহেও ; শুধু রসলোকে বিহারের ক্ষমতাতে নয়, ধুলির ধরণীর 
আপাত-নীব্রস কর্মে নিষ্টা ও কূশলতাতে-ও | | 


& ইহাকে কোন কোন সমালোচক 7:০11510 বা বানুল্যদোষ বলিয়াছেন । বস্ততঃ ইহ) 
এক্জাতীয় রোমান্টিকন্তার জক্ষণ। 


১০ কবিগুরু 


তাহার উপর, রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব । রূপে, স্বাস্থ্যে, 
কণ্ঠস্বরে_আলাপে, পরিহাসে, বাগ্সিতায়, ব্যবহারে, শীলে_ উদ্যমে, 
ধৈর্য্য, সহিষু্তায়_ধৃতিতে ও ধী-শক্তিতে-_বাহা ও আন্তরিক 
সৌম্যতায়-এক কথায় সাবিক “দৈবী সম্পদে” তাহার সমতুল 
আধুনিক জগতে কে জন্মিয়াছেন ? 


(৩) 

অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমাদের খণ্ডিত, সঙ্কুচিত জীবনের 
মাঝখানে পুর্ণ তর মানবতার অবতার, আমাদের ঈক্সিত স্বর্গের দূত ও 
জীবন্ত প্রতিচ্ছবি । এইজন্য রবীন্দ্রনাথের নাম স্মরণ করিলেই যেন 
একটা আকাজ্কষিত স্বর্গের স্পর্শ আমরা অন্থভব করি । এইখানেই; 
রবীন্দ্রনাথের বিশেষত্ব । তিনি শুধু রূপদক্ষ স্ুরত্রষ্টাী রসবিলাসী কবি 
ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের জীবনের মূর্ত আদর্শ । আধুনিক 
যুগে সমস্ত ভারতবর্ষ ব্যাপিয়া যে অভিনব সাধনা চলিতেছে, যে 
সাধনার বিভিন্ন রূপ আমরা মহাত্মা হইতে আরম্ভ করিয়া তরলমতি 
তরুণ ও তরুণীর ভাব ও চিন্তার মধ্যে দেখিতে পাই, সেই সাধনার 
পরিপূর্ণ আদর্শ যেন বিকশিত হইয়া উঠিয়াছিল রবীন্দ্রনাথের দেহে, 
মনে ও জীবনে । এক দিক্‌ দিয়া তিনি 4১০ 0: 707 মানবতায় 
পরিপূর্ণ “পৃথিবীর শিশু”, আর এক দিক্‌ দিয়া তিনি 45০07) ০£ 90০” 
_ৈবী প্রেরণার অবতার, দৈব এশ্বর্যের বিগ্রহ । এইজন্য তিনি 
শুধু কবি নহেন, তিনি কবিগুরু । 

বস্তৃতঃ রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক যুগের [0:0707)66 বলা যাইতে 
পারে। প্রাচীন ইহুদীদিগের ইতিহাসে কোন কোন যুগে যেমন 
188181), ৩০) প্রভৃতি পয়গম্বর ভগবত-প্রেরণা লাভ করিয়া সমগ্র 


কবিগুরু /১১ 


জাতির ভাব ও কর্মধারা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস করিয়াছিলেন, মানব- 
জীবনের সত্য ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিয়াছিলেন, রবীন্দ্রনাথ 
আধুনিক যুগে পৃথিবীতে সেই কর্তব্য সম্পাদন করিয়াছেন । তাহার 
রচনায় ও জীবনাদর্শের মধ্যে আধুনিক মানবচিত্ত এমন কিছুর সন্ধান 
পাইয়াছে যাহা পরশপাথরের মত মানবপ্রকৃতির একটা মৌলিক 
পরিবর্তনই সাধন করিতে পারে । বর্তমান কালের খণ্ডিত ও বন্ধ- 
জটিল জীবনে তিনি আনিয়াছেন পূর্ণতার আভাস ও পরিত্রাণের 
আশ্বাস। এইজন্যই পৃথিবীর সব্বদেশেই ফাহারা শ্রেষ্ঠ মনীষী ও 
জ্ঞানী, তাহার! রবীন্দ্রনাথকে আপনার বলিয়া বিবেচনা করিয়াছেন, 
তাহাকে গুরুর হ্যায় শ্রদ্ধা করিয়াছেন, তাহার বাণীআবাহন করিয়াছেন। 
আধুনিক যুগে খিন্ন নিপীড়িত বিষয়-বিষ-বিকার-জীর্ণ মানব আত্মাকে 
যথার্থ মুক্তির বাণী যে রবীন্দ্রনাথই শুনাইয়াছেন, তাহা সব্ধদেশের 
স্বধীবৃন্দ স্বীকার করিয়াছেন। যে অন্কুতুতি ও উপলন্ধষির ফলে জীবনের 
অস্তদ্বন্দের অবসান হয় ও মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হয়, তাহাই 
রবীন্দ্রসাহিত্যের উপজীব্য । এই অন্থুভব মানুষের প্রাণে আবিভূতি" 
হইলে সমগ্র মানবসত্তায় চরিতার্থতার বঙ্কার বাজিয়া উঠে, অমৃত- 
লোকের আনন্দে চিত্ত আপ্লুত হয়। এই আনন্দ-ই মুক্তির লক্ষণ, এবং 
ইহারই বাণী রবীন্দ্রসাহিত্যে ধ্বনিত হইয়াছে । পৃথিবীর ছুর্ভাগ্য যে, 
সে বাণী সর্বত্র ও সবর্বদা অন্ুস্থত হয় নাই । 

রবীন্দ্রনাথকে কেহ কেহ খষি বলিয়াছেন এবং এই কথা লইয়া 
কিছু কিছু প্রতিকূল সমালোচনাও হইয়াছে । প্রাচীন ভারতীয় মুনি 
ধাধিদের হ্যায় আহার-বিহার, আচার ও জীবনধারা অবশ্য রবীন্দ্রনাথের 
ছিল না, কিন্তু এ সমস্ত তর্ক সম্পূর্ণ অবাস্তর । আহার বা আচারের 
কোন বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করিলেই কেহ খধি হইতে পারেন না। 


১২ কবিগুরু 


ধিনি জীবন-সত্যের সহজদ্রষ্ঠা, সেই সত্যের মূর্ত প্রতীক ও প্রচারক, 
সেই সত্যের মন্ত্রবলে যিনি সমগ্র জাতিকে বা জগৎকে উদ্ধদ্ধ করিতে 
পারেন, তিনিই খষি । ইহাই যদি ধধিত্বের পরিচায়ক হয়, তবে 
রবীন্দ্রনাথকে খষি কিংবা প্রাচীন খধিদের উত্তরসাধক বলিতে 
আমাদের কোন দ্বিধা থাকিতে পারে না। বেদ ও ব্রাহ্মণের মাহাত্ম্য 
অস্বীকার করিয়াও যদি শাক্যসিংহ বোধ লাভ করিয়া দশাবতারের 
মধ্যে অন্যতম বলিয়া গণ্য হইতে পারেন, তবে রবীন্দ্রনাথও প্রাচীন 
মুনিদের আচার পালন এবং সব্বতোভাবে তাহাদের মতান্ুসরণ না 
করিয়াও জীবনসত্যের অন্যতম দ্রষ্টা হিসাবে খষি বলিয়া পরিগণিত 
হইতে পারেন । অবশ্য প্রাচীন খষিদের সহিত তাহার অনুভূতির ও 
দৃষ্টির পার্থক্য আছে। তিনি আধুনিক জগতের কবি ; বৈজ্ঞানিক 
যুক্তি ও বিচারের দ্বারা তাহার কাব্য পরিশীলিত ; বুদ্ধির দ্বারা তাহার 
দৃষ্টি পরিচালিত ; সংসার তাহার কাছে মায়া নয়, সত্য, এবং এই! 

ংসারের বিচিত্র সত্যের তিনি দ্রষ্টা ও ভোক্তা ; মানবস্থলভ অন্ুভূতিই 
'তাহার উপলন্ধির মূল । তত্রাচ খধিদের সহিত এই হিসাবে তাহার 
মিল আছে যে খষিদের ন্যায় তাহারও জীবন ছিল একটা সাধনা 
সত্যোপলন্ধির একটা একান্তিক প্রয়াস ৷ তাহার সাহিত্য-চ্চা, রাজ- 
নৈতিক ক্রিয়াকলাপ, গ্রামসেবা* নৃত্যগীতাদি সুকুমার শিল্পের অনুশীলন 
ইত্যাদি জীবনব্যাপী নানা কর্মের সমস্তই ছিল সত্যকে উপলব্ধি 
করিবার ও জীবনের মধ্যে তাহাকে পরিস্ফুট করিবার প্রয়াস । মহাত্মা 
হ্যায় ভাহারও জীবন ছিল একটা সাধন! বা “105109727009106 ৮7101) 
0০010, | 


কবিগুরু ১৩. 


(৪) 

এই সাধনার ইতিহাস রবীন্দ্রনাথের কাব্যধারায় পরিস্কুট | “সন্ধ্যা- 
সঙ্গীত' হইতে “শেষ লেখা” পর্যস্ত রবীন্দ্রনাথের সমস্ত কাব্যগ্রন্থ যদি 
আমর] মনোযোগ দিয়া পাঠ করি, তবে দেখিতে পাইব যে, তাহার 
মধ্যে রহিয়াছে এক উন্মুখ মানবাত্মার ক্রমবিকাশের ইতিহাস । বিশ্বের 
বিচিত্র লীলার মধ্যে বিশ্ব-আত্মার প্রকাশ, সেই বিশ্ব-আত্মার স্বরূপ 
সম্পর্কে কবিহৃদয়ের উপলব্ধির বিকাশ এবং এই উভয়ের মধ্যে একটা 
নিবিড় যোগাযোগ-_-এই কয়টি বিষয় অবলম্বন করিয়াই রবীন্দ্রকাব্য 
গড়িয়া উঠিয়াছে। নিরপেক্ষ স্বয়ংসিদ্ধ মানবিকতার কবিতা তিনি 
কখনও কখনও রচনা করিয়া থাকিলেও তাহার কাব্য প্রধানত; একটা 
আত্তিক্য ভাবে অনুপ্রাণিত; তাহার প্রেরণা, তাহার ধর্ম মূলতঃ 
আত্মিক । “ও ইতি ব্রহ্ম" যাহা কিছু মানবান্নৃভৃতির বিষয় সমস্তই 
ব্রহ্ম__ইহাই তাহার মন্ত্র। তাই বলিয়া যেন কেহ মনে না করেন যে, 
রবীন্দ্রকাব্যে মানবস্থলভ অনুভূতি বা আবেদনের অভাব আছে। 
বস্ততঃ আধ্যাত্মিকতা ও মানবতা উভয়ই রবীন্দ্রকাব্যে ওতপ্রোত, 
এইখানেই রবীন্দ্রপ্রতিভার বেশিষ্ট্য । তাহার কাছে যাহ! ইন্জরিয়গ্রাহা 
তাহাই অতীন্দ্রিযরূপে প্রতিভাত হইয়াছে, প্রেয়সীই দেবী হইয়! 
উঠিয়াছে। তীহার কাব্যে “জীৰন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে” একটা 
রহস্যলোকের আভা প্রতিফলিত হইয়া মানব জীবনের অন্নুভব ও 
আকাতজ্ষাকে উদ্ভাসিত, রঞ্জিত ও রূপায়িত করিয়াছে । তাহার কাব্য- 
সাধনায় মানবপ্রেম ও ঈশ্বরভক্তি একই: হইয়! ঈাড়াইয়াছে, তথাকথিত 
মোহ-ই: যুক্তির সন্ধান আনিয়া দিয়াছে । তিনি যথার্থই “৮:৪৪ ০ 
0159 (00750. 70011069 ০9117995679 21501707006” ) মর্ত্য অন্ৃভূতি 
ও স্বর্গের উপলব্ধি যেখানে পরস্পরকে স্পর্শ করিয়াছে, ,সেই মিলন- 


১৪ কবিগুরু 


রেখাতেই তাহার কাব্যের স্থান । “আকাশপুথিবীর বিবাহমন্ত্রগুঞ্জন৮-ই 
রবীন্দ্রকাব্যের বাণী | 

এই জন্যই রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা কখনও ছুঃখবাদঃ সংশয়বাদ 
বা আত্ম-অবিশ্বাসে পর্যবসিত হয় নাই । 


(৫) 


রবীন্দ্রপ্রতিভার মৌলিকতা হইল মানুষের মানবিক বৃত্তি ও 
আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে এই সংযোগশ্মত্রের আবিষ্ষারে । ইহার 
দ্বারা রবীন্দ্রনাথ ভারতের সাধনার সনাতন ধারাকে নৃতন দিকে, 
নূতন আদর্শের অভিমুখে মোড় ফিরাইয়! দিয়াছেন। ভারতীয় 
সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের ইহাই বিশিষ্ট দান। 
বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের সহিত আধ্যাত্মিক সাধনার বিরোধিতা- ইহা 
স্বতঃসিদ্ধ সত্যরূপে চিরদিনই গৃহীত হইয়া আসিয়াছে । “যোগঃ 
চিত্তবৃত্তি-নিরোধ?” ইহাই সাধন-মার্গের গোড়ার কথা । সঙ্কল্পজাত 
কামনাসমূহকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করিয়া এবং মনের দ্বারা ইন্ড্রিয়- 
সমূহকে বিষয়-ব্যাপার হইতে নিবৃত্ত করিয়া সাধনমার্গে অগ্রসর হইতে 
হইবে, এই উপদেশই শাস্রকারের! দিয়াছেন । শঙ্করাদি আচার্যগণের 
মতেও একমাত্র পথ হইল বিষয়াদি হইতে ইন্ড্রিয়সমূহের প্রত্যাহার, 
বিবিস্তসঙ্গ হইয়া অবস্থিতি, কুম্মনীতি গ্রহণ এবং একমাত্র লক্ষ্য 
হইতেছে নিবর্বাণ__বৌদ্ধমতের নিবর্বাণ না হউক, ব্রহ্মনিববাণ। সত্ব 
ও রজোগুণের মধ্যে তাহারা কোন মিল দেখেন নাইঃ রজোগুণকে 
জয় করাই ছিল তাহাদের লক্ষ্য । সংসারের বন্ধনকে এড়াইতে 
হইবে, বিষয়কে ত্যাগ করিতে হইবে”এই কথাই তাহার! 
বলিয়াছেন ; মানবস্বলভ সমস্ত প্রবৃত্তির শিরে মোহমুদগরের আঘাত 


কবিগুরু ১৫ 


হানিয়া বৈরাগ্যের ধূসর পথ-ই একমাত্র মুক্তিপথ বলিয়া নির্দেশ 
করিয়াছেন । | 

বীততধুষ্টের সুমহান্‌ নীতিধন্মও এবছ্িধ মতের উপর প্রতিষ্ঠিত । 
স্বর্গরাজ্য (01089020 ০৫ 7398591)) বা মুক্তির আশা করিলে 
পাথিব রাজ্য (7099০020009 108৮০) অর্থাৎ ভোগস্খ 
একেবারে বিসর্জন দিতে হইবে, ইহাই ছিল যীশুর অভিমত ৷ 

মোটের উপর বলা যাইতে পারে যে, পুর্ধাচার্য্যগণ প্রায় সকলেই 
মানবস্লভ প্রবৃত্তি ও আধ্যাত্মিক মুক্তি_-এতছ্ভয়ের মধ্যে বিরোধিতা 
কল্পনা করিয়া আসিয়াছেন। ইহারা স্থ্টির মধ্যে দেখিয়াছেন একটা 
বিরাট দ্বিধাভাগ (€ 0191,06০10% ), বিধাতার পরিকল্পনার মধ্যে লক্ষ্য 
করিয়াছেন একটা অনাবশ্যক, নিষ্ঠুর দ্বন্দ । যে সহজ প্রবৃত্তি জীবনকে 
নিরন্তর পরিচালিত করিতেছে, সেই প্রবৃত্তির সহিত জীবনের লক্ষ্যের 
কোন সঙ্গতি নাই, ইহাই তাহাদের অভিমত । এরূপ দৃষ্টি যে 
একদেশদশিতাছুষ্ট, তাহা অবিলম্বেই প্রতীত হয়। জীবন ও সংসারের 
অখণ্ড সত্যকে বুঝিবার ও সেই সত্যকে যথার্থরূপে গ্রহণের অক্ষমতাই 
এই একদেশদশিতা!র দ্বারা স্মচিত হয় । বিধাতার পরিকল্পনার মধ্যে 
একটা মৌলিক অসামঞ্জস্ত ও অপচয় কখনই সত্য হইতে পারে না। 

রবীন্দ্রনাথও মুক্তি-সন্ধানী, কিস্তু তাহার মত পুরর্ধাচাধ্যগণের মত 
হইতে বিভিন্ন! এই মত একটা মহত্তর সমন্থয়ের (17161527951061.6918) 
উপর প্রতিষ্টিত। অবশ্য সমাজে ও ধর্মব্যবস্থায় ভারত অনেক সমন্বয় 
পুবেবে করিয়াছে, কিন্তু সে সমন্বয় আংশিক, তাহার পরিধিও সন্কীর্ণ। 
আধুনিক জগতের পীড়িত আত্মা যে সমন্বয় চায়, সে সমন্বয়ের পথ 
রবীন্দ্রনাথই পুরাপুরি দেখাইয়াছেন | এ সমন্বয় শুধু প্রাচ্য ও 
পাশ্চাত্তের ভাব, চিন্তা বা আদর্শের সমন্বয় নহে। এসমন্বয় এছিকের 


১৬ কবিগুরু 


সহিত পারক্রিকের, কর্মের সহিত ধর্মের, বুদ্ধির সহিত বোধির, 
রজোগুণের সহিত সন্বগুণের, ভোগের সহিত ত্যাগের, “সঙ্গের 
সহিত মুক্তির, নীরস কর্তব্যপালনের সহিত রসোচ্ছল উপলব্ধির 
সমন্বয় । সন্কীর্ণতর ক্ষেত্রে ইহা কাজের সহিত খেলার সমন্বয়, গগ্ভের 
সহিত পছ্যের সমন্বয় । 

এইখানেই: রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য । মানবপ্রকৃতির নানা বৃত্তির 
মধ্যে যে একটা পারস্পরিক আপাতবিরোধ আছে বলিয়া মনে হয়, 
তাহার অপুর্ব সমন্বয়ে সেই বিরোধের অবসান ঘটিয়াছে এবং সমগ্র- 
ভাবে মানবসত্তা ও মানববৃত্তির সমাকলন (11366878807) হইয়াছে, 
মানবের যুগপৎ আনন্দ ও মুক্তির অভিনব পথ খুলিয়া গিয়াছে। অসংখ্য 
ভগবানকে আসিতে দেখিয়াছেন । এই অনুভবের ফলে রবীন্দ্রসাহিত্যে 
ফুটিয়া উঠিয়াছে একটা জীবনব্যাপী স্বরসঙ্গতির বোধ । এই সঙ্গতি 
“বসম্ভরাগেন যতিতালাভ্যাং গেয়” কোন আলাপ (99199) নহে, 
ইহা একটা মহত একতান (15%70002)5) 1 জীবনের সব কিছুকে 
জানিয়া, ছুঃখ ও বেদনাকে গ্রহণ করিয়া, কঠোর কর্তব্যপালনের সহিত 
মহত্তের প্রতি অবিচলিত নিষ্ঠার সামঞ্জন্য সাধন করিয়া এই একতানের 
সথষ্টি। জীবনে অন্নুভূতির একতানের মধ্যে প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতাই 
একটা খণ্ড সুরের মত, তাহাদের সমাবেশের মধ্যে একটা মহাসৌন্দর্যের 
স্বত্র নিহিত রহিয়াছে । এই মহাসৌন্রর্ধ্য যখন জীবনে উপলব্ধ হয়, 
তখনই লাভ হয় যথার্থ মুক্তি। “ভুমৈব স্তুখং নাল্সে স্ুখমস্তি ।” 
“বিশ্বাতোমুখ”, “অনেকবণ” বিচিত্রের-ই জয়গান রবীন্দ্রসাহিত্যে ধবনিত 
হইয়াছে । 

রবীন্দ্রনাথের সাধনায় শুষ্ক বৈরাগ্য নাই, কিন্ত তামসিক আসক্তিও 


কবিগুরু ১৭ 


নাই । ববীন্দ্রনাথ ওমর খেয়াম নহেন, সংশয়বাদীর ভোগ-তৃষ্ণা 
তাহার নাই | জীবনে যে একটা শুদ্ধ উপভোগের দিক আছে, 
তাহাকে তিনি কোন মূল্য দেন নাই। এমন কি সেই দিকৃটার প্রতি 
তাহার নজর নাই বলিলে চলে । জীবনে কোমলতা ও লালিত্যের 
চচ্চাকে তিনি কখনই প্রাধান্য দেন নাই | ছুঃখ ও মৃত্যুর কথাই বোধ 
হয় তাহার কাব্যে বেশী । “আম্ৃত্যুর ছুঃখের তপস্তা এ জীবন-_-সত্যের 
দারুণ মূল্য লাভ করিবারে”__ইহাই তাহার জীবনের বাণী । জ্যোৎ্সা 
ও ফুলের কথা রবীন্দ্রকাব্যে যে অপেক্ষাকৃত কম, শুধু তাহাই নহে, 
জ্যোৎস্না ও ফুলের যে স্থুল ভোগের দিকৃটা আছে, তাহাকে উপেক্ষা 
করিয়া তাহার স্থক্ম আধ্যাত্সিক আবেদনের কথাই রবীন্দ্রনাথ 
বলিয়াছেন। আসলে কোন বস্তগত ভোগের প্রতি, কোন বিশেষ 
বস্তর প্রতিই তাহার কোন লিগ্পা নাই । “ভাল মন্দ যাহাই আস্মক, 
সত্যেরে লও সহজে” ইহাই তাহার মুল মন্ত্র। এই উদার বলিষ্ঠ 
মনোবৃত্তি-ই তাহার গৌরবস্থল । বিষয়কে তিনি বজ্গন করেন নাই, 
আবাল তাহাকে আকড়াইয়াও ধরেন নাই ; ছঃখকে তিনি ভয় করেন 
নাই, অশান্তিতে তিনি বিচলিত হন নাই । বুহত্তর সত্যের সহিত 
সংঘাতের ফলেই জীবনে ছুঃখের উৎপত্তি, অহঙ্কার ও ক্ষুদ্রতা হইতে 
ভূমার উপলন্ষিতে আরোহণের ইহা সোপান. মানবের আত্মবিকাশের 
জন্যই ইহার প্রয়োজনীয়তা--এ কথা তিনি বারংবার বলিয়া গিয়াছেন। 
মোটের উপর সব্রবিধ অভিজ্ঞতাকেই তিনি ভগবানের প্রকাশ জানিয়া 
গ্রহণ করিয়াছেন, সমস্তই তাহার মুক্তির সহায়ক হইয়াছে । ইহাই 
সাহার বাজযোগ্ন 


৬৮ কবিগুরু 


(৬) 

গ্রই যোগের রহন্য রবীন্দ্রনাথ পাইয়াছেন মানবের সহজ 
(সৌন্দর্ধ্যবোধের মধ্যে । ইহাই ভুলোক ও ত্বর্লোকের যোগসেতু, 
ইহাই মর্ত্যজীবনে অস্থতের স্পর্শ আনিয়। দেয়, ইহার আস্বাদন ও 
স্ষ্টিতেই মানবজীবনের সার্থকতা । 

সৌন্দ্্যাহ্ৃভূতির ঘে বিশেষ লক্ষণটির উপর রবীন্দ্রনাথ জোর 
দিয়াছেন, তাহা হইতেছে পুলক-স্পন্দন বা ছন্দোময়তা । ছন্দোময় 
অনুভূতির দ্বারাই রবীন্দ্রনাথ স্কুলের সহিত স্ক্ষ্ের, ছুঃখের সহিত 
আনন্দের সামপ্ুস্ প্রতিষ্ঠা করিয়া অসম্ভবকে সম্ভব করিয়াছেন । 
যখন বেগের সহিত যতির, নিয়মের সহিত গতির, আবেগের সহিত 
সংযমের সমাবেশ ও সামগ্তস্ত ঘটে, তখনই ছন্দের স্ষ্টি হয় । পরস্পরের 
সহিত অঙ্জাজিভাবে জড়িত ছুইটি আ-বিরোধী শক্তির পারস্পরিক 
ক্রিয়ার দ্বারাই ছন্দের উৎপত্তি হয় এবং তাহার ফলে এক অভিনব 
স্পন্দন ও অস্তিত্বের আবির্ভাব হয় । এই আবির্ভাব একটা নৃতন স্থষ্টি ; 
এই স্থষ্টির মূলে যে দ্বিবিধ শক্তির ক্রিয়া আছে, তাহার সমন্বয় হতে 
ইহা উদ্ভূত হইলেও ইহার প্রকৃতি অন্যরূপ | ইহা উপাদানীভূত শক্তির 
প্রভাব হইতে মুক্ত একটা নৃতন উপলব্ধি আমাদের আনিয়া দেয় | এই 
ছন্দোময় অনুভুভিতেই আনন্দ ও মুক্তির সন্ধান রবীন্দ্রনাথ পাইয্মা- 
ছেন। এই আনন্দ পাথিব স্খভোগ হইতে সঞ্জাত নহে । বরং সুখের 
আকাত্ষা ও অপরাপর পাথিব বন্ধ হইতে যখন আত্মার মুক্তি ঘটে, 
যখন অন্তর বিকশিত, নিন্ম্ল ও স্বভাবশ্নুন্দর হয়, যখন বিশ্বের 
সহিত আত্মার যোগ সাধিত হয় এবং এশ ছন্দে জীবন প্রবাহিত হয়, 
তখনই আনন্দের উপলব্ধি হয় । তখন অন্তর জাগ্রত, উচ্ভত, নিঃসংশয় 
ও নির্ভয় হয়| “আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান ন বিভেতি কুতশ্চন 1”--তখন 


কবিগুরু ১৪ 


ব্রহ্মানন্দ লাভের ফলে আমরা আর কিছুতেই ভয় পাই না । আমাদের 
সাংসারিক জীবনে ছুঃখ আছে, সুখ আছে, কান্নাও আছে, হাসিও 
আছে, কিছুতেই যথার্থ আনন্দ বা মুক্তি নাই । কিন্ত যদি আমরা 
“কান্নাহাসির দোল দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা”র ছন্দের তালে 
তালে নৃত্য করিতে পারি, তবে সেই নৃত্যের ছন্দেই আমরা উপলন্ধি 
করিব আনন্দ, লাভ করিব মুক্তি । সমস্ত জগত্ময় চলিতেছে একটা 
ছন্দের লীলা, সেই লীলায় যোগ দিবার জন্যই কবিগুরু আহবান 
করিয়াছেন | 

“পারবি না কি যোগ দিতে এই' ছন্দে রে, 

খসে যাবার, ভেসে যাবার ভাঙবারই আনন্দে রে | 

সেই আনন্দচরণপাতে ছয় খতু যে নৃত্যে মাতে, 

প্লাবন বহে যায় ধরাতে বরণ-গীতে গঞ্ধে রে ॥৮ 
আসক্তি-ই মৃত্যু, এইজন্য “তেন ত্যক্তেন ভুঞ্ীথাঃ” ইহাই শাস্ত্রের 
উপদেশ । “পথের মাঝে নিজ সিংহাসন পাতা'_ইহাতেই আত্মার 
অপমান ও অধোগতি | রবীন্দ্রনাথ একান্ত সৌন্দর্যযসাধনার 41৮০ 
$০৮/৪:৮-এ নিজে বাস কন্েন নাই, বা কাহাকেও আহবান করেন নাই | 
এমন কি ভজন, পৃজন, আত্মোপলব্ধির নিভৃত মন্দিরেও তিনি প্রয়াণ 
করেন নাই । তাহার মতে, জগতের ছন্দে ছন্দে সুর মিলাইয়া 
মানবাত্মা তীর্থযাত্রীর মত স্্দূর লক্ষ্যের দিকে কেবলই অগ্রসর হইবে, 
ইহাতেই মুক্তি ও তৃপ্তি। তীর্ঘযাত্রীর পক্ষে পথের মুল্য নাই; যাত্রারই 
মূল্য আছে, অথচ পথ ধরিয়াই তাহাকে চলিতে হয়। চলার পথে 
অগ্রসর হইতে হইলে পশ্চাতের পথের প্রেমে আবদ্ধ হইয়া থাকিলে 
চলিবে না । জীবনের বস্তু ও অভিজ্ঞতা এইভাবেই অপরিহার্য অথচ 
উপেক্ষণীয় | 


২০ কবিগুরু 


এই জন্য বরবীন্দ্রনাথের দেবতা নটরাজ, কারণ নৃত্যেই ছন্দোময় 
সত্তার প্রকাশ । শিশু ভোলানাথ নৃত্য-পাগল, বস্তুর প্রতি আসক্তিহীন, 
এই জন্য সে কবির আদরশস্থানীয় । এই নৃত্যের স্পন্দন, মুক্তির সাধন 
বিশ্বের সব্বত্র,_ প্রকৃতির কন্দরে, নদীর প্রবাহে, আকাশে বাতাসে, 
পত্রে পু্পে, গ্রহে নক্ষত্রে, অণুতে রেণুতে ৷ এই নৃত্যচ্ছন্দে প্রাণ 
জাগ্রত হইলে সব বন্ধন হইতে মুক্তি হয়। নতুবা প্রেমও 
নিগড় হইয়া দাড়ায় । 

এইভাবে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সাধনাকে জীবনে ও জগতে সার্থক 
ও পুর্ণ করার পথ নির্দেশ করিয়াছেন । এই পথে চলিলে আমরা যাহা 
পাইব, তাহা৷ ব্রঙ্গানির্ববাণ নহে, স্পন্দনময় ব্রন্মানম্দ। এই আনন্দ 
তিনি মূর্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন শুধু কাব্যে নয়, জীবনেও-_বিশেষ 
করিয়া সেই মুহূর্তগুলিতে যাহার পরিচয় পাওয়া যায় রবীন্দ্র-সঙ্গীতে 

এই রবীন্দ্রসঙ্গীত ভারতের সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অপূর্ব স্ষ্টি। 
যে স্বরলোকে রবীন্দ্রনাথ বাস করিতেন, তাহার প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া 
যায় এই সঙ্গীতে । “সবরের গুরু, দাও গো সবরের দীক্ষা” ইহাই 
ছিল জীবনদেবতার নিকট তাহার প্রার্থনা! এই স্ুরলোক 
*[১8/2,0199” নয়, গোলোক বা শিবলোকও নয় ; ইহা রবীন্দ্রনাথেরই 
স্ষ্টি, অতি সুক্ষ সৌন্দর্য্যান্ুভূতি ও মানবাত্মার উচ্চতম প্রবৃত্তি ইহার 
উপাদান । ইহার রূপ ও রস অপুবর্ব। রবীন্দ্রসজগীতের মুচ্ছনা এই 
স্বরলোকের আভাস আমাদের মনে আনিয়া দেয়, বস্তময় জগৎ হইতে 
উদ্ধারের মন্ত্র আমাদের কানে কানে গুঞ্তরণ করেঃ 20 6809 
101 (09 11020169+ জীবনযাপনের প্রেরণা দেয় অসীমের স্বরে 
জ্লীবনতন্ত্রী বাঁধিয়া দেয় | ইহার বঙ্কারে অকস্মাৎ আমাদের বক্ষমাঝে 
চিত্র আত্মহারা হয়। ইহাই হয়ত রবীন্দ্র-প্রতিভার শ্রেষ্ঠ অবদান | 


কবিগুরু ২৯ 


ঠী 

রবীন্দ্রনাথকে একটা নবধন্মের প্রচারক বলিলে হয়ত অনেকেই 
আপত্তি করিবেন । যে অর্থে আমরা হিন্দু, মুসলমান, খুষ্টায় মতবাদ 
ও অন্নুশাসনকে ধর্ম বলির! থাকি, সে অর্থে রবীন্দ্রনাথ কোন ধর্মের 
প্রচার অবশ্য করেন নাই । রবীন্দ্রনাথ নিজে কখনও ধর্মগুরু বলিয়। 
আত্মপ্রচার করেন নাই । 

তত্রাচ রবীন্দ্রনাথের স্থ্টি, ভাবনা ও প্রেরণা একটা নবজীবনের 
বাণী ও মুক্তিসাধনার আদর্শ আধুনিক জগতে উপস্থাপন করিয়াছে, 
অনির্বচনীয়ের স্পর্শ লাভ করিবার সন্ধান দিয়াছে! সেই হিসাবে তিনি 
একটা অভিনব ধর্ম্মের, অন্ততঃ পন্থার প্রবর্তক বলা যাইতে পারে । 

এই নবধর্ম্মের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে । প্রথমতঃ, ইহা আধুনিক 
জ্ঞানবিজ্ঞানের বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টির সহিত সঙ্গত । অ-লৌকিক উপলব্ধির 
সহিত ইহার সংশ্রব নাই, কোন তন্ত্রমনত্র আচার-অন্ুষ্ঠান বা গুঢ় 
প্রক্রিয়ার উপর ইহার বিশ্বাস নাই | পারত্রিক মতবাদ, তাত্বিক 
গৌড়ামি, আপ্তবাক্য ইত্যাদিতে ইহার প্রত্যয় নাই । দ্বিতীয়তঃ, বাস্তব 
জগৎ ও সাংসারিক সত্যের প্রতি ইহার ওদাসীন্য নাই, বরং সামশ্রিক- 
ভাবে মানবিক বৃত্তি ও ক্ষমতার বিকাশ এবং জীবন-সাধনাই ইহার 
স্ত্র । তৃতীয়ত, সুস্থ মানবের সহজ সংস্কারে যাহা স্বাভাবিক, সুন্দর 
ও মহৎ বলিয়া প্রতীত হয়, তাহার দ্বারাই ইহা জীবনের মুল্যায়ন 
করে ; ** বহুমুখী মানবপ্রীতিই ইহার ভিত্তি | 

এ সমস্তই বিধৃত রহিয়াছে এক মহান্‌ আস্তিক্য উপলন্ধিতে | 
অনুভবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী, বিশ্বনিয়ন্তা, আনন্দস্বরূপ এক বিরাট 
সত্তার স্পর্শলাভ করাই এই' ধর্ম্মের লক্ষ্য, সেই পরমপুরুষের কাছে 


* এজন্য কেহ কেহ্‌ রবীন্দ্রনাথকে ৬£০০০522, বলিয়া কটাক্ষ করিয়াছেন । 


২ কবিগুরু 


আত্মনিবেদনই পরমার্থ । সঙ্গীত, প্রেম, ত্যাগ ও পৌরুষের সাধনা 
সেই' পরমার্থলাভের উপায়ন্বরূপ ৷ 


(৮) 


“লিপিকা*য় একটা কথিকা আছে। এক ফালি সরু, বাঁকা গলি, _ 
জঞ্জালে ও আলো-আজধারিতে পূর্ণ-_তাহার মাঝে এক ঝলক স্থর্য্যা- 
লোক হঠাৎ কখন আসিয়া পড়ে, গ্রলির মনে একটা সন্দেহ জাগে 
হয়ত বা আরও কিছু আছে, হয়ত অন্য রকমের একটা অক্তিত্বও সম্ভব। 
আধুনিক জগতে রবীন্দ্রকাব্য সেই রকম একটা বিস্ময় ও পুলকিত 
সন্দেহ জাগায় । আজকাল জগতে নানাভাবে পু পুগ্ত জণ্ডাল জমিয়া 
উঠিতেছে ; সত্যের সন্ধানের পরিবর্তে স্থলতন্থ বস্তুর লালসাই জীবনে 
প্রবল হইয়াছে, দর্শন হইয়াছে জড়বাদী, মানুষে মান্বষে মিলনের স্থলে 
দ্বন্ব ও সংগ্রামেই ক্ষমতা ব্যয়িত হইতেছে, আম্ুরী সম্পদই হইয়াছে 
একমাত্র লক্ষ্য, মানুষ হইয়াছে বস্ত্রজগতের কৃমিকীট, লোকে “অনেক- 
চিত্ত-বিভ্রান্তা মোহজাল-সমাবৃতাঃ প্রসক্তাঃ কামভোগেষু” হইয়া 
পড়িয়াছে ; এমন কি 

“অসত্যমপ্রতিষ্ঠন্তে জগদাহ্‌রনীশ্বরম্‌ 

অপরস্পরসম্ভৃতং কিমন্যৎ কামহেতুকম্‌ 1 
এখন জীবনে “নাই সুরঃ নাই' ছন্দ”ঃ শুধু আছে “অর্থহীন, নিরানন্দ 
জড়ের নর্তন।” ফলে মানবজীবন “7১৮০ 1,97)0” অর্থাৎ উর 
মরুভূমিতে পরিণত হইয়াছে । ইহার মাঝখানে রবীন্দ্রকাবা বাজাইতেছে 
একটা সুন্দরের স্বর, “জটিল সে ঝঞ্চনায়-বাধিয়। তুলিতে চায়__ 
সৌন্দর্যের সরল সঙ্গীতে ।” পৃথিবীতে ও মানবজীবনে আজ 
সৌন্দর্যের স্থান সঙ্কীর্ণ। এমন কি সাহিত্যেও আছে প্রধানতঃ 


কবিগুরু ১৩ 


আধুনিক মনোবিকারের পরিচয়, তাহাতে শাশ্বত মানব-আত্মার তৃপ্তি 
বা আশ্রয়ের নির্দেশ নাই | জীবনে প্রেম অপেক্ষা উদগ্র কামনা এবং 
ধন্ম অপেক্ষা 70০9৪ [0116109 ও 108৮ 1[0116108-র প্রভাবই 
বেশী। এইভাবে “নিখিল করিছে মগ্র_জড়িত মিশ্রিত ভগ্ন 
গীতহীন কলরব কত” ; রবীন্দ্রনাথের বাণী “পড়িতেছে তারি পর-_ 
পরিপূর্ণ সুধাস্বর-_পরিশ্ফুট পুষ্পটির মত।” সে বাণী আমাদের 
অহরহ স্মরণ করাইয়া দিতেছে যে মক্ুষ্যত্ের পরিচয় ও বিকাশ স্ন্দরের 
আরাধনা ও স্স্টিতে ;-স্বন্দরের গ্রীতির জন্যই মানুষ পশু হইতে শ্রেষ্ট । 
সুন্দর-ই মর্তো স্বর্গের প্রকাশ । যেমন আলোকের আরাধনায় পঙ্গে 
কমল ফুটিয়া উঠে, তেমনি সুন্দরের আকর্ষণেই মানুষের মন, হৃদয় ও 
আত্মা বিকশিত হয় । সুন্দরের আরাধনার মধ্যে পীড়ন বা জ্বালা নাই, 
সুদ্রুতা বা পঞ্ষিলতা নাই ; আছে সখ, গ্রীতি, স্থির স্সিগ্ধ হদ্য অনুভূতি 
ও আনন্দ । ইহাতে হয় সত্বগুণের বিকাশ | রবীন্দ্রনাথ এই আনন্দ 
ও সৌন্দর্য্যের বাণী নৃতন করিয়া জগৎকে শুনাইয়াছেন | তাহার ধ্যান- 
দৃষ্টি ও স্থষ্টিকুশল কল্পনার সাহায্যে তান উপলব্ধি করিয়াছেন ঘে কি 
ভাবে বর্তমান জগতের দ্বন্ঘ ও সমস্ত্াঃ বিরাট কর্মমপ্রচেষ্টা ও বিচিত্র 
অভিজ্ঞতা সৌন্দর্য্যের অনুভূতিতে রূপায়িত হইতে পারে, মানুষ 

ংসারে থাকিয়াও “অমুতস্ত পুত্রাঃ” অভিধার যোগ্য হইতে পারে এবং 
মর্ত্যজীবনের সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়াই দিব্যজীবন যাপন করিতে 
পারে । “সত্যম্‌ আনন্দরূপমম্ৃতং”_-এই বলিয়া যাহার নির্দেশ করা 
হয়, তাহারই আভাস তিনি দিয়াছেন । এই জন্যই রবীন্দ্রনাথের বাণী 
পাশ্চাত্য জগতেও এত শ্রদ্ধা অর্জন করিরাছিল, এমন সাড়া 
জাগাইয়াছিল। এই জন্য রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি নহেল, তিনি 
জগদ্গুর | 


ববান্্রকাব্যের মরমবাণী 


৪ 
সুর্য্যমণ্ডলের স্বরূপ নির্ণয় করার উদ্দেশে দীপ্ত মধ্যাহহূর্ষেটর প্রতি 
দৃষ্টিপাত করিলে তাহার প্রদীপ্ত প্রভায় যেভাবে আমাদের চক্ষু ঝলসিয়া 
যায় এবং আমাদের দৃষ্টিশক্তিই সাময়িকভাবে যেন অবলুপ্ত হইয়া পড়ে, 
রবীন্দ্রকাব্যের প্রকৃতি ও লক্ষণ নিদ্ধারণ করিতে গেলেও আমাদের 
প্রায় সেই দশাই ঘটে। তীহার কাব্যের এশ্বর্ধ্য এত অধিক ও এত 
প্রোজ্জল যে, সমালোচকের বিচারশক্তি সাময়িকভাবে পঙ্গু হইয়া পড়ে, 
এবং অতিশয়োক্তির আশ্রয় লইয়া নিজের অক্ষমতা গোপন করিতে হয়। 
তাহার কাব্যে “এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে”, 
এত বিচিত্র অনুভূতি, ভাব ও চিন্তার অপরূপ ছটা আছে যে সমা- 
লোচনার মানদণ্ডে তাহাদের মূল্য নিরূপণ করা, এমন কি তাহাদের 
প্রকৃতি নিদ্ধারণ করাই ছুরূহ হইয়া পড়ে । তথাচ যেভাবে ধুত্র কাচ- 
খণ্ডের অন্তরাল হইতে দৃষ্টিক্ষেপ করিলে রবিরশ্মির তীক্ষ দীপ্তির 
প্রভাব এড়াইয়া স্র্যযমণ্ডলের অনেক লক্ষণ গোচর করা যায়, সেইভাবে 
রবীন্দ্রকাব্যের ভাব ও চিন্তার সম্পদ এবং তাহার ভাষা ও ছন্দ প্রভৃতি 
আঙ্গিকের এশ্বধ্য উপেক্ষা করিয়া যদি তাহার অন্তরের উপলব্ধি ও 
তাহার হৃদয়ের স্পন্দন বিশেষ করিয়া লক্ষ্য কর] যায়, তবে রবীন্দ্র- 
কাব্যের বিশিষ্ট প্রকৃতি ও লক্ষণগুলি নির্ণয় করা সম্ভব হইতে পারে 
এবং তাহা কেবলমাত্র আমাদের" মুগ্ধ বিষ্ময়ের উদ্রেক না করিয়া 
আমাদের বিচারশক্তিকে উদ্ুদ্ধ করিতে পারে, আমাদের রসবোধকে 
জাগ্রত করিতে পারে, আমাদের সত্যপর্শনের সহায়তা করিতে পারে। 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্মবাণী ২৫ 


রবীন্দ্রকাব্যের মধ্যে যাহা “বাহ” তাহা অতিক্রম করিয়। কাব্যের মর্্ম- 
স্থলে প্রবেশ করিতে না পারিলে আমাদের পক্ষে রবীন্দ্রকাব্যের চষ্চা 
বহুল পরিমাণে ব্যর্থ হইবে । 


(২) 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্্কিথা কি তাহা নির্দেশ করার চেষ্টা অনেকে 
করিয়াছেন । এমন কি রবীন্দ্রনাথ নিজেও বাদ যান নাই । কিন্ত 
সমালোচক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও 
ব্বীকার করিতে হইবে যে, কবি রবীন্দ্রনাথকে সমালোচক রবীন্দ্রনাথও 
সম্পূর্ণ আয়ত্ত করিতে পারেন নাই । রবীন্দ্রকাব্যের সমস্ত পবের্বই 
“সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন স্বর” এই একটি মাত্র মূল 
স্বর ধ্বনিত হইতেছে, অথবা “বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়” 
ইহাই রবীন্দ্রকাব্যের মর্ম্মবাণী,_ইত্যাঁক।র উক্তি ভ্রান্ত না হইতে পারে, 
কিন্তু ইহাতেই রবীন্দ্রকাব্যের বিশিষ্ট তত্টি ধরিতে পারা যায় না। 
সীমার মাঝে অসীমের সুরের ঝঙ্কার আরও অনেক কবি উপলব্ধি 
করিয়াছেন, ইংরেজী কাব্যের ইতিহাসে রোম্যান্টিক যুগের অনেক 
কবিই তো তাহ! করিয়াছেন, কিন্ত তাহাদের কাব্যের মন্ম্মকথা এবং 
রবীন্দ্রকাব্যের মন্মকথা ঠিক এক বলিয়া আমাদের মনে হয় কি? 
“বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সেআমার নয়” একথা ব্রাউনিং-এর কাব্যেরও 
বাণী, তত্রাচ রবীন্দ্রনাথ ও ব্রাউনিং এই উভয়কে আমরা সহোদর 
ভাই বলিয়া বিবেচনা করিতে পারে না। স্বৃতরাং “এহ বাহা, আগে 
কহ আর” এই কথাই বলিতে ইচ্ছা! হয়। রবীন্দ্রকাব্যে ভারতবর্ষের 
সনাতন সাধনার বাণী ব্যক্ত হইয়াছে, এবম্বিধ মত শুনিলেও অতৃপ্তি 
জন্মে। যদি ধরিয়াও লওয়া যায় যে, নানা বিরোধী আচার ও সাধন- 


২৬ কবিগুরু 


মার্গ ভারতবর্ষে প্রচলিত ও পরিগৃহীত হওয়া সত্বেও ভারতের সাধনার 
একটি সনাতন আদর্শ আছে, তবে তাহার বাণী কি বৈরাগ্য সাধনে 
মুক্তিরই উপদেশ দেয় মা? “উবর্ধশী” ও “শেষের কবিতা” যদি রবীন্দ্র- 
নাথের লক্ষণীয় রচনা হয়, তবে তাহার সাঁহত ভারতের সনাতন সাধনার 
আদর্শের সামপ্ডস্য কোথায়? 


(৩) 


ছন্দ, ভাষা ও নানা কবিকল্পনার হ্যায় নানা ভাব ও চিন্তা কাব্যের 
বহিরঙ্গ মাত্র । কোন কবির ভাব ও চিন্তা সঙ্কলন করিলেই তাহার 
যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায় না, তাহার কাব্যের যথার্থ রস বা আবেদন 
কি তাহা ধরিতে পারা যায় না, তাহার কাব্যের মধ্যে উৎকৃষ্ট ও 
অপকৃষ্টের পার্থক্য বিচার করা যায় না। কাব্য একটা স্ষ্টি, তাহারও 
একটা আত্মা আছে; সে আত্মা “ধ্বনি” বা অন্য যাহা কিছু হোক, 
সেই আত্মার জন্যই কাব্যের মূল্য। কাব্যের সমস্ত উপাদান সেই 
আত্মার দ্বারাই বিধুত, তাহার সঞ্ভীবনীশক্তির প্রভাবেই ভাষা ইত্যাদি 
কাব্যের উপাদান অলৌকিক মহিমায় উদ্ভাসিত হয় । আবার কবিই 
কাব্যের জননী, কাব্যের আত্মা কবির আত্মা হইতেই উদ্ভূত, উভয়ের 
মধ্যে নাড়ীর সংযোগ আছে, কবির অন্তরের স্পন্দনই কাব্যে প্রাণ 
সঞ্চার করে । যেখানে এই আত্মার প্রকাশ আছে সেখানেই কাব্য 
সার্থক ; যেখানে এই স্পন্দনের অভাব বা যেখানে এই স্পন্দন ক্ষীণ, 
সেখানে কাব্য নানালঙ্কৃত সারগর্ভ রচনা হইতে পারে কিন্তু প্রাণহীন 
ও নিরর্থক । এই জন্য 110011১07-এর 7,06০8-98,6০7৪ সার্থক 
কবিতা এবং 10.51]3 ০0? 01)8 176 চিন্তিত রচনা হইলেও কাব্য 
হিসাবে ব্যর্থ । আবার কবি 1:927)507-এর যথার্থ পরি৯য় পাইতে 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্মরবাণী ২৭ 


হইলে তাহার নৈতিক আদর্শ, তাহার সামাজিক ও রাস্থীয় লক্ষ্য, 
তাহার ধর্মমত, এমন কি তাহার কাব্যের দার্শনিক তত্ব দেখিলেই 
চলিবে না, তাহার কাব্যের প্রাণস্পন্দন কোথায় তাহ! দেখিতে হইবে । 
হয়ত সেই প্রাণের স্ম্পষ্ট পরিচয় আমরা পাইব 07058177669 ০০ 
অর্থবা 7983, $016 €9৪,:৪ প্রভৃতি স্বল্পপরিসর কবিতায়, চ81709698 
বা [9113 ০ 05 1115 প্রভৃতি সুদীর্ঘ নানাতত্বময় কাব্যে নয়৷ 
কবি ও কাব্যের সত্য পরিচঘ পাইতে হইলে বা৷ রসগ্রহণ করিতে হইলে 
কাবোর ভাব ও তত্তের অন্তরে যে প্রাণস্পন্দনটুকক আছে তাহা আমাদের 
লক্ষ্য করিতে হইবে 1 রবীন্দ্রকাব্যের ত্বরূপ বুঝিতে হইলে এইভাবেই 
আমাদের অগ্রসর হইতে হইবে । 


(৪) 


এইভাবে যদি আমরা ববীন্দ্রকাব্যের মর্মোদঘাটন করার চেষ্টা 
করি, তাহা হইলে যাহা পাইব তাহা কোন ধন্মমত নয়। কোন 
দার্শনিক তত্ব নয়, কোন আদর্শ নয় । আমরা পাইব এক অসাধারণ 
মানব আত্মার নিগুট় সত্য, তাহার হৃদয়ের স্পন্দন। রবীন্দ্রনাথ 
ঝধি ছিলেন কি না, কোন অপৌরুষেয় সত্য তিনি নিরীক্ষণ ও প্রচার 
করিয়াছিলেন কিনা, তিনি হস্তামলকবৎ শ্রহ্মকে উপলব্ধি করিতে 
পারিয়াছিলেন কি না_-এ সমন্ত তর্কে প্রবৃত্ত হইব না। আমরা 
তাহার কবি-হ্দয়ের যথার্থ প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি বুঝিবার চেষ্টা করিব । 
তাহার মনোমুকুরে কোন কোন তত্ব প্রতিভাত হইয়াছিল এবং সেই 
প্রতিভাসের মূল্য কি, তাহার মধ্যে কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যা, 
এ সমস্ত আলোচনা বর্তমান প্রসঙ্গের মধ্যে আনিব না। 

এই প্রসঙ্ে কবি 1'6575890-এর কথা আর একবার উত্থাপন 


২৮ কবিগুরু 


করিব ॥ রবীন্দ্রনাথ '['625012-এর অন্নুরাগী ভক্ত ছিলেন, তাহাব 
কবিপ্রকৃতির সহিত 1101015)800-এর যথেষ্ট মিল ছিল। আধুনিক 
যুগের সমালোচকেরা.1[911)580:0-এর কাব্যের মর্মোদ্বাটন করিয়া 
পাইয়াছেন কোন দাঁশনিক তত্ব বা আদর্শবাদ নহে, পাইয়াছেন এক ভীত 
নি:সঙ্গ মানবাত্মার আর্ত ক্রন্দন । অজানা জগতের গোধুলিময় 
প্রান্তে দাড়াইয়া কবির চিত্ত শিহরিয়া উঠিয়া অস্ফুটন্বরে বলিতেছে-_ 
“হারিয়ে গেছি আমি” ; সেই হারিয়ে যাওয়া আত্মার আর্তনাদ ও 
শিহরণ-ই '[0107301)-এর কাব্যের মন্ম্রকথা | 

রবীন্দ্রনাথের কাব্যের নানা ভাব, চিন্তা, আদর্শ ইত্যাদির মুলে 
আছে একটা বিশিষ্ট অনুভূতি ও আকৃতি | তাহার প্রায় সমস্ত কাব্য, 
মৌলিক ও লক্ষণীয় গগ্ রচনা, নাটক, এমন কি তাহার চিন্তাধারার 
মধ্যে ইহা গানের রেশের ন্যায় ঝঙ্কৃত হইতেছে ! ইহাই তাহার গান, 
তাহার সাহিত্য ও তাহার চিত্রের ঘুল স্বর | এখানেই রবীন্দ্রপ্রতিভার 
সত্য ও সার্থক পরিচয় । 


(৫) 


রবীন্দ্রচিত্তের এই বিশিষ্ট অনুভূতির সন্ধান পাওয়া যায় রবীন্দ্র- 
সঙ্গীতে | ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে রবীন্দ্রসঙ্গীত যে একটা অভিনব 
স্বষ্টি, বাঙলার রামপ্রসাদী সঙ্গীত বা কীর্ভনের মত ইহার যে একটা 
নিজন্ব অতুলনীয় আবেদন আছে তাহা সকলেই জানেন ও স্বীকার 
করেন । এই সঙ্গীতের মধোই যে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব প্রতিভার, 
তাহার রসোপলন্ধির সব্বাপেক্ষা সহজ ও স্বাভাবিক প্রকাশ তাহা 
রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলিয়াছেন এবং রবীন্দ্রকাব্যরসিক মাত্রেই স্বীকার 
করেন। সুতরাং এই রবীন্দ্রঙ্গীতের বিশিষ্ট প্রকৃতি কি তাহা অস্থু- 


রবীন্দ্রকাব্যের মর্্মবাণী ২৯ ৮৫ 


ধাবন করিলে রবীন্দ্রচিত্তের বিশিষ্ট অন্নৃভূতি কি তাহা নির্ণয় করার 
স্ববিধা হইবে | 

সঙগীতকলার দিক্‌ দিয়া রবীন্দ্রসগীতের গঠনকৌশলের মধ্যে কি 
কি বৈশিষ্ট্য আছে তাহা সঙ্গীতাচার্যযদিগের আলোচ্য বিষয়। মার্গসঙ্গীত- 
বিশারদগণের মতে রবীন্দ্রস্গীতে মাধুর্য থাকিলেও রাগ-রাগিনীর 
শুদ্ধ রূপ রক্ষিত হয় নাই । তীহার প্রায় সমস্ত সঙ্গীতই মিশ্র-জাতীয় | 
এই সম্পর্কে বল! যাইতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথের শিল্পকল! সর্ববিধ 
একদেশদশিতার বিরোধী, বৈচিত্র্যের সন্ধানই তাহার ধর্ম, সমন্বয়ই 
তাহার লক্ষ্য । সনাতন রাগ-রাগিনীর মধ্যে একটা স্ুমহৎ অথচ 
একান্তবর্তী ভাববিলাস আছে, উদ্ধলোকেই তাহার যথার্থ স্থানঃ 
বাস্তব জীবনের সহিত তাহার সঙ্গতি নাই, রবীন্দ্রপ্রতিভা কখনও 
তাহাতে সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করিতে পারে না এবং সেই পরিসরে 
আবদ্ধ থাকিতে পারে না। যাহ। হউক এখানে সেই সঙ্গীতের 
আবেদনই আমাদের বিবেচ্য । রবীন্দ্রসঙগীতের রস যখন আমাদের 
চিত্তে অনুপ্রবিষ্ট হয়, তখন মনে একটা “বেদনাবিধুর” অথচ অভিনব 
পুলকমিশ্র বেপথুময় ভাবের সঞ্চার হয়। মনের অনাবিষ্কত কোমল 
পর্দা গুলির উপর অতি স্থক্ম অঙ্গুলিক্ষেপণ করিয়া যেন কোন “অলক্ষ্য 
স্রন্দরী” আমাদের “হৃদয়গহনের দ্বার” ঈষৎ উন্মোচন করিয়া দেয় । 
সেই রহম্যঘন রসলোক হইতে এক অপাথিব মাধুর্যের আভাস 
আমাদের চিত্তকে স্পর্শ করিয়া উদ্‌ত্রাস্ত করিয়া তোলে । এক 
বিশ্ৃতপ্রায় বিরহ-বেদনা যেন মনকে আকুল করিয়া তোলে ; এ বিরহ 
কাহার জন্ঠা তাহা নির্দেশ করা যায় না, মনে হয় সেই “অজানা” 
“গানের ওপারে” থাকিয়া বীণা বাজাইতেছে ; এবং “সহসা এ জগৎ, 
ছায়াবৎ হয়ে যায় তাহারি চরণের পরশের লালসে”-_ আমাদের প্রাণে 


৩০ কবিগুরু 


রহিয়৷ যায় শুধু একটা উন্মুখ ব্যাহত “চঞ্চলতা” এবং তাহার ফলে 
একটা ছন্দের আন্দোলন ও আবর্তন। একটা অতি-কোমল, স্থুল- 
হস্তের স্পর্শকাতর, রহস্যোন্ুখ, ছন্দোবিলমিত অধীরতা কম্পিত 
দীপশিখার মত শিহরণ করিতে করিতে একটা পরিক্ষীয়মাণ মুচ্ছনার 
মধ্যে বিলীন হইয়া খায়, রাখিয়া যার একটা অতৃপ্ত স্পন্দন । এ যেন 
প্রণয়োন্মুখ বিরহখিন্ন তরুণীচিত্তের স্বতঃপ্রকাশ | 


(৬) 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্স্থলে প্রবেশ করিলে যে কেন্দ্রীয় উপলন্ধির 
পরিচয় পাওয়া যায়, তাহ। রবীন্দ্রসঙ্গীতেরই অনুরূপ । নানা কবিতায় 
নানা ভাব ও আদর্শের সহযোগে ইহা ব্যক্ত হইয়াছে, যথেষ্ট উদ্ধৃতির 
দ্বারা তাহা পরিস্ফুট করা এ প্রবন্ধের পরিসরের মধ্যে সম্ভব নহে । তবে 
তাহার শেষ বয়সের একটি লেখা হইতে কয়েকটি পংক্তি এখানে উদ্ধৃত 
করিতেছি, রবীন্দ্রনাথের কাব্যের মর্মস্থলে ষে অনুভূতি আছে তাহা 
শুদ্ধরূপে এখানে পরিব্যক্ত হইয়াছে । 
“একদিন নিমফুলের গন্ধ অন্ধকার ঘরে অনির্বচনীয়ের আমন্ত্রণ 
নিয়ে এসেচে ; 
মহিষী বিছানা ছেড়ে বাতায়নের কাছে এসে দাড়ালো, 
মাহষীর সমস্ত দেহ কম্পিত, 
ঝিল্লী-বঙ্কৃত রাত, 
কৃষ্ণপক্ষের চাদ দিগন্তে ।” 
( শাপমোচন-_ পুনশ্চ ) 
একটু বিশ্লেষণ করিলে এখানে রবীন্দ্রকাব্যের অনেকগুলি বিশিষ্ট লক্ষণের 
পরিচয় পাওয়া যাইবে । 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্্বাণী ৩5 


(ক) “অনিরর্বচনীয়ের” উপলব্ধি 

এই লক্ষণটি রবীন্দ্রসাহিত্যে সকলেই লক্ষ্য করিয়াছেন এবং 
ইহাকেই সাধারণতঃ “অসীমের স্ুর' ইত্যাদি কথার দ্বারা নির্দেশ করা 
হয়। কিন্তু শুধু অনিরর্চনীয় বা অসীম ইত্যাদি নেতিবাচক শব্দ দ্বারা 
ইহার স্বরূপ ঠিক ব্যক্ত করা যায় না । “অবাউ মনসোগোচরম্” বলিতে 
সাধুসন্তরা যাহা বুঝিতেন, সে উপলব্ধি এখানে নাই. । 

৫010 70098 6178 21)6269৮ 0109576] 108, 019৬9 ০092 1৮9 

[10007696196 009 06610 119 6০9০ 99610 [শে 692,8১৮ 
এ কথায় ৮০0709৮০011, হাসিকান্নার সীমান। ছাড়াইয়া৷ যে উপলন্ধির 
আভাস দিয়াছিলেন, তাহাঁও এখানে নাই । রবীন্দ্রনাথের কাব্যে 
যে মুক্তির কথা আছে, সে মুক্তি ভোগেরই উধ্বগে সংস্করণ 
(8010170)95107) | “যে কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে গদ্ধে গানে” তাহারই। 
উপর ইহা প্রতিষ্ঠিত ; “এই বস্ধার মৃত্তিকার পাত্রখানি” সেই আনন্দের 
রসে পরিপূর্ণ । সংসারের ক্ষুদ্র বৃহৎ কর্মে সংসারের নানা স্খ-ছুঃখময় 
অভিজ্ঞতার স্পর্শে সেই আনন্দ বিধৃত । এক কথায় বলিতে গেলে, 
তাহ! বস্তর মধ্যে রসের উপলব্ধি, একপ্রকার 1)181)97 ৪9৪01)9- 
6101970. “রসো বৈ সঃ” ব্রহ্ষের এই পরিচয়ের উপরই রবীন্দ্রনাথ বার 
বার জোর দিয়াছেন, কিস্তু “রস” কথাটি বৈষ্ণব মহাজন ও অন্যান্য শাস্ত্র 
কারেরা যে অর্থে গ্রহণ করিয়াছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সে অর্থে গ্রহণ করেন 
নাই । বৈষ্ণবদের “শুদ্ধা ভক্তি”র ম্যায় ইহা কোনরাপ “শুদ্ধা” কিংবা 
নিরপেক্ষ উপলব্ধি নহে । ইহার সহিত সাংসারিক বস্তঃ বিষয় ও 
ব্যবহারের একাস্ত ও অত্যন্ত সংযোগ আছে, এবং এই সংযোগই 
রবীন্দ্রনাথের কাব্য ও দর্শনের প্রধান তত্ব । ইহা সত্যই “দেবতারে 
প্রিয়” করিতে পারে কিন! তাহা সন্দেহের বিষয় ; তবে ইহ] *প্রিয়েরে 





৩২ কবিগুরু 


দেবতা” করিয়া তোলে তাহা নিশ্চিত। ইহা দ্বারা ৪1)0৮1790319 
০: 19 ৪/618610 10061 সাধিত হয় অর্থাৎ রসবৃত্তিতেই দৈবীভাবের 
সঞ্চারণ কর৷ হয়। অতি শৈশবে যখন তিনি “জল পড়ে-_পাতা 
নড়ে” এই সরল বাক্য দুইটি হইতে কাব্যদীক্ষা পাইয়াছিলেন অথবা 
খিড়কীর বাগানে নবধারাবর্ষণের দৃশ্য জানালার খড়খড়ির ভিতর 
দিয়া দেখিয়া! অনির্বচনীয় পুলক অন্নুভব করিয়াছিলেন, সেই সময় 
হইতে তাহার এই রসোপলব্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। সাধারণ 
অনুভব অপেক্ষা এই উপলব্ধি বহুগুণে তীব্র, প্রগাঢ়, ব্যাপক ও 
মর্মস্পর্শা । এই রসান্ৃভৃতির প্রবণতা ছিল বলিয়াই “যা দেখেছি 
যা পেয়েছি তুলনা তার নাই”, “মধুময় এ পৃথিবীর ধুলি”__এই স্বীকৃতি 
তাহার জীবনের শেষকথা | 

তবে এই সম্পর্কে একটা কথা প্রণিধানযোগ্য । যদিও এই! 
রসোপলন্ধির সহিত সাংসারিক কর্মময় জীবনের সংযোগ আছে, সে 
কর্মের পরিধিতে এই উপলব্ধি সীমায়িত নহে । “অজজ্ম সহত্রবিধ 
চরিতার্থতা”র কথা রবান্দ্রকাব্যে সাংসারিক জীবনের আদর্শ হিসাবে 
স্থান পাইয়াছে বটে, কিন্তু যে বিশিষ্ট অনুভূতির স্পন্দন রবীন্দ্রকাব্যের 
মন্মস্থিলে আমরা পাই* তাহার উৎস বাস্তব জীবনের বিস্তৃতির মধ্যে 
নহে, ভাবের গোপন নিবিড়তার মধ্যে । রোম্যান্টিকভার উচ্চতম 
পর্দাতেই রবীন্দ্রকাব্যের সুর বাধা । ভাবাবেশেই তাহার চরিতার্থতা। 
«মোর কিছু ধন আছে সংসারে, বাকি সব ধন স্বপনে, _নিভূভ 
স্বপনে,” ইহাই কবির স্বীকৃতি । রবীন্দ্রনাথের কাব্য ও নাটকে যে যে 
চরিত্রের মধ্যে কবির বিশিষ্ট মনোবৃত্তি প্রকাশ পাইয়াছে, তাহারা 
সংসারে থাকিয়াও সংসার-বিমুখ ; “ছুয়ে থেকে ছলে শিশির খেমন 
শিরীষ ফুলের অলকে” সেইভাবেই তাহারা জীবনযাপন করিতে চায় । 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্ম্বাণী ৩৩ 


সংসারে তাহার! রসোপলব্ধির স্বযোগই খু'জিয়া থাকে, “কর্ম্মবন্যার 
উচ্ছলিত তত” বা “মহাবিশ্ব-জীবনের তরঙ্গ” হইতে একান্তে 
থাকিয়। “চক্ষে স্বপ্াবেশ” লইয়া বাশি বাজাইতে বাজাইতে সংসার- 
সীমা ছাড়াইয়া “রসলোকের একান্ত সুদূরে” চলিয়া যাইবার দিকেই 
তাহাদের প্রবৃত্তি । “মালঞ্চের মালাকর”* “ব্রজের রাখাল বালক”, 
ঠাকুরদা, বাউল, পঞ্চক, “ডাকঘরে*র অমল প্রভৃতি চরিত্রেই রবীন্দ্র- 
কাব্যের মর্ম্মবাণী ফুটিয়া উঠিয়াছে। এমন কি “যোগাযোগের হ্যায় 
বাস্তবধন্মী উপন্যাসের নায়িকা কুমুও সাংসারিক গ্রানির মধ্যে গীতবা্ভের 
রসেই শাস্তি ও জীবনের সার্থকতার সন্ধান পাইয়াছে | 

এই: “একান্ত স্তর” সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের ধারণা স্স্পষ্ট নহে এবং 
হইতেও পারে না, কারণ ইহা অনির্বরচনীয়। ইহার কয়েকটি লক্ষণ 
রবীন্দ্রনাথের চিত্তে প্রতিভাত হইয়াছিল । 

প্রথমতঃ, ইহা রহস্যময়, ইহার নিদিষ্ট রূপ নাই, ইহার ব্বরূপ 
নির্ণয় করা যায় না। 

দ্বিতীয়তঃ, ইহার মধ্যে একটা! ব্যক্তিত্ব, একটা ইচ্ছাশক্তির ক্রিয়া 
দেখিতে পাওয়া যায় । ইহাকে জীবনদেবতা৷ বা এবংবিধ নামে অভিহিত 
করা যাইতে পারে । কবিকে লইয়া ইহা নানাভাবে লীলা করিয়া 
থাকে, কখনও বা কঠোর স্বামিনীর মত, কখনও বা প্রণয়ীর মত, কখনও 
বা সখীর মত ইহা ব্যবহার করে; কিন্তু চিরদিনই ইহা “হাসালো, 
কীদালো, চিরদিন দিল ফাঁকি”। ইহার সম্বন্ধে কোন সুস্পষ্ট দার্শনিক 
প্রত্যয় বা প্রাচীন যুগের সাধকদের ন্যায় কোন প্রত্যক্ষ দৃষ্টি কবির 
নাই । 
এই *ক্কীকিই” রবীন্দ্রনাথের সাধনার শেষ কথা । যে জিজ্ঞাসা 
ভাহার অন্তরে জাগ্রত হইয়াছিল শেষ পর্য্যস্ত তাহার “মেলেনি উত্তর”, 


ঘ-_-৩ 


৩৪ কবিগুরু 


অন্ত রহস্য তাহার কাছে কখনই হস্তামলকবৎ হয় নাই । অনিশ্চয়ের 
দোছুল স্থত্র অবলম্বন করিয়া তাহার ভাবাবেগ উচ্ছৃসিত হইয়াছে । 

তৃতীয়ত, এই অনির্ধচনীয়ের প্রকাশ সুন্দরের মধ্যে; সে সৌন্দর্য্য 
বিশ্বপ্রকৃতির প্রায় সব্ধবত্র-_তাহার রুদ্র ও কান্ত, স্তব্ধ ও উদ্দাম সমস্ত 
রূপে এবং মানবচরিত্রের স্ুকুমারবৃত্তির মধ্যে প্রকাশিত। এই 
সৌন্দর্য্যের কয়েকটি লক্ষণ হইল সৌষম্য, সামঞ্জস্, সমন্বয় এবং তাহার 
সহিত কমনীয়তা । রমণীর রূপ ও প্রকৃতি সেই অনস্ত রহস্যময় 
সৌন্দর্য্যের মূর্ত প্রকাশ ও প্রতীক ; “রমণীরূপে আপন মাধুরী আপনি 
বিশ্বের নাথ করিছেন চুরি”, “রমণী ক্ষণকাল” আমাদের পাশে আসিয়া 
সেই প্রহস্ত-আ সে” চিত্ত ভরিয়া দেয়। এইজন্য রবীন্দ্রকাব্যে 
শুধু স্বর্গের “অনম্তযৌবনা উব্বশী” নহে, পৃথিবীর প্রতিবেশিনী 
“পঞ্চদশী” কিশোরীও অনির্বচনীয়ের আত্বাদ আনিয়া দিয়াছে । 
এইজন্য “নরনারী-মিলন মেলায়” যে প্রেমের মাল্য গ্রথিত হয়ঃ রবীন্দ্র- 
সাহিত্যে তাহার বিশেষ একটা মূল্য আছে, এই বরমাল্য বধুর জন্য 
রচিত হইলেও তাহা জীবনদেবতারই কণ্ঠে অপিত হয়। প্রেমই 
বন্তিকাহস্তে আমাদিগকে সসীম হইতে অসীমের “নিশীথ-অন্ধকার” 
পথে লইয়া যায়। কিন্তু এই প্রসঙ্গে একটা কথা আমাদের স্মরণ 
রাখিতে হইবে যে, ব্রবীন্দ্রকাব্যের প্রেম ধরাছোয়ার প্রেম নহে, তাহা 
একটা চিরন্তন মানসিক অভিসার; তাহার “একটুকু ছোঁওয়া”' 
আমাদের মনে “ফাল্ভনীর” মাধুর্য স্থপতি করে, অনন্তের আভাস 
আমাদের মনে আনিয়া দেয় । এই ম্বপন-বিহারী প্রেমেরই জয়গান 
রবীজ্দকাঁব্যে ধ্বনিত হইয়াছে । 

রবীন্দ্রনাথ অধীম ও অনির্বচনীয়ের প্রকাশ কেবল যে প্রকাতির 
ও জীবনের নান! সৌন্দর্য্যের মধ্যে লক্ষ্য করিয়াছেন তাহা নহে, মানব- 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্মবাণী ৩৫ 


চরিত্রে পৌরুষের লীলার মধ্যেও তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। মানুষ 
যখন কর্তব্যের আহ্বানে, মহত্বের প্রতি একান্তিক নিষ্ঠায় “বজ্রাদপি 
কঠোর” হয়, লাভালাভ (উপেক্ষাপুর্র্বক সক্কোচের বিহবলতা ও সঙ্কটের 
ভয় দমন করিয়া ছুদ্দিনের বারিধারার মধ্যে অবিচলিতচিত্তে অগ্রসর 
হয় তখন মানবের মধ্যেই সেই অসীমের আবির্ভাব দেখিতে পাওয়া! 
যায়। 

শুধু জগৎ ও মানবজীবন নহে, স্ৃত্যুর বিরাট অন্ধকারের মধ্যেও 
রবীন্দ্রনাথ অনির্বচনীয়কে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন । মৃত্যু আমাদিগকে 
সাধারণ জীবনের ধুলিমলিন ক্ষুদ্রতা হইতে উদ্ধার করিয়৷ অনন্তের 
কোলে আশ্রয় দেয়; নিশীথিনীর মৌন স্তবন্ধতা ও রহস্তময় ইঙ্গিত 
আমাদের মনে. যে সত্যের আভাস আনিয়। দেয়, সেই সত্যের পারা- 
বারে আমরা বিলীন হইতে পারি জীবনক্রোতের মোহানা মৃত্যুকে 
অতিক্রম করিয়াই । এইজন্য সৌন্দর্য্যের পূজারী রবীন্দ্রনাথ মহাকালের 
একান্ত ভক্ত । “অতি নিবিড় ঘন তিমিরে” আচ্ছন্ন একটা গোপন 
স্তব্ধতা রবীন্দ্রকাব্যের ঈশ্সিত অনির্বচনীয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষণ, 
মৃত্যু আমাদিগকে সেই বিরাট স্তন্ধতার অংশভাগী করে বলিয়াই তাহা 
রবীন্দ্রনাথের কবিচিত্তকে এত আকৃষ্ট করে । 


(৭) 
(খ) ছন্দঃস্পন্দন । 
যে বিশিষ্ট রস রবীন্দ্রনাথের কাব্যে পরিব্যাপ্ত তাহার পরিচয় 
একপ্রকার ছন্দোময় স্পন্দনে । রসোপলব্ধিতে এই স্পন্দন রবীন্দ্রনাথের 
কাছে অপরিহার্য্য ৷ রবীন্দ্রকাব্যে যেখানেই কোন রসোপলব্ধির কথা, 
কোন মহান্‌ বা অনির্ব্চনীয় অনুভূতির কথা আছেঃ (সেখানেই রক্তের 


৩৬ কবিগুরু 


দোলা, বক্ষের স্পন্দন, অন্তরে অন্তরে শিহরণ ইত্যাদির উল্লেখ আছে । 
বীণাতন্ত্রীর বা আবেগপ্লত কণ্ঠম্বরের বিকম্পনের সহিত ইহা তুলনীয় । 
এমন কি যখন তিনি প্রকৃতির মধ্যেও একটা লীলারস বা মহত্তর 
আবির্ভাব লক্ষ্য করিয়াছেন, তখনও তিনি সেখানে লক্ষ্য করিয়াছেন 
এই স্পন্দন | সন্ধ্যার অন্ধকারে ঝিলমের তীরে গিরিশ্রেণী ও দেওদার- 
বন শিহরিয়া উঠিতেছে, “ব্যোমে মহাকাল ছন্দে ছন্দে” তাল দিতেছেন, 
“দশদিকৃবধূ খুলি কেশজাল” নৃত্য করিতেছেন । কবিহৃদয়ও “ম্বদূরের 
পিয়ামী", এইজন্য চিরচঞ্চল | 

বস্তবিশেষকে আকড়াইয়া স্থিতি বা আসক্তিই, কবির মতে, 
আধ্যাত্মিক অপমৃত্যু । কিন্তু মাত্র উদ্দাম উধাও চঞ্চলতাকে রবীন্দ্র- 
নাথ কখনও খুব উচ্চ স্থান দেন নাই; যে চঞ্চলতা সৌন্দর্য্যের 
অভিব্যক্তি, যাহার আন্দোলন ও আবর্তন আমাদের রসান্বৃভৃতির 
প্রতীক, যাহ ছন্দোময় তাহাকেই রবীন্দ্রনাথ শ্রেষ্ঠ আসন দিয়াছেন | 
ছন্দোময় গতির নামই নৃত্য, এইজন্য নৃত্যচ্চাকে রবীন্দ্রনাথ এত 
মূল্যবান মনে করিতেন। এমন কি নৃত্যেই তিনি মুক্তির রূপ 
এবং এই বিশ্বের অধিদেবতার ছায়া প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন । কোন 
বস্তরতেই আসক্ত ন! হইয়া বিষয় হইতে বিষয়াস্তরে প্রগতি এবং এই 
প্রগতির দ্বারাই চিরস্ৃন্দরের মাধুর্য জীবনে উপলব্ধি, পুলকমিশ্র 
চাঞ্চল্যের প্রভাবে বস্তকে বারংবার স্পর্শ করিয়াও তদৃদ্ধে অবস্থিতি 
ও তদ্দারা জীবনুক্তির হিল্লোলের অনুভূতি, সমগ্র সত্তাকে মথিত 
করিয়া এক অপুবর্ব পুলকের স্থষ্টি-__এ সমস্তই নৃত্যের এবং রবীন্দ্র- 
নাথের মতে মুক্ত মহাজীবনের লক্ষণ । এইজন্য রবীন্দ্রনাথের দেবতা 
নটরাজ ; সমগ্র দেহ, মন ও জীবনের ছন্দ দিয়া “নটার পুজা”ই তাহার 
বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ পৃজা। এমন কি যে স্তন্ধতা অনির্বচনীয়ের একটা! 


রবীন্দ্রকাব্যের মন্মবাণী ৩৭ 


পরিচয়, সেই “্তন্ধতার ঢাকা” খুলিয়া ফেলিলে পাওয়া যাইবে একটা! 
স্পন্দন । আধুনিক পদার্থতত্ব-ও পদার্থের স্বরূপ উদঘাটন করিতে 
গিয়া শেষ পর্য্যস্ত পাইয়াছে একটা স্পন্দন। এই ছন্দঃস্পন্দনই রবীক্দর- 
কাব্যের মর্মকথা | 


(৮) 


রবীন্দ্রকাব্যের মর্মস্থলে প্রবেশ করিবার চেষ্টা করিয়া আমরা 
পাইলাম একটা বিশিষ্ট সুর ও তাল । সেই: সুর রবীন্দ্রসঙ্গীতেও আমর। 
পাই। ইহা আমাদের মনে আনিয়া দেয় একট! অনন্ত রহস্যবোধের 
সহিত একপ্রকার উন্মুখ স্বপনচারী রূসঘন বেপথুময় ভাব। আর 
যে তালে রবীন্দ্রকাব্য ধ্বনিত হইতেছে, তাহা নটরাজের নৃত্যের তাল ; 
তাহা আমাদের আত্মাকে কর্বন্ছল জীবনেই ছন্দোবিলাসের পথে 
জীবস্মুক্তির সন্ধান দেয়। এই স্বরে ও তালে রবীন্দ্রনাথ স্থষ্টি 
করিয়াছেন এক গীতমুখর গন্ধবর্বলোক ; তাহা ন্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যে 
একটা অপরূপ সেতু রচন! করিয়াছে, তাহা ইন্দ্রধন্ুর রঙে উজ্জল ও 
শেষবর্ষণের রসে স্িগ্ধ। এই সেতুপথে 

পুষ্পমাল্যমাঙ্গল্যের সাজি লয়ে সপ্তষষির দলে 
কবি সঙ্গে চলে ।” * 


* রবীন্দ্র-মানসের সম্যক পরিচয় দিতে হইলে আরও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, 
এই পরিচ্ছেদের সঙ্কীর্ণ সীমার মধ্যে তাহা সম্ভবপর নহে । ববীন্দ্র-প্রতিভার অপর একটি বিশিষ্ট 
ষ্টি_ভাহার চিত্রকলার স্বরূপ হাদয়ঙগম না কৰিলে রবীল্দরম'নসের রহন্তের পরিচয় পাওয়া যাক 
না। বাহাতঃ রবীন্দ্রনাথকে সহজ মানুষ বা কাছের মানুষ বলিয়া! মনে হইলেও আসলে 
চিরদিনই তিনি ছিলেন অ-সাঁধারণ, অন্তরের মৌন রহত্তে মগ্ন । তাহার ম্যায় কবি-ই আত্ম 
পরিচয় উপলক্ষে বলিতে পারেন-_- 


রবীন্্র-মানমের ত্রিখার। 
(১) 
রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার স্বরূপ উপলন্ষি করিবার জন্য ধীহারা প্রয়াস 
করিয়াছেন, তাহাদের প্রতোকের নিকট একটি লক্ষণ প্রথমেই স্পষ্ট * 
হইয়। উঠিয়াছে ই তাহা হইতেছে রবীন্দ্র-প্রতিভার বৈচিত্র্যমুখিতা । 
তাহার এই বৈচিত্র্যমুখিতার জন্য তাহার প্রতিভা জীবনে নানা বিভিন্ন- 
রূপে বিকশিত হইয়াছে । কখনও তিনি সঙ্গীতসাধক, কখনও তিনি 
দেশনায়ক ; কখনও তিনি রেখা ও রঙের অদ্ভুত বিলাসী চিত্রকর, 


2503 0061 102001302৮০] 10৩ 
190 ৬৩ 0৬/0]1]5 10 002 07062101106 00. 31176175, 
4৯ 1205 21021 000) ৩০৮? 


সম্ভবতঃ তাহার অন্তঃকরণের রহস্ত তিনি নিজেও সম্পূর্ণভাবে জানিতেন না, এই জঙ্যই 
তিনি বলিয়াছেন-_ 
আমি--কাঁন পেতে রই আমার আপন হৃদয়গহন-দ্বাবে 
কোন্-_গোঁপনবাসীব কান্নাহাসিব গোপন কথ! শুনিবাবে । 
ভ্রমর সেথায় হম বিনাগি নিভৃত নীলপয্ম লাগি 
কোন্-বাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে । 
মহাপুরুধদেব হৃদযগহনেধ বহস্ত উদঘাটন কৰা ভাগীবথীব উৎস সন্ধানের ন্যায়ই দুরূহ । 
বন্ধ প্রয়াসের পব যখন যাত্রী গোমুখীব সন্নিধানে উপনীত হয, তন দেখে আর অশ্রগতি 
'অসম্ভব, যে গহন কন্দর হইতে গৈরিক জলধাবা উৎসারিত হইতেছে, তাহা মত্ত্যবাসীর পক্ষে 
অগম্য ও দৃষ্টির অগোচর। রপান্দ্রমানসের সন্ধ।নীর পক্ষেও এতাদৃশ অভিজ্ঞতা অবশ্যন্তাবী । 
[ুযোেঃ]ত৮র হ্যাষ চিব -বহস্তময় চরিত্রের ব্যাথা। সমালোচকের মন ও প্রকৃতির উপর নির্ভর 
করে। এই জন্য একজন ৫0166৩-র ব্যাখাঁব সহিত একজন ০১০০৮৮৩-র ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ 
সঙ্গতি হয় না। রবীন্দ্রকাবোর তাৎপধ্যও এই কারণেই বিভিন্ন জিজ্ঞাঙুর নিকট বিভিন্নন্রপেই 
প্রতীত হয়। 


রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধারা ৩৯ 


কখনও তিনি জীবনের যাত্রাপথে শ্বধীর পথিক 7; কখনও তিনি উদাসীন 
বাউল, কখনও তিনি সতর্ক স্ববিজ্ঞ কর্মী; কখনও তিনি মরমী 
দার্শনিক, কখনও তিনি জনসেবক ; কখনও তিনি লোকগুরু, কখনও 
তিনি হান্যরসিক ; কখনও তিনি অনাবিল সত্যের, কখনও তিনি উদ্ভট 
“খাপছাড়া”্র সন্ধানী। তাহার প্রতিভার কোনও একটা বিশেষ 
প্রকাশের মধ্যে তাহার সামগ্রিক পরিচয় পাওয়া যায় না, কোনও 
একটা স্বলভ বিশেষণ দিয়া তাহার প্রতিভার স্বরূপ ব্যক্ত করা যায় না। 
কেবল রবীন্দ্রনাথের জীবনব্যাপী কর্মের ও প্রচেষ্টার, তাহার 
চরিত্রের ও আচরণের পরিচয় নহে, তাহার কবিপ্রতিভারও পরিচয় 
দিতে হইলে অন্থ্রূপ সমস্তার সম্মুখীন হইতে হয়। তাহার কাব্য কি 
কেবল এঁকাস্তিক নিরপেক্ষ স্বয়ংসিদ্ধ রসযোগের সাধনা ? “বিনা কাজে 
বাজিয়ে বাঁশী কাটবে সকল বেলা”-ইহাই কি তাহার কাব্যের মর্ম 
বাণী? না, তিনি সমস্তাজজ্ঞর মানবজীবনের শুভসাধনার মন্ত্রদাত। 
কল্যাণব্রতী গুরু ? না, তিনি তত্বসন্ধানী দার্শনিক, বিশ্বের বিচিত্র 
লীলার মধ্যে সেই “ছুর্দর্শং গুঢ়মন্কুপ্রবিষ্টমেশর উপলদ্ধির প্রয়াসী ? 
তিনি কি চিরচঞ্চল উদ্দাম প্রাণশক্তির সাধক? তিনি কি *শান্তম্‌ 
শিবম্‌ অদ্বৈতম্”-এর প্রচারক, না, “তা-তা-থৈ-থৈ নিতিম্বত্যে”্র সাধক? 
তাহার রচনা হইতে উদ্ধতি সহযোগে ইহার যে কোনটাই প্রমাণ করা 
যায়। | 
তাহার সাহিত্যিক জীবনের বিভিন্ন যুগে তিনি যাহা রচনা 
করিয়াছেন, তাহার মধ্যেও এই লক্ষণ বিষ্ধমান । তখন “রোগশয্যায়” 
“শেষ লেখা" প্রভৃতি দার্শনিক কাব্য রচনা করিয়াছেন সেই সময়েই 
তিনি রচনা করিয়াছেন “ছড়া” কৌতুকময় খেয়ালী কবিতা 
“প্রান্তিকে”র উপনিষদৃ-তুল্য কবিতাগুলি যখন রচিত হয়, প্রায় লেই 


৪০ কবিগুরু 


সময়েই রচিত হয় খেয়ালখুমির কাব্য “ছড়ার ছবি' ও বৈজ্ঞানিক 
সন্দর্ভ “বিশ্বপরিচয়” ; আন্দামানের রাজবন্দীদের অনশন ধর্মঘট সম্পকে 
তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করিয়া রবীন্দ্রনাথ রাজনৈতিক বক্ৃতা-ও সেই 
সময়ে করেন, আবার 'বর্যামঙ্গলের' জন্য নৃতন নৃতন শিপ্ধ গান-ও রচনা 
করেন । 
একই গ্রন্থের অন্তভূক্ত এবং প্রায় একই সময়ে রচিত কবিতা- 

বলীর মধ্যেও এই লক্ষণ বর্তমান। “সোনার তরী”র বিদ্রপাত্মক 
কবিতা “হিং টিং ছট্‌” যে দিন রচিত হয়, তাহার পরের দিনই রচিত 
হয় অলৌকিক আকৃতিময় কবিতা “পরশপাথর”। যে দিন তীহার 
শ্ববিদিত সঙ্গীত-_“যামিনী না যেতে জাগালে না কেন, বেলা হল মরি 
লাজে”-রচনা করেনঃ সেই দিনই লেখেন-_ 

“অমর মরণ রক্ত-চরণ নাচিছে সগৌরবে 

সময় হয়েছে নিকট, এখন বাঁধন ছি'ডিতে হবে ।” 

(বিদায় কল্পনা ) 


(২) 


রবীন্দ্রনাথের রচনার মধ্যে এই যে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য দেখিতে 
পাওয়া যায়, তাহার ব্যাখ্যা পাইতে হইলে রবীন্দ্র-মানসের গভীরতর 
সত্যের সন্ধান কৰবিতে হইবে । এই সত্যের ভিত্তি রবীন্দ্রনাথের 
অসাধারণ ব্যক্তিত্ে। 

সাধারণতঃ প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কোন একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য 
থাকে । তাহার রুচি, প্রকৃতি, চিন্তা, লক্ষ্য ইত্যাদি হইতে এই 
বৈশিষ্টোর পরিচয় পাওয়া যায়, এবং এই বৈশিষ্ট্যই অন্যান্ত মানুষ 
হইতে তাহার পার্থক্য সুচনা করে । রামের মধ্যে রাম ত্ব বলিয়া 


রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধারা ৪১ 


একটা বৈশিষ্ট্য আছে, সুতরাং সে কদাপি শ্যাম হইতে পারে না। 
তাহার মনে একতারার একটি স্বরই বাজে; তাহার যে নিজস্ব চারিত্রিক 
ধর্ম তাহাতেই সে একনিষ্ঠ । তাহার যদি কোন রুচি-র বা প্রবণতার 
পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা হইলে অন্ততঃ তদ্িরোধী অন্য কিছু তাহার 
সম্বন্ধে প্রত্যাশা করা যায় না। 

কিন্তু শ্রীকৃষ্ণাদি এশ্বধ্যশালী পুরুষ সম্বন্ধে এ কথা সত্য নহে। 
তাহাদের বিরাট ব্যক্তিত্বের মধ্যে যেন বছবিধ ব্যক্তিত্বের সমন্বয় 
দেখিতে পাওয়া যায়। যিনি যশোদানন্দন, তিনিই পৃতনা-হস্তা ; 
যিনি গোপীবল্পভ. তিনিই কংসারি ; যিনি পার্থসারথি, ভীম্মের মতে 
তিনিই নরশ্রেষ্ঠ | অবশ্য শ্রীকৃষ্ণের সহিত এ কালের কোনও মানবের 
তুলনা হইতে পারে না। তবে মানুষের ইতিহাসে 9০৪1৪ বা 
রবীন্দ্রনাথের ন্যায় বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী যে সমস্ত পুরুষ 
আবিভূতি হইয়াছেন, তাহাদের মধ্যেও প্রতিভার ও প্রকৃতির বহুমুখিতা! 
দেখা যায়। তীহাদের মধ্যে আপাতবিরোধী বহু গুণের ও প্রবৃত্তির 
সমন্বয় হইয়াছে দেখিতে পাওয়া যায় । তাহাদের সম্বন্ধেও বলা যায় 

বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা 
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা । 

রবীন্দ্রনাথের “ধেয়ানে” বা মনের গহন-লোকে বহু সাধনার ধারাই: 
মিলিত হইয়াছিল, নানা প্রবণতার সমন্বয় হইয়াছিল । রূপকচ্ছলে 
বলা যায় যে এই সম্মিলিত প্রবাহ গঙ্গার পাবনী ধারার তুল্য । লোক- 
চক্ষুর অগোচর গোমুখের কন্দরে ইহার উৎপত্তি । সেখান হইতে 
বাহির হইয়া নানা! নগর জনপদ অতিক্রম করিয়া এই প্রবাহ ক্রমেই 
অগ্রসর হইতে থাকে অজানা এক সাগরসঙ্গমের অভিমুখে । ক্রমেই 
ইহার জলরাশির় গভীরতা! বাড়িতে থাকে, প্রসার হয় বিস্তৃত । গতি 


৪২ কবিগুরু 


কখমও দ্রুত কখনও মন্থর হইলেও বেগ হয় ক্রমশঃ প্রবল । বহুজনে 
ইহার পুণ্যোদকে জান ও পান করে, কুলে কুলে ইহা বিস্তার করে 
উব্বরতা ও সরস শ্যামপ্রী, ইহার প্রভাবে বৃদ্ধি পায় কল্যাণ সম্পদ্‌ 
এশ্বরধ্য | চলার পথে কত ক্ষুদ্র বৃহৎ উপনদী আসিয়া ইহার আোতে 
মিলিত হয়, জলধারার আয়তন বৃদ্ধি হয়, ক্োত হয় বিশাল । 
ফলে অনেক সময় মনে হয় যেন একই প্রবাহে কয়েকটি ত্রোত 
গঙ্গা-যমুনা-সরন্বতীর ন্যায় একই সঙ্গে পাশাপাশি চলিতেছে ; কখনও 
একটি শক্োত দক্ষিণে ও অপরটি বামে ; কখনও বা! একটি উপরে 
অপরটি নীচে ; কখনও একটির টান বেশী, অপরটির কম 1 মাঝে মাঝে 
ইহার ফলে জলধারায় আবর্তের স্থ্টি হইতেছে, জলরাশি বিক্ষুব্ধ 
ফেনিল হইয়া উঠিতেছে, ক্রোতধারার দিক্‌-পরিবর্তন হইতেছে, নদী 
কুল ভাউিয়! মোড় ফিরিতেছে, বাকের মুখে নদী যেন দিশাহারা! 
হইয়া নূতন কোনও অজানা লক্ষ্যের সন্ধানে ছুটিতেছে | রবীন্দ্রকাব্য- 
ধারার অনুধাবন করিলে সহ্ধদয় কাব্যামোদীর মনেও অন্বরূপ একটা 
উপলদ্ধি হয়। গঙ্গাআোতের ন্যায়ই রবীন্দ্রকাব্যের পাবনী শক্তি, 
উভয়ই আর্ধ্যাবর্তের মন্মবানীর প্রবাহিণী। ইহার্ও স্যষ্টিতত্ব পাঠক 
ও সমালোচকের অগোচর, ইহাও জীবনের অভিজ্ঞতার দেশে দেশে 
বিচিত্র কুটিল গতিতে প্রবাহিত হইয়া পরিশেষে এক বিশ্বান্ুভৃতির 
সাগরসঙ্গমে মিশিয়াছে । ইহারও প্রবাহে নানা আোতের মিলন 
ঘটিয়াছে, তাহার মধ্যে তিনটি ধারাই প্রবল । প্রধানতঃ এই তিনটি 
ধারার সংযোগের ফলে রবীন্দ্রকাব্যের বিচিত্র রূপ ও লক্ষণের স্ষ্টি 
হইয়াছে । এক একটি ধারার উৎপত্তি হইয়াছে রবীন্দ্রনাথের বিরাট 
ব্যক্তিত্বের অন্তর্গত এক এক একটি অংশসত্তা হইতে । ভাহার 
সামগ্রিক সত্তার সহিত এই সমস্ত অংশসত্বা অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্বদ্ধ ! 


রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধারা ৪৩ 


(৩) 

রবীন্দ্র-মানসের একটি ধারা হইল তাহার ধী-সত্তার প্রকাশ । 
বিজ্ঞান শব্দটিকে যদি একটা বিশেষ অর্থে ক গ্রহণ করা হয়, তবে 
এই ধারা তাহার বিজ্ঞানময় কোশ হইতে উত্তুত,”_-এইরূপ বলা যায়। 
এই ধারারই: প্রভাব দেখা যায় তাহার যুক্তিবাদে, তাহার বাস্তবনিষ্ঠায়, 
তাহার অনলস কর্মসাধনায় | তাহার সহজ মানবিকতা, সেবাপরায়ণতা 
ইত্যাদি প্রবৃত্তি-ও এই ধারা-রসে সঙ্ীবিত। রবীন্দ্রনাথের চা, 
তাহার ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, কৌতুকপ্রবণতা এই ধী-সম্তার অন্যতম পরিচয় । 
এই সত্তার বিহার অস্তর্জগতের ভূ-লোকে । 

রবীন্দ্রনাথের এই সত্তার প্রকাশ হইয়াছে প্রধানতঃ তাহার গগ্য- 
রচনায় ও কর্মজীবনে! তিনি ভারত-পথিক রামমোহনের উত্তরাধি- 
কারী। যে বাস্তববোধ, যে মানবিক আদর্শ, যে ব্যবহারিক জীবন- 
দর্শন, ফ্ব ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার উপর যে আস্থা ;__-ও যে আত্ম- 
প্রত্যয়, যে বিচারবুদ্ধি, যে নৈতিক নিষ্ঠা, যে ঈশ্বর-বাদ ;-_এবং যে 
ব্বদেশশ্রীতি, যে উদার জাতীয়তাবোধ, যে বিশ্ব-মানবতা রামমোহনকে 
অনুপ্রাণিত করিয়াছিল, তাহাই রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যকে 
বহুল পরিমাণে অনুপ্রাণিত ও পরিচালিত করিয়াছে, এবং তাহার ' 
রসান্ৃভূতির সহিত সংযুক্ত হইয়া নানা ভাবে বিকশিত হইয়া গৌরবো- 
জ্ৰল হইয়াছে | 

ইহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ রহিয়াছে তাহার কন্মঘ্রময় জীবনের ইতিহাসে । 
প্রথম যৌবন হইতেই তিনি দেশের অন্যতম চিস্তানায়ক, আধুনিক 
জগতের চিন্তাধারার মহত্বম আদর্শের প্রচারক! দেশের রাষ্ট্রনৈতিক 


*. বিজ্ঞানং যজ্ঞ তনুতে কন্মাণি তমুতেহপি চ। 
(তৈতিরীয়োপনিষদ ২৪ ও ২৫ দ্রঃ) 


88 কবিগুরু 


আন্দোলনে অনেক সময়ই তিনি পুরোধা ছিলেন এবং সারা জীবনই 
এই আন্দোলনে নানা ভাবে অংশ গ্রহণ করিয়াছেন ও ইহার লক্ষ্য ও 
আদর্শ নিরূপণ করিয়াছেন । শিক্ষাসংস্কার, সমাজসেবা, দেশের 
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ইত্যাদি সব্ববিধ জাতীয় হিত-প্রচেষ্টায় তিনি 
অনেক সময়ই পথিকৃৎ ছিলেন এবং নানা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তাহার 
এই প্রবণতার প্রমাণ রাখিয়া গিয়াছেন । 

ইহার আরও প্রমাণ পাওয়া যায় তাহার মনস্ষিতায় । কবি হইলেও 
মননশীল রচনার প্রতি তাহার বিশেষ আকর্ষণ ছিল, বিশ্বের জ্ঞান- 
ভাগ্ডারের প্রত্যেকটি বিভাগের সহিত তাহার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল, 
ভাষাতত্ব ইত্যাদি বহু বিষয়ে তিনি গবেষণা করিয়াছেন বা গবেষণার 
পথনির্দেশ করিয়াছেন | সর্ববিষয়ে চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন 
তীক্ষধী বোদ্ধা ও বিচারক, গৌজামিল বা “গণ্ডায় এগ্ডা মিলান” 
তাহার কাছে চলিত না। 

রবীন্দ্রনাথের এই বুদ্ধিদীপ্ত মননশীলতা ও বাস্তববোধের প্রভাব 
তাহার কাব্যেও আছে । বস্ততঃ ইহা রবীন্দ্রকাব্যের অন্যতম 
মূলধারার উৎস। তাহার কবিতাকুর্ধে যে রাগিনী বঙ্কৃত হইয়াছে, 
তাহার অন্যতম মুলস্বরের ইহাই উপাদান | তাহাই রবীন্দ্রকাব্যের 
সংবাদী স্বর | & 


(৪) 
রবীন্দ্রকাব্যের অপর ধারা হইল তাহার রসসত্তার প্রকাশ । 
& [ তবে ববীন্্র-মানসেব এই ধাবা সর্বদ1 ভাহাব কাব্যধারার অনুগামী নহে | অনেক 
সময়ে ইহা পৃথক-গামী” এমন কি আপাতদৃষ্টিতে বিপবীত-গামী | “কড়ি-ও-কোমলে”র 
কবিতাগুলি যখন লিখিত হয়” সেইসময়কাঁর বিতর্কমূলক ও বিজ্রপাত্মক গঘ্ভরচনার সহিত “কড়ি- 
ও-কোমলে”র মূল ভাবের সঙ্গতি নাই ]। 


রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধারা ৪৫ 


আনন্দময় কোশ হইতে এই ধারার উদ্ভব ।% অস্তর্জগতের ভূবর্পোকে 
অর্থাৎ ভূলোক ও 'ম্বর্পোকের মধ্যবর্তী অন্তরীক্ষে অপাথিব অথচ 
পৃথ্বীষ্পর্শী নভোমণ্ডলে এই সত্তার বিহার । 

এই রসসত্তার আবেশই: রবীন্দ্রজীবনের প্রধান তত্বঃ ইহাই: 
তাহাকে মুখ্যতঃ কবি ও শিল্পী করিয়াছে । শিশুকালে “জল পড়ে 
পাতা নড়ে" এই ছুইটি পদের সরল ছন্দ এবং আসন্নবৃষ্টি অপরাহ্ে 
নীলাঞ্জনপুঞ্জের রূপ ও রেখা তাহার মনে প্রয়োজন ও মননের অতিরিক্ত 
যে অনির্র্চচনীয় মাধূর্য্যের সন্ধান দিত, তাহাই ছিল তাহার সমগ্র 
জীবনের মুল শুর । এই: স্থরই রবীন্দ্রকাব্যের বাদী সুর । 

এই জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, “কবিরে পাবে না, পাবে না, 
তাহার জীবন চরিতে ।” কেবল যে বাল্যকালে তিনি ছিলেন 
“কুনো” একলা” একঘরে” তার খেলা ছিল আপন মনে-__তাহা 
নয়, চিরদিনই তিনি ছিলেন মূলতঃ “ন্ষপনমূরতি, গোপনচারী”। 
আত্মপরিচয় দিতে গিয়া তিনি বলিয়াছেন যে “নিরঞ্জনের""*এক 
শুভ্র জ্যোতি যখন বহুবিচিত্র হন, তখন তিনি নানাবর্ণের আলোক- 
রশ্মিতে আপনাকে বিচ্ছুরিত করেন, বিশ্বকে রঞ্জিত করেন ; আমি 
সেই বিচিত্রের দূত | % % বিচিত্রের লীলাকে অন্তরে গ্রহণ ক'রে 
তাকে বাইরে লীলায়িত করা__এই আমার কাজ । &% *্ যে বিচিত্র 
বহু হয়ে খেলে বেড়ান দিকে দিকে সুরে গানে নৃত্যে চিত্রে, বর্ণে বর্ণে 
রূপে রূপে, সুখছ্ঃখের আঘাতে-সংঘাতে, ভালো মন্দের দ্বন্দে_ তার 
বিচিত্র রসের বাহনের কাজ আমি গ্রহণ করেছি 1” সারা জীবন নানা 
কাজে সময় কাটাইলেও কাজ-কে তিনি “খেলা” হিসাবেই-_অর্থাৎ 
রসসাধনার উপায় হিসাবেই গ্রহণ করিতে চাহিতেন; যখনই কোন 

* তৈত্তিবীয়োপনিষদ্‌) ২৫ দ্রঃ 


৪৬: কবিগুরু 


কাজে আর সেই রসের আস্বাদ থাকিত না, তখনই তাহা পরিত্যাগ 
করিয়া অন্যভাবে রস সাধনায় মনোনিবেশ করিতেন । “স্থর ভুলে যেই 
ফিরতে গেলেম কেবল কাজে”, তখনই যে তিনি ভুল করিয়াছেন 
সে বোধ বারবার করিয়া তাহার মনে জাগ্রত হইয়াছে । স্বীকার 
করিয়াছেন যে জীবনে “বস্তু যা পেয়েছি তার চেয়ে রস পেয়েছি 
অনেক বেশী। আজ বুঝতে পেরেছি এই জন্যই আমার আসা 1" 

বিশ্ব-রচনার অমৃতত্বাদের আমি যাচনদার |” 
তাহার এই রসসত্তার প্রকৃষ্ট পরিচয় পাওয়া ষায় সাহার গানে ও 
তাহার চিত্রকলায় | তাহার বহু গান অবশ্য জীবনের সহজ ও 
সর্বজনীন সত্যের উপলব্ধির প্রকাশ ; কিস্তৃব হুতর গান-_যাহাকে 
সাধারণতঃ অস্পষ্ট ভাষায় “রবীন্দ্রসঙ্গীত” বলা হয়-_তাহা হইল শুদ্ধ 
তাহার মনের গহনে অনির্বচনীয়ের আভাসের বা “হঠাৎ আলো”র 
ঝলকানি । রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের অনেক গান, অনেক 
প্রখ্যাত ব্রহ্মসঙ্গীত, দেশপ্রেমের ও প্রণয়ের গান প্রথম-জাতীয় ৷ 
কিন্ত তাহার মৌলিক রসান্গুভৃতি বিশেষ ভাবে প্রকাশ পাইয়াছে 
তাহার উত্তর-জীবনে রচিত অনেক সঙ্গীতে--“কেন বাজাও কাকন 
কন কন” ইত্যাদি হইতে “স্বপনপারের ডাক শুনেছি”, “মন মোর 
মেঘের সঙ্গী”, “পাগল হাওয়ায় বাদল দিনে” ইত্যাদি গানের ভাবে, 
স্বরে ও ঝঙ্কারে । কথা অপেক্ষা স্থরের বিশ্যাসেই এই সব গানের 
পরিচয়, তাহার ধী-সত্তার সহিত এই সকল গানের সম্বন্ধ খুব ক্ষীণ । 
অন্তরীক্ষ হইতে যেন ইহা ঝরিয়া পড়িতেছে, ইহ] যেন ভুবর্লোক- 

বিহারী কোনও গন্ধবেবর বীণায় কচিতশ্রুত ঝঙ্কার | 
[10 6156 ০1০90 11619651106 
€0 6106 81010918310. 


রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধার! ৪৭ 


0,62 1101) 01009 ৪০ 10710189601, 
71000 90086 90896 800. 2010, 

14015 ৪ 01010093399 105 ড71)089 18,098 29 15961098118 
এই সমস্ত সঙ্গীতের আষ্টা সম্বন্ধে 91)91169-র এই কথাগুলি প্রয়োগ 
করা যায়। 

এই রবীন্দ্রসঙ্গীতের ধারা কখনও কুলপ্লাবী, কখনও অন্তঃসলিল! | 
কখনও ইহ] কাব্যধারার সহগামী, কখনও বা ইহা স্বাধীনভাবে 
প্রবাহিণী। রবীন্দ্রনাথের সাংসারিক জীবনের অভিজ্ঞতা সব সময়ে 
ইহার উৎস নহে; জীবন যখন শুকায়ে যায়, কাব্যধারা যখন মরুপথে 
লুপ্ত, এমন সময়েও এই সঙ্গীতের ধার! উৎসারিত হয়। পারিপাশ্বিক 
অবস্থার প্রভাব ইহার উপরে সামান্যই । 

রবীন্দ্রনাথের সংসারমুক্ত অবাধ কল্পনা মূর্ত হইয়াছে তাহার খেয়াল- 
খুপীর আর এক স্থপ্টিতে অর্থাৎ তাহার চিত্রকলায়। “ন্বপ্ন যত অব্যক্ত 
আকুল/খুজে মরে কুল”-ইহাই তাহার চিত্রকলায় নানা অভাবনীয় 
বিচিত্ররূপে ইঙ্গিত হইয়াছে । রবীন্দ্রচিত্তের নিগুঢ় রহস্তের চাবির 
সন্ধান বোধ হয় রবীন্দ্রচিত্রের মধ্যেই পাওয়া যাইবে | 


(৫9) 
এই যে ছুইটি ধার! রবীন্দ্র-মানসে বরাবরই প্রবল ছিল, তাহার 
কাব্যে তাহারা অনেক সময় পাশাপাশি বহিয়া চলিয়াছে; কখনও 
একটি প্রবলঃ কখনও অপরটি প্রবল। ইহাদের মধ্যে যে একটা 
মৌলিক বিরোধ আছে, তাহাও তিনি অনেক সময় অনুভব 
করিয়াছেন । মধ্যজীবনের “এবার ফিরাও মোবে" এবং শেষ জীবনের 
“এঁকতান” ইত্যাদি কবিতায় এই বিরোধান্ুভূতির পরিচয় পাওয়া 


৪৮ কবিগুরু 

যায়। এই ছুই ধারাকে তিনি মিলাইবার চেষ্টা বরাবরই করিয়াছেন, 
এই' চেষ্টা তাহার জীবনব্যাপী সাধনায় রূপায়িত হইয়াছে । “ছূর্যদেব, 
তোমার বামে এই সন্ধ্যা, তোমার দক্ষিণে এ প্রভাত, এদের তুমি 
মিলিয়ে দাও”-_ ইহাই-তাহার অন্তরের বাণী । 


(৬) 


রবীন্দ্রকাব্যের তৃতীয় ধারা হইল তাহার “চৈতন্যসত্তা্র প্রকাশ । 
তাহার চিন্ময় “সত্যাত্সা”ঞ্চ হইতে ইহার উদ্তব । অন্তর্জগতের ত্বর্লোকে 
এই সত্তার বিহার । ব্রহ্মজিজ্ঞাসা ইহার তপস্তা, “আত্মানং বিদ্ধি” 
ইহার মন্ত্র । যে “ধর্মবোধ” রবীন্দ্রকাব্যে পৃববাপর অন্ুস্যত রহিয়াছে, 
তাহাতেই এই ধারার পরিচয় । ূ 

আপাতৃষ্টিতে ইহাই: রবীন্দ্রকাব্যের প্রধান ধারা বলিয়া প্রতীত 
হয়। ইহাই মূলধারা কিনা সে বিষয়ে তর্কের অবকাশ থাকিলেও 
ইহাই যে আর ছুই ধারার সহযোগে রবীন্দ্রকাব্যের বিশিষ্ট গুণ ও 
রূপের স্্টি করিয়াছে সে বিষয়ে সন্দেহ নাই'। ববীন্দ্রকাব্যের 
আবেদন প্রধানতঃ এই ধন্মবোধের জন্তাই,। এই বোধই তাহার সমগ্র 
জীবনের সাধনাকে অনুপ্রাণিত করিয়াছে জীবনের তাৎপধ্য নানা- 
ভাবে তাহার অন্তরে ক্রমশঃ পরিস্ফুট করিয়াছে । 

বলা বাহুল্য যে এই ধন্মবোধ মানে কোনও সাম্প্রদায়িক বা 
কোনও শাস্ত্রীয় তত্ব, মতবাদ বা আচার-অন্ুষ্ঠানের অন্ববর্তন কিংবা 
তৎসম্পূক্ত উপলব্ধির জন্য প্রয়াস নহে। তাহার নিজের মধ্যে যে 
এক “গৃট়াত্মা” ক্রমেই বিকাশের পথে চলিয়াছে, বিশ্বজগতের সহিত 
তাহার একটা আত্মীয়তার সম্বন্ধ আছে; এবং যে এক অধিদেবতা 

ঞ তৈত্রীয়োপনিষতৎ-১৬।২ ব্েঃ 


রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধার! ৪৯. 


তাহার জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রিত ও তাহার প্রবৃত্তিকে প্রণোদিত 
করিতেছেন, রসানৃভূতি ও কর্মযোগের মাধ্যমে তাহার সহিত আত্মিক 
মিলনেই জীবনের সার্থকতা বা মোক্ষ ; এবং বিশ্বের সর্বত্র ও প্রতিটি 
ব্যাপারে সেই অধিদেবতার প্রকাশ রহিয়াছে,_এই জাতীয় অনুভব 
ও স্বতঃপিদ্ধ উপলন্ষির মধ্যেই এই ধর্্মবোধের পরিচয় । এই ধর্মমবোধ 
তাহার নিজস্ব, স্বতঃস্,র্তত একটা প্রবণতা ; ইহাকে স্ুনিদ্দিষ্ট তত্বের 
নিরূপিত ভাষায় প্রকাশ বা ব্যাখ্যা করা যায় না। উপনিষদের অনেক 
বচন যে জাতীয় উপলব্ধির প্রকাশ, তাহার সহিত ব্ববীন্দ্রনাথের 
আধ্যাত্মিক উপলম্ষির সৌসাদৃশ্য অবশ্য আছে, তত্রাচ স্বীকার 
করিতেই হইবে যে সমগ্রভাবে রবীন্দ্রকাবা ওপনিষদিক তত্ত্বের 
কাব্যরূপ নহে। ব্বীন্দ্রনাথ কাব্যে তাহার স্বকীয় উপলব্ধির 
কথাই বলিয়াছেন ; তাহার প্রেরণার উৎস খষিবাক্য নহে, তাহার 
«“অন্তরতমের” নির্দেশ । কোন কোন ক্ষেত্রে সেই নির্দেশের মধ্যে 
উপনিষদের ছুই একটি বচনের প্রতিধ্বনি থাকিতে পারে, এই মাত্র 
বলা যায়। মানবপ্রেম ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অনুভূতি রবীন্দ্রকাব্যে 
যে প্রাধান্য লাভ করিয়াছে ও তৎসম্পর্কে যে উপলব্ধির প্রকাশ 
রবীন্দ্রকাব্যে রহিয়াছে, তাহার উপর উপনিষদের বাণীর কোন প্রভাব 
নাই,। . 

যে রোম্যার্টিকতা রবীন্দ্রকাব্যের প্রধান লক্ষণ, তাহার উৎস এই: 
ধন্মবোধ বা আধ্যাত্মিক প্রবৃত্তি । প্রথম জীবনে এই রোম্যান্টিকতার 
যে প্রাথমিক রূপটি দেখ! যায় তাহার পরিচয় “নিহ্ধল কামনা”য় ও 
“নিরুদ্দেশ যাত্রা”্য় । শেষ জীবনে এই রোম্যান্টিকতার পরিণত 
রূপটি দেখ যায় “মধুময় পৃথিবীর ধুলি” এই উপলব্ধিতে এবং “পথের 
শেষে” পোৌছিয়া “আমার আমির ধার! মিলে যেথা যাবে ক্রমে ক্রমে 
ঘ-_-৪ 


৫০ কবিগুরু 


পরিপূর্ণ চৈতন্যের সাগরসঙ্গমে” সেই দিকে শ্রথবৃন্ত পরিপক্ক ফলের 
মত ঝরিয়া পড়িবার এষণায় | 


(৭) 


রবীন্দ্রকাব্যে এই তিনটি ধারাই প্রবল । কখন কখন এক একটি 
ধারার স্বতন্ত্র আতোবেগ অন্নুভব করা যায়, তবে সম্মিলিত আোত- 
ধারা রূপেই তিনটি প্রায়শঃ প্রবাহিত। রূপকচ্ছলে বলা যায় যে 
ইহারা যেন গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী ; যমুনা হইল কবির যুক্তিবাদী বাস্তব- 
নিষ্ঠ সত্তার প্রকাশ ; সরস্বতী হইল কবির রসবিলাসী সত্তার প্রকাশ ; 
আর গঙ্গা হইল কবির আত্মোপলব্ধির ও ধর্্মবোধের প্রকাশ । এই 
ত্রিধারা লইয়া অন্যবিধ রূপকও রচনা করা যায় । ব্বীন্দ্রকাব্য গঙ্জা- 
প্রবাহ হইলে তাহার তিনটি ধারা হইল অলকানন্দা, ভোগবতী ও 
মন্দাকিনী। অলকানন্দা মর্থ্যে প্রবাহিতা, ইহাই হইল বাস্তববাদী 
যুক্তিনিষ্ঠার ধারা ; ভোগবতী পাতালে প্রবাহিতা, ইহাই হইল কবির 
অবচেতন মানসের প্রবণতা, তাহার নন্দনবৃত্তি (8,98610961035700) ও 
রসান্নুভবের প্রকাশ ; মন্দাকিনী স্বর্গে প্রবাহিতা, ইহাই হইল কবির 
চিদানন্দান্ুভৃতির প্রকাশ 1% 


(৮) 
এই ত্রিধারা ছাড়া আরও একটা অন্তঃসলিল! ধারাও আছে! 
ভাহাকে কবির ভাষায় “খেয়ালআোতি” বলা যায় । চপলতা, উন্মার্গতা, 
খাপছাড়া বচন, হাঁল্ক! হাসি, পাগলা-ভোলা ক্ষ্যাপার নাচনে তাহার 


_*. এই জাতীয় রূপকে অবশ্য কবিব জীবনসত্যের সহিত স্ধগত সৌসাদৃশ্ত রক্ষিত হইতে 
পাবে মা? হুতরাং এই লইয়া কোন কুটতর্কের উত্থাপন শা করাই সঙ্গত। 


রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধারা ৫১ 


প্রকাশ । মাঝে মাঝে সমস্ত নিয়মকে তুচ্ছ করিয়া এই আত 
ফুলিয়া ফাপিয়া অপরাপর আতকে ছাপাইয়া ওঠে । কবি নিজেই 
বলিয়াছেন__ 
আমার জীবনকক্ষে জানি না কী হেতু 
মাঝে মাঝে এসে পড়ে খ্যাপা ধূমকেতু 
তুচ্ছ প্রলাপের পুচ্ছ শূন্যে দেয় মেলি, 
ক্ষণতরে কৌতুকের ছেলেখেলা খেলি 
নেড়ে দেয় গম্ভীরের ঝাঁটি। 
তাহার মতে, চতুঙ্ুখের যদি চারিটি মুখ হয়, 
নিশ্চিত জেনো তবে 
একটাতে হো হো রবে 
পাগলামি বেড়া ভেঙে উঠে উচ্ছাসিয়া । 
তাই তারি ধাক্ায় 
বাজে কথ পাক খায়, 
আওড় পাকাতে থাকে মগজেতে আসিয়া | 
এই আওড় বা আবর্থ হইতে কেবল যে “খাপছাড়া” ইত্যাদি 
কাব্যের স্থষ্টি তাহা নয়; ক্ষণিকা” “শিশু “ছড়ার ছবি ইত্যাদি 
অল্লাধিক চপল অথচ ভাব-গভীর কাব্যেরও উৎপত্তি । 


রবান্্নাথের মাধন। 
৪ 

রবীন্দ্রনাথের বহুবিচিত্র কবিপ্রতিভা ও তাহার বহুবিস্তৃত কর্মমশক্তির 
নানা প্রকাশের মধ্যে একটা এঁক্যের বন্ধন খুঁজিতে গেলে তাহার 
জীবনব্যাগী একটা সাধনার ইতিহাস পাওয়৷ যায় । তাহার সবর্বতো- 
মুখী প্রতিভার বহু বৈচিত্র্যের উৎস সন্ধান করিলে দেখিতে পাইব ঘে, 
আসলে তিনি সাধক; নানা কর্মের ও নানা অনুভূতির ভিতর দিয়া 
তাহার একটি প্রয়াসই প্রকট হইয়াছে, সে প্রয়াস আয্মোপলব্ধির 
প্রয়াস ব সাধনা । % 


(২) 
সাধনা কথাটি আমাদের দেশে স্থপরিচিত। যে প্রয়াসের দ্বারা 
মানুষ নিজের আধ্যাত্মিক সত্তার উপলব্ধি করিতে ও জীবনের চরম 


» এই প্রসঙ্গে একটা কথা স্মবণ রাখা দরকার । আমাদের দেশে অনেক সময়ই গুহ) 
প্রক্রিয়াসক্ত, অণিমা-লঘিমা ইত্যাদি অতি-প্রাকৃতিক এশ্বধ্য বা বিস্বৃতির সন্ধানী, লোকোত্তর 
শক্তির অধিকারী সংসাবতাগী তপ্থীকেই সাধক বল] হয়। রবীন্দ্রনাথ এই জাতীয় সাধক 
ছিলেন না, মানবন্ুলভ প্রবৃত্তির বিকাশ ও উৎকর্ষই ছিল তাহার সাধনার লক্ষণ। এই জন্যাই 
তিনি বাববার করিয়! বলিয়াছেন যে “আমি সাধু নই, সাধক নই»" "আমি তত্বজ্ঞানী শাস্ত্জ্ঞানী 
গুরু বা নেতা নই,” “একটা! মাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছুই নয়, আমি কবি 
মাত্র।” তবুও একটা সাধনার লীলা যে তাহার জীবনে চলিতেছিল সে সম্বন্ধে তিনি সচেতন 
ছিলেন, এবং অনুভব কবিতেন যে “আমি হইয়া উঠিতেছি আমি প্রকাশ পাইতেছি” ইহাই 
এক পরম আশ্চধ্য | তিনি স্পষ্টই স্বীকার করিয়ছেন, "আমার মনে সন্দেহ নেই আমার মধ্যে 
*-্থাষ্টিসাধনকারী একাগ্র লক্ষ্য নির্দেশ করে চলেছেন একটি গৃঢ় চৈতন্য ॥ বাধার মধ্যে দিয়ে 
'আত্মপ্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে |” 


রবীন্দ্রনাথের সাধনা ৫৩ 


সার্থকতা লাভ করিতে পারে, তাহাকেই বলা হয় সাধনা । এক কথায়, 
মোক্ষলাভের প্রচেষ্টাকেই সাধনা বলা হইয়া থান । অবশ্য, সঙ্কীর্ণতর 
অর্থেও সাধনা শক্খের প্রয়োগ আছে । যেমন, শিল্পীর সাধনা বা 
বীরের সাধনা । এই: সব ক্ষেত্রে একটা সন্গীর্ণতর সাংসারিক লক্ষ্যের 
জন্য সমস্ত প্রয়াস নিয়ন্ত্রিত হয় । কিন্ত নদীমাত্রেই যেমন শেষ পর্যস্ত 
সাগরের জলে মিশিয়া যায়, সেইরূপ সমজ্ত সাধনাই শেষ পর্য্যস্ত 
আজ্মোপলন্ধি বা মোক্ষলাভের দিকে অগ্রসর হয় । সাধনার লক্ষণ 
এই যে, ইহা মানুষের চিত্ববৃত্তিকে স্ফারিত করে, স্তুনিয়ন্ত্রিত করে, 
উন্মার্গতার অভিশাপ হইতে রক্ষা করে, ফলে মাহৃষ “ইতো৷ ভ্রষ্টঃ ততো 
নষ্টঃ” না হইয়া জীবনের সার্থকতা লাভ করে । মান্নুষের জীবনের যে 
সার্থক প্রয়াস, তাহার গতি মাত্র এক গ্রুব লক্ষ্যের দিকেই হইতে 
পারে ; স্থতরাং সার্থক সাধন! যে কোন সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রেই আরম্ত হউক 
না কেন, ইহা! শেষ পর্যযস্ত মোক্ষের দিকেই লইয়া যায়। এই জন্য যথার্থ 
শিল্পী-ও আধ্যাত্মিক সাধক, যথার্থ বীর-ও আধ্যাত্মিক সাধক | সাধনা 
মাত্রেরই চরম লক্ষ্য-_জীবন্মুক্তি ; সাধনায় চরম সিদ্ধিলাভ করিলে 
এমন একটা উপলব্ধি হয়, যাহাতে মানুষের আত্মা আর মায়াপ্রপঞ্চের 
দাস থাকে না, বিশ্বরহস্ত যেন করতলগত আমলকের হ্যায় স্পষ্ট হয় 
এবং ব্রহ্মান্বাদের লাভ হয় । 

সাধনার নানা পথ, নানা মত আছে । প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগে 
ভারতবর্ষে ও ইউরোপে নানা স্ধী ও সাধক এই বিষয়ে চচ্চা করিয়া 
ছিলেন। মানুষের মধ্যে প্রবৃত্তি ও যোগ্যতার নানা বৈচিত্র্য আছে । 
এই বৈচিত্র্য অনুসরণ করিয়াই সাধনার বিচিত্র পথের সন্ধান পাওয়া 
গিয়াছিল। জ্ঞানযোগ, কর্্মযোগ, ভক্তিযোগ, রাজযোগ- হীনযান, 
মহাযান, সহজবাদ প্রভৃতি শবের সঙ্গে কত বেচিত্র্যময় সাধনার 


৫৪ কবিগুরু 


ইতিহাস জড়িত হইয়া রহিয়াছে । এক হিসাবে আমরা সকলেই 
সাধক, আমাদের প্রত্যেকের পক্ষেই “7106 ০219. 29 ৪, 58110 
06 ৪0101-1008510.” আমরা প্রত্যেকেই যেন এক একটি বিশ্বের 
কেন্দ্রস্থলে রহিয়াছি, নানাভাবে আমাদের সহিত এই বিশ্বের সংঘাত 
চলিতেছে, সেই সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় আমাদের অন্তনিহিত জীব- 
শক্তির উদ্বোধন হইতেছে । এই উদ্বোধন কাহারও পক্ষে সতেজ ও 
সাবলীল, কাহারও পক্ষে অতি ক্ষীণ, কাহারও পক্ষে জড়তাগ্রন্ত ও 
ব্যর্থ । যাহার জীবনে এই' ক্রমশঃ অত্মোপলন্ধি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার 
ক্রিয়া সদাজাগ্রত ও অস্থলিত, তাহাকেই আমরা সাধক বলি। 

কৰি__রসস্্টি ফাহার কাজ-তিনিও এক রকমের সাধক। 
ভক্তি যেমন এক প্রকারের উপলব্ধি ও মনোবৃত্তি নির্দেশ করে, রস-ও 
তক্রুপ একটা বিশিষ্ট উপলন্ধি অভিজ্ঞতা ও আনুষঙ্গিক মনোবৃত্তি 
নির্দেশ করে । ভক্তিযোগের দ্বারা যেমন মোক্ষলাভ সম্ভব, রসযোগের 
দ্বারা তদ্রূপ সম্ভব । কারণ, “রসো বে সঃ | রসং হোবায়ং লন্ধানন্দী- 
ভবতি ।” % কবিচিত্ত সচ্ছিদ্র বংশীর হ্যায় ; মানবস্থলভ যে কোন 
অভিজ্ঞতা স্বকৌশলে তথায় প্রবাহিত করিতে পারিলে অলৌকিক 
মাধূর্্যময় রসের উৎপত্তি হয়! অনেক কবির জীবনে এই স্থ্টি-_ 
জীবনের অভিজ্ঞতা হইতে রস-স্ষ্টি-আকস্মিক বা সাময়িক মাত্র । 
তাহাদের রসোপলব্ধির মধ্যে একটা সমগ্রতার অভাব থাঁকে: তাহারা 
সাধকের পর্য্যায়ে উঠিতে পারেন না। কিন্তু ধাহারা বাল্ীকি প্রভতির 
শ্যায় কবিকুলশ্রেষ্ঠ আখ্যা পাইবার যোগ্য, তাহাদের জীবনে এক 
অখণ্ড রসস্থষ্টির প্রবৃত্তি ও যোগ্যতা দেখা যায়, তাহারা সাধক নামের 
সম্পূর্ণ যোগ্য । 


 তৈততিরীয়োপনিৎ ২৭ 


রবীন্দ্রনাথের সাধনা ৫৫ 


(৩) 

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কাব্যজীবন পধ্যালোচনা করিলে এরূপ একটা! 
যথার্থ সাধনার ধারা দেখিতে পাওয়া যায় । তিনি কবি; মনে প্রাণে, 
সাংসারিক ও সামাজিক আচরণে তিনি কবিস্বলভ মনোবৃত্তি ও 
প্রতিভার পরিচয় দিয়াছেন । বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষ অভিজ্ঞতার 
বিভিন্ন লৌকে বিচরণ করে, কেহ স্থুল ইক্জিয়গ্রাহা সংসারে, কেহ 
অতীনব্দ্রিয় সুক্মলোকে, কেহ শুধু বুদ্ধিগ্রাহ্হ মনোলোকে নিজের যথার্থ 
স্থান খুঁজিয়া পায়। রবীন্দ্রনাথের জগণ-_রসলোক, যেখানে ইন্দ্রিয় 
ও ইন্ড্রিয়াতীতের সঙ্গমে একটা ছন্দোময় সত্তার উৎপত্তি হইতেছে এবং 
সমগ্র বিশ্বের প্রতিচ্ছায়া একটা নৃতন আলোকে উদ্ভাসিত হইয়া 
“রসাত্মক বাক্যে” প্রকট হইতেছে । গ্রন্ধর্বলোক যেমন স্বর্গ ও 
মর্ত্ের মাঝামাঝি, সেখানে মর্থ্যের রস+ সৌন্দর্য্য ও মানবস্লভ 
প্রবৃত্তির সহিত স্বর্গের অনস্ত মহিমা ও অমরত্ব আসিরা মিশিয়াছে, 
রবীন্দ্রনাথের মানসজগণ সেইবূপ স্থুল উপলব্ধির সংসার ও জুষ্মম 
ধ্যানলোকের মাঝামাঝি 14 রসস্থষ্টি বা কবিত্বই তাহার যথার্থ 
কাজ, সে কথা তিনি নিজেই বারংবার ব্যক্ত করিয়াছেন | এই কবিত্ব 
তাহাণর পক্ষে একটা সাময়িক কিছু নহে, ইহার মধ্যে তাহার জীবনব্যাপী 
একটা অখণ্ড সাধনার ইতিহাস রহিয়াছে । 

রবীন্দ্রনাথ মহধি দেবেন্দ্রনাথের পুত্র» ধরন্মপিপাসার প্রবল 
প্রভাবের মধ্যে প্রতিপালিত, ভারতীয় চিন্তাধারার যথার্থ মন্মমগ্রাহী ও 
উত্তরাধিকারী--এই সব কারণেই যে তিনি সাধক হইয়াছেন তাহ! 


_. * এই প্রসঙ্গে উপনিষদের কয়েকটি বচন শ্বর্তব্য £ 
তেযে শতং মানুষ! আনন্দ স এক মনুষ্বগন্ধর্বাণামাননাঃ |. 
তে যে শতং মন্ুস্গন্বর্বাণামানন্দাঃ স এক দেবগদ্ধক্বাণামাননাঃ 1" 


( তৈত্তিরীয়োপনিষৎ ২1৮) 


৫৬ কবিগুরু 


নহে। এই সমস্ত কারণ সত্বেও হয়ত কাহারও কাহারও জীবনে 
সাধনার স্বত্রপাত অসম্ভব হইতে পারে । ল্রবীন্দ্রনাথ সাধনার পথে 
অগ্রসর হইয়াছেন তাহার অন্তরতমের নির্দেশে । এই সাধনার পথ 
তিনি কোন প্রাচীন গুরুর নিকট শিক্ষা করেন নাই, তাহার অস্তনিহিত 
আধ্যাত্মিক শক্তিই নদীর আোঁতের মত নিজের পথ করিয়া লইয়াছে । 
এই সম্পর্কে তিনি স্পষ্টরূপেই বলিয়াছেন, “আমি বেশ বুঝতে পারছি, 
আমি ক্রমশ আপনার মধ্যে আপনার একটা সামপ্রস্ত স্থাপন করতে 
পারব,_লআমার সুখ-ছুঃখ, অন্তর-বাহির, বিশ্বাস-আচরণ, সমক্তটা 
মিলিয়ে জীবনটাকে একটা সমগ্রতা দিতে পারব 1” এই উপলব্ধির 
প্রেরণার বলে সারা জীবন ধরিয়া যে পথে তিনি চলিয়াছেন ও যাহার 
সন্ধান তিনি দিয়াছেন তাহা হয়ত অন্য কোন পথের সমান্তরাল, হয়ত 
সেই “ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা ছুরত্যয়া ছুর্গং পথম্তৎ” চলিবার জন্য 
পাথেয় বা উপদেশ নানা স্থান হইতে তিনি পাইয়াছেন। কিন্তু সে 
পথ সব্বসাধারণের রাজপথ নহে, সে পথের অভিজ্ঞতাও সব্বসাধারণের 
নহে। ইহার ইতিহাস মেরুপথের যাত্রার হ্যায় কিহ্বা চ11£70108 
770876১8-এর হ্যায় চমকপ্রদ, ইহা! সবর্বাধশেই একটা! 49০01,8 
80৮61761516) 12৪,৮০9 81)0. 716৮৮” বলিয়া গণ্য হইবার যোগ্য | % 
ডঃ বৃহিজগতেব প্রতি €তনি উদাসীন ভিলেন না, সাংসাবিক জীবনেও একাস্ত কর্তব্যনিষ্ঠ ও 
শ্নেহপ্রবণ ছিলেন । কিন্তু পাথিব জগতেব ও জীবনেব প্রতিক্রিযা, এমন কি ব্যক্তিগত শৌোকও 
তাহাব আত্মান্বভন ও উপলব্ধির উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে নাই। তাহার সম্বন্ধে 


বলা যায় 
আপনাব মাঝে আছে সে অনেক দূরে । 


শানু মনেব স্তব্ধ গহনে 
ধানের বীণার সুবে 
রেখেছে তাহাবে ঘিবি। 
হৃদয়ে তাহার উচ্চ উদয় গিরি । 


রবীন্দ্রনাথের সাধনা ৫৭ 
(৪) 


একটা চিরচঞ্চল গতিশীলতা! এই সাধনার একটা বিশিষ্ট লক্ষণ । 
স্থির হইয়া কোন একটা কিছুকে আকড়াইয়া থাকা চিরদিনই রবীন্দ্র- 
নাথের প্রকৃতিবিরুদ্ধ। এইজন্য কোন ক্ষেত্রেই তিনি সনাতনী হইতে 
পারেন নাই! কোন একটা বস্তু, অবস্থা বা ভাবের প্রতি একান্ত 
আসক্তি কখনই রবীন্দ্রন।থের পক্ষে সম্ভব ছিল না। 


“ওরে পথিক, ধর না চলার গান, 
বাজ৷ রে একতারা, 

এই খুসিতেই মেতে উঠুক প্রাণ 
নেইক কুল কিনারা” 


ইহাই তাহার মূলমন্ত্র । এই চঞ্চলতাই ভাহাকে একটা মুক্তির 
আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির প্রেরণা দিয়াছিল, ইহাই তাহাকে ভোগের মধ্যে 
ত্যাগের সন্ধান দিয়াছিল । বলিতে কি, মুক্তি সম্বন্ধে তাহার যে প্রত্যয় 
বা সংস্কার তাহা তাহার ব্যক্তিত্বের এই লক্ষণটির সহিত বিশেষরূপে 
জড়িত । রবীন্দ্রনাথের কাছে মুক্তি একটা নেতিবাচক (79626159) 
প্রত্যয় ; ইহা যে সীমা ও আসক্তি হইতে অসীমের দিকে, অনাসক্তির 
দিকে ও অজানার দিকে লইয়া যায় এইটুকুই তাহার কাছে বিশেষরূপে 
স্পষ্ট ছিল, এবং ইহাই তাহার পক্ষে যথেষ্ট । কোন একটা বিশেষ 
ভাব বা উপলব্ধি এক সময়ে তাহার কাছে যতই: মহৎ বলিয়া মনে 
হউক না কেন, তাহাকে অতিক্রম বা 0:87)80961)0. করিয়া সব্বদাই: 
তিনি অগ্রসর হইতে প্রস্তুত। “আরো কোথা, আরো কত দূর ?”-- 
এই জিজ্ঞাস! সর্ধদাই তাহার মধ্যে জাগরূক | 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই চিরচঞ্চলতার মধ্যে সর্বদাই একটা ছন্দের 


৫৮ কবিগুরু 


পরিচয় পাওয়া যার । “শুধু ধাঁও, শুধু ধাও, উদ্দাম উধাও৮__এই 
ধরণের গতি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিগত নহে, বরং “দে দোল্‌, দে দোল” 
বলিয়া যে স্পন্দনময় আন্দোলন তিনি কল্পনা করিয়াছেন তাহাই: 
তাহার অনুভূতি ও উপলব্ধির অন্থুগামী। ছন্দোময় গতির মূলে 
আবিরোধী কয়েকটি শক্তির ক্রিয়া থাকে, রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও তাহা 
ছিল। ছন্দের যে একটা ০5০16 বা আবর্ত থাকে, ঘুরিয়া ঘুরিয়া 
পূর্বস্থানে আসার যে একটা প্রবৃত্তি থাকে, তাহাও রবীন্দ্রনাথের 
মধ্যে ছিল। তাহার সমগ্র কাব্যপ্রবাহের মধ্যে এই ছন্দোময় গতির 
পরিচয় পাওয়া যায়। তরঙ্গে তরঙ্গে এই ছন্দ ফুটিয়া উঠিয়াছে এবং 
প্রত্যেকটি তরঙ্গভঙ্গের মধ্যে এই গতির একটা সাদৃশ্য দেখিতে পাওয়া 
যায়। অনেক দার্শনিকের মতে এই ছন্দঃপারম্পর্য্যই বিশ্বের গৃট়ৃতম 
রহস্তের পরিচায়ক । অন্ততঃ রবীন্দ্রনাথের মানস-জগতের পরিচয় 
এই ছন্দের মধ্যেই পাওয়া যায় । 

এই ছন্দোময় গতির সম্যক বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার জন্য দর্শনের 
একটা নূতন পরিভাষা ও নৃতন সঙ্কষেতের প্রয়োজন । তবে লক্ষ্য করিলে 
দেখা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের ভাব-প্রবাহের মধ্যে একট ত্রিধাগতি 
আছে ।% ভারতীয় দর্শনের ভাষায় বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের কাব্য- 
জগতে স্ষ্টির যূলে যে শক্তি আছে তাহা ক্রমাগত একটা বিবর্তনের 
পথে চলিতেছে ! তাহার ফলে একট] অভাবের € ভাবাভাব ) পর 
একটা ভাবের আবির্ভীব এবং সেই ভাব হইতে মহাভাবের উৎপত্তি 


"এই প্রসঙ্গে ০৫6]-এব 0116515 -470006515--9570005515 এই পারম্পয্যেব কথা 
স্বভাবত:ই শ্রবণ হইতে পাবে । কিন্তু 7০০ কথিত হুত্রের সহিত রবীন্দ্রম'নসের বিবর্ভীন- 
হুত্রের সাদৃগ্ভ আপাততঃ থাকিলেও মূলতঃ তাহাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। (পরবর্তী 
অধ্যায়েব শেষ পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য ) 


রবীন্দ্রনাথের সাধনা ৫৯ 


ঘটিতেছে। পুনশ্চ মহাভাবের পর আবার নৃতন করিয়া ভাবাভাব ও 
তাহার পর একটা নূতন ভাব এবং তাহা হইতে একটা নৃতন আর 
এক রকমের মহাভাব এবং তাহারও পর আর একটা ভাবাভাব--- 
এইভাবে নকৃশা কাটিয়া তাহার উপলব্ধির ইতিহাস অগ্রসর হইতেছে । 
কবি ও সাধকের জীবনে এই: ত্রিধাগতির সত্যতা অনেক চিন্তাশীল 


ব্যক্তিই স্বীকার করেন। একজন ইংরেজ সমালোচক বলেন»_ 
“13 01999 ৮71)0 9991 9911-105066100)906 610705121) 6139 


00179080709 6 :870198 01 61)6 সা11] ৮9979 2556 8৮০: 109 
99971011080 01)9 70070 06 ৪170, (07215910698 900. 
79091)018,01010 ১ 01১ 00৮ 10079 18,1915, 01 6119 ৪9058 ০01 
18,41019, 261)9৮90 1:890156 8১৭ ৪70 909983.,+ 
সমালোচকের কথিত এই *5০17০০৮6100977 00710021) ৮189 
00109010793 ৪3:910199 0 ৮৮111” মানেই সাধনা | . তিনি 1811019, 
[8118 া90. 7'9801৮9 ও ৪1009688 বলিতে যাহা নির্দেশ করিয়াছেন 
তাহাই ভারতীয় দর্শনের ভাবাভাব, ভাব ও মহাভাব। ইহাদের 
পারম্পর্ধ্য বোধ হয় অনেক সাধনার ইতিহাসেই দেখিতে পাওয়া যায় । 
রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে এই পারম্পর্ধয আছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ 
নাই। এক সময়ে তিনি নিজেই ইহা কতকটা লক্ষ্য করিয়া 
লিখিয়াছিলেন__ 
চিরকাল এ কি লীলা গো__ 
অনন্ত কলরোল । 
অশ্রুত কোন্‌ গানের ছন্দে 
অন্তুত এই দোল । 
ছুলিছ গো, দোলা দিতেছ। 


৬৩ কবিগুরু 


পলকে আলোকে তুলিছ, পলকে 
আধারে টানিয়া নিতেছ। 

অস্পষ্টভাবে যাহা এখানে বলা হইয়াছে, তাহা আরও স্পষ্ট করিয়া 
বলা হইয়াছে অন্যত্র । “আত্ম-পরিচয়ে” রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, 
“ধর্মবোধের এই. যে যাত্রা, এর প্রথমে জীবন, তার পর মৃত্যু, তার 
পরে অমৃত ।” স্ৃতরাং ভাব, অভাব ও মহাভাব-_-এই' তিনটি মূলতত্ 
তিনি নিজেও স্বীকার করিয়া গিয়াছেন | | 

এই' ভাবে দেখিলে রবীন্দ্রনাথের কাব্যচক্রকেএকটা 90126100990 
89178] ( সীমাহীন কন্ধুরেখা ) মনে হয়। কন্বুরেখার গতির অনুসরণ 
করিয়া তাহার কাব্য ঘুরিয়া ঘুরিয়া অবিরাম উদ্ধ হইকে উদ্ধতর 
লোকে প্রয়াণ করিয়াছে । 


(৫) 


রবীন্দ্রনাথের কাব্যস্থষ্টির ইতিহাস আলোচনা করিলে আমরা পর 
পর কয়েকটি প্রেরণার তরঙ্গ দেখিতে পাই । প্রত্যেক তরঙ্গের 
প্রভাবকালকে একটি যুগ মনে করা যাইতে পারে । দেখা যায় যে, 
কোন একটি প্রেরণা কবির মনে আসিবার পর তাহা পর পর কয়েকটি 
অবস্থার ভিতর দিয় শ্নিয়মিতভাবে অগ্রসর হইতে থাকে, যতক্ষণ 
না ইহার বেগের পরিণতি ও অবসান ঘটে | তরঙ্গের ইতিহাসে যেমন 
কয়েকটি অবস্থার পর্যায় আছে, এ ক্ষেত্রেও তেমনি কবি-প্রেরণার 
আত্মপ্রকাশের একটা নিদ্দিষ্ট পর্যায় আছে। এক একটি বিশিষ্ট 
প্রকাশকে আমর রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনের এক একটি পর্ব মনে 
করিতে পারি। প্রত্যেক পর্ধেই কবির একট! বিশিষ্ট অনুভূতি ও 
দৃষ্টিভঙ্ষিমার পরিচয় আছে । কিন্তু লক্ষা করিলে দেখা যাইবে যে, 


রবীনজ্দনাথের সাধনা ৬১ 


যে কোন পর্বের সহিত পূর্ববর্তী ব। পরবর্তী পর্য্যায়ের প্রতিসম পর্ষের 
একটা প্রকৃতিগত সাদৃশ্য আছে । অবশ্য, উপলব্ধির দিক দিয়া এক্য 
নাই, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিমার দিক্‌ দিয়া সাদৃশ্য আছে, তাহ! দেখিতে পাওয়া 
যাইবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, “মানসী'র অনুভূতি ও “কল্পনা” 
অনুভূতি এক নয়, কিন্তু উভয়ত্রই একটা অভাবের ব্যাকুলতা। রহিয়াছে 
এবং সেই: দিক্‌ দিয়া ইহাদের মধ্যে একটা মিল আছে। ম্ুৃতরাং 
সঙ্গীতের রাজ্যে যেমন বিভিন্ন গ্রামের অষ্টক আছে, রবীন্দ্রনাথের 
কাব্যেও তদ্রুপ বিভিন্ন পর্যায়ের ত্রিক আছে মনে করা যাইতে পারে । 

রবীন্দ্রনাথের কাব্যে এক একটা পর্ব আসে, যখন তিনি বাস্তব 
জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে খুব সচেতন এবং তাহাকে সব্বজনসুলভ দৃষ্টি 
দিয়াই দেখেন । এই সময়ে তাহার কাব্যে মানবসুলভ উপলব্ধি ও 
সহৃদয়তার (10709771977) পরাকাষ্ঠা দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার 
সহিত বিচারবুদ্ধির (9,92081165) তীব্র লীলাও দেখা যায়| কিন্তু 
ঈপ্সিত “অযুতং” যে তিনি লাভ করিতে পারেন নাই, “সত্যং” ষে 
তাহার জ্ঞানের পরিধির বাহিরে রহিয়া গিয়াছে, সে বোধ হয় খুব তাত্র 
এবং তাহার জন্য আকৃতি হয় প্রবল । সঙ্গে সঙ্গে স্থল ও বাস্তব 
সম্বন্ধে সচেতন থাকার জন্য কবি-হৃদয়ে এই সময়ে একটা ছায়। 
দেখিতে পাওয়া যায়, সে ছায়া বাস্তব জগতের ছায়া । ফলে অনেক 
সময় একটা বিষাদ ও ব্যর্থতার অন্কৃভূতি তাহার কাব্যে প্রতিফলিত 
হয়। কখন কখন সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও দুজ্জেয় বাস্তব সত্যকে অতিক্রম 
করার একটা তীব্র আকাতম্ী (598710178) এই সময়কার কাব্যে 
পরিস্ফুট হয়! এই সমস্ত লক্ষণের জন্য এই পর্ধের কাব্যকে অনেক 
সময়েই আধুনিক রুচির দিক দিয়া সর্ধ্বাপেক্ষা চিত্তাকর্ষক বলিয়া মনে 
হয়। এই জন্যই “মানসী” “বলাকা” ইত্যাদি কাব্য আধুঁনকের কাছে 


৬২ কবিগুরু 


বিশেষ রুচিকর | দার্শনিকদের ভাষায় এই পর্ববকে “অভাব” বা 
“ভাবাভাব”সূচক বলিতে পারি । “অ-ভাব”, “অ-সৎ” “নাস্তিক্য” 
জাতীয় অনুভূতিই এখানে প্রবল । তবে এই “অভাব” হইতেই 
পরবর্তী “ভাবে”্র উৎপত্তি, এই ““নাস্তি” হইতে “অস্তি”র উৎপত্তি । 
প্রলয়ের মধ্যে যেমন স্থ্টির বীজ থাকে, ইহাও তদ্রপ । তবে ইহাকে 
“ভাবাভাব”স্থচক বলাই সঙ্গত, কারণ এখানে অভাবের সহিত 
ভাব জড়িত হওয়ায় একট! বিচিত্র সত্তার সম্ভাবনা ঘটিয়াছে। এই 
ভাবাভাবের পৰব্রে কবিচিত্ত “কেন” “কুত?”*% ইত্যাদি প্রশ্নে উচ্ছল 
হইয়া থাকে ।" সত্যজ্ঞানের জন্য এষণা এই পৰে প্রবল হয় বলিয়া 
ইহাকে জিজ্ঞীসার পবর্ব বলা যাইতে পারে । এই সময়ই হয় 
ভাবী আবির্ভাবের বোধন । 

তাহার পর রবীন্দ্রনাথের জীবনে আর একটা পর্ব আসে, যখন 
সহসা একটা নূতন ভাব বা মন্নুভৃতির উচ্ছ্বাসে তাহার মন প্রাণ 
আপ্র,ত হইয়া উঠে। বিষাদ ও ব্যর্থতার অন্ধকার কাটিয়া যায় এবং 
এক নৃতন আলোকের (£5স্৪1%6107 ) দীপ্তি কবিকে মুক্তির বা 
মোক্ষের একটা নৃতন সন্ধান দেয়। এই সময় মনে হয় যে, কবি 
বাস্তবের রাজ্য ছাড়িয়া ভাবের রাজ্যে পাখা মেলিয়া স্বেচ্ছাবিহার 
করিতেছেন, সমগ্র পাথিব অভিজ্ঞতাই তাহার চোখে বদলাইয়া গিয়া 
নৃতন রূপ ও অর্থ পরিগ্রহ করিয়াছে! এই পবের্ব উচ্ছাস বেশী, 
দার্শনিকতা ও মননশীলতা অপেক্ষাকৃত কম। অনেকের কাছে, 
বিশেষতঃ বাস্তবপন্থীদের কাছে এই সময়ের কাব্যকে অস্পষ্ট ও 
ধেশয়াটে বলিয়া বোধ হয় এবং তাহাদের কাছে কবি “৪, 106৪4৮10ি] 
800. 11)660্591 80261, 0986106 010 6179 910. 1719 1811711)- 


* কেনোপনিষৎ ও গ্রাম্মোপনিষৎ দ্রঃ 


রবীন্দ্রনাথের সাধনা ৬৩ 


909 চ011065 11) ৪0” বলিয়া! প্রতীত হন! কারণ, এই সময়ের 
কাব্যের মূল উপাদ্ধান একটা অ-সাধারণ অনুভব, কবিচিত্তের একটা 
অভ্ঞাতপুর্ব্ধ উল্লাস । ইহা! মূলতঃ এক প্রকারের পলায়নী বৃত্তির বা 
98098-এর কাব্য এবং স্বীকার করিতে হয় যে, যদিও এই যুগে 
কবি একটা অভিনব উপলব্ধির স্বর্গে আরোহণ করিয়া মুক্তির আনন্দ 
পাইতেছেন, তাহা জীবনে সত্য, সফল ও মূর্ত হইয়া উঠিতেছে না; 
জীবনের সহিত ভাবের একটা ব্যবধান থাকিয়া যাইতেছে! ইহ! 
একটা আবির্ভাব, কিন্তু ইহাতেই নবজীবনের স্থপ্টি হইতেছে না । 
তত্রাচ এই পরের জিজ্ঞান্্ব মনে একটা নূতন জ্ঞানের আলোক ফুটিয়া 
উঠে, এই জন্য ইহাকে সংজ্ঞানের পর্ব বলা যাইতেপারে । 
ইহার পরে যে পর্ব আসে, তাহাকে আমরা মহাভাবের পর্ব 
বলিতে পারি । পুর্বে যে ভাবের প্রকাশ ঘটিয়াছিল, সেই ভাব এই 
ঘুগে পরিণতি লাভ করে | ** দেখা যায় যে, পুবের্ব যাহা আবেগময় 
একটা কল্পনা ছিল, তাহ! এখন একটা জীবনব্যাপী উপলন্ধষিতে 
(58119961091) পরিণত হইয়াছে । কল্পনা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে একটা 
সামর্জস্ত হইয়াছেঃ উভয়ই পরস্পরকে অবলম্বন করিয়া রহিয়াছে । 
মনে হয়ঃ এইবার যেন কবি তাহার লক্ষ্যে পৌছিয়াছেন, তাহার 
সাধনার চুড়ান্ত সিদ্ধি হইয়াছে । অতৃপ্তি, আকাঙ্ক্ষা, ব্যাকুলতা 
ইত্যাদির স্থলে এখন একটা সুগভীর তৃপ্তি, শাস্তি ও পূর্ণতা বিরাজ 
করিতেছে । জীবন ও বাস্তবের প্রতি আর বিদ্রোহ নাই, কারণ 
নৃতন দৃষ্টিতে কবি সর্বত্রই তাহার মহাভাবের প্রকাশ দেখিতে 


* ভাবের ক্রমিক শোধন ও গাঢ়তাবৃদ্ধির ফলে মহাভাবের উদয় হয় ইহাই 'আচার্ধ্যগণের 
মত। 


৬৪ কবিগুরু 


পাইতেছেন। এইকারণে ইহাকে &%& প্রজ্ঞানের পর্ব বলা যাইতে 
পারে। 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্তদীর্ঘ সাধনার পথে কোন আশ্রয়ই তাহার 
অবিরাম গতির সীমা টাশিয়া দেয় না| এইজন্য মহাভাবের যুগের 
পরই আবার ভাবাভাবের যুগ আসে, এইরূপে সেই পুরাতন পালা 
বারবার করিয়া আরম্ত হয় এবং শেষ হইয়া পুনরায় সুরু হয়। ভাব 
ও অভাবের দ্বদ্ব তাহার জীবনে সনাতন, কাহাকেও তিনি একেবারে 
অস্বীকার বা নিঃশেষরূপে বজ্জন করিতে পারেন নাই । বার 
বার করিয়া নানা রূপ ধরিয়া এই কয়েকটি মূল তত্ব তাহার কাছে 
আসিয়াছে; তাহারা যে তীাহারই মানসের বিভিন্ন মুখের প্রতিচ্ছবি | 


% জ্ঞানের প্রথম ও শেষ রূপ নির্দেশ করার জন্য সংজ্ঞান ও প্রজ্ঞান শব্দ দুইটিব ব্যবহাঁন্‌ 
উপনিষদে আছে। 
(এ্তরেয়োপনিবৎ। ৩১২ জঃ) 


রবীন্কাব্যে পর্ব  যুগ-বিভাগ 


(১) 
রবীন্দ্রকাব্যের ইতিহাস অবলম্বন করিয়া তাহার সাধনার অর্থাৎ তাহার 
আজ্মোপলন্ধি ও ধন্মবোধের ইতিহাস অনুসরণ করিন্্ত হইলে 
প্রথমতঃ কয়েকটি বিষয়ে অবহিত হইতে হইবে | রবীন্দ্রনাথ চিরদিনই 
যে আধ্যাত্মিক মর্গে প্রগতিপরায়ণ ছিলেন, কখনই যে তিনি পথের 
মাঝে নিজ সিংহাসন পাতিয়া বসেন নাই, যুগে যুগে পবেব পর্বে যে 
তিনি “অস্পষ্ট অতীত হতে অস্ফুট সুদূর যুগান্তরে” অগ্রসর হইয়াছেন, 
“অজানা হইতে অজানা”য় পরিক্রম করিয়াছেন, তাহা সব্ববাদিসম্মত | 
বস্ততঃ সাধারণ রোম্যান্টিক অন্টুভব হইতে মহামানবের চিত্তবৃত্তি 
পর্য্যন্ত বিকাশের ইতিহাস রবীন্দ্রকাব্যে পাওয়া যায় । এইজন্য রবীন্দ্র- 
কাব্য বুঝিতে হইলে তাহার ক্রমবিকাশের পারম্পর্য্য, তাহার পর্ব্ব- 
বিভাগ ইত্যাদি হৃদয়ঙ্গম করা প্রয়োজনীয় । নহিলে, রবীন্দ্রকাব্য- 
প্রবাহকে আমরা আবর্ত বলিয়া ভুল করিব, “সোনার তরী”র রহস্যময়ীর 
আর “শেষলেখা"র ছলনাময়ীর প্রত্যয় একই মনে করিব, মৃত্যু সম্পর্কে 
“চিত্রা যে ধারণা তাহার সহিত “জন্মদিনের ধারণা মিশাইয়া 
ফেলিব। রবীন্দ্রকাব্যের আলোচনার সময় কবির স্বীকৃতি স্মরণ 
রাখিতে হুইবে যে তাহার “কাব্যের খতুপরিবর্তন ঘটেছে বারে বারে | 
কালে কালে ফুলের ফসল বদল হয়ে থাকে, তখন মৌমাছির মধু 
যোগান নতুন পথ নেয়। ফুল চোখে দেখবার পূর্বেই মৌমাছি 
ফুলগন্ধের স্ুমক্ম নির্দেশ পায়, সেটা পায় চারদিকের হাওয়ায় । 
যারা ভোগ করে এই: মধু তারা এই. বিশিইত1 টের পায় শ্বাদে। 
ঘ-_€৫ 


৬৬ কবিগুরু 


কোনো কোনো বনের মধু বিগলিত তার মাধুর্যে, তার রঙ হয় 
রাঙা; কোনো পাহাড়ি মধু দেখি ঘন, আর তাতে রঙের আবেদন 
নেই, সে শুভ্র; আবার কোনো আরণ্য সঞ্চয়ে একটু তিক্ত স্বাদেরও 
আভাস থাকে । কাব্যে এই মে হাওয়া-বদল থেকে স্যগ্টিবদল এতো 
স্বাভাবিক, এমন স্বাভাবিক যে এর কাজ হতে থাকে অন্যমনে | 
কবির এ সম্বন্ধে খেয়াল থাকে না ।” 

রবীন্দ্রকাব্যের “পালাবদল' বা ভাবান্তর খতুপরিবর্তনের সহিত 
তুলনীয় । অর্থাৎ “সময়ের ঘড়িধরা অস্কেতে ইহার সন তারিখ 
নির্ণয় করা যায় না। ষড়খতুর পারম্পর্ধ্য পঞ্জিকাকার কখনই 
তারিখ ধরিয়৷ স্স্থির রূপে নিরূপণ করিতে পারেন না। প্রচণ্ড 
শ্রীয্েও বর্ধা কোন কোন দিন নামে, কিন্তু তখনও বর্ষাকাল নয়; 
এমন কি শীতকালেও কখন কখন বর্ষণ হয়; আবার বর্ষাকালেও 
প্রচণ্ড তাপ অনেক সময় অনুভূত হয়। বর্ষার পরে এবং হেমন্তের 
পুবের্ব মধুর শরত্কালের আবির্ভাব হয়, কিন্তু শরতৎকাল যেন বড় 
ক্ষণন্থায়ী, তাহার পূর্ণরূপটি কয়েকদিন মাত্র দেখা যায়, শরতের বাকি 
কয়টা দিন বর্ষা ও হেমন্তের প্রকোপ অনুভূত হয়। তেমনি রবীন্দ্র- 
কাব্যের এক একটি যুগের কিম্বা পবের্বর কবে স্থচনা হইল এবং কবেই 
বা শেষ হইল, তাহার ঠিক সন তারিখ দেওয়া যায় না। “চিত্রা 
পরব্রধে সোনার তরী'ব ভাব এবং “কল্পনা” পবের্ব “চিত্রা ভাব অনেক 
সময় দেখা দিরাছে । তবুও শ্রীষ্মঃ বর্ষা ও শরৎ যেমন বিভিন্ন খু, 
তেমনি 'সোনার তরী” “চিত্রা” ও “কল্পনা' রবীন্দ্রকাব্যের বিভিন্ন পর্বের 
নিদর্শন । আবার, নদীর প্রবাহে যেমন কখনও কখনও একই সময়ে 
যুগপৎ জোয়ার ও ভাটার টান অনুভব করা যায়, একটা টান জল- 
প্রবাহের উপরের দিকে ও আর একটা টান নীচের দিকে বহিয়া চলে, 


রবীন্দ্রকাব্যে পর্বব ও যুগ-বিভাগ ৬৭ 


কবিমানসেও তাহা! সময়ে সময়ে হইয়া থাকে । যুগান্তরের বা 
পর্বাস্তরের সীমারেখায় অনেক সময় রবীন্্রকাব্যেও ছুইটি ভাবধারার 
ক্রিয়া যুগপৎ দেখা যায় । 
বসন্তকালেই কোকিল ডাকে বটে, কিন্ত বসম্ত সমাগমের পূর্বেই 
যে কদাচ ছুই একটি অগ্রদ্বত কোকিলের ডাক শোনা যায় না এমন 
নয়। সেই রকম নৃতন একটা যুগ বা পবেধের প্রারস্ত হওয়ার পুর্বেরবেই 
সেই যুগের বিশিষ্টভাব কিছু কিছু পৃব্বের রচনায় কখনও দেখা যায়। 
আবার অনেকদিন পরেও একটা বিগত যুগের বিশিষ্ট ভাবের পুনরু- 
জ্জীবন হইতে পীরে, যেমন বর্ধাকালেও কখন কখন কোকিল ডাকে । 
উদাহরণম্বরূপ বলা যায় যে “চিত্রা'র “মুখ' কবিতাটি “সোনার তরী, 
পর্যায়ের কবিতাগুচ্ছ রচনার সময়েই লেখা হয় ; আবার শেষ জীবনে 
“পুনশ্চ-শেষসপ্তক' রচনার পর্ধধেই “বীথিকা'র এমন কতকগুলি কবিতা 
রচিত হয় যেগুলি বিগত বর্ষার অবশিষ্ট মেঘমালার শেষ বর্ষণ। 
এইজন্য সময়ের অঙ্কের অন্ুুবর্তন না করিয়া ভিন্ন ভিন্ন কাব্যগ্রন্থের 
রচনার অন্রুত্রম অন্থুসারে পর্ধব-বিভাগ করিলে অনেক সময় স্ববিধা 
হইতে পারে । কারণ, “অন্রকালের ব্যবধানে যে সমস্ত ( কবিতা ) 
পরে পরে রচিত হইয়াছে তাহাদের পরস্পরের মধ্যে একটি ভাবের 
এঁক্য থাক! সম্ভবপর মনে করিয়া” তদহ্ুসারে কবি অনেকসময় এক 
একটি গ্রন্থের কবিতা নিবর্ধাচন করিয়াছিলেন । কিন্তু ছুঃখের বিষয় 
সব সময়ই তাহা করা হয় নাই । “শিশু' কাব্যের কতকগুলি কবিতা 
রচিত হয় “কড়ি ও কোমল” পব্রবে এবং অন্যান্যগুলি রচিত হয় 
খেয়া" পরের জ্চনার ঠিক পুর্বে । এখানে শুধু একটা বিষয়গত 
এঁক্য আছে, কিন্ত ভাবগত এঁক্য নাই । কখন কখন ব্যবহারিক স্থবিধা 
বিবেচনা করিয়া গ্রন্থের কবিতা নিব্বাচন করা হইয়াছে । ভাবগত 


৬৮ কবিগুরু 


এক্য আছে কি-না--“কবির এ সম্বন্ধে খেয়াল থাকে না”। হয়ত 
রচনার সময়ে বা প্রকাশের কালে এ বিষয়ে কিছু নির্ধারণ করা 
সম্ভবও নয়, কারণ “স্থ্টিবদলে”র “কাজ হ'তে থাকে অন্যমনে” | 
ৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে পরিশেষ' কাব্যগ্রন্থের অন্তভূক্ত কবিতা- 
'খুলি বেশ কয়েক বৎসর ধরিয়া এক একটি করিয়া রচিত হইয়াছিল, 
ইতিমধ্যে কবির মনে 2হাওয়াবদল” এবং রচনায় “স্থষ্টিবদল' হইয়া- 
ছিল, কিস্তু এইগুলিই হইবে তাহার শেষ রচনা এইরূপ বিবেচনা 
করিয়া সবগুলি একহ গ্রন্থে প্রকাশের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন । তখন 
জানিতেন না যে “পুনশ্চ, তাহাকে রচনা করিতে হইবে । 

এতত্তিন্ন আরও একটা বিষয় মনে রাখিতে হইবে | রবীন্দ্রনাথের 
কাব্যগ্রন্থে যাহা স্থান পাইয়াছে সবই যে তাহার আত্মিক সাধনার 
প্রকাশ তাহা নহে । কতকগুলি কবিতা সাময়িক উপলক্ষ্যে রচিত, 
তাহাদের রচনায় শিল্পসৌন্দর্য্য থাকিলেও আত্মপরিচয় নাই । তাহা 
ছাড়া কখনও কখনও তাহার অবচেতন মনের অস্তঃসলিলা রসধারা 
সমস্ত বাস্তববোধ ও ধন্মবোধ ভেদ করিয়া ফোয়ারার মতন প্রধানতঃ 
গানের আকারে উৎসারিত হয় ; যখন ঝড়ের মুখে বোট (7১০৪৮) 
টলমল, তখন লেখেন “যদি বারণ কর, তবে গাহিব না”; যখন 
লিখিতেছেন “দামামা এ বাজে, 


দিনবদলের পালা এল 
ঝোড়ো যুগের মাঝে' 


প্রায় সেই সময়েই লিখিলেন, 


“নৃবল দাদা আনল টেনে আদম দীঘির পাড়ে, 
লাল বাঁদরের নাচন লেখায় রামছাগলের ঘাড়ে । 


রবীন্দ্রকাব্যে পর্র্ধ ও যুগ-বিভাগ ৬৯ 


তাছাড়া ধর্মবোধের কবিতা রচনার কালেও তাহার শুদ্ধ যুক্তি" 
বাদী সত্তার ক্রিয়া শুধু গ্ভে নয় পছ্েও অভিব্যক্ত হয়, “গীতাঞ্তলি'তে 
আত্মনিবেদনের মধ্যেও “ছুর্ভাগ৷ দেশে"র মুঢ়তা ও ভবিষ্যৎ সবর্বনাশের 
কথা চিন্তা করিয়া তিরস্কার করেন । 

রবীন্দ্র-মানসের 'নানা ধারা তাহার কাব্যকোতে যুগপৎ প্রবাহিত 
হওয়াতে গতি অনেক সময় কুটিল ও ইহার প্রকৃতি জটিল হইয়াছে । 
স্বতরাং সাবধানে এ বিষয়ে আলোচনা করিতে হয়। তবে গতিধে 
একটা আছে, এবং তাহা যে একটা আত্মিক প্রগতির অন্ুগামী তাহাতে 
সন্দেহ নাই । কবির জীবনে একটা “আবির্ভাব” কি ভাবে তাহাকে 
“অতীতের মধ্য হইতে অনাগতের মধ্যে প্রাণের উপর প্রেমের হাওয়া 
লাগাইয়া'-.কাল মহানদীর নৃতন নৃতন ঘাটে বহন করিয়া লইয়া 
চলিয়াছেন,” তাহাই রবীন্দ্রকাব্যের বস্ত । 


(২) 


“নূতন নৃতন ঘাট” ধরিয়া কবিচিত্তের “অবারণ চলা”র অর্থাৎ 
কাব্য-রচনার সুত্র অবলম্বন করিয়া কবির আত্মিক প্রগতির মহান্‌ 
ইতিহাস বা! মহাভারত আলোচনা করিলে আঠারোটি পৰব্রের বা 
কবিচিত্তের আঠারোটি বিভিন্ন প্রকাশের সন্ধান পাওয়া যায় । অবশ্য 
নদীআোত এক ঘাট হইতে অপর ঘাটে অবাধেই প্রবাহিত হয়, বাক 
ঘুরিলেও আ্োতে. বাধার স্থষ্টি হয় না; কবিচিত্তের এক একটি প্রকাশও 
তেমনি পরবর্তী প্রকাশ হইতে বিচ্ছিন্ন বা বিষুক্ত নহে । শীতের পর 
বসন্ত যেমন অলক্ষিত ভাবেই আসে, তেমনই অলক্ষিত ভাবে এক 


ণও কবিগুরু 


পর্বের পর আর এক পব্রের স্ষচনা হয় তবে পর্বের পারম্পর্যের 
মধ্যে এই চক্রগতি বরাবরই দেখা যায় । 


পারম্পরিক তিনটি পরে রবীন্দ্রকাব্যের এক একটি যুগ--এইরূপ 
ধারণা করা যাইতে পারে । এক একটি যুগ প্রেরণার এক একটি 
তরঙ্গের পূর্ণ বিস্তার ৷ ভাবাভাব, ভাব, মহাভাব-_-পর পর এই তিনটি 
অবস্থা অতিক্রান্ত হওয়ার পর এক একটি তরঙ্গের প্রশমন হয়, তাহার 
পর অপর একটি তরঙ্গ অনুরূপ ভাবে অগ্রসর হয়। এই লীলা- 
চাঞ্চল্য ও তাহার নিয়মিত আন্দোলন চিরকালই রবীন্দ্রকাব্যে 
চলিয়াছে। 


(৩) 
এই কয়েকটি পর্ব ও যুগের পারম্পরিক সম্পর্ক নিয়লিখিত নকশা 
ধরিয়৷ নির্দেশ করা যাইতে পারে । এক একটি পর্ধ সমকালে রচিত 
কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে । তবে এই নির্দেশ 
একেবারে নিদ্ধারিত নহে ; তাহার কারণ পুর্ব পরিচ্ছেদেই ব্যক্ত করা 
হইয়াছে । তবে ইহার চেয়ে স্বক্মভাবে নির্দেশ করার আর কোন 
সহজ উপায় নাই । 


রবীন্দ্রকাব্যে পর্ব ও যুগ-বিভাগ ৭১ 


এই পারম্পর্্য লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে ভাবাভাবে ইহার 
সুত্রপাত ও মহাভাবে ইহার পরিশেষ। * আধ্যাত্মিক সাধনার 
ইতিহাসই এইরূপ । স্থষ্টিরও বোধ হয় এই ইতিহাস । 
অসদ্বা ইদমগ্র আসীৎ। ততো বৈ সদজারত 
( তৈত্তিরীয়োপনিষৎ, ২1৭ ) 
কিন্তু সৎ (অর্থাৎ অভিব্যক্ত জগৎ ) প্রকট হইলেই হয় স্থষ্টি- 
কালের আরন্ত । এই জন্যে এক একটি ভাব হইতেই রবীন্দ্রকাব্যের 
এক একটি ঘুগের আরন্ত । এক একটি ঘুগ ধরিয়া এক এক প্রকার 
অনুভবের পূর্ণ বিকাশ হয়। কবিচিত্তে এক একটি উল্লাম বা এক 
একটি আবির্ভাবের আন্ববঙ্গিক ক্রিয়া চলিতে থাকে এক একটি যুগ 
ধরিয়া | 


* যেখানে একট! নিরস্তব চক্রগতি অ।ছে সেখানে কোথায় আরম্ত তাহ) নির্ণয় কৰা দু। 
প্রথমে বাজ ও পরে বৃক্ষ, না? প্রথমে বৃক্ষ ও পবে বীজ--এই প্রশ্নের শেম মীমাংসা বোধ হয় 
আজও হয় নাই। রবীন্দ্রকাল্যের বিবর্তন লক্ষ্য করিয়া! যেরূপ প্রতীতি হয়ঃ তদন্ুসাবেই এই 
পরিচয় দেওয়া] হইল। 


৭২ কবিগুরু 


(৪) 











রবীন্দ্রকাব্যের বিবর্তনের নকৃশাটি এইরূপ £ 
তাবাভাব 
ভাব মহাভাব 
সারার 
যুগসন্ধ্য ূ ১ পর্ব 
নিরানি পা সন্ধ্যাসঙ্গীত 
খয পব ভিজ 
১ম যগ র প্রভাতসঙ্গীত কড়ি-ও-কোমল ইঃ 
ৰ ধর্থ প্ৰ্ব 
মানসী 
ৰ এম পরব 25508852- 2 
ূ তি ইঃ 
২য় যুগ ৃ সোনার তথা ] চিত্র, চৈতালি ইঃ 
ৃ ণম পর্ন 
| কল্পনা, কখ।-ও-কাহিনী ই? 
ূ 1) ম পর্ব 
ক্ষণিকা নৈবেছ্ 
৩য় যুগ হর 
ৃ স্মরণ, শিশু, উৎসর্গ ইঃ 
১১শ বাব ১২শ পর্বব 
্থ ূ খেয়া গীতাঞ্রলি, গীতিমাল্য, গীতালি 
রা র ১৩শ প্ 
র বলাকা? পলাতকা ইঃ 
নি? ১৪শ পর্কব ১৫শ পর্বব 
| পৃববী মহুয়া-»পরিশেষ 
নিযে | ১৯৬শ পর্বব 
ূ পুনশ্চ-সশ্যামলী 
্ চি ১৭শ পব্ব ১৮ পর্ব 
যুগ র প্রানস্তিক-»সানাই রোগশয্যায়-৮”শেষ লেখা 


আরারাররাররেরাররাররারররারররররররএররারারাররররারাাচররররারারাচারারাারারাররাররররাররারাররধারররারহাররারারর উহার 
পরবর্তী কয়েকটি অধ্যায়ে এই ক্রমবিকাশেব সুত্র অহলম্বন করিয়া রবান্রনাথের কাব্য 
সাধনার পরিচয় দেওয়া হইল । 


রবীন্দ্রকাব্যে পর্ব ও যুগ-বিভাগ ৭৩ 


(৫) ৃ 
হেগেল (1796০1)-রচিত ন্যাযদর্শন (10010 2৪ 17)6181)1)55108 
অন্নুসারে বিবর্তনের মুল স্ত্র হইতেছে 11)9818, 417 016079519 ও 
971)61,9818 এই ব্রি-তত্বের পর্যায় । 01)6518 অংশ-সত্য ; এই 
অংশ-সত্য অপূর্ণ সুতরাং ইহা অংশতঃ মিথ্যা । স্বভাবতঃ ইহার 
অন্ুক্রমে উদ্ভূত হয় ইহার বিপরীত অংশ-সত্য বা 41001-0179915, 
[1,991 ও 48100161)6918-র বিরোধের অবসান হয় যখন একটা 
বৃহত্তর সত্য বা 9786179918-র মধ্যে উভয়ই মিলিত হয়। কিন্তু 
প্রথম পর্য্যায়ের 9:)01)9818ও পুর্ণ-সত্য নহে, স্তরাং পুনশ্চ সেই 
চিরন্তন প্রক্রিয়ার পুনরারন্ত হয় ও তাহার ফলে আরও বৃহত্তর একটা 
91)09819-র উত্তব হয় । এইভাবে 479801569 106৪ বা “পূর্ণের 
দিকে ক্রমশঃ প্রগতি চলিতে থাকে । 
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে হেগেল যাহাকে 17931, 4001- 
01)9919 ও 97/0616818 বলিয়াছেন তাহাই ভাব, ভাবাভাব ও মহা- 
ভাব, অর্থাৎ ( রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলিতে গেলে ) জীবন, মৃত্যু ও 
অমৃত । কিন্ত রবীন্দ্রকাব্যের অনুসরণ করিলে দেখা যায় যে 
রবীন্দ্রনাথের সাধনার ইতিহাস হেগেল-কখিত পর্যায়ের অন্কুগামী 
নহে । এখানে ভাবের অন্ুক্রম ভাবাভাবে নহে, মহাভাবে । মহাভাবের 
পর ভাবাভাব দেখা দেয় বটে, কিন্তু এই বিরোধের অবসান 
ঘটে বৃহত্তর কোন ভাবের মধ্যে উভয়ের সম্মিলনে নহে, একটা 
নৃতন অপ্রত্যাশিত (925)67567)6) আবির্ভাবে । ভাবধন্মী পব্বের 
কাব্যগুলির -( প্রভাতসঙ্গীত, সোনার তরী, ক্ষণিকা, খেয়া, পূরবী, 
প্রান্তিক ) মৌলিক উপলব্ধি বিবেচনা করিলেই তাহা বুঝিতে পারা 
যাইবে । 


৭৪ কবিগুরু 


তবে মূলতঃ রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধির বিকাশের মধ্যে যে এক 
প্রকাশের দ্বন্বমূলক (91815061081) সুত্র আছে, তাহা কবির নিজের 
অনেক স্বীকৃতিতেই প্রকটিত হইয়াছে । “আমার মধ্যে স্থ্টি-সাধন- 
কারী একাগ্র লক্ষ্য নির্দেশ করে চলেছেন একটি গুঢ় চৈতন্য বাধার 
মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে”__এই স্বীকৃতিতে 3689! 
কথিত 1175 19695 61199101716, 01891506108] 1079098৪-_সবই 
সমথিত হইয়াছে | 0:986)%০ 705০18610-র তত্বও এখানে স্বীকৃত । 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ 


অতি অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথ কাব্য রচনা আরম্ভ করেন, “কবি হয়ে 
জন্মেছি ধরায়” এ কথা বলিবার অধিকার তাহার ছিল | তাহার প্রথম 
কাব্য যখন প্রকাশিত হয় তখন তাহার বয়স মাত্র সতের, ইহার অনেক 
পুর্ব হইতেই তিনি উল্লেখযোগ্য কবিতা রচনা করিতেছিলেন । তবে এ 
কথা স্বীকার করিতেই হইবে যে রবীন্দ্রনাথের অল্প বয়সের ঘে কবিতা- 
গুলি আছে, লেখকের বয়স হিসাবে সেগুলির যতই ম্ুখ্যাতি হউক, 
এই সমস্ত এ 09188]18, (বাল রচনা)-র মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের 
নিজস্ব সাধনার পরিচয় পাওয়া যায় না। তখন পধ্যন্ত রবীন্দ্রনাথের 
কাব্যে অন্ুকরণ-স্পৃহা এবং কবিপ্রসিদ্ধ মত ও ভাবের প্রতিধ্বনি ছাড়া 
বড় একটা কিছু নাই। রোম্যান্টিক ভাবালুতা ও আদর্শের সহিত 
লবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটিয়াছিল, বিলাতী রোম্যান্টিক কাব্য ও বিহারী- 
লাল প্রভৃতি দেশী কবিদের রচনা তাহার উপর স্পষ্ট প্রভাব বিস্তার 
করিয়াছিল । অবশ্য এই জাতীয় রচনার প্রতি রবীন্দ্রনাথের একটা 
স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই । কিশোর কবি 
হিসাবে রবীন্দ্রনাথ তাহার অল্পবয়সের এই সমস্ত রচনায় স্থানে স্থানে 
কুশলতা, এমন কি বাহাছুরি দেখাইয়াছেন, কিন্তু তদপেক্ষা আর বেশী 
কিছু তাহাতে নাই । এই জন্য রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাহার কাব্যের 
বিচারের সময় এ অপরিণত বয়সের রচনাগুলিকে বাদ দিতে বলিয়া- 
ছেন। “কবি কাহিনী”, “বনফুল” “ভগ্রহৃদয়”* “রুভ্রচ্ড_ এই 
কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ এই পর্যায়ে পড়ে । “ভানুসিংহের পদাবলী'কেও 
এই সঙ্গে ধরা যায়। যদিও এই পদাবলী প্রকাশিত হয় কয়েক 
বতমর পরে, রচনাকাল এবং সাহিত্যিক গুণ বিবেচনা করিলে 


৭৩ কবিগুরু 


এই গুলিকে বাল্যরচনার মধ্যেই ফেলা উচিত । এই সময়ে কবির 
বয়স ১৪ হইতে ১৮।১৯ বৎসর, কবি. তখন পর্যন্ত নাবালকেরই 
সামিল। জীবনেও তেমন উল্লেখযোগ্য কোন অভিজ্ঞতা লাভের 
স্বযোগ রবীন্দ্রনাথের তখনও হয় নাই! তবে চারিদিকে যে শিক্ষা, 
সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের আত বহিতেছিল, যে সকল 
আদর্শের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের জীবনে পড়িতেছিল, তাহা হইতে নানা 
উপাদান অবশ্য কবির অন্তকরণে সঞ্চিত হইতেছিল ৷ 

এই সময়টাকে আমরা স্থষ্টির প্রাক্কালের সহিত তুলনা করিতে 
পারি । “10870006588 ৪৪ 10010 0106 ৮০10. 8100. 106 9101700 
09 0800 70590. 01901 6119 90০7৪” এই কথাগুলিতে জগৎ 
স্থষ্টির ঠিক পুবের্বের ঘে অবস্থাটি বর্ণনা করা হইয়াছে, সেই অবস্থাই 
তখন রবীন্দ্রনাথের চলিতেছিল । তখনও তাহার “4কাব্য-ভূসংস্থানে 
ডাউা জেগে উঠতে আরম্ভ” করে নাই, একটা অন্ধকারময়ী শূশ্যতাই 
তরল কবিচিত্তকে চাপিয়া রাখিয়াছিল, যদিও তাহার অস্তরালে স্ষ্টির 
আগ্যাশক্তির ক্রিয়া আরম্ত হইয়াছিল । কবির জীবনে এইটাই কন্প- 
সন্ধ্যা । তবে এই সময়ের কোন কোন রচনায় যে কবিত্ব নাই এমন 
নয়। “ভান্ুসিংহের পদাবলী" কথাই প্রথমে মনে হইবে । ইহার 
ভাষা বজবুলির সফল অন্নুকরণ, ইহার পদলালিত্য ও ছন্দের বঙ্কার 
চমতকার ৷ কিন্তু ষাহারই বৈষ্ণব কাব্যের সহিত ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে, 
তিনিই স্বীকার করিবেন যে ইহার ভাব, ছন্দ বা বাচন-ভঙ্গী কোনটাই 
বৈষ্ণব পদাবলীর' অন্ুসারী নহে । “মরণ রে, তৃছ' মম শ্যাম সমান” 
ইত্যাদি পদের মধ্যে একটা চটক আছে, কিন্তু তাহাতে পদাবলীর রস 
নাই । আসলে ভান্কুসিংহের পদাবলীর মধ্যে পরের সোনা কানে 
দিবার প্রয়াসই বেশী আছে,_ খাঁটি অন্কুতীতি কম । 


বৃদ্ধা 
প্রথম পর্ত্র 
সন্ধ্যাসঙগীত 
( ভাবাভাব ) 


রচনা কাল £ ১৮৮১ খঃ 
বয়ল 2 ২২০ 


রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব কাব্যজীবনের স্বত্রপাত হইল “সন্ধ্যাসঙ্গীতে" । 
পুবেব তিনি যাহা রচনা করিয়াছিলেন তাহার মধ্যে অল্পবিস্তর কাব্য- 
মূল্য আছে, কিন্তু সে সমস্ত কাব্য তাহার নিজস্ব উপলব্ধি ও প্রতিভার 
স্বতঃপ্রকাশ নহে, সেগুলি ছিল “কপিবুকের কবিতা” । কবির ভাষায় 
বলা যায়, “সেই কপিবুক-যুগের চৌকাঠ পেরিয়েই প্রথম দেখা দিল 
সন্ধ্যাসঙ্গীত। তাকে আমের বোলের সঙ্গে তুলনা করব না* করব 
কচি আমের গুটির সঙ্গে, অর্থাৎ তাতে তার আপন চেহারাটা সবে 
দেখ৷ দিয়েছে শ্যামল রঙে । রস ধরে নি তাই তার দাম কম ।” 

উৎকৃষ্ট কাব্য না হইলেও “সন্ধ্যাসজীতে" রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব 
অনুভূতির পরিচয় আছে । বিশ বৎসর বয়সে তরুণ যৌবনের উন্মুখ 
আকাজ্ষার সহিত জীবনসত্যের প্রতিঘাত হইতে এই কবিতাগুলির 
উৎপত্তি । এই প্রতিঘাতের ফলেই হইল কবির আত্মবোধের স্ত্রপাত, 
ভাহার আধ্যাত্মিক সত্তার বোধন । 

প্রতিঘাতের বেদন হইতে “সন্ধ্যাসঙ্গীতে'র উৎপত্তি বলিয়া এই 
কাব্যে ভাবাভাবের লক্ষণ সুস্পষ্ট । যুরোপে রোমান্টিক আন্দোলনের 


৭৮ কবিগুরু 


ইতিহাসে ৪৮০] 91). 97805 ( ঝড়-ঝাপট )-যুগে যে মনোভাবের 
প্রকাশ হইয়াছিল, 09099$1.8-র 9০0705৪ ০0 ৮৮9:6)০7-এ যাহার 
প্রমাণ রহিয়াছে, সেই মনোভাবের পরিচয় এই কাব্যে পাওয়া যায়। 
এই মনোবৃত্তির কতকগুলি বিশেষ লক্ষণ আছে; যথা, অতিরিক্ত 
ভাবাতুরতা, স্ব-চেতনতা (5611-00108010980988), তীব্র ভোগতৃষ্জা, 
অধীরতা, এমন কি আত্মমর্দন ইত্যাদি । তাহার সহিত অবিচ্ছেগ্ভভাবে 
জড়িত থাকে অতৃপ্তি, বিষাদ ও চিন্তাজঙ্জরতা | এই সমস্ত লক্ষণই 
অল্লাধিক পরিমাণে “সন্ধ্যাসঙ্গীতে” বর্তমান । নিদর্শনস্থানীয় কয়েকটি 
কবিতার শিরোনাম হইতেই এই সমস্ত লক্ষণের ইঙ্জিত পাওয়া 
যাইবে । “তারকার আত্মহত্যা”, “আশার নেরাশ্য”, “স্থখের বিলাপ” 
“ছুঃখ-আবাহন”, “অসনা ভালোবাসা” “হলাহল” ইত্যাদি কবিতার নাম 
হইতেই বস্তর পরিচয় পাওয়া যায় । ১6৮] 800 0:8106-র 
উচ্ছবাসময় কাচা রোম্যার্টিকতার লক্ষণ সন্ধ্যাসঙ্গীতের সব কবিতাতেই 
আছে। সমগ্র কাব্যটির মধ্যে রহিয়াছে সন্ধ্যার রউঃ একটা আলো- 
আধারি নৈরাশ্য। কবির মর্ম্মববাণী প্রকাশ পাইয়াছে সন্ধ্যার আবাহনে । 
যেথায় পুরানো গান, যেথায় হারানো হাসি 
যেথা আছে বিস্মৃত স্বপন 
সেইখানে সযতনে রেখে দিস গানগুলি, 
রচে দিস সমাধিশয়ন । 
কেবল আত্মবিলাপ নহে, আত্মবিলোপের কামনা-ও এখানে 
ধ্বনিত হইয়াছে । 
“সন্ধ্যাসঙ্গীতের কবি উপলন্ধির কোনও উচ্চগ্রামে আরোহণ 
করিতে পারেন নাই । শব্দচয়নে দৈন্যের এবং শব্দবিন্তাসে ও প্রকাশ- 
| ভঙ্গীতে দুর্বলতার, জড়িমার ও অপটুতার পরিচয় রহিয়াছে । ভাবা- 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- বুগসঙ্থ্যা ৭৯ 


বেগ মাঝে মাঝে ঈষৎ তীব্র হইলেও, অনুভবের মধ্যে একটা গোধূলির 
অস্পষ্টতা রহিয়া গিয়াছে । 

কিন্তু নানা ক্রটি থাকিলেও “সন্ধ্যাসঙ্গীতে'র মধ্যে যথার্থ কাব্যগুণ 
আছে, অনুভূতির সত্য আছে, কবির যথার্থ প্রাণের কথা ও মুখের 
ভাষা এখানে ধ্বনিত হইয়াছে । বহ্কিমচন্দ্রের স্ায় তীক্ষধী সমালোচকের 
কাছে ইহার কাব্যগুণ তৎক্ষণাৎ প্রকট হইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ যে 
মূলতঃ গীতিকাব্যের কবি, 1571018হ যে তাহার স্বধন্ম তাহা এখানেই 
পরিস্ফুট হইল । কবি নিজেকে আবিষ্কার করিলেন, নিজের পথ 
খুঁজিয়া পাইলেন । 

রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব কবিপ্রতিভা যে এখানে স্ফুরিত হইয়াছে 
তাহার আর একটা পরিচয় পাওয়া যায় এই কাব্যের ছন্দে । প্রচলিত 
পরিপাটীতে সন্তষ্ট না থাকিয়া কবি নূতন নূতন পরিপাটার সন্ধান 
করিতেছেন, নানাভাবে চরণ গঠনের ও বিন্যাসের চেষ্টা করিতেছেন, 
তবে কোনটাই যেন একটা স্থির বা ঞ্রুব রূপ শ্রহণ করিতে পারিতেছে 
না, বুদ্ধদের মত ফুটিতে ফুটিতে তখনই লয় পাইতেছে। কবির 
ভাবসাধনা ও ছন্দসাধনা উভয়ই একভাবে চলিতেছে, ভাবের ও ছন্দের 
এক একটি অপরিস্ফুট রূপ-_ 

“সমুখেতে ভাসিয়া বেড়ায় 
কভু ফোটে কভু বা মিলায়।” 


রথ যুগ 
[ প্রভাত সঙ্গীত'--“মানসী' ] 
€( ১৮৮৩--১৮৯০ ) 
(বয়স ২২২৯) 


“প্রাণের বাসনা, প্রাণের আবেগ 
রুধিয়া রাখিতে নারি” 


/“সন্ধ্যাসঙ্গীতে' যে কবিত্ব-শক্তির আভাস দেখা গিয়াছিল, তাহার 
উন্মেষ হইল 'প্রভাত-সঙ্গীতে' ) এই সময় কবি আইনের চক্ষেও 
যেমন নাবালক হইতে সাবালক হইলেন, সাহিত্য-সমালোচকের চক্ষেও 
তেমনি “কবিযশঃপ্রার্থী” হইতে “কবি” হইলেন । তাহার কবিতা মক্কা 
করার দিন শেষ হইল; এই সময় হইতে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব প্রতিভার, 
নিজন্য উপলব্ধির বাণী প্রকাশ পাইল তাহার কবিতায় । সদর স্তরের 
বাড়িতে থাকিবার সময় যে দিন স্ধ্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এক মুহূর্তের 
মধ্যে তাহার “চোখের উপর হইতে একটা পর্দা সরিয়া গেল”, তিনি 
“একেবারে সমস্ত চৈতন্য দিয়া দেখিতে আরম্ভ” করিলেন, সেই দিন 
হইতে তাহার যথার্থ কাব্যসাধনার স্ত্রপাত। ইহার পর হইতেই 
তাহার কাব্য তাহার বৈশিষ্ট্যময় জীবনের সাধনার সহিত এক হইয়৷ 
গিয়াছে । 
(এই সময় হইতে রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাধনার ইতিহাসে যে প্রথম 
যুগের আরস্ত হইল, তাহাকে আমরা আত্ম-সচেতনতার যুগ বলিতে 
পারি। কবি তাহার প্রাণের একট] নিজন্ব গতি, আকাজ্সন ইত্যাদি 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- প্রথম যুগ ৮5 


সম্পর্কে সচেতন হইয়া উঠিতেছেন, নির'রের ব্বপ্রভঙ্গ হইয়াছে । নিজের 
“প্রাণের বাসনা, প্রাণের আবেগ” ছাড়া কবি আরও একটা জিনিষের 
উপলব্ধি এই সময়ে করিলেন । বহির্জগতের মধ্যে, ধরণীব্যালী সমগ্র 
মানবের চাঞ্চল্যের মধ্যেও যে একট। বিশিষ্ট সত্তা রহিয়ছে, তাহার 
একটা আভাম এই সময়ে তিনি অনুভব করিলেন । তাহার প্রাণের 
সহিত এই জগৎসত্তার ঘে একটা নিবিড় যোগ আছেঃ এবং পরস্পরের 
জন্যই যে এই উভয় সত্তার স্ষ্টি হইয়াছে, অন্ততঃ ইহাদের মধ্যে যে 
একটা ভাবের আদান-প্রদান চলিতে পারে, তাহাও তিনি প্রতাক্ষভাবে 
অন্নুভব করিলেন 1) 
সাধনার প্রথম ধাপ হিসাবে এই উপলন্ষি খুব অকিঞ্চিৎকর 

বলিয়া অনেকে মনে করিতে পারেন । কারণ, উপনিষদে * প্রাণ যে 
অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, সে অর্থে প্রাণের উপলব্ধির পরিচয় এ সময়ে 
পাওয়া যায় না। এই সময়ে প্রাণ বলিতে মানব-স্থলভ বৃত্তি, 
অনুভূতি ও বোধের কেন্দ্র-ই বুঝিতে হইবে । তবে এ কথাও স্বীকার 
করিতে হইবে যে এ সমস্ত বৃত্তি ও অন্থুভুতি আমাদের সকলের 
মধ্যেই থাকা সত্বেও তাহাদের মৌলিক এক্য, তাহাদের স্দুরপ্রসারী 
আবেদন ও তাৎপর্য সম্বন্ধে সাধারণ মানবের বোধের অত্যন্ত অভাবই 
পরিলক্ষিত হয়। এতগ্ডিন্ন এই বৃত্তির তীব্রতা, এক মুখিতা ইত্যাদি-ও 
সাধারণ ব্যক্তির চরিত্রে দেখিতে পাওয়। যায় না। ঘেমন, যে ভাবে 
দ্য ০:9৭৪৬7০:৮৮এর কথিত “& ৪1701)19 01110. 9913 169 1216 1 
5৮০9] 1170৮, সে ভাবে 1109 বা প্রাণশক্তির অফুরন্ত প্রাচ্ধ্য 
অন্ৃভব করা সকলের পক্ষে সম্ভব নহে। অথচ এই প্রাণশক্তির 

* পযদিদং কিঞ্চ জগৎ সর্বং প্রাণ এজতি নিঃহতম্” (কঠোপনিষযৎ »1৩২) ইত্যাদি উত্ত্ি 
দ্রষ্টব্য । 
ঘ--৬ 


৮২ কবিগুরু 


তীব্রতা ও প্রাচর্ধ্য-ই সাধকগণের চরিত্রের অন্যতম লক্ষণ । তাহাদের 
মধ্যে অনেকেই: প্রথম জীবনে ছর্দাস্ত উচ্ছংঙ্ঘল জীবন যাপন করিতেন, 
এই উচ্ছঙ্খলতা তাহাদের প্রাণশক্তিরই পরিচায়ক |. কিন্তু ইহা 
উহাদের সাধনার পরিপন্থী না হইয়! বরং তাহাদের সাধনার সোপানই 
হইয়াছিল । জীবনীশক্তির সম্যক উদ্বোধন না হইলে আধ্যাত্মিক 
জীবনের স্ুত্রপাত হয় না। স্বুতরাং মানবিক বৃত্তির প্রখরতা সাধনার 
একটা প্রাথমিক সোপান বলিয়াই বিবেচিত হইয়া থাকে । অপিচ, 
যদিও সংসারের নানা সৌন্দর্য্য অনেক সময় আমাদের ইন্দ্রিয়গোচর 
হইয়৷ থাকে, তত্রাচ জাগতিক সৌন্দর্যের মধ্যে যে একটা এক্য ও 
একটা বিরাট প্রাণের প্রবাহ রহিয়াছে এবংবিধ অন্ুভূতি সুলভ নহে । 
অথচ বিশ্বের বিরাট সত্যের উপলব্ধির পক্ষে এতাদৃশ অন্ৃভতি-ই 
সর্বপ্রথম আবশ্যক । এই জাতীয় অন্ভূতি-ই রবীন্দ্রকাব্যের প্রথম 
যুগে কবিকে অনুপ্রাণিত করিয়াছে, এই জন্যই রবীন্দ্র-সাধনার 
ইত্তিহালে প্রথম যুগের কাব্যের একটা বিশেষ মূল্য আছে। 
শুধু কাব্যরসের দিক্‌ দিয়া আলোচনা করিলে এই যুগের অনেক 
কবিতাকে খুব উচ্চ স্থান দেওয়! যাইতে পানে । যে স্থূল মানবতা 
(00107801970) অনেক কাব্যের, এমন কি অনেক শ্রেষ্ঠ কাব্যের 
উপাদান তাহা এই সময়ের রচনায় স্বপ্রচুর । $69৯৮৪-এর প্রথম 
বয়সের রচনায়, 7). 0. 7২০৪৪০৮1-এর অনেক কবিতায় যে যৌবন- 
স্বপ্ন ও উচ্ছাসের পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা নিপুণ শিল্পকলার সহিত 
যুক্ত হইয়া এই সময়ের অনেক কবিতাকেই রসরূপ দান করিয়াছে । 


দ্বিতীপ্ব পর্ন (ভাব) 
[ “প্রভাত-সঙ্গীত” ; “ছবি ও গান” ] 
(১৮৮২-১৮৮৩ ) 
€( বয়স__২১।২২) 
“জাগিয়া উঠেছে প্রাণ” 


€ঁবীক্রসাধনার প্রথম যুগের প্রথম পর্ধের রচনা-_প্রভাতসঙ্গীত' । 
একটা নবজীবনের আবেগ ইহাকে আকুল করিয়া রাখিয়াছেঃ রবীন্দ্র- 
কাব্যে প্রথম “ভাবের” প্রবাহ এই কাব্যেই দেখিতে পাওয়া যায়। 
“নিঝরের স্বপ্রভঙ্গ' নামক বিখ্যাত কবিতাটিতে এই ভাবটি পরিস্ফুট 
হইয়াছে । এই ভাবের প্রথম কথা একটা আত্মসচেতনতা--জাগিয়া 
উঠেছে প্রাণ | সেই প্রাণের সহিত পারিপান্থিকের ছন্দ-_ইহার দ্বিতীয় 
তথ্য । “ওরে চারিদিকে মোর-_এ কী কারাগার ঘোর' ইহাই তাহার 
নালিশ । এই পাষাণকারাকে ভাঙিয়া চুরিয়া সে আত্মপ্রকাশ করিবে-_ 
জড় বাধার সহিত সংগ্রাম করিয়া প্রাণের প্রতিষ্ঠা করিবে ইহাই তাহার 
প্রতিজ্ঞা । তৃতীয়তঃ এই প্রতিষ্ঠার অর্থ হইতেছে জীবনে সৌন্দর্য্যের 
পরিপূর্ণ বিকাশ, “কেশ এলা ইয়া, ফুল কুড়াইয়া, রামধন্থ-আাকা পাখা 
উড়াইয়া, রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া” জীবনকে বিকশিত করাই; 
ইহার “সাধ” । এই ভাবে রবীন্দ্রকাব্যের কয়েকটি মৌলিক তত্ব 
'প্রভাভ-সঙ্গীতে'ই প্রকাশ পাইয়াছে ।-/ 

কিন্তু এই প্রকাশ এখনও অস্ফুট, প্রভাতন্বপ্নের হ্যায় মধুর হইলেও 
অলীক, প্রত্যুষের কুহেলির ন্যায় রক্তীন হইলেও ক্ষণিক ! “সৃষ্টি, 
স্থিতি, প্রলয়', “অন্ত জীবন”, “অনম্ত মরণ', ইত্যাদি নানা কল্পনা 


৮৪ কবিগুরু 


রডীন ফাহৃষ এখন কবির মনশ্চক্ষুর সম্মুখে ভাসিয়! বেড়াইতেছে, তাহার 
হৃদয় উচ্ছুসিত হইয়া উঠিতেছে। বিশ্বস্ষ্টির প্রতিধ্বনি” তাহার 
অন্তরেও একটা আবেগের স্থপ্টি করিতেছে । কোন রহস্যের তত্ব 
এখনও তিনি স্পষ্ট করিয়া ঝুঝিতে পারেন নাই, কিন্তু পৃণিমা নিশীথে 
সিন্ধুর মত তাহার প্রাণ বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে। “হৃদয় আজি মোর 
কেমনে গেল খুলি, জগৎ আদি সেথা করিছে কোলাকুলি |” মনে 
হইতেছে কী যেন একটা রহস্তের “অরুণ-রথচুড়া আধেক যায় দেখা” । 
তাহাকে তিনি আলিঙ্গন করিতে চান, “আমারে লও তবে, আমারে 
লও তবে” ইহাই তাহার আহ্বান । (জগতত্রোতে ভাসিয়া চলিতেই 
এখন তাহার আগ্রহ । একটা অবোধ অনিদ্দিত আকুতিই “প্রভাত- 
সঙ্গীতের" মূল ভাব ।) 

এই ভাব-ই “ছবি ও গানে” আমরা পাই । তবে প্রভাত-সঙ্গীতে'র 
উপজীব্য ভাবের সহিত ইহার সামান্য কিছু পার্থক্য আছে । 'প্রভাত- 
সঙ্গীতে আমরা পাই শুধুই একটা আকু-্পাকু ভাব, উদ্বাহু হইয়া 
শুন্যকে আকড়াইয়া ধরার প্রয়াস। “ছবি ও গানে তাহা কতক 
পরিমাণে নিদ্দিষ্ট হইয়াছে বলিতে পারি। পরবর্তী কাব্য “কড়ি ও 
কোমলে" কবির ভাব যে পথের অনুসরণ করিয়াছে, তাহার দিকরেখার 
একটা আভাস এখান পাওয়া যায়। 

“ছবি ও গানের অধিকাংশ কবিতাতেই দেখা যায় একটা জাগ্রত 
স্বপ্নাতুরতা- স্বপ্নসাধনার সহিত ব্বপ্লাবেশ। স্বপ্নস্থখ “বাতায়ন-বাসী” 
কবিকে যেন বাহ্জ্ঞানহারা “মাতাল”, এমন কি সময়ে সময়ে 'বোগী'তে 
পরিণত করিয়াছে বলা যায়। “কী এক রহস্যময়/সমুদ্রে অরুণোদয়/ 
আভাসের মতো যায় দেখা'-_এই বোধই অপরিস্ফুট ভাবে কবির 
অস্তঃকরণে পরিব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে। : 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ প্রথম যুগ ৮৫ 


এই স্বপ্রসাধনার আর একটা দিক “রাহুর প্রেম” কবিতাটিতে 
ব্যক্ত হইয়াছে | ব্রাহুর বিরতিহীন অন্সরণ, সব্বশ্রাসী সব্বনাশা 
ক্ষুধা এই সময়কার ভাবাবেগের একটা উপযুক্ত প্রতীক । আন্তরিকতা 
ও তীব্রতার হিসাবে “বাহুর প্রেম'ই এই কাব্যের সব্বাপেক্ষা উল্লেখ- 
যোগ্য কবিতা । 


তিতীয্ঘ পর্জ্থ ( মহাভাব ) 
| “কড়ি ও কোমল" ] 
€( ১৮৮৪-১৮৮৫ ) 
( বয়স__ ২৩1২৪ ) 
“মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে, 
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই, 
প্রথম যুগের দ্বিতীয় পর্বের রচনা_“কড়ি ও কোমল” । “প্রভাত- 
সঙ্গীত' একটা ভাবের কাব্য, “কড়ি ও কোমল; মহাভাবের কাব্য । 
প্রথম পর্ধে যে ভাব আকাশে মেঘের মতন বিচরণ করিতেছিল এবং 
সূর্য্কিরণে উজ্জ্বল হইয়া আমাদের দৃষ্টিকে মুগ্ধ করিয়াছিল, তাহা 
এখন পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইয়া ধরাকে সরস করিয়াছে এবং নানা 
ফুল ও ফলে রূপান্তরিত হইয়! বিচিত্র পাথিব সৌন্দধ্য স্যত্টি করিয়াছে । 
অস্পষ্ট আবেগ ও উচ্ছাস এখানে রূপ গ্রহণ করিয়াছে, ভাব একটা 
মহাভাবে পরিণত হইয়াছে । যে কোন যুগের মহাভাবের কাব্যেই 
আমরা দেখি যে সেই যুগে কবির অনুভূতি ও কল্পনা যেন একটা 
সৃম্পষ্ট আদর্শের রূপ গ্রহণ করিয়াছে । “কড়ি ও কোমলে" কবির 
ভাব জীবনের পরিধিকে আলিঙ্গন করিয়া এক নূতন স্থগ্টিরূপে প্রকট 
হইয়াছে, তাহার যৌবনস্বপ্ণে বিশ্বের আকাশ পরিব্যাপ্ত হইয়াছে । 
রবীন্দ্রনাথের নিজের মতে, এই সময় হইতেই তাহার সার্থক কাব্য- 
সৃষ্টির আরম্ভ হয়, তাহার “কাব্য-ভূসংস্থানে ডাঙা জেগে উঠতে আরম্ভ 
করে।” ইহার পুরে তাহার শিল্পকর্ম্মে যে যে দুর্বলতা ছিল, তাহা৷ 
এখন আর নাই । 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- প্রথম যুগ ৮৭ 


অনুভবের দিক্‌ দিয়াও কবি এখন প্রাপ্তবয়স্ক । তিনি এখন 
বিবাহিত; আদি ব্রাহ্ম সমাজের সচিব হিসাবে সমকালীন শিক্ষিত 
সমাজে সুপরিচিত ও দায়িত্বপূর্ণ পদে প্রতিচিত। কাদম্বরী দেবীর 
মৃত্যুতে জীবনের নিদারুণ সত্যের সহিত তাহার সাক্ষাৎ পরিচয় 
ঘটিয়াছে, তাহার অলস স্বপ্পাবেশের দিন চলিয়া গিয়াছে । রসান্ধ- 
ভবের সহিত মননশীলতার সহযোগের স্ুত্রপাত হইয়াছে । 

“কড়ি ও কোমলে'র মুল ভাবটি পাওয়া যায়_“মরিতে চাহিনা 
আমি সুন্দর ভুবনে এই কবিতাটিতে । প্রকৃতির ও মানবজীবনের 
স্থল সৌন্দর্য্যের উপভোগ ও বাস্তব জীবনে একট। অক্ষুণ্ন সৌন্দর্য্যের 
প্রতিষ্ঠার ভিতর দিয়! “প্রাশের আবেগ, প্রাণের বাসনা”র চরিতার্থত! 
লাভের বাণী কবি এইখানে দিয়াছেন । 136৪৮৪-এর প্রথম জীবনের 
কবিতার সবরের সহিত ইহার বেশ মিল আছে । ইন্দ্রিয়জ ভোগের 
কল্পনাবিলাস, মানবন্লভ আকাজক্ষা ইহার প্রত্যেক কবিতাকে একটা 
সহজগ্রাহ অনুপম রূপ প্রদান করিয়াছে | প্রকৃতির সৌন্দর্য্যে, 
শৈশবের স্মৃতিতে, নারীর রাপে যেখানেই ঘষে ইন্দ্রিয়গ্রা সৌন্দর্য্য 
মানবের মনকে স্পর্শ করিতে পারে, তাহাকেই কবি কাব্যরসে প্রাণ- 
বান্‌ করিয়া তুলিয়াছেন। মৃত্যু সে প্রাণোচ্ছাসের উপর ছায়াপাত 
করিলেও তাহাকে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই । 

কিস্তু এই ভোগাকাতক্ষার সহিত একটা অত্ৃপ্তিও যেন গোপনে 
লুকাইয়া আছে । ইন্ড্রিয়ান্ুভতির মাধুর্য যে সমস্ত কাব্যের উপজীব্য 
তাহাতে এই অতৃপ্তির স্রর সব্ধদাই দেখিতে পাওয়া যায়। “কড়ি ও 
কোমলে' দেখিতে পাই থে নাঝে মাঝে কবি “কুনুমের কারাগারে রুদ্ধ 
এ বাতাস, ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও বদ্ধ এ পরাণ” বলিয়া হাপাইয়া 
উঠিতেছেন ; কখনও বা “এ মোহ ক'দিন থাকে, এ মায়া মিলায়” 


৮৮ কবিগুরু 


বলিয়া কবি বিলাপ করিতেছেন। স্বদেশ ও সমাজের মধ্যে, দৈনন্দিন 
অভিজ্ঞতার মধ্যে ঘে একটা পরিপূর্ণ জীবনের প্রতিষ্ঠা তিনি 
কল্পনা করিতেছেন, তাহা নানাভাবে ব্যাহত হইতেছে বলিয়াও কবির 
অন্তঃকরণে একটা অতৃপ্তি ঘনাইয়া উঠিতেছে । যে অতৃপ্তির স্বর 
এখানে বাজিয়া উঠিয়াছে, তাহ] বরবীন্দ্রকাব্যের একটা সনাতন স্বর ; 
এই অতৃপ্থিই চিরদিন রবীন্দ্রনাথকে “সন্মুখপানে চালাতে চলিতে” 
শিক্ষা দিয়াছে! তাই “কড়ি ও কোমলে'র শেষের কবিতায় দেখি যে 
কবি বর্তমান জীবন ও তাহার আদর্শের অসম্পূর্ণতা বুঝিতে পারিয়া দূর 
আকাশের দিকে তাকাইয়া অস্বস্তির দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিতেছেন । 

মনে হয় কি একটি শেষ কথা আছে, 

সেইটি হইলে বলা সব বলা হয়। 

কল্পনা ফিরিছে সদা তারি পাছে পাছে, 

তারি পানে চেয়ে আছে সমস্ত হৃদয় । 


চতুর্থ পর্ব (ভাবাঁভাব ) 
[ “মানসী” ] 
( ১৮৮৭--১৮৯০ ) 
( বয়স-_২৬-২৯ 9 
“বৃথ। এ ক্রন্দন 
বৃথা এ অনলভরা ছুরন্ত বাসনা 1” 

প্রথম যুগের তৃতীয় পবেরবর রচনা--“মানসী” | “মানসী' ভাবাভাবের 
কাব্য, অর্থাৎ পুর্বে ষে ভাব ছিল তাহা অতিক্রম করিয়া একটা নৃতন 
অভাব-বোধ এখানে দেখা দিয়াছে, এবং ঘৃতন একটা ভাবের আভাস- 
ও যেন ফুটিয়া উঠিতেছে । তবে অভাবের বোধটাই বেশী প্রবল । 

মানসী" কাব্যে একটা তীব্র আধ্যাত্মিক নৈরাশ্যের সুর ধবনিত 
হইতেছে । বাস্তব জগতের ভোগের দ্বারা আত্মার পরিতৃপ্তি হয় না, 
আমাদের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির সহিত পার্িপাশ্বিক জীবন 
ও অবস্থার কোন সঙ্গতি নাই এই অসঙ্গতি ও তজ্জনিত ব্যর্থতা 
কবিকে নিরন্তর পীড়িত করিতেছে | এইখানেই “মানসী কাব্যের 
“অভাব” | 

“মানসী'তে দেখিতে পাই যে ভোগলিপ্স, মনের অন্তরালে যে 
মহত্তর আত্মা রহিয়াছে, তাহা জাগ্রত হইয়াছে । “প্রভাত-সঙ্গীতে' ঘে 
প্রাণের জাগরণ্রে কথা বলা হইয়াছে, তাহার সহিত এই জাগরণের 
পার্থক্য আছে । এখন বরং কবির কাছে “প্রভাত-সঙ্গীতের' উচ্ছ্বসিত 
কল্পনা “নিশার স্বপন” বলিয়াই প্রতিভাত হইবে | “আত্মার রহস্ত্য- 
শিখার” তীক্ষ ছ্যতিতে কবির মন ঝলকিয়া উঠিতেছে, “প্রভাত-সঙ্গীতে'র 





৯১০ কবিগুরু 


উষালোক “স্বর্গের আলোকময় রহস্ত অসীমে” মিলিয়া গিয়াছে, “মহা- 
কাশভর! এক নিবিড় আলো-অন্ধকারই” সত্য বলিয়া মনে হইতেছে । 
পূর্র্ষ পূর্ধব পর্বে যে উল্লসিত প্রাচুর্য্যের অন্ৃভূতি ছিল, তাহার স্থলে 
এখন পাই “জীবনের অনস্ত অভাবের” বোধ । 

এই অভাববোধের মূলে আছে একটা আধ্যাত্মিক অনুভূতি । 
আত্মার ক্ষুধা ও আকাঙ্ক্ষা মহত্তর, এই জন্য পাথিব জীবনের লোভ বা 
মোহ তাহার পক্ষে যথেষ্ট নহে । বাস্তবের মোহ কবির এখন আর 
নাই। তিনি এই স্থল ভোগের জগৎ ছাড়াইয়া অন্য একটা কিছুর 
সন্ধান করিতেছেন, কিন্তু তাহাকে ঠিক পাইতেছেন না, এই জন্যই “বৃথা 
এ ব্রন্দন” | মানব-প্রেম, ্বদেশ-প্রীতি, সমাজ-ব্যবস্থা, বিশ্ব-প্রকৃতির 
লীলা, মানবজীবনের তাৎপর্য ও লক্ষ্য ইত্যাদি যে বিষয়েই তিনি 
এখন আকৃষ্ট হইতেছেন, সর্বত্রই তিনি একটা বৈষম্য ও মানবাতআ্মার 
ব্যর্থতা দেখিতে পাইতেছেন | 

তবে অন্য একটা ভাবের আভাসও এখানে পাওয়া যায় | কবি- 
জীবনের সাধনার যাহা লক্ষ্য, যাহার প্রতি কবির মন-প্রাণ ধাবিত 
হইতেছে, তাহার স্থান বাস্তব জগতে নয় । সে “মানসী” ধ্যানলোকেই 
তাহার স্থান। স্থূল ভোগের জগতের সহিত আমাদের বন্ধন ছিন্ন 
হইলে আমরা বিরহী যক্ষ বা অন্ধ স্বুরদাসের ন্যায় তাহার সাক্ষাৎ 
পাই । 

তবে এই “মানসী একেবারে কল্পনার স্থষ্টি নহে। ইহ! বাস্তব 
জীবনের অভিজ্ঞতারই উচ্চতর রূপান্তর । সংসারের “বাসনা-মলিন” 
কলঙ্ক তাহাকে স্পর্শ করে না, দেশ ও কালের পরিবর্তন তাহাকে বিকুত 
করিতে পারে না । কবিকল্পনা বাস্তবকে রূপান্তরিত করিলে যাহা 
দাড়ায় তাহাই “মানসী'। “মন্ম্ের কামনা” যখন গাঁডুতম ও গভীরতম 


রবীন্দ্রকাব্যের ভ্রমবিকাশ-_ প্রথম যুগ ৯১ 


হয়, তখন আমর বাস্তবকে যে বাস্তবাতীত অপরূপ মুত্তিতে দেখি, 
তাহাই “মানসী? ৷ 

ইহার চেয়ে বেশী দূর কবি এখন পর্যন্ত অগ্রসর হন নাই । কোনও 
লোকোত্তর প্রত্যক্ষ উপলব্ধির কথা “মানসী' কাব্যে নাই । “মানসী'র 
কবি পুথিবীর-ই কবি, মানবিকতার-ই কবি, অধ্যাত্স প্রেরণা এখনও 
তাহাকে কোনও অতীন্দ্রি় জগতে লইয়া যায় নাই। এই কারণেই 
“মানসী'র জনপ্রিয়তা আজ পধ্যন্তও অক্ষুগন রহিয়াছে । “মানসী? সত্যই 
“সকল-সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী' ; মানব-সাধারণের হৃদয়ে যে স্কুল ও যে 
সুন্ম বাসনা চিরস্তন, তাহার এত স্বন্দর ও স্ুনিপুণ রূপায়ণ খুব কমই: 
দেখিতে পাওয়া যায় । 

“নানসী'তেই কবিপ্রতিভা সর্বপ্রথম পূর্ণ আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ 
করিল । “মানসী'তে কবি আধুনিক মাত্রাচ্ছন্দের প্রবর্তন করেন ; এক- 
তান স্বরের বদলে ধ্বনি-হিল্লোলে তাহ!র ছন্দ স্পন্দিত হইয়া উঠিল । 
শুধু ছন্দে নহে, ভাষার প্রয়োগে, কবিকল্পনার স্ষ্টিশক্তিতে রবীন্দ্র- 
কাব্যের নিজস্ব এশ্বধ্য ও গৌরব প্রকটিত হইল | রবীন্দ্রনাথের কবি- 
প্রতিভার বৈশিষ্ট্য, তাহার অনুভূতি ও প্রকাশের মৌলিকতা, তাহার 
কাব্যসম্পদের এরশ্বর্ধ্য “মানসী কাব্যেই পূর্ণবিকশিত রূপে প্রথম 
প্রস্ফুটিত হয় ও সব্বত্র সমাদর লাভ করে। 


দ্বিতীয় যুগ 
| “সোনার তরী'_-“কল্পনা” ] 


( ১৮৯২-১৯০০ ) 
( বয়স ৩১-৩৯ ) 


“স্বপ্রমঙ্গলের কথা অমৃত-সমান” 


“মানসী রচনার কাল রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের একটা সন্ধিক্ষণ । 
“মানসী' পধান্ত রবীন্দ্রনাথ অন্নুভৃতির একটা জগতে বিচরণ করিতে- 
ছিলেন, সে জগৎ আমাদের সুপরিচিত জগৎ । সেখানেও দেখি 
আমাদেরই “এই দিবা, এই নিশা-_এই ক্ষুধা, এই তৃষা” প্রাণপাখী 
কাদে এই বাসনার টানে ।” সে পধ্যস্ত অনেক সাহিতিক ও অনেক 
অসাহিত্যিক ব্যক্তিও পৌছিয়াছেন। বাস্তব জগৎ ও তাহার বিষয়ের 
সহিত আমাদের আত্মার গভীরতম ব্যাকুলতার বৈষম্য এবং তজ্জম্য 
একটা মর্্মভেদী ব্যর্ঘতা আমরা অনেকেই অনুভব করিয়া থাকি | 
কিন্তু ইহার পরে অগ্রসর হওয়াই শক্ত । উপলব্ধির অন্য একটা জগতে 
প্রয়াণ সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে 
পারে ঘে রুবায়েতের কবি ওমর খেৈয়াম এই সাধারণ অনুভূতির জগৎ 
ছাঁড়িয়া আর বেশী দূর অগ্রসর হইতে পারেন নাই । অবশ্য তজ্জন্য 
তাহার কবিত্বের লাঘব হইয়াছে এ কথা বলা যায় না, বরং তাহাতে 
হয়ত রসস্থপ্টির বা প্রতীতি উৎপাদনের সুবিধাই হইয়াছিল । কবি 
798৮৪ “ইহ” জগতের কথা দিয়াই তাহার অনবদ্য কাব্য রচনা 
করিয়াছেন, যদিও তাহার শেষের দিকের রচনা ও পত্রাবলী হইতে 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_দ্বিতীয় যুগ ৯৩ 


বুঝিতে পারা যায় যে অন্য এক জগতের সম্পর্কে তাহার উপলব্ধির 
স্মব্রপাত হইয়াছিল । কবি 8১119% কিন্তু লোকাতীত এক জগতের 
সন্ধান পাইয়াছিলেন, এবং ৮ড০:9৪৮/০:৮, লোকোত্তর অভিজ্ঞতার 
বাণীই তাহার অমর কবিতায় লিপিবদ্ধ করিয়! গিয়াছেন । 

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলিয়া রাখা দরকার । যে লোকোত্তর 
অনুভূতি বা লোকাতীত জগতের কথা বলা হইতেছে তাহা৷ ভৌগোলিক 
একটা অঞ্চলের ন্যায় নিদ্দিষ্ট বা ব্যক্তিনিরপেক্ষ কিছু নহে । সাধারণ 
জগতের অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করিয়া উদ্ধপ্রয়াণ ধাহারা করিয়া 
থাকেন, তাহারা প্রত্যেকেই যে একই উপলব্ধির জগতে উপনীত হইয়া 
থাকেন এমন নয় । এই উদ্ধলোক প্রত্যেকের বিশিষ্ট রুচি, প্রবৃত্তি, 
আধ্যাত্মিক শক্তি অনুসারে নিরূপিত হইয়া থাকে । এক কথায় ইহা 
আমাদের তপস্যারই  স্থষ্টি-__ইহা আমাদের নিজস্ব তপোলোক। 

এই নিজস্ব একটা তপৌলোকের সন্ধান রবীন্দ্রনাথের কাব্যে 
পাওয়া যায়--“মানসী'র পরবর্তী যুগে। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত 
জীবনেও এই সময়ে একটা নৃতন যুগের আরপ্ত হইল । তাহার বয়স 
এখন ত্রিশের উদ্ধে; তিনি পুত্রকন্যার জনক, ঠাকুর-বংশের বিশাল 
জমিদারির পরিচালক । সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি এখন স্বুপ্রতিষ্ঠ লেখক 
ও সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক | “সাধনা' পত্রিকার সহিত তাহার 
ঘনিষ্ঠতার জন্য এই সময়টাকে “সাধনার যুগও অনেক সময় বলা হয়। 

এই সময়ে প্রকৃতির, বিশেষতঃ মধ্যবঙ্গের সজলা, সুফল, শস্য- 
শ্যামলা পল্লী-অঞ্চলের ও পল্লীবাসীদের জীবনযাত্রার সহিত তাহার 
আন্তরিক সহানুভূতির সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। ইহার পরিচয় পাওয়া যায় 
সমসাময়িক “ছিন্নপত্রে” ও তাহার নৃতন স্থষ্টি “গল্পগুচ্ছে”। 

এই ষুগে কবি যেন একটা নূতন অভিজ্ঞতার জগতে উপনীত 


৯৪ কবিগুরু 


হইলেন, “বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবলোকের মধ্যে নিত্যসচল অভিজ্ঞতার 
প্রবর্তনা” তাহার কল্পনাকে উন্মুখ করিয়া তুলিল। পুর্ব পর্বে বাস্তব 
জগতের তথ্য ও আধ্যাত্মিক আকুতির মধ্যে বৈষম্যের জন্য কবির মন- 
প্রাণ গাড়িত ও ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা হইতে কবি উদ্ধার 
পাইলেন এক ন্বপ্রপ্রয়াণের মধ্যে । সেই ন্বপ্ন চন্দ্রালোঁকের ন্যায় 
মানবজীবনের অভিজ্ঞতাকে আলিঙ্গন করিয়া রহিয়াছে, ইহাই তাহার 
এই যুগের কেন্দ্রীয় উপলব্ধি । তিনি 73:0%য01778-এর মত জীবনের 
বৈষম্যকে ব্যাখ্যা করিলেন না, তাহাকে অস্সীকার-ও করিলেন না ) 
তিনি স্থল জগতের প্রতিবেশে এক স্বপ্রস্ন্দর কল্পলোকের সন্ধান পাইয়া 
“নিরুদ্দেশ যাত্রা” করিলেন । তীহার বাহন হইল “সোনার তরী" 
এই খানেই রবীন্দ্রকাব্যের ইতিহাসে দ্বিতীয় যুগের আরম্ত হইল । 

বাস্তবের নিষ্ঠুর পীড়ন হইতে মুক্তির যে একটা পথের ইঙ্গিত এই 
যুগের রবীন্দ্রকাব্যে পাওয়া যায়, সে পথ রবীন্দ্রনাথের একটা নিজস্ব 
পথ। ঠিক সেই রকম একটা পথের কথা অন্ত কেহ বলিয়াছেন কি 
না সন্দেহ । এই সময়টায় বিশেষ করিয়া একটা বাস্তবাতিবর্তী 
কল্পনার প্রাধান্য দেখা যায়। বাস্তবের কঠিন নিগড়ে কবির মন এখন 
আবদ্ধ নহে, বাস্তবকে ঘিরিয়া যে ধ্যান ও কল্পনার মণ্ডল রহিয়াছে 
সেইখানেই তাহার মন প্রাণ বিহার করিতেছে | এই স্ক্ম পরিমগ্ডল 
হইতে এক অলৌকিক সুষমা সংসারে এখানে ওখানে বিকীর্ণ হইতেছে, 
তাহার সংস্পর্শে জগতের নানা বস্তু উজ্জল আভায় ঝকমক করিয়া 
উঠিতেছে । কবি তাহা লক্ষ্য করিয়া সেই সুষমার উৎস খু'জিতে বাহির 
হইয়াছেন । “সোনার শিকল" নহে, “পরশপাথর”-ই এখন তাহার 
লক্ষ্য | 

এই সময় হইতে রবীক্দ্রনাথের কাব্যে একটা অলৌকিক 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-দ্বিতীয় যুগ ৯৫ 


অনুভূতির পরিচয় পাওয়া যায় । এখন হইতে তিনি মাত্র &বহ্ু 
মানবের প্রেম দিয়ে ঘের! স্ুন্দর ধরাতলের” কবি নহেন। এখন 
হইতে তাহাকে চালাইতেছে ও তাহাকে উদ্ধ,দ্ধ করিতেছে অন্য এক 
অদৃশ্য মহ সত্ব! । কবি ক্রমে ক্রমে তাহারই প্রভাবে গিয়া 
পড়িতেছেন, তাহাকেই বুঝিবার চেষ্টা করিতেছেন, তাহারই নানা 
বিচিত্র রূপ তাহার চক্ষে প্রতিভাত হইতেছে । এই সত্ত্। নারীমৃত্তিকে 
আশ্রয় করিয়া প্রথম কবিকে দেখা দেয়, কখন কখন কবি তাহাকে 
প্রণয়িণী প্রেয়সীর সহিত অভিন্ন বলিয়া বিবেচনা করিয়াছেন | কিন্তু 
এই অভেদারোপ কদাচ-ই কবি করিয়াছেন। ক্রমে সে মানসী 
মুত্তিতে কবির কাছে দেখা দেয়; পরে কবি তাহাকে চিরবাঞ্ছিত মানস- 
স্বন্রী রূপে মনশ্চক্ষে দর্শন করেন | সেই সুন্দরীর মাধুর্যের পারা- 
বারে অসীম আকাত্ষার সহিত পরিপূর্ণ তৃপ্তি, বর্তমানের সহিত অতীত 
ও ভবিষ্যৎ, স্ুল বাস্তবের সহিত স্থক্ম কল্পনা এক হইয়া মিশিয়। 
গিয়াছে । তাহার সৌন্দর্য্য চুম্বকের মত কবিকে আকর্ষণ করিয়াছে । 
প্রথমতঃ সে কবির ধরা-ছোয়ার বাহিরে থাকিয়াও অপরূপ মানসমুন্দরী 
রূপে কবি-কল্পনাকে উদ্ধ,দ্ধ করিয়াছে । কিন্তু ক্রমেই সে মায়াবিনীর 
মত কবিকে শ্রাস করিয়াছে এবং অতৃপ্তির অনলে তাহাকে দগ্ধ 
করিয়াছে । সেই সোনার তরীর কর্ণধার ; চিত্রা রূপে সে জগতের 
সর্ধবত্র সৌন্দর্য্য ও মোহ বিকিরণ করিতেছে ; উব্বশী রূপে সে “অখিল- 
মানস-ন্বর্গে অনন্ত-রজ্িনী” হইয়া বিরাজ করিতেছে; আবার “মোহিনী, 
নিষ্ঠুরা, রক্তলোভাতুরা ন্বামিনী” বা 7218988-এর মত সে কবিকে 
আদেশ করিয়া নিরস্তর চালাইতেছে । সে-ই কবির “[.9 76115 
[09709 9819 19701” ; আবার সে-ই “জীবন দেবতা রূপে কবি- 
হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ অধ্য লইয়াছে এবং কবিকে শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক পুরস্কার 


৯৬ কবিগুরু 


দিয়াছে । এই যুগের রবীন্দ্রকাব্য এই “বিচিত্রবূপিনী”, “কৌতুক- 
ময়ী-”র বিজয়-গাথা । 

কে সে1?_এই “ন্বপ্নসঙ্গিনী”, “ভুবনমোহিনী” কে? সে ত 
শুধু কবিকল্পনার স্থষ্টি নয়। কবির জীবনের বাহিরে বিশ্বের বিরাট 
রহস্যের সিংহাসনে এই “মহারাণী, রাজরাজেশ্বরী”র আসন । এই কি 
মহামায়া? এই কি বিশ্বের আগ্ভাশক্তি? ফাঁহারা সাধক মহাপুরুষদের 
জীবনী আলোচনা করিয়াছেন তাহারা জানেন যে বিশ্বশক্তি নানা 
ভাবে নানা রূপে দেখা দিয়া থাকেন বা উপলব্ধির পরিধির মধ্যে 
আবিভূতি হইয়া থাকেন । সাধকের আধ্যাত্মিক প্রকৃতির উপর এই 
রূপের বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে । এই ভাবেই দশমহাবিদ্যা ইত্যাদি লইয়া 
পৌরাণিক কাহিনীর উদ্ভব হইয়াছে । রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক 
প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যের জন্য সচ্চিদানন্দময়ী বিশ্বশক্তি এই এক অনভিজ্ঞাত- 
পুর্ব রূপে তাহার কাছে প্রতিভাত হইয়াছিল । মীরাবাইয়ের 
“গিরিধারী গোপাল”, শ্রীরামকৃষ্ণের “ভবতারিণী মা” যেমন তাহাদের 
সাধনলব্ধ নিজস্ব দেবতা ও পরমাত্মীয় ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের জীবন- 
দেবতাও তাহার কাছে তাহাই ছিলেন ।% 

এই সময়টায় রবীন্দ্রনাথের কাব্যে বাস্তব সত্যের স্থান সন্গীর্ণ। 
একটা “স্বপ্রো হু মায়া স্ব মতিভ্রমে হু” জাতীয় ভাব অর্থাৎ একটা 
অলৌকিক অনুভূতি এই দ্বিতীয় যুগের কাব্যে প্রধল ও পরিব্যাপ্ত 
হইয়াছে । “মানসী'র কবির দৃষ্টি ও “সোনার তরী-চিত্রা'র কবির দৃষ্টি 
এক নহে । যে বাস্তব সমস্যা “মানসী'র কবির সম্মুখে সমুপস্থিত 
হইয়াছিল, জীবনদেবতার ইজিতে তাহাকে পাশ কাটাইয়াই “সোনার 
তরী'র কবি সহসা অন্য এক পথে অগ্রসর হইলেন । 


« এই প্রসঙ্গে “আত্ম-পরিচয়ের ঈম প্রবন্ধ ও তাহা পরিশিষ্ট রষ্টব্য | 


পঞ্চম পর্ব (ভাব ) 
[ “সোনার তরী” ] 
(১৮৯২-৯৩ ) 
( বয়স্---৩১।৩২ ) 


_স্বপ্র-প্রয়াণ 
“48001506150 800 02,019703 1101) 109 ৯০৪1]? 


রবীন্দ্রকাব্যের দ্বিতীয় যুগের প্রথম রচনা “সোনার তরী; এই: 
কাব্যেই এ যুগের মুল ভাবটি স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে । ইহার 
প্রথম কবিতা-ই একটা অভিনব উপলন্ষির নিদর্শন এবং স্বীকারোক্তি । 
কবি এখানে স্বীকার করিতেছেন যে এক মহামায়ার হাতে তিনি ধরা 
পড়িয়াছেন। মানবজীবনের বাহিরে ইহার পিংহাসন কিন্তু ইহার 
প্রভাব মানবের জীবনে পরিব্যাপ্ত । অলৌকিক একটা সৌন্দর্য ইহার 
পরিচয় ; আমাদের যেন মন্ত্রমু্ধ করিয়া সে একটা অজানার দিকে 
আমাদের ইঙ্গিত করে | সাধারণতঃ নৈরাশ্যময় ও সন্গীর্ণ জীবনে আবদ্ধ 
থাকিয়া আমরা হা-হুতাঁশ করিয়া থাকি ; বড় জোর, হৃদয়ের আশা 
আকাঙ্ক্ষার পুজি লইয়া তাহা হইতেই আমরা একটা মানসী প্রতিমা 
গড়িবার চেষ্টা করি এবং তাহাকেই জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদূ মনে করি। 
এমন সময় সহসা অস্তরাল হইতে এক সৌন্দর্যময়ী শক্তি আসিয়া 
আমাদের জীবনে আবির্ভূত হয়; জীবনে যেন একটা বিপ্লব ঘটিয়া 
যায়, পুরাতন সব ধারণা বদলাইয়া যায়, সংসার ও জীবন একটা 
রহস্থাগ্লুত নৃতন রূপে দেখা যায় । আমাদের পুর্ব জীবনের যত কিছু 
ঘ-__৭ 


৯৮ কবিশুরু 


আধ্যাত্সিক সঞ্চর এই; প্লাবনে ভাসিয়া চলিয়া যায়| কিন্তু ইহাকে 
আমরা ধরিতে পারি না, জীবনের অংশ করিয়া লইতে পারি না ; ইহা 
আমাদের মনে একটা অভূতপূর্ব অনুভূতি ও আকাঙজ্ক্ার উদ্রেক করে, 
কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত তৃপ্তি দেয় না, যেন বঞ্চনা করে ; মনে হয় আমরা 
“শুন্য নদীর তীরে রহিন্ু পড়ি, যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী” । 
তাহার হাতে আপনাকে সম্পূর্ণ ভাবে সঈঁপিয়া দিলেও তাহার করুণা 
পাওয়া যার না, সেই রহস্যময়ী “বিদেশিনী” “শুধু মুখ পানে চেয়ে কথা 
না বলে” উপহাস করে; তাহার “দেহসৌরভের” আমেজ, তাহার 
কেশরাশির ক্ষণিক স্পর্শ মাত্র আমরা পাইতে পারি, কিন্তু যতই আকুল 
ভাবে তাহাকে প্রার্থনা করি, তাহাকে কখনও আমরা ধরা-ছৌোওয়ার 
মধ্যে পাইব না। “নিরুদ্দেশ যাত্রা” কবিতায় এই বিপ্রলব্ধির দীর্ঘ 
নিঃশ্বাস ধ্বনিত হইয়াছে । 

“সোনার তরী"র অন্যান্য কবিতাতেও এই অতিবাস্তব সৌন্দর্যের 
কথাই বলা হইয়াছে । “নিদ্রিতা, কবিতায় ইহা রূপকের মাধ্যমে 
ব্যক্ত হইয়াছে ; “ঘুমের দেশে ঘুমায় রাঞবালা, তাহারি গলে পরায়ে 
দিন্ু মালা” বলিয়া যে রাজপুত্র তৃপ্তি লাভ করিয়াছেন, তিনি “সোনার 
তরী'র কবির সহিত অভেদাত্মা | এই রূপকের অন্য একটা দিকৃ-_ 
অলৌকিকের ক্ষণিক স্পর্শ পাইলেও তাহাকে হাতে না পাওয়ার জন্য 
বিধুরতা-_প্রকাশ পাইয়াছে “সুপ্তোথিতা' ও “পরশ পাথর” কবিতা 
ভুইটিতে | স্বপ্নভঙ্গের পর রাজকন্যা উদাস অধীর চিত্তে ভাবিতে 
লাগিলেন “কে পরালে মালা”; সন্যাসী ঠাকুর পরশপাথর হাতে 
পাইয়াও অনবধানতাবশতঃ হারাইয়া অতি দীন ও নিরাশ চিত্তে সেই 
পরশপাথরের ব্যর্থ সন্ধানে “বাকী অর্ধ ভগ্ন প্রীণ” দান করিলেন। “গান- 
ভঙ্গের মধ্যেও সেই ইঙ্গিত রহিয়াছে ; “বাতাসে বনসভা শিহরি কাপে 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- দ্বিতীয় যুগ ৯৯ 


তবে সে মর্্মর ফুটে”, মানুষের জীবনেও অলৌকিক একট! অনুভূতির 
শিহরণ আসিলে তবে যথার্থ সৌন্দর্যের স্থষ্টি হয়, কিন্ত সে সৌন্দর্য্য 
লোকোত্তর, তাহ! কাশীনাথের গানের মত জনগণমনের তৃতপ্তিবিধায়ক 
নহে । কবির মনে এখন যে উপলন্ধি প্রবল তাহাই, অর্থাৎ বাস্তবের 
মধ্যে একটা অতিবাস্তবের ইরজিতের উপলব্ধি-ই এই কাব্যের “ছুই 
পাখি' “যেতে নাহি দিব' প্রভৃতি কবিতার মর্ম্মবাণী। খাঁচার পাখি 
“সোনার তরী'র কবিরই প্রতিনিধি; একদা কী করিয়া সে বনের 
পাখির প্রেমে পড়িল তাহা বিধাতাই জানেন, কিন্তু তদবধি সেই 
অদ্ধপরিচিত বনের পাখির সহিত মিলনের আকাজ্কাই তাহার প্রধান 
প্রবৃত্তি হইয়াছে! “ছু জনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে, বুঝাতে 
নারে আপনায়”, তবুও “একা একা ঝাপটি মারে পাখা, কাতরে কহে 
কাছে আয়” । বস্ৃহ্ধরাও স্তব্ধ মর্মাহত চারি বৎসরের কন্যার মত 
উদ্দাসিনী, তরুর মনরে একটা ব্যাকুলতার ধ্বনি, “মেঠো স্বরে কাদে 
যেন অনন্তের বাঁশি বিশ্বের প্রান্তর-মাঝে” | “সমুজ্রের প্রতি ও 
“বসুন্ধরা” কবিতা ছুইটিতেও দেখি যে একট বাস্তবাতীত রহস্তের 
ভাব অতি স্ুল রহস্যের ভিতর হইতেই' যেন ইঙ্গিত করিতেছে । 
প্রেমের কবিতাতেও এই সময়ে একটা পরিবর্তন দেখা যায়। 
প্রেমের আকর্ষণ মুলতঃ অতিবান্তবের আকর্ষণ এই উপলব্ধি এখন 
কবির মনে ফুটিয়া উচিতেছে । তাই “ঝুলন' ও “হৃদয় যমুনায় দেখিতে 
পাই যে মৃত্যুর রহস্য ষেন প্রেমের রহস্যের সহিত এক হইয়া গিয়াছে । 
“মানস-স্থন্দরী'তে যদিও বাস্তবজীবনে ও সাংসারিক সম্পর্কের মধ্যে 
প্রেমের বিজয়সিংহাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হইয়াছে, তত্রাচ সেখানেও প্রেম 
একটা বহুজন্মব্যাপী রহস্ত-লীলার সহিত একীভূত হইয়া গিয়াছে । 
“ছুবের্বোধ' কবিতায় কবি “অন্তহীন রহস্যণিলয়” প্রেমিক হৃদয়ের “নব 


১০০ কবিগুরু 


নব ব্যাকুলতা” ব্যাখ্যা করা যে অসম্ভব তাহাই বলিতে চাহিয়াছেন । 
মোটের উপর প্রেমের মধ্যেও একটা ছৃজ্ঞেয় রহস্তের আভাস-ই 
“সোনার তরী'তে ফুটিয়া উঠিয়াছে ।% 


& “সোনার তরী'ব কতকগুলি কবিতায় অবশ্য এই সমস্ত বিশিষ্ট লক্ষণগুলি নাই, সেই 
কবিতাগুলিতে প্রথম যুগোচিত লক্ষণাদিই দেখিতে পাওয়া যায়। এই অনুবৃত্তিতে অবশ্য 
বিল্মিত হইবার কিছু নাই ! ('রবীন্্রকাবোর পর্ব ও যুগ-বিভাগ? অধ্যায় দ্রষ্টব্য ) 


ষ্ঠ পর্ণ (মহাভাব ) 
[ চিত্রা__চৈতালি ] 
€( ১৮৯৪-১৮৯৬ ) 
( বয়স_ ৩৩-৩৫ ) 
“্বপ্রমঙ্গল, 
10116 01 138865, 1796 90986 00109901869 
161) 01776 0 11099 ৪11 61000 0096 ৪1)1109 1010101, 


“চিত্রা” দ্বিতীয় যুগের দ্বিতীয় পর্বের রচনা । “সোনার তরী'র 
অস্পষ্ট আকুলতা৷ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া কবি এইখানে একটা প্রগাঢ় 
উপলব্ধির জগতে আসিয়া পৌছিয়াছেন, ভাব একটা মহাভাবে পরিণত 
হইয়াছে । যে অলৌকিক রহস্যময় সৌন্দর্য্য “সোনার তরী'তে কবিকে 
ইঙ্গিতে আহ্বান করিয়াছিল, তাহা “চিত্রা”য় একটা বিশিষ্ট রূপ ধারণ 
করিয়াছে । এক দিকে ইহ] বিশ্বের প্রবাহের মধ্যে বিচিত্ররূপিণী “চিত্রা, 
রূপে পরিস্ফুট হইয়াছে, অপর দিকে ইহা আমাদের অন্তরে অস্তরতম 
হইয়া “জীবনদেবতা” রূপে বিরাজ করিতেছে । “চিত্রা” ও “জীবন- 
দেবতা'__-এই নাম ছুইটিই তাৎপর্য্যে পরিপূণ । 

রবীন্দ্রসাধনার মার্গে “চিত্রা” একটা উল্লেখযোগ্য অবস্থান । 
এখানেই রবীন্দ্রনাথ মানবহৃদয়ের আকাঙ্ক্ষার সহিত জাগতিক 
সৌন্দর্য্যের গ্বকটা সামগ্ম্ত উপলব্ধি করিলেন । এই জন্য কবির 
মন হইতে অধীর আকুলতার ও বাস্তববিমুখ স্বপ্লাতুরতার মেঘ কাটিয়া 
গিয়াছে ; “আজি মেঘমুক্ত দিন”, তাহার এখন মনে হইতেছে যে “ম্থখ 
অতি সহজ সরল” | “রাত্রে ও প্রভাতে” কবিতায় এই তত্বই ব্যঞ্জিত 


১০২ কবিগুরু 


হইয়াছে । রহস্যময়ী নিশীথের উর্বশী মুত্তি এবং শান্ত উষার কল্যাণী 
মুত্তি আসলে যে একই, একই জীবনসত্যের এ পিঠ আর ও পিঠ, 
তাহা এখন কবির কাছে স্বস্পষ্ট হইয়াছে । “সিন্ধুপারে' কবিতাটিতে 
ইহা আরও বিশদ ভাবে ত্বপ্রকাহিনীর ছলে ব্যক্ত হইয়াছে । রহস্যময় 
আহ্বান ; অবগুষ্ঠিতা রমণীমৃত্তি ; অজ্ঞাত ভয় ও পুলকে মিশ্রিত কল্পনা- 
মধুর ব্বপ্নরাজ্য ; রহস্যময় উদ্বাহ; এবং পরে অপ্রত্যাশিতভাবে 
চিরপরিচিত জীবনদেবতারই সাক্ষাৎলাভ ও তাহার সহিত সম্বন্ধ 
স্থাপন । “খেলা করিয়াছে নিশিদিন মোর সব স্থখে সব ছুখে__এ 
অজানাপুরে দেখা দিল পুন সেই পরিচিত মুখে 1” “সহজ, সরলে”র 
কাছে “রহস্তে”্র পরাজয়, অথব1 “সহজ ও পরিচিতে'র মধ্যেই রহস্যের 
প্রকাশ, অস্তিত্ব ও পরিব্যাপ্তি-__ইহাই এই কাব্যের প্রতিপাদ্ধ । এই 
তত্বেরই ইঙ্গিত “বিজয়িনী” কবিতায় পাওয়া যায় । রূপসীর নিরাবরণ 
অকুণ্ঠ সৌন্দর্যের কাছে রহস্তবিলাসী অনঙ্গদেবতা নতি স্বীকার 
করিলেন ; প্রত্যক্ষ সরল সত্যের কাছে কল্পনাকৌতুক ও রঙ্গবিলাস 
পরাজিত হইল । এইবার কবির “নিরুদ্দেশ যাত্রা” যেন “দিনশেষে” 
সমাপ্ত হইল ; তাহার “মাথা রাখিবার ঠাই” মিলিল উপবনসজ্জিত 
পল্লীনিকেতনের বকুল-ঝরা পথ্প্রান্তে। “পরশপাথরে'র কবি আজ 
স্বর বদলাইয়া বলিতেছেন যে “ভালে নাহি লাগে আর-__ আসা যাওয়া 
বারবার- বহুদূর ছুরাশার প্রবাসে” । কবি এইবার “রঙ্গময়ী কল্পনা”র 
“ন্বর্গ হইতে বিদায়” গ্রহণ করিতে সমুতস্বরক | “পলাতক বালক” 
এবার প্রতিদিবসের কর্ম্টে নিরলস থাকিয়া জীবনকণ্টকপথে চলিতে 
প্রস্তুত । 

“জীবনদেবতা”র আবির্ভাব এই সময়ের অপর একটা লক্ষণীয় 
ব্যাপার । এই “জীবনদেবতা' প্রত্যয় আর “বিশ্বদেব* বা ঈশ্বর প্রত্যয় 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_দ্বিতীয় যুগ ১০৩ 


এক নহে ।% যদি জীবনদেবতা কেহ থাকেন, তিনি বাস্তবিক কে এবং 
তিনি আসলে ব্বয়ং জগদীশ্বর কি না, ইতাকার তর্ক অনাবশ্যক ও 
অবান্তর । কবির উপলব্ধির দিক্‌ হইতেই বিষয়টি বিবেচনা করিতে 
হইবে | জীবনদেবতা এশ সত্তা হইলেও তাহার একট! বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব 
আছে। তিনিই কবির নিজস্ব আশা, আকাঙ্ক্ষার রব নক্ষত্র, কিন্ত 
তিনি কেবলমাত্র আকাজ্ষারই বিকারস্থ্ঠ একটা মুত্তি নহেন, কবির: 
কল্পনাকে তিনিই নিরন্তর অনুপ্রাণিত করিয়া থাকেন। তাহার ধ্যানে, 
পূজায় ও তাহার সহিত মনোমিলনেই কবির চরম তৃপ্তি । তাহার কাঁছে 
সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করাতেই, তাহার একান্ত সেবাতেই কবির জীবনের 
সার্থকতা ! জীবনদেবতা-ও কবিহ্ৃদয়ের প্রেমের আকাঙ্ষা করিয়া 
থাকেন, এবং মুগ্ধ ভক্তের প্রয়াস ও চেষ্টা নিয়ন্ত্রণ করিয়! চব্রিতার্থতার 
পথে লইয়া যান । মোটের উপর, এই জীবনদেবতাকে উচ্চতর লোক- 
বিহারী প্রেমাম্পদ বলা যাইতে পারে । প্রণয়ীকে হৃদয়দেবতা বা 
প্রণয়িনীকে হৃদয়েশ্বরী বলিতে যথার্থ যাহা বুঝায়, জীবনদেবতা-ও 
তাহাই ।ণ* তবে জীবনদেবতা সীমাবদ্ধ রক্তমাংসের জীব নহেন, এই 
মাত্র। তাহাকে সুক্ষ অনুভূতির দ্বারাই পাওয়া যায়, তিনি এশী 
শক্তির সহিত একীভূত, এবং বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে তাহার লীলার 
প্রকাশ ৷ 
৫ সত ৯৫ স৫ 

« কবির নিজের মতে “বস্থৃত চিত্রায জীবনবঙ্গভূমিতে যে মিলননাটোব উল্লেখ হয়েছে তার 
কোন! নায়ক-নায়িক1 জীবের সতাঁব বাউবে নেই, তাব মধ্যে কেউ ভগবানের স্ানাভিযিক্ত 
নয়।” 

1 এই সম্পর্কে কবি বলিয়াছেন? *চিত্রায়-..আমাব একটি যগ্ম সন্ত। আমি অনুভব করেছিলুম 


যেন যুগ্ম নক্ষত্রের মতো, মে আমাবই ব্যক্তিত্বের অন্তর্গত, তারই আকর্ষণ প্রবল । তারই সংকল্প 
পূর্ণ হচ্ছে আমার মধ্য দিয়ে, আমার হখে দুঃখে” আমার ভালো মন্দয় |” 


১০৪ কবিগুরু 


“চৈতালি'র কবিতাগুলি প্রায় এই সময়েই বা কিছু পরে লেখা 
হইয়াছিল, এবং তাহার মধ্যেও “চিত্রা”র মনোভাব স্ৃস্পষ্ট । এগুলি 
সন্ভাবশতকের ন্যায় কেবল নিরপেক্ষ তত্বময় রচনা নহে । সাধারণ 
মানবজীবনের নানা দিকের পরিচয়, নান। বাস্তব চিত্র এই কবিতাগুলির 
মধ্যে এবং “চিত্রা'রও কয়েকটি কবিতায় আছে, এবং সর্বত্রই কবি 
জাগতিক সত্যের মধ্যে তাহার অন্তরের মহাভাবের বাহ্‌ প্রকাশ দেখিতে 
পাইতেছেন।% প্রাচীন ভারতের জীবনের নান। চিত্র, পশ্চিমী মজুরের 
ছোট মেয়ের ভ্রাতৃন্সেহ, পদ্মার প্রবাহ, নারীর সৌন্দর্য সব্বাত্রই যেন 
অন্তরব্যাপিনী, বিচিত্র-প্রেমলীল।, চিররহস্তময়ী জীবনদেবতার পরিচয় 
রহিয়াছে । “দেবতার বিদায়ে”র নীতিকথা পুরাতন হইলেও ইহার 
মধ্যে জীবনদেবতার তত্ব নিবিষ্ট আছে । জীবনদেবতা-ই জগতে দরিদ্র 
বা অন্য কোন অন্থন্দর রূপে ফিরেন, এবং নানা ভাবে ভক্তকবিকে 
ছলনা করেন । বঙ্গণাতা, পদ্মা, প্রাচীন ভারত-_মে রূপেই হউক না 
কেন, এই জীবনদেবতা একটা মোহমধুর স্িগ্ধ স্বপ্ন রচনা করিয়া 
বাস্তবের উপর একটা রঙীন আভাস আনিয়া দেন। 


« কবি বলিয়াছেন “চৈতা'ল -'এক টুকবৌ কাব্য যা অপ্রত্যাশিত। স্রোত চলছিল যে 
কাপ নিয়ে অল্প-কিছু বাইবের জিনিসেব সঞ্চয় জমে ক্ষণকালের জন্তে তার মধ্যে আকশ্মিকর 
আবিততাব হল।” 


সপ্তম পর্ব ( ভাবাভাব ) 
| %“কল্পনা”কিথা ও কাহিনী? ] 
( ১৮৯৭--১৮৯৭৯ ) 


ও ঠ 


স্বপ্রভঙগ 


“০৮ 101,090 17019 দা 91706] 210 ৮৪173011010 


“িত্রায় ঘে মহাভাবের পরিচয় আমরা পাই, তাহার অবশ্যান্তাবী 
পরিণতি দেখিতে পাই “কল্পনা অনেকগুলি কবিতায় এবং “কথা ও 
কাহিনীতে । এই সময়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় যুগের শেষ পর্বে পুনশ্চ 
একটা অভাবের বেদনা ও স্বপ্নবিহারী কল্পনার বিপক্ষে বিদ্রোহের ভাব 
ফুটিয়া উঠিয়াছে। একটা 'ম্বপ্রভঙ্গে'র কথ। ও কাহিনী এই পর্ধের 
কাব্যে বিবৃত হইয়াছে | 

এই বিদ্রোহের ভাব “চৈতালি'র “বঙ্গমাতা” প্রভৃতি কবিতাতেও 
কিছু কিছু পাওয়া যায়। ঘে “মুগ্ধ জননী” সাত কোটি সন্তানেরে 
াঙালি করিয়! রাখিয়াছেন, মানুষ করেন নাই, তিনি শুধু "বঙ্গমাতা? 
নহেন, তিনি কবির স্বপ্ররাজ্যের অধিষ্ঠাত্রী “চিত্রা”ও বটেন। মানুষ 
হইবার জন্য যে পুণ্য পাপে ছুঃখে স্বখে পতনে উত্থানে জীবনের ভালো- 
মন্দের সহিত পরিচয় থাঁকা ও সংগ্রাম করা দরকার, সেই ভাব-ই 


 কল্পন1” মিশ্র কাবাগ্রস্থ £ অর্থাৎ হহাতে “চিত্রার মহাভাবের পাশাপাশি নুতন এক 
ভাবাভাবের শ্োত প্রবাহিত হইয়াছে । জগতের মাঝে বিচিত্ররূপিনীর জয়গাথ। কতকগুলি 
কবিতাষ ধ্বনিত হুইয়।ছে, আবাঁব কতকখুলিতে নিনিড়-তিমির-আকা! মতনভ-অঙ্গনের মহ] 
আশঙ্কা জপিত হইবাঁছে। যে কয়েকটি গান ও প্লেষাক্সক কবিতা ইহাতে স্থান পাইয়াছে, 
সেগুলির সহিত কবির সাধনার সংযোগ নাই । ( “রবীন্দ্র-মানসের ত্রিধারা? উষ্টব্য ) 


১০৬ কবিগুর, 


ক্রমে প্রবল হইয়া “কল্পনা” এবং “কথা ও কাহিনীতে পুর্ণতর অভিব্যক্তি 
লাভ করিয়াছে । এই সময়ে কবি অনুভব করিতেছেন যে একটা 
কঠোর, এমন কি নিষ্ঠুর অথচ বিরাট সত্য চারিদিক হইতে জীবনকে 
ঘিরিয়া রাখিয়াছে এবং আমাদের কল্পনার গণ্ডী ভািয়া জীবনকে 
পীড়িত করিতেছে । “চিত্রা"য় যে ব্বর্গ রচিত হইয়াছিল এবং পাথিব 
জীবনে তাহার যে প্রতিচ্ছবি দেখা গিয়াছিল, তাহা ক্রমশঃ অলীক 
স্বপ্নের ন্যায় ক্ষীণ হইয়া উঠিতেছে। 70৪৪,6৪-এর 094০ 6০ ৪,1011/6109- 
৪1৪-এর শেষে ত্বর্গ হইতে বিদায়ের জন্য যে বিলাপ ধ্বনিত হইয়াছে 
17800 08/71706  01898,6 90 ৮7011) 01609911170 ০16 সেই 
বিলাপের মূলে যে উপলব্ধি ছিল, এখানেও তাহাই বর্তমান । “ওরে 
আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা”__ইহাই “কল্পনা'র মৌলিক 
উপলব্ধি । সুতরাং “কল্পনা"র মধ্যেও একটা অভাবের ছায়া পড়িয়াছে। 
কিন্তু “মানসী'র সহিত ইহার পার্থক্য উল্লেখযোগ্য । “মানসী'র ক্রন্দন 
স্থল জগতের স্থল ভোগের অসম্পূর্ণতা ও অসারতা বোধের জন্য; 
“কল্পনার বিষাদ কল্পলোকের তিরোভাবের জন্য | “মানসী'র কবি 
আর্ত ছুবর্বল ; “কল্পনা"র কবি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির শক্তিতে বলীয়ান্‌, 
আত্মপ্রত্যয়বান্‌ ; “ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,__ এখনিঃ অন্ধ, বন্ধ 
করো না পাখা” ইহাই এখন তাহার বাণী। 

“কল্পনা'তেই কবি সব্বপ্রথম উপলব্ধি করিলেন যে সংসারে ক্ষুদ্র 
বৃহ, ভাল মন্দ সর্বববিধ ব্যাপারই এক বিরাট মহণড সত্যের প্রকাশ । 
সে সত্য ছুজ্ঞেয়, তাহা হয়ত আমাদের বচনাতীত, এমন কি আমাদের 
বুদ্ধি ও বিচারের অতীত । তাহার হাত হইতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব 
নয়, বোধ হয় মুক্তির চেষ্টা করাই বিড়ম্বনা ও ষূর্খতা | “সোনার তরী? 
ও “চিত্রা'য় যে কল্পলোকের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, ভাহা হইতে এই 


রবীন্দ্রকাবে/র ক্রমবিকাশ-_দ্বিতীয় যুগ ১০৭ 


জগদ্ধাপী ও জীবনব্যাপী সত্য বিভিন্ন । এই সত্য হইতে নিস্তার 
কোথাও নাই, ইহা আমাদের স্বপ্রনুন্দর চিরপোযিত কল্পনাকে বঞ্চিত 
করে। প্রতীক্ষমানা তরুণীর লগ্ন ভরষ্ট হয় ; স্বপ্রলোকে প্রিয়ার 
সাক্ষাৎ পাইলেও তাহাকে চিনিতে পারা যায় না, রজনীর অন্ধকার 
সমস্ত অরলুপ্ত করিয়া দেয়।% শুধু তাহাই নয়। এই সত্যের 
পরিচয় নিষ্ঠুর কঠোরতায়, “চিত্রা'-“চতালি'র প্রতীয়মান সুষমায় 
নহে । আকাশে বন্ধ্যা সন্ধ্যার আগমন ঘটে, কল্পনার কুন্দকুন্ুমরপঞ্তিত 
কুর্জের স্থলে বিরাট নিষ্ঠুর সত্যের বারিধির ফেনহিল্লোল ফুটিয়া 
উঠে। কিন্তু কবির আত্মা নিজেকে নিরাশ্রয়, অসহায় বোধ 
করিলেও আপন অন্তরের শক্তির বলে আঘাতের বেদনা জয় 
করিয়া কঠোর সত্যকে অবলম্বন করিয়াই প্রলয়ের ওপারে অলক্ষ্য 
লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হইল ! এই ভাবে চিত্রা” “চৈতালি” পর্বের 
আধ্যাত্মিক সন্কীর্ণতা হইতে মুক্তিই “কল্পনা” পরের বিশেষত্ব | 
“চিত্রা'র কবি 

71109 17506 61520 10650] 85৪ 010 969 0 18,800, 

1170 001898078,01010১ 81). 61)9 8১095 101921) 
-এর কথা বলিয়াছেন ; “কল্পনা'র কবি তাহা হইতে বিদায় লইয়া! 
বলিতেছেন 

178,957611, 195%7511 6109 1)98/ 617 11593 ৪0109, 

17301099911) 2 079810+ ৪৮ 0182009 2027) 009 2109 ! 

ইহার মধ্যেও কিন্তু জীবনদেবতার লীলা ও ক্রিয়া আছে । জীবন- 
দেবতাই অদৃশ্য শক্তিরূপে জোর করিয়৷ কবিকে দিয়া কাজ করাইয়া 
লইতেছেন, যদিচ কবির মুগ্ধ হৃদয়কে প্রলুব্ধ করা, বঞ্চিত করা, ছলন। 
* এই প্রসঙ্গে চিত্রা” “শিক্ধুপারে? কবিতাটি তুলনীয় 


১০৮ কবিগুরু 


করা এবং সান্ত্বনা দেওয়াও তাহার কাজ । এই জন্য কবি তাহাকে 
“রে মোহিনী, রে নিষ্ঠুরা--ওরে রক্তলোভাতুরা-__কঠোর স্বামিনী” 
বলিয়া আবার তাহার কাছেই আবেদন করিতেছেন । ্বপ্নভঙ্গের পর 
কবি ঘে নৈরাশ্য ও অবসাদের অন্ধকারে আপনাকে বিলুপ্ত করিয়া 
দিবেন, তাহাও সে সহ্য করিবে না; কবিকে সে পুনশ্চ আহ্বান করে 
ংসারের কর্মভার গ্রহণ করিবার জন্য | “এ তো! খেলা নয়, এ তো 
খেল! নয়, এ যে হৃদয়-দাহন জ্বালা, সখি” বলিয়া কবি অন্নযোগ 
করিলেও কবির নিস্তার নাই। জীবনদেবতার প্রাসাদে সুপ্তি বা 
তন্দ্রা নাই | 

এই ভাবে “কল্পনা*য় একট। ৬1৪ 8০৮৪, বা নবজীবনের স্ত্র- 
পাত হইল। এই নবজীবনের আদর্শ ও বাণী “বর্ষশেষ' কবিতার 
উদাত্ত, তীব্র স্তরে ধ্বনিত হইয়াছে । কালবৈশাখীর রূপে নৃতনের 
আবির্ভাব হইল; পুরাতন বৎসরের ক্লান্তি জীর্ণপাতার ন্যায় উড়িয়া 
গেল । বসন্তের আবেশহিল্লোল বা মর্মারিত কুজনগুঞ্জন (“চিত্রা'র ন্যায়) 
সে.আনে না। ধ্বংসের ভিতর দিরা সে নৃতনের স্যষ্টির আয়োজন 
করে। তাহার আদর্শ কবির জীবনে ওতপ্রোত ভাবে মিশিয়া 
গিয়াছে, _ক্ষুদ্রতার পঙ্ক হইতে উদ্ধার পাইয়া তিনি “মহান মৃত্যুর 
সাথে মুখোমুখি” হইতে চাহেন, “যুগধুগান্তরের বিরাট স্বরূপ”-কে 
দেখাই তাহার এক মাত্র লক্ষ্য । তাহার পরে তিনি ভগ্ন, চূর্ণ হইয়া লুপ্ত 
হইলেও তাহাতে তাহার জ্রক্ষেপ নাই 


* এইবূপেই আ.ছ্যাশন্কি সমত্ত জগতে চালাইতেছেন+ নিজের উদ্দেশ্রকে সফল করিতেছেন, 
তাহাঁব বিচিত্র লীলা সার্থক ও মূর্ত হইতেছে ; মানুষের মধ্যে যে পুকষ শক্তি মহাদেবের মত, ভয, 
গুণাতীত ধ্যানযোগে। ন) হয়? ততমীময় অনসাদের নেশায় সংসার হইতে বিচ্ছিন্ন থাকিতে চায়, 
প্রকৃতি তাহাকে উদ্বদ্ধ কবিয় সত্বরজোময় পংপারকশ্মে নিল্মাজিত করেন । 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-দ্বিতীয় যুগ ১০৯ 


এই' নবজীবনের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকে কবি “বর্ষশেষ' কবিতায় 
রণজয়ী কিশোরকুমার কাত্তিকেয় রূপে কল্পনা করিয়াছেন । পরে 
“বৈশাখ কবিতায় তাহাকে তিনি রুদ্রভৈরব রূপে দেখিয়াছেন। 
ললিত সৌন্দর্য তাহার নাই, বরং তাহার সাধনার অগ্নিশিখায় সমস্ত 
জড়তাময় পদার্থস্ত,প ধ্বংস হর; কিন্তু সে-ই আমাদের শান্তি দেয়, 
ছুঃখকে বিস্তারিত রূপে দেখাইয়া এবং “মুখ দুঃখ আশা ও নৈরাশেশ্র 
অবসান করিয়া “বিশাল বৈরাগ্যে” হৃদয় পূর্ণ করে ও স্বস্তি দেয় । এমন 
কি কবি মাঝে মাঝে অনুভব করেন যে বিশ্বের অন্তর অন্তঃপুরে একে- 
শ্বরী রাণী হইলেন মহাকালী শবর্বরী, তাহারই নিখিললুপ্ত অন্ধকারে 
মহাযোগী বিশ্বের মুক্তিপথ দেখিতে পান। 

আপাততঃ এই ভাবেই কবি জীবনদেবতার মায়া হইতে উদ্ধার 
লাভ করিয়া মহত্তর জীবনসত্যের দিকে অগ্রসর হইলেন । 

১৩ সঃ মর ৭ 

এই কঠোর জীবনসত্যের বাস্তব পরিচয় কবি দিয়াছেন “কথা৷ ও 
কাহিনী”র আখ্যায়িকাগুলিতে | এই সত্য আমাদের আশাকে চূর্ণ 
করে, আকাতক্ষা-কে ধ্বংস করে, আমাদের মনগড়া হ্যায় অন্যায়, উচিত 
অনুচিত, ধন্মাধন্ম-বোধকে বিজ্রপ করে । আমরা অহরহ আপন 
অন্তর হইতে বাসনার দ্বারা, আমাদের বুদ্ধির দ্বারা, আমাদের কল্পনার 
দ্বার জগৎ সম্বন্ধে যে ধারণ! গড়িয়া ভুলিয়াছি, তাহার মিথ্যা কি ভাবে 
জীবমসত্যের নিকষে ধরা পড়ে, তাহা এই কাহিনীগুলিতে উদাহ্গত 
হইয়াছে । শ্রীমতীর ভক্তি, বাসবদত্তার প্রণয়াকাজ্ষা, কেসর খায়ের 
রঙ্গরসম্পুহা-প্রভৃতি উচ্চ ও নীচ প্রবৃত্তি এই জীবনসত্যের কাছে যেমন 
ব্যাহত হইয়াছে, তেমনই শ্যামার আত্মনিবেদন, বজসেনের ধর্মবোধ, 
মল্লিকার স্থগভীর সন্তানস্বেহ ও একান্তিক নিষ্ঠা, মোক্ষদার অন্তরব্যথা, 


১১০ কবিগুরু 


মৈত্র মহাশয়ের অন্তিম বিবেকদংশন, নিরপরাধ অনাথ রাখালের 
শিরুপায় প্রাণভিক্ষা ইত্যাদি পবিত্র, মহৎ, করুণ অন্ৃভূতিগুলিও 
ইহার কাছে উপহসিত হইয়াছে! এই জীবন-সত্যকে উদ্দেশ করিয়া 
বল। যায় 
দেবতার 'মতো.তুমি নিশ্চল নিষুর 
অমোঘ তোমার দণ্ড, কঠিন বিধান । 
তত্রাচ মন্থুয্যত্বের গৌরব এই যে এই নিষ্ঠুর দেবতার দণ্ড-কে সে 

অবিচল ভাবে মাথা পাতিয়া লইতে পারে এবং মানবিক আদর্শে 
প্রতিষ্ঠিত থাকিতে পারে । 

11) 0109 191] 011701) 0৫ 017070107968/009 

1 108৮6 17706 /11709ন0. 10] 07169. ৪087. 

[017097. €09 1015 02901017908 07 01)97)09 

115 1)98,9. 19 10910909955 108৮ 101)0৮790, 

এই গৌরবই অজ্জন করিয়াছিলেন কর্ণ, ঘিনি “নিহ্ষলের, হতাশের 

দল” বরণ করিয়াছিলেন, “জয়লোভে যশো লোভে রাজ্যলোভে” বীরের 
সদ্গতি হইতে ভ্রষ্ হন নাই; করিয়াছলেন মহারাজ সোমক, যিনি 
স্বেচ্ছায় স্বর্গহ্বখ ত্যাগ করিয়া পাপীর প্রতি সমবেদনায় নরকবাসী 
হইয়াছিলেন ; করিয়াছিলেন গান্ধারী, যিনি পতিপুত্রপ্রীতির উর্ধে 
উখিত হইয়া ধের্ধয ধারণপুববক মহাকালের শান্তির প্রতীক্ষা 
করিয়াছিলেন ; করিয়াছিলেন বন্দা, যিনি “নিজহাতে অবহেলে” 
শিশুপুত্রকে বধ করার পর স্থিরভাবে দগ্ধ সাড়াশিতে ছিন্নদেহ হইয়া 
মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন । এই ভাবে “কথা ও কাহিনী”র আখ্যান- 
কাব্যগুলিতে “খজু শুভ্র মুক্ত জীবনের জয়ধ্বনি” স্বকঠোর বেদনার 
ভাষায় ঘোষিত হইয়াছে 


তীয় যুগ 
[. “ক্ষণিকা”__-উৎসর্গ' ] 
( খু অঃ ১৯০৭-১৯০৪ ) 
( বয়স ৩৯-৪৩ ) 


“ভাল মন্দ যাহাই আম্মবক 
সত্যেরে লও সহজে” 


কাব্যজীবনের দ্বিতীয় যুগের পরিশেষে রবীন্দ্রনাথ কঠোর বাস্তবের 
মধ্যে একটা বিরাট সত্তার আবির্ভাব লক্ষ্য করিয়াছিলেন, এবং “অতি 
উচ্চ বেদনার আগ্নেয় চুড়ায় মানব আত্মার “অনিব্বাণ জ্যোতিশ্র 
উদ্ভাসন প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন । শ্রেষ্ঠ ট্রাজেডির মধ্যে আমরা যে 
উপলব্ধির পরিচয় পাই, তাহাই যেন এই সময়ে তাহার কাব্যে 
রূপায়িত হইতেছিল । মনে হইতোছিল যে কবি এইবার স্বপ্নলোকের 
প্রতি বিমুখ হইয়া কর্্মবৈচিত্র্যের মধ্যে আত্মদান করিবেন, “দেবতার 
দীপ হস্তে” আবির্ভূত “রুদ্রদৃতের” ম্যায় “বন্ধন পীড়নছুঃখ অসম্মান 
মাঝে” “আত্মার বন্ধনহীন আনন্দের গান” গাহিবেন» বিবেকানন্দ বা 
উপাধ্যায় ত্রহ্মবান্ধবের আদর্শ তাহার জীবনে ও কাব্যে মূর্ত হইয়া 
উঠিবে। “কথা ও কাহিনী”র অনেকগুলি কবিতা হইতে এই ধারণার 
পৌষকতা পাওয়া যায়। কিন্তু ঠিক এই সময়ে আবার একটা 
গুরুতর পরিবর্তন ঘটিল, রবীন্দ্রকাব্য আর একবার মোড় ফিরিয়া 
নৃতন পথে অগ্রসর হইল । “সোনার তরী'তে বোঝাই সাঙ্গ করিয়! 
এবার কবি তাহাকে বিদায় দিলেন । 


১১২ কবিগুরু 


“অনেক খেল অনেক মেল সকলি শেষ করে 
চল্লিশেরই ঘাটের থেকে বিদায় দিন তোরে ।” 

এই পরিবর্তনের প্রমাণ প্রথম পাওয়া যায় “ক্ষণিকাণ্য । 

এই জাতীয় দিকৃপরিবর্তন রবীন্দ্রকাব্যের ইতিহাসে অনেকবারই: 
ঘটিয়াছে, দেখিতে পাওয়া যায়। “মানসী'র পর “সোনার তরী, 
রচনায়, “বলাকা' ও “শিশু ভোলানাথের' পর “পূরবী" রচনায় এতাদৃশ 
বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখিতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রমানসের মুল 
প্রবৃত্তির সহিত এই পরিবর্তনশীলতার একটা গুঢ় সম্পর্ক আছে। 
পুবের্বই বলা হইয়াছে যে ছন্দোবিলাস রবীন্দ্রনাথের মজ্জাগত, 
ছন্দোময় সত্তার তরঙ্গিত স্পন্দন তাহার মৌলিক উপলব্ধির সহিত 
একীভূত | এই জন্যই তাহার সাধনার ইতিহাসেও আমরা দেখিতে 
পাই যে কোন একটা ভাব-কেই তিনি একান্তভাবে অন্বুসরণ করেন না, 
অভিজ্ঞতার তরঙ্গে তরঙ্গে নূতন ভাব আসিয়া তাহার সাধনাকে নৃতন 
দিকে সঞ্চালিত করে। কোন কোন আোতম্বিনী যেমন কখনই জু 
সরল গতিতে অগ্রসর হয় না, বারংবার করিয়া দিক পরিবর্তন 
করে, যে কোন ক্ষুদ্র বা বৃহৎ বাধার সম্মখীন হইলেই অবিলম্বে পাশ 
কাটাইয়! অন্য এক দিকে প্রবাহিত হয়, শিলাখণ্ডে ধারাআোত প্রতিহত 
হইলে নটার ম্যায় কিন্কিনীর ধ্বনি সহকারে শ্ৃত্যচ্ছন্দে আকা বাঁকা 
পথ কাটিয়া! অগ্রসর হয়, রবীন্দ্রমানসও ঠিক সেই ভাবে বারে বারে 
অধ্যাত্বজীবনের নব নব বাধা ও সমস্যাকে পাশে রাখিয়া নব ভাবের 
পথে অগ্রসর হইয়াছে । জীবনআোতের ছন্দতরঙ্গের দোলায় তিনি 
একটা ভাবের তীরে আসিয়া আশ্রয় পাইলেন বলিয়! যখনই মনে 
হয়, পর মুহূর্তেই সেই তরঙ্গের পশ্চাৎ প্রবাহ তাহাকে অন্য এক 
তীরে লইয়া যায় । 


রবীন্দ্রকাব্যের জু __তৃতীয় যুগ ১১৩ 


ইহা ছাড়া আরও একটা কারণ বোধ হয় আছে। রবীন্দ্রকাব্যে 
অনেক সময় সাংসারিক জীবনের আদর্শ হিসাব কর্্মসাধনার প্রশংস! 
থাকিলেও তাহার সহিত রবীন্দ্রকাব্যের মূল সুরের ঠিক সঙ্গতি নাই । 
জ্ঞানে বা কর্মে নহে, রসান্ুভৃতিতেই রবীন্দ্রনাথ মানব আত্মার 
সার্থকতা উপলব্ধি করিয়াছেন । মাঝে মাঝে বাস্তবের তীব্র অনুভূতির 
আবেগে তিনি “এবার ফিরাও মোরে” বলিয়া কর্মবছুল জীবন যাপনের 
জন্য অধীর হইয়া থাঁকিলেও, এই অধীরতা অধিক দিন স্থায়ী হয় নাই; 
বরং ইহাকে তিনি “পরো ধন্মঃ” বলিয়াই অনুভব করিয়াছেন ও 
অস্বস্তি বোধ করিয়াছেন । তাহার অন্তরদেবতা ইহাতে ক্ষুব্ধ হইয়া 
তাহাকে তিরস্কারই করিয়াছেন; “স্থর ভুলে যেই ঘুরতে গেলাম কেবল 
কাজে, লাগল মুখে তোমার চোখের ভঙসনা যে”__ইহাই তাহার 
অভিজ্ঞতা । এই জন্ট বারেবাবেই তিনি সংসারের সংগ্রাম ও জটিল 
কর্মজালের বন্ধন এড়াইয়া নিজব্ব রসসাধনায় নিবিষ্ট হইয়াছেন । তিনি 
অলস জীবন যাপন করেন নাই, কিস্ত তাহার নানা কাজ এক রকম 
“খেলা” অর্থাৎ রসোপলন্ধির উপায়-ই ছিল । তিনি খেলার ছলে কাজ 
করেন নাই, কাজের ছলে খেলা করিয়াছেন । কুরুক্ষেত্র তাহার 
ধর্মক্ষেত্র ছিল না, সেখানে “সমাগতাঃ বুযুতৎসবঃ”-র সঙ্গে জীবন 
ংগ্রামে লিপ্ত হওয়াকে তিনি ধর্ম বিবেচনা করেন নাই । তিনি 
বিবেকানন্দ-ও ছিলেন না, কিন্বা 1301997:৮ 1370 211)0-ও ছিলেন 
না। এ] ৮98 9592. ৪, 991651৮ এরূপ কোন আতক্মোপলক্ষি 
তাহার ছিল না । এই জন্য “কথা ও কাহিনী'র বীরত্ব ও মহত্বের 
আখ্যানে তাহার কবিচিত্তু চরিতার্থতা লাভ করিতে পারে নাই । 
যাহাই হউক, “কল্পনা” ও “কাহিনী'র পর রবীন্দ্রকাব্যে সহসা 
একটা নূতন সুরের পরিচয় পাওয়া যায় । এক দিক্‌ দিয়া অবশ্য এই 


ঘ-৮ 


১১৪ কবিগুরু 


সময়কার ভাব পূর্বতন পবেরধরই অন্ুবৃত্তি__এ কথা বলা যায়, কারণ 
বাস্তব সত্যকে স্বীকার করার প্রবৃত্তিই এই সময়ে আরও প্রবল 
হইয়ছে। কিন্তু যাহাকে পরের ভীষণ ও রহস্যময় বলিয়া মনে হইয়া- 
ছিল, তাহাকে এখন কবি অন্য চক্ষে দেখিতেছেন । কবির নিপীড়িত 
আত্মা এখন বাস্তবের মধ্যেই আনন্দোচ্ছল মুক্তির সন্ধান পাইয়াছে। 
“সত্যরে লও সহজে” ইহাই এখন তাহার বাণী, এবং এই বাণীই 
এখন তাহাকে দিতেছে আনন্দ, মুক্তি ও সার্থক জীবনের সন্ধান । 


অষ্টম পর্ন (ভাব) 
[ ক্ষণিকা ] 
(১৯০০) 
“শুধু অকারণ পলকে 
ক্ষণকের গান গা রে আজি প্রাণ, ক্ষণিক দিনের আলোকে ।” 
এই তৃতীয় যুগের প্রথম পবের্বর রচনা “ক্ষণিকা” এবং এই কাব্যেই 
একটা বিস্ময়কর নৃতন ভাবের প্রথম প্রকাশ দেখিতে পাওয়া 
যার। জীবনসত্যের একটা নূতন তত্বের সন্ধান এখন পাইয়াছেন 
বলিয়া কবির মনে হয়। ইহা এক প্রকারের অভিনব ক্ষণবাদ । 
ইহাতে জীবনের সত্যের সহিত হৃদয়ের ঈক্সার সামগ্রস্য ঘটিয়াছে। 
জীবন্মুক্তির ও আনন্দ-সাধনার একটা সহজ পন্থা ইহাতে পাওয়া যায়। 
ক্ষণিকা' কাব্যের স্ুচনায় “উদ্বোধন” কবিতাটিতেই ইহাঁর সারমর্ম 
ব্যক্ত হইয়াছে । কবি এখন বলিতেছেন যে জগৎ-প্রবাহের বিরুদ্ধে 
আম্মার অনর্থক ও ব্যর্থ বিদ্রোহ-ই ছুঃখের আসল কারণ । জগতের 
সহিত আত্মার এই চিরন্তন দ্বন্দের মূলে রহিয়াছে একটা স্থল আসক্তি, 
যাহার জন্য আমর! অতীতকে বা অতীয়মানকে আকড়াইয়া থাকিতে 
চাই, এবং ভবিষ্যৎকে ব! বর্তমানের নব বূপায়নকে ভয় করি । এই 
আসক্তি ও ভয়কে কাটা ইয়া খন আমরা পরিবর্তমান ক্ষণকে আশ্রয় 
করিয়াই সংসার-কআ্োতে ভাসিতে পারিব, তখনই ছন্দ ও ছুঃখের 
অবসান হইবে । তখন [%8-এর মতনই আমরা এই “08581706 
0)07151)1 ( পরিবর্তমান ক্ষণ )-কে “69০ 09৪9%181” (অতি 
সুন্দর ) বলিয়া জানিতে পারিব ও স্ুল বস্তবিশেষের মোহ হইতে 


১১৬ কবিগুরু 


আমরা মুক্তি লাভ করিব। প্রত্যেক বস্তই বুদ্ধদের ন্যায় “ফুটে 
আর টুটে পলকে”, তত্রাচ সব কয়টির পারম্পর্য্যে যে একটা উজ্জ্বল 
প্রবাহের স্থ্টি হয় তাহা আমাদের অনাসক্ত হৃদয়ে অনন্ত আনন্দের 
সঞ্চার করিতে পারে । ছুয়ে থেকে ছলে শিশির যেমন শিরীষ 
ফুলের অলকে” সেইভাবে “ধরণীর পরে শিখিল-বাধন” হইয়া “প্রাণ 
যাপন” করাতেই মুক্তি ও আনন্দ করতল-গত হয়। এই আনন্দ 
একটা “অকারণ পুলক” বস্ত ও অবস্থা-নিরপেক্ষ* হৃদয়ের ্বত:স্ফ্ 
লীলার রস হইতেই ইহা প্রাণশক্তি শিশুর মত আহরণ করে। 
এই আনন্দের সন্ধান পাইলে কল্পনার স্বপ্ললোকের সন্ধানে আমাদের 
ঘুরিয়া ঘুরিয়া অতৃপ্ত বা ব্যর্থ হইতে হইবে না; বাস্তব জগতের 
অপূর্ণতা ও ভঙ্গুরতা আমাদের পীড়িত করিবে না। “সোনার তরী, 
ও “চিত্রা'র স্বপ্ন এবং “মানসী ত্রন্দন__উভয় হইতেই আমরা উদ্ধার 
পাইব । “কল্পনায় যে রহম্যময় বিরাট বাস্তব ও কঠোর কর্মসাধনার 
আভাস আছে, তাহাও এখন কবির চক্ষে সত্য বা সার্থক মনে হইতেছে 
না । 1)1099798৮-দের মত কবিও এখন মনে করেন যে “নদীজলে 
পড়া আলোর মতন” ঝলকে ঝলকে ছুটিয়া চলাই একমাত্র করণীয়, 
কারণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্ত ও তখনকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপলব্ধি লইয়াই জীবন, 
ইহা ছাড়া বিরাট ব সনাতন কিছুর ধারণা একটা মিথ্যা কল্পনা মাত্র । 
তথাকথিত কন্মসাধনা একটা নেশার মত আমাদের মনে সাময়িক 
একটা উৎসাহ আনিতে পারে, কিন্ত এই সাধনার ফলে কোন সিদ্ধি 
লাভ হয় না। আধ্যাত্মিক অশান্তিতেই ইহার উদ্ভব এবং তাহাতেই 
ইহার পরিণতি ; কোন শাস্তি, তৃপ্তি বা অপবর্গ ইহাতে পাওয়া যায় 
না ; বস্তজগত যাহা ছিল তাহাই থাকিয়৷ যায়, তাহার চঞ্চল প্রবাহ 
রোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা অসাধ্য ! স্বৃতরাং কবি বলেন, 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-__তৃতীয় যুগ ১১৭ 


হাল ছেড়ে মাজ বসে আছি আমি, ছুটিনে কাহারো পিছুতে, 
মন নাহি মোর কিছুতেই, নাহি কিছুতে । 
সাংসারিক রীতি, নীতি, আদর্শবাদ ইত্যাদির প্রতি এই উদাসীনতার 
প্রশস্ত প্রাঙ্গনে আসিয়া কবি হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন। তাহার মন 
প্রাণ স্বাধীনভাবে খেলা করিবার ও আনন্দ আহরণ করিবার শ্বযোগ 
পাইল । 
এতদিন পরে ছুটি, আজ ছুটি, মন ফেলে তাই ছুটেছি। 
তাড়াতাড়ি করে খেলাঘরে এসে জুটেছি । 

সংসারকে একটা খেলাঘর বলিয়া গ্রহণ করা ও খেলা খেলা 
করিয়াই জীবন যাপন করা--ইহাই হইল “ক্ষণিকা"র অভিনব ধর্ম । 
স্থতরাং এইখানে আসিয়া কবির সাধনা এক নূতন ধরণের জহ্জিয়। 
বাদে পরিণত হইল । এই সহজিয়া বাদ-ই এক হিসাবে রবীন্দ্রনাথের 
বিশিষ্ট রুচি ও প্রকৃতির পরিচায়ক | এই সহজিয়া বাদের একটা স্তত্র 
হইতেছে জীবনের তথাকথিত কর্তব্য, উচ্চাশ! ইত্যাদিকে একেবারে 
পরিহার করা । সাংসারিক মুল্য ব। মানের ইহা একেবারেই কোন 
খেয়াল রাখে না ; স্বতরাং ভোগ, বিলাস, এশ্বধ্য ইহার কাছে যেমন 
নিরর্থক, তেমন জ্ঞান, কর্ম, এমন কি প্রেম-ও ইহার কাছে নিরর্থক, 
যদি তাহা একটা জটিল ও ব্যাপক প্রয়াস বা সাধনার মুস্তি গ্রহণ 
করে। “কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখে”্র ক্ষণিক দৃষ্টিতেই ইহা 
পরিতৃপ্ত, “মন নেওয়া দেওয়া”্র সাধনায় ইহার রুচি নাই.। মূহুর্তের 
আনন্দই ইকার কাছে যথেষ্ট, এবং মুহূর্ত অতীত হইলে তাহার জন্য 
কোন লোভ বা শোক ইহা পোষণ করে না। এই আনন্দের উৎস 
খুঁজিয়া পাওয়া যায় মানবহৃদয়ের মৌলিক বৃত্তির সরল ও সহজ 
অনুশীলন ও প্রকাশের মধ্যে । এহিক ও পারত্রিক কোন লাভ, 


১১৮ কবিগুরু 


শাস্ত্রের “শ্রেয়ঃ” বা “প্রেয়”-_কিছুই ইহার অভীক্ষিত নহে; একটু 
অভিনব অর্থে, ইহা “আত্মক্রীড় আত্মরতি2” | প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য 
মগ্ন হইয়া ভাবনা-কামনাহীন জীবন যাপন করা, হৃদয়ের উচ্ছাসে 
অসম্ভবের অন্নুসরণ করা, “সোজাস্থজি” প্রণয়ের চচ্চা করা এবং 
“ভালো মন্দ যাহাই আম্মুক” তাহার জন্য ভ্রুক্ষেপ না করিয়া হৃদয়ের 
অনিরুদ্ধ প্রকাশের উল্লাসেই মযুরের মত নৃত্য করা-ই ইহার ধর্ম। 
কালিদাসের কাব্যে যে সহজ রসোচ্ছল নাগরিক জীবনের চিত্র 
আছে, তাহার জন্যই ইহা কবির কাছে মধুর মনে হইতেছে ; 
অগ্নিমিত্র, ছুম্মন্ত, বিক্রম বা যক্ষের জীবনের আবেগচঞ্চল অ-নৈতিক 
দিক্টাই তাহার কাছে উপাদেয়, রঘুবংশের রাজযিবৃন্দের পুরুষান্ু- 
ক্রমিক আদর্শনিষ্টা ও সাধনা তাহার কাছে নিরর্৫থক। 

এই উচ্ছ্বসিত আবেগময় সংসারবিমুখ মুক্ত জীবনের হিল্লোল 
স্বভাবতঃই প্রকাশ পাইয়াছে এক প্রকারের অনন্যসাধারণ ভাষা 
ও অভিনব ছন্দের মাধ্যমে । বক্তব্য গুরুতর হইলেও আপাতচপল 
ভঙ্গীতে, লঘুগতি কথ্য ভাষায় এবং চুল ছড়ার ছন্দেই তাহা ব্যক্ত 
হইয়াছে! সহজ ধর্ম্মের ভাষা ও ভঙ্গী সহজ হওয়াই উচিত; স্্রতরাং 
“গভীর স্বরে গভীর কথা শুনিয়ে দিতে” কবির কোন ইচ্ছা নাই» 
এমন কি “মনের কথা” স্বগন্তীর হইলেও তাহাকে “ঠাট্টা করে” 
উড়াইয়া দিতেই কবির প্রবৃত্তি । “চপলতা আজ যদি কিছু ঘটে 
করিয়ো ক্ষমা” | 

যাহা হউক কবি এই নৃতন দৃষ্টিভঙ্গী লাভ করায় তাহার 
কাছে আনন্দ ও মুক্তি যে সরল ও সহজ হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই । 
যে কোন অবস্থাতেই তিনি পুলকের সন্ধান পান। ফলে এই লাভ 
ঈাড়াইয়াছে যে “সোনার তরী” পব্বের কল্পনা যে অলীক ও ব্যর্থ তাহা 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- তৃতীয় যুগ ১১৯ 


হৃদয়ঙ্গম হইলেও এখন আর “কল্পনা” পবের্বর বিষাদ ও অস্বস্তি নাই; 
অভাব বোধের যুগ কাটিয়া গিয়া নূতন ভাবের উপলব্ধি আসিয়াছে, 
“অনেক দিকেই: যায় যে পাওয়া অনেকটা সান্তনা” । এই সাস্তনার 
মূলে আছে--সত্যকে সহজ ভাবে দেখিবার ও গ্রহণ করিবার প্রবৃত্তি 
ও ক্ষমতা ; যতদিন কবি “বকুলশয়নে নিলীন” ও “মধুকরসম সঞ্চয়- 
প্রয়াসী” ছিলেন, ততদিন এই সান্ত্বনা তাহার পক্ষে পাওয়া সম্ভব হয় 
নাই । এখন তিনি “সবলে কারেও বাসনা মুঠিতে” ধরিতে চাহেন না 
বলিয়াই “ত্রিভুবন ফিরিছে তাহারি পিছুতে” । 


%% স 


26 
2৮৮ 


কিন্তু এই বাহা লীলাচাপল্যের অন্তরালে তাহার গভীরতর 

সত্তার ক্রিয়া অব্যাহত ছিল । সব্বখতু সর্ককালে ফাহার সিংহাসন, 
যিনি অন্তরতম, তাহার জন্যই কবির প্রাণের ও গানের শ্রেষ্ঠ অর্থ্য 
নিবেদিত হইতেছিল, নানা ছলে কবি উ|হাকেই ডাকিতেছিলেন | 

যে দেবতারে গড়েছিলেম 

দ্বারে যাদের পড়েছিলেম 
তাহাদের মধ্যে “কে বা আছেন এবং কে নেই, কেই বা বাকি 
কেই বা ফাকি” এই সব জল্পনা আপাততঃ তিনি নিরর্থক মনে 
করিয়াছিলেন বটে» কিন্তু যখন পথচলার “সমাপ্তি” ঘটিল তখন 
দেখিলেন 

তোমার নীরব নিভৃত ভবনে 

জানি না কখন পশিনু কেমনে । 

পরিশেষে এক নূতন উপলন্ধষি কবির অন্তঃকরণে ফুটিয়া উঠিল । 
“ক্ষণিকা মূরতি” তিরোহিত হইল, তাহার “চপল দরশন” মিলাইয়া 
গেল, ত্রিভুবন জুড়িয়া এক মহীয়সী শক্তি নীল গুনের আবরণে 


১২০ কবিগুরু 


থাকিয়৷ উত্তাল তুমুল ছন্দে আত্মপ্রকাশ করিলেন, তাহার আবির্ভাবে 
কবি চমকিত হইলেও তাহাকে তিনি সহজে গ্রহণ করিতে ও 
বুঝিতে পারিতেছেন, ক্ষণিকের পাতার কুটারেই তাহাকে আহ্বান 
করিতেছেন | জলভরা বরযায় তাহার পরাণ ভরিয়া সেই আবির্ভাবের 
গান বাজিতেছে, তাহার হৃদয় শ্যাম-সমারোহে ভরিয়া গিয়াছে । 

এ কাহার আবির্ভাব? এ কি জীবনদেবতার ? তাহা নয়। 
জীবনদেবতা এবার বিশ্বদেবতার সহিত মিশিয়া গিয়াছেন। এখন 
যিনি আবিভূতি হইলেন, তিনি প্রেয়সী বা৷ প্রেমিক নহেন ;তাহার স্তব- 
গান আপনিই ধ্বনিত হয়ঃ “বাসর ঘরের ছুয়ারে” তিনি “পুজা”্র অধ্্য 
বিরচন” করান, তাহাকে আমরা দিতে পারি শুধু আমাদের একান্তিক 
আত্মনিবেদনের নৈবেছ্ভ । এই ভাবে “ক্ষণিকা”র সহজ ধর্ম নূতন এক 
ভাবে অনুপ্রাণিত হইল, তাহার প্রকাশ হইয়াছে পরবর্তী কাব্য 
“নবেছ্োে' । % 


% £ক্ষণিকাঁ'র আপাতলণু উল্লাস ও ক্ষণবাদ মূলতঃ অলৌকিক ভাবপরায়ণত! ও লৌকিক 
বাস্তবপরায়ণতা উভয়কেই অতিক্রম করিয়া আত্মার আশ্রয় সন্ধানেব প্রয়াস হইতে উদ্ভুত । 
এই প্রয়াসের পরিণতি হয় অনেক পরে খেয়া-গীত।ঞুলির যুগে। 


নবম পর্ন (মহাভাব) 
“নবেছ্য 
(১৯০১) 
( বয়স-৪০ ) 
“যে কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে গন্ধে গানে 
তোমার আনন্দ রবে তার মাঝখানে | 

“ক্ষণিকা' পর্ধের শেষের দিকে যে একটা অনুভূতির আভাস আমরা 
ইতঃপুবের্ধ লক্ষ্য করিয়াছি, তাহারই পরিণত ও পুর্ণতর প্রকাশ হইয়াছে 
“নৈবেছ্ে । “নৈবেগ্ভ* মহাভাবের কাব্য ; ইহার মধ্যে একটা প্রগাঢ়, 
স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত, গৌরবোজ্জল উপলব্ধি বিকশিত হইয়াছে, কবির 
আত্মা সাময়িক ভাবে একটা স্বর্গলোক রচনা করিয়াছে । “নবেষ্' 
রচনার সময় কবি যৌবন ও প্রৌটত্বের সীমারেখায় উপনীত । জীবনের 
যে খতুতে “শত বরণের ভাব-উচ্ছ্াস” প্রাণে বিকশিত হয় এবং যে 
ধতুতে মেঘমুক্ত সকালে “ভরা জলে--'স্থখে' ভাসিয়া যাইতে ইচ্ছা হয়, 
সেই সব খতুর অবসান হইয়াছে । “আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত 
চরাচরে” ৷ এই শান্ত শুন্ধতার মধ্যে কবি আত্মস্থ হইলেন। “যুগযুগাস্তের 
বিরাট স্পন্দন” ও নিজের “প্রাণতরৃঙ্গমালা” উভয়ের মধ্যে এক্য প্রত্যক্ষ 
করিয়া কন্মযোগের নির্দেশ পাইলেন । “ভাবের ললিত ক্রোড়ে না 
রাখি নিলীন-_কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন ইহাই এখন তাহার 
প্রার্থনা । ইহার পরিচয় পাওয়া যায় তাহার ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠায়, 
“বঙ্গদর্শন' পরিচালনায়, শান্তিনিকেতনে নিবাস স্থাপনায় । 

কেহ কেহ বলিয়াছেন যে “ক্ষণিকা'র সহিত “নৈবেছ্ে'র কোন 


১২২ কবিগুরু 
সঙ্গতি নাই, “নৈবেদ্য” “কল্পনা'রই অন্থবৃত্তিঃ “ক্ষণিকা” এই. উভয় 
কাব্যের মধ্যে একটা আকস্মিক উজ্জল ব্যবধান অনাবশ্যক ভাবেই 
রচনা করিয়া রাখিয়াছে, “ক্ষণিকা” একটা প্রক্ষিপ্ত উচ্ছাস-চাপল্য মাত্র | 
কিন্তু ভাল করিয়া পরীক্ষী করিলে দেখা যাইবে যে বাস্তবিক পক্ষে 
“ক্ষণিকা” ও “নৈবেদ্যের মধ্যে একটা গুঢৃতর সম্বন্ধ আছে। উভয় 
কাব্যেই একটা সহজ ধর্ম্মের কথা বলা হইয়াছে, এবং সাংসারিক 
লাভালাভের মানদণ্ডে বিচার না করিয়া কেবলমাত্র মানবহৃদয়ের 
আনন্দান্ৃভৃতির মানদণ্ডেই সমস্ত অভিজ্ঞতার বিচার করা হইয়াছে; 
উভয় কাব্যেই বাস্তব সত্য তথা ভাল ও মন্দকে সমভাবেই আনন্দান্টু- 
ভূতির উপাদান হিসাবে গ্রহণ করার কথা বলা হইয়াছে; উভয় 
কাব্যেই একটা প্রত্যয়বান্‌, ্বপ্রতিষ্ঠ, বলিষ্ঠ, নিভীঁকি মনোবৃত্তি প্রকট 
হইয়াছে । পার্থক্য এই যে, “ক্ষণিকা'র আনন্দ জীবনের পলাতক 
ক্ষণগুলি হইতে মাধুকরী বৃত্তিতে আহত 7 “নৈবেদ্যে'র আনন্দ জীবন- 
ব্যাপী সামশ্রিক অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত । “ক্ষণিকা” নিরীশ্বর, 
“নৈবেছ্' ঈশ্বরবাদী। ক্ষণিকা” চটুলভাষী, চপলমতি, লঘুগতি ; 
“নৈবেছ্যি' “অমত্তঃ গম্ভীর”, সমাহিত, কন্্মযোগী ! তবে একটু লক্ষ্য 
করিলেই দেখা যাইবে যে “ক্ষণিকা*য় যে উপলব্ধি বিক্ষিপ্ত ও খণ্ড খণ্ড 
ছিল, তাহাই গ্রথিত ও ঘনীভূত হইয়া “নৈবেদ্যে প্রকাশ পাইয়াছে, 
এবং মানবজীবন সম্পর্কে যাহা একটা দৃষ্টিভঙ্গী মাত্র ছিল তাহা এখন 
একটা জীবনদর্শনে পরিণত হইয়াছে, যাহা বিদ্রোহ ছিল তাহাই; 
এখন স্বপ্রতিষ্ঠ হইয়া আদর্শনিষ্ঠায় পরিণত হইয়াছে । 

“নৈবেদ্যের মধ্যে মুল উপলব্ধি ছুইটি। প্রথমটি “ক্ষণিকা'র 
মধ্যেও পাওয়া যায়, ইহাই ব্যক্ত হইয়াছে সুপরিচিত এই কয়েকটি 
পউ.ভ্তিতে 2-- 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_তৃতীয় যুগ ১২৩ 


বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয় | 

অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় 

লভিব মুক্তির স্বাদ । 
এই উপলব্ধি যাহার আছে তাহার কাছে প্রেম ও ভক্তি, মোহ ও মুক্তি 
একই হইয়া দাড়ায় ৷ ইহা নব সহজিয়া বাদ বা সহজ ধর্ম্মেরহ' স্মৃত্র | 

দ্বিতীয় যে উপলব্ধিটি “নৈবেদ্য” কাব্যকে একটা বৈশিষ্ট্য প্রদান 

করিয়াছে, তাহা হইতেছে ইহার উশ্বরবাদ । ইহার পুরে রবীন্দ্রকাব্যে 
জীবনদেবতার কথা বলা হইয়াছে বটে, কিন্তু জীবনদেবতা 80:07 
981176, 90901904100] 1)8,9177017১ 6189 13085900107 137106- 
07001) ইত্যাদির স্বগোত্রীয়, তিনি ঈশ্বর বা 9০৭ নহেন | “ক্ঘণিক।? 
কাব্যের পরিশেষে আবির্ভাব কবিতায় ঘে উপলব্ধির আভাস পাওয়া 
যায়, তাহারই পূর্ণ বিকাশ হইয়াছে “নৈবেদ্যে'র ইঈশ্বরান্ৃভূতিতে । 
এই বিকাশের স্ত্র আমরা দেখিতে পাই প্রাণ কবিতাটিতে। যে 
অনন্ত প্রাণ বিশ্বের সমস্ত বস্ততে সঞ্চারিত, তাহাই কবির নাড়ীতে 
নাড়ীতে স্পন্দিত হইতেছে । *স্তব্ধতা কবিতাটিতে কবি বলিতেছেন 
যে “এই অন্ুপরমাণুদের নৃত্যকলরোল” ঈশ্বরেরই “আসন ঘেরি অনস্ত 
কল্লোল ।” “দেহলীলা"য় বলিতেছেন যে “প্রত্যেক প্রাণীর মাঝে 
প্রকাণ্ড জগৎ” রহিয়াছে এবং, যতই ক্ষুদ্র হউক, প্রত্যেকের হৃদয়াসনই 
ঈশ্বরের মিলনশয্যা | কবির জীবনের অধিদেবতা এখন বিশ্বদেব বা 
দর্শনশান্ত্রের 900 বা ঈশ্বর । তিনি একাধারে প্রেম, শান্তি ও 
সৌন্দধ্যের আধার,এবং বিরাট নিগুণ সত্তা, একাধারে তিনিই আকাশ 
ও নীড়। একদিকে তিনি রুদ্র, তিনি ম্যায়ের বিধাতা, তিনি পিতার 
হ্যায় লালন ও শাসন উভয়ই করিয়া থাকেন । অপর দিকে তিনি-ই 
“অন্তরযামী” “জীবনস্বামী” “জীবননাথ” । তিনি হৃদয়ে হৃদয়ে 


১২৪ কবিগুরু 


প্রবেশ করিয়া তাহাকে পবিত্র করেন । তাহার স্পর্শ কখনও রুক্ষ, 
কখনও কোমল । তীহার প্রভাবের মধ্যে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ__ইহা 
অপেক্ষা চরম পুরুষার্থ বা অপবর্গ কিছু হইতে পারে না। বিশ্বের 
সমস্ত কাজে, মানবসমাজের উত্থান পতন ও নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে 
তাহারই অমোঘ শক্তি ও ইচ্ছার প্রকাশ দেখিতে পাওয়া যায় । প্রত্যেক 
মানুষের প্রতি তাহার আদেশ ও আহ্বান রহিয়াছে; সে আহবান 
কর্মের জন্য, শ্যায়ের ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য, ব্যক্তির ও সমাজের 
জীবনে ঈশ্বরান্ুভৃতির মুক্তানন্দ ফুটাইয়া৷ তুলিবার জন্য | সেই আহ্বানে 
সাড়া দেওয়াই মানবের শ্রেষ্ঠ কর্তব্য । কর্্মযোগ ও ভক্তিযোগের 
সাধনার পথ একই । তাই কবির এখন প্রার্থনা 
ভকতিরে বীর্য দেহে। 
কর্ম্মে যাহে হয় সে সফল, প্রীতি স্নেহ 
পুণ্যে উঠে ফুটি । 

এই ভাবে “নৈবেছ্” কাব্যে ঈশ্বর সম্বন্ধে যে একট৷ সুমহৎ প্রত্যয় 
প্রকাশ লাভ করিয়াছে, তাহাকে ভিক্টোরীয় যুগের ঈশ্বর-ধারণার শেষ 
কথা বলা যাইতে পারে । বাইবেলে 0০৭ সম্বন্ধে যে ধারণা আছে 
তাহার সহিত কতক পরিমাণে ভারতীয় দর্শনের ঈশ্বরতত্বের সংমিশ্রণ 
ইহাতে ঘটিয়াছে, এ কথা মনে হইতে পারে । এখানে ঈশ্বরকে 
জগতের ও মানবহৃদয়ের নৈতিক শক্তির সহিত একীভূত বলিয়া 
বিবেচনা করা হইয়াছে । 24857118985 প্রভৃতি দার্শনিকের, বিশেষতঃ 
ভারতীয় ব্রাহ্ম সমাজের, প্রভাব এখানে প্রবল, এইরূপ সিদ্ধান্ত 
বোধ হয় অসঙ্গত নয়। কিন্তু ইহার চেয়েও বড় কথা এই যে 
এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিমানসের বহ্ুবর্ষব্যাগী একটা সাধনারই 
পরিণতি ঘটিয়াছে। পুর্ব পুবর্ব যুগে যে সমর্ত উপলপ্ধি তাহার 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- তৃতীয় যুগ ১২৫ 


হইয়াছিল তাহার প্রায় সমস্তই এখানে একটা সামশ্রিক অধ্যাত্ম 
উপলব্ধির মধ্যে স্থান পাইয়াছে। সেই উপলব্ধিতে তাহার প্রাণের 
আবেগ ও আকাতক্ষা যেমন সত্য, ঈশ্বরের শাসন ও স্নেহ-ও তেমনই 
সত্য । এই জীবনদর্শন কবিরই অধ্যাত্ম দৃষ্টির ক্রমশঃ সম্প্রসারণের 
ফল । 'প্রভাত-সঙ্গীত” হইতে “ক্ষণিকা” পধ্যন্ত রচনার সময়ে তাহার 
কাব্যে যে সমস্ত মৌলিক অনুভূতি ও প্রবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়, 
সে সমস্তই এখন সমন্বিত হইয়া এক সামগ্রিক সুমহৎ উপলন্ষির অঙ্গী- 
ভুত হইয়াছে । এই সমন্বয়ের শ্ৃত্র হইতেছে প্রেম-ময় মঙ্গলময় সব্র্ব- 
নিয়ন্তার জীবন্ত স্পর্শ সম্পর্কে একটা প্রত্যক্ষ অন্ুভূতি । 

যে মহান আদর্শ এই সময়ে কবির চিত্তে প্রতিভাত হইয়াছে 
তাহার শ্রেষ্ঠ বিকাশ কবি দেখিতেছেন প্রাচীন ভারতের জীবন ও 
ধর্ম্মে। অবশ্য এই প্রাচীন ভারত এতিহাসিক বিচারে সম্পূর্ণ সত্য 
বলিয়া প্রমাণিত না হইতে পারে । কিন্তু প্রাচীন ভারতের মহাকাব্য, 
দর্শন, উপনিষদ হইতে ঘে পরিচয় পাঁওয়। যায়, তাহাতে কবি মনে 
করেন যে অন্ততঃ এই আদর্শ সে সময়ে একটা জীবন্ত ভাব বা 1098, 
রূপে বর্তমান ছিল, এবং ইহাকে বাস্তবে রূপায়িত করার একটা প্রয়াস 
তখনকার জীবনের প্রধান নীতি ছিল। সেই আদর্শকেই কবি 
আধুনিক জীবনে ও সমাজে, বিশেষ করিয়া বর্তমান ভারতে, প্রতিষ্টিত 
দেখিতে চাহেন। জীবনে এই আদর্শের প্রতিষ্ঠা হইলে বিরোধী বৃত্তি- 
নিচয়ের সঙ্গতি হয়; সন্কীর্ণতা, ক্ষুদ্রতা ও ভীরুতার অবসান হয়) 
মানবত্র স্বধর্ম্মে স্থিতি হয়। 

ক্ষণিকা'য় মুক্তানন্দের যে সন্ধান পাওয়া গিয়াছিল, তাহা অনেক 
পরিমাণে নেতিবাচক । সাংসারিকতাকে অস্বীকার করিয়া মানব- 
হৃদয়ের সহজ ধর্ম্মের অনুবর্তন করার কথাই সেখানে বলা হইয়াছে । 


১২৬ কবিগুরু 


ক্ষণিকায় সমাজ বা বৃহত্তর জীবনের কোন কথা নাই, জীবনের নানা 
উদ্ধাদানের সামপ্জস্তের কোন কথা নাই, মুহুর্তের আনন্দস্পন্দন ছাড়া 
দেশ-কালজয়ী কোন দৃষ্টি ও উপলব্ধির কথা নাই । “ক্ষণিকা'য় যুক্তি 
ব্যক্তিগত হৃদয়ের, “নৈবেছ্ে'র মুক্তি সমগ্র জীবনের, জাতির ও 
সমাজের । “নৈবেছ্যে এই জীবন্মুক্তির বিরাট ধারণা এবং তজ্জন্য 
নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সাধনার পরিকল্পনার মূলে আছে ইহার ঈশ্বরা- 
নুভৃতি । রবীন্দ্রকাব্য এখন হইতে পুরাপুরি আস্তিক্যবাদী । 


দশম পর্ব (ভাবাভাব ) 
উৎসর্গ, স্মরণ, শিশু' 
( ১৯০২--১৯০৪) 
“মৃদুর, বিপুল সুদুর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি__ 
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার, সে কথা যে যাই পাসরি ॥৮ 

“নৈবেগ্ের মধ্যে আমরা যে আধ্যাত্মিক শান্তি ও উদ্ভাসনের 
(11101709101) পরিচয় পাই, তাহাতেও রবীন্দ্রকাব্যের শেষ কথা 
ব্যক্ত হয় নাই । মানব-সভ্যতার তথা বিধাতার স্থষ্টির ইতিহাস যেমন 
একট। চিরস্তন প্রগতির ইতিহাস, কোন খানেই যেমন তাহার ফ্াড়ি 
টানা যায় না, রবীন্দ্রমানসের ও রবীন্দ্রকাব্যর ক্রমিক বিবর্তনের ধার! 
অনুসরণ করিতে গেলেও আমর! দেখিতে পাই যে কোন একটা বিশেষ 
আদর্শের উপলব্ধিতেই তাহার শেষ হয় নাই, তাহার আোত এক কু 
হইতে অপর কুণ্ডেঃ এক তীর্থ হইতে অপর তীর্থে পথ কাটিয়া চির- 
দিনই প্রবাহিত হইয়াছে । “সেথা এসে তার ত্রোত নাহি আর, কল- 
কল ভাষ নীরব তাহার”-_এমন কোন গঙ্গা-সাগরই রবীন্দ্রকাব্যে নাই, 
ইহাই রবীন্দ্রকাব্যের একটা মুখ্য লক্ষণ। ইহা তাহার গৌরবের না 
তাহার দুর্বলতার পরিচায়ক, সে বিষয়ে কোন তর্ক এখানে অনাবশ্যক। 

“নৈবেষ্ঠ' রচনার পরেই দেখি যে কবির জীবনে নানা দিক্‌ হইতে 
অপ্রত্যাশিত আঘাত আসিতে থাকে । মহাজনারণ্য মাঝে যে উদার 
স্তব্ধতা কবি “নৈবেছ্ে' লক্ষ্য করিয়াছিলেন তাহার শাস্ত বেলাভূমি এখন 
অশ্রুসাগরের জোয়ারে প্লাবিত হইল । পত্ী ও কন্যার বিয়োগ ঘটিল, 
আশ্রমের পরিচালনায় বহু গুরুতর সমস্থ্যা দেখা দিল, “সাথী যা ছিল 


১২৮ কবিগুরু 


গেল ছাড়ি” ; দেশের বৃহত্তর জীবনে বঙ্গভঙ্গ পরব্রের স্ুচনা হইল, 
আস্থা ও আদর্শের ভিত্তিভূমি কবির পায়ের তলা হইতে সরিয়া যাইবার 
উপক্রম হইল । কবির আধ্যাত্মিক জীবনেও এইবার আর একটা 
পরিবর্তন আসিল, তাহার প্রভাবে রবীন্দ্রকাব্যেও পরিবর্তন ঘটিল। 
এই সময়ে রবীন্দ্রকাব্যে আবার ভাবাভাবের লক্ষণ দেখা দিল, পুনশ্চ 
একটা অজানা কিছুর অতি আকর্ষণ প্রবল হইয়া তাহার কাব্যজীবনে 
একটা আন্দোলন আনিল । *্* “ক্ষণিকা” ও “নৈবেছ্ে' দেখি যে একটা 
অর্তি-বাচক প্রত্যয়, “জানিয়াছি” বা “পাইয়াছি” এই জাতীয় একটা 
ভাবই প্রবল; “ইহৈব সন্তোহথ বিদ্যস্তদ্বয়ং” ( বৃহদারণ্যকোপনিষৎ 
৬1৪১৪ ) এই স্মত্রই যেন এ ছুই কাব্যে মূর্ত হইয়াছে । কিন্তু 
পরবর্তী পব্রধে অন্য একপ্রকার মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়, সেই 
মনোভাব “নাহং মন্যে স্ববেদেতি, নো ন বেদেতি বেদ ৮৮ ( কেনোপ- 
নিষৎ ২২) এই ত্ত্প্রসিদ্ধ স্ত্রে যে ভাবটি রহিয়াছে তাহারই: 
সমজাতীয়। 

“উৎসর্গে'র অনেকগুলি কবিতায় এই মনোভাবটি ব্যক্ত হইয়াছে । 
“নৈবেছ্যে' কবি “এই বন্ত্রধার মৃত্তিকার পাত্র খানি” বারংবার ভরিয়াই 
অবিরত ভাগবত অমৃত পান করিতে পারিবেন বলিয়৷ ভরসা করিয়া- 
ছিলেন, “প্রদীপের মতো সমস্ত সংসার.*"লক্ষ বন্তিকায়” ঈশ্বরের 
শিখায় ঈশ্বরের মন্দিরমাঝে আলো জবালাইয়া ভুলিবে, এই কথা জোর 
করিয়া বলিয়াছিলেন। কিন্তু পরবর্তী পরের দেখি যে বাস্তবের 
অভিজ্ঞতা পুনশ্চ তাহার কাছে অসম্পূর্ণ মনে হইতেছে, ইহার মধ্যে 
তাহার বাঞ্চিত ও চির-উপাস্ত্ের সম্যক পরিচয় নাই । কিছু পরিমাণে 


*« এই সময়ে কবিচিত্তে যে “ফেনতরঙ্গের থেলা” আরম্ভ হয়, তাহার পরিচয় পাওয়া যায় 
সমসাময়িক যুগান্তকারী উপন্যাস “চোখের বালি” ও 'নৌকাড়ুবি'তে। 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_ তৃতীয় যুগ ১২৯ 


তিনি সংসারে ব্যক্ত, কিন্তু সবটা নহেন। তাহার সহিত মিলন স্ৃতরাং 
কেবল সংসারের সত্যে হইবে নাঃ হইবে বাস্তবাতীত ব্বপনে” । 
“মোর কিছু ধন আছে সংসারে, বাকি সব ধন স্বপনে” 

সমপর্য্যায়ের অন্যান্য কাব্যের সহিত তুলনা গিনি বিনিনী 
ভাবাভাবের প্রকৃতি আরও বিশদ ভাবে বুঝিতে পারা যাইবে । 
“কল্পনা'য় আছে মানবহৃদয়ের ইঙ্গিত সৌন্দর্য্যমধুর কল্পনাবিলাসের 
বিরুদ্ধে বিরাট জীবনসত্যের অভিমুখে প্রতিক্রিয়া ; এখানে আছে 
বাস্তবের আধ্যাত্মিকতা সম্বন্ধে অতিকল্পনার বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া ; 
“নৈবেছযের কবি 78/6159196, উৎসর্গে'র কবি 708,0010101)9186 ও 
['8/050918091)181186, আবার, “মানসী'র সহিত যদি “উৎসর্গে'র 
তুলনা করা যায়, তবে এক হিসাবে একটা সাদৃশ্য পাওয়া যাইবে, 
কারণ “মানসী'তেও বাস্তবের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আছে। কিন্ত 
সেখানে বাস্তবের শুধু স্থল আবেদনের কথাই আছে, বাস্তবের যে 
দিকটা “নবেছ্ে* প্রকাশ পাইয়াছে তাহার বিষয় কিছু নাই | “মানসী” 
তে প্রতিক্রিয়ার প্রেরণা আসিয়াছে “মর্ম্ের কামন1” হইতে, সে কামনা 
এক প্রকারের মানবস্থলভ রোমান্টিক আকাতক্ষা মাত্র, তাহা “উৎসর্গের 
উন্মনা ব্যাকুলতা নহে । “মানসী'র কামনা পরে “সোনার তরী? ও 
“চিত্রা'র স্বপ্নসাধনায় আশ্রয় লাভ করিয়াছে, উৎসর্গের ব্যাকুলতা 
“খেয়া"র গুটাত্যবাদে পরিণত হইয়াছে । 

পুবের্ধ বলা হইয়াছে ষে “উৎসর্গ পর্ের প্রধান কথা এই যে 
বাস্তবের মধ্যে ষে সত্যটুকু ফুটিয়া ওঠে তাহা আংশিক, তাহা পরম 
সত্যের পুর্ণ প্রকাশ নহে ৷ আসল কথা এই যে সেই সত্যে এখন কৰি- 
হৃদয়ও তৃপ্ত নহে, তাহা বাস্তবাতীত আরও কিছুর সন্ধান করিতেছে । 
এই যে নূতন ধরণের একটা আত্মবোধ, “তরুণ-গরুড়-সম্‌ কী মহৎ 
ঘ-_৯ 


১৩০ কবিগুরু 


ক্ষুধা”র উদ্রেক_-ইহা এই সময়ের কাব্যের দ্বিতীয় লক্ষণ । এই জন্য 
তিনি “চঞ্চল” ও “স্ুদূরের পিয়াসী”, “কন্তরী-মৃগসম” পাগল | এই 
জন্যই তিনি পাথিব জীবনের অভিজ্ঞতার রুদ্ধ-ছুয়ার কক্ষে হাপাইয়া 
উঠিতেছেন | “কুঁড়ির ভিতরে কীদিছে গন্ধ আপন মনে ।” কিন্ত 
এ ক্রন্দন কিসের জন্য ? ইহা! ত “মানসী” “ক্রন্দন” নয় । এ ক্রন্দন 
নিজের সীমাবদ্ধতার জন্য । এ আকাঙ্ক্ষা কোন বস্তুর জন্য নহে, 
কোন সৌন্দর্য্যের জন্য নহে ; আপন সীমাকে অতিক্রম করিয়া অসীমের 
সহিত মিলিত হইবার জন্যই এই ব্যাকুল আকাত্ষা । এইজন্য ধুপ 
দ্ধ হইয়া নিজের সীমা অতিক্রমপুব্বক সীমাস্তপারের গন্ধে মিলাইতে 
চায় । “সীম! চায় হতে অসীমের মাঝে হারা”__এই আকাজ্মন 
উৎসর্গ” পর্ধের কাব্যে বিশেষ ভাবে অভিব্যক্ত হইয়াছে । 

অসীমের জন্য এই আকুলতা কবিহৃদয়ে প্রবল হওয়ার জন্য 
স্বভাবতই এখন কবির পক্ষে মৃত্যু ও মৃত্যুর তাৎপধ্য সম্বন্ধে কবিতা 
রচনার একটা প্রবৃত্তি হইয়াছিল । তছ্পরি কবির স্ত্রীবিয়োগ হওয়াতে 
স্মরণ নাম দিয়া যে কাব্যটি প্রায় এই সময়ে তিনি রচনা করেন 
তাহাতে যে মৃত্যুরহস্য সম্পর্কে অনেকগুলি কবিতা স্থান পাইয়াছে 
তাহা খুবই স্বাভাবিক হইয়াছে । এই কবিতাগুলিতে দেখিতে পাওয়া যায় 
যে মৃত্যু কবির কাছে এক বরণীয় অতিথি বলিয়া প্রতিভাত হইতেছে, 
কারণ মৃত্যু আম!দিগকে পৃথিবীর সীমা হইতে উদ্ধার করিয়া গ্রহ- 
তারকার অসীম পথে তুলিয়া লইয়া যায়, অনন্ত লোকের উপলন্ধি 
আনিয়া দেয়, মরজীবনের প্রেমকে পরশমণির স্পশে অমর করিয়া তুলে 
এবং তাহাকে সম্পূর্ণ করে । “উৎসর্গ” কাব্যেও মরণ সম্বন্ধে যে কবিতাটি 
আছে তাহাতেও কবি বলিতেছেন যে মৃত্যুপ্তয় শিবের মতই মৃত্যু 
আমাদিগকে স্বখশয়ন ও অবসাদ হইতে আহ্বান করিয়া ব্যাপকতর 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_তৃতীয় যুগ ১৩১, 


জীবনের অকুল সাগরে লইয়া যায় । নিস্তব্ধ গিরিরাজ-ও এখন কবির 
চক্ষে এই অসীমের সাধনা ও অসীমের মাঝে আত্মসমর্পণের প্রতীক 
বলিয়! প্রতিভাত হইতেছে । এইরূপে নানাপ্রকারে এই সময়ের কাব্যে 
অসীম ও “অজানারে কবে করিব আপন” এই ব্যাকুলতা-ই ধ্বনিত 
হইয়াছে । 

এতন্ডতিন্ন আরও একটা উপলব্ধির পরিচয় এই সময়ের কাব্যে মাঝে 
মাঝে পাওয়া যায়। কেবল যে সীমাই অসীমকে খুঁজিয়া থাকে তাহা! 
নয়ঃ “অসীম সে চাহে সীমার নিবিড় সঙ্গ” | 46251-এর মত কবিও 
অনুভব করিতেছেন যে 1998 বা 26 45080156 (নিগুণ, 
নিরুপাধি পরম সত্তা) সীমাবদ্ধ ০০6০৮এর ( সগুণ, সোপাধিক প্রপঞ্চ 
সত্তার ) মাধ্যমেই রূপায়িত এবং আমাদের গোচরীভূত হয়| এতন্িন্ন 
তাহার আত্মপ্রকাশের আর কোন পন্থা নাই । পরম সত্তা যে স্বভাবতঃই; 
এই ভাবে প্রকট হয়, তাহা! নহে ; এ জন্য তাহার দিক হইতে একটা 
রীতিমত প্রয়াস আছে । এই উপলব্ধি বৈষ্ণবদর্শন-সম্মত ; শ্রীরাধিকা 
বা মানবাত্মার জন্য শ্রীকৃষ্ণ বা অক্ষরাত্মার একট ব্যাকুলতা আছে, 
[))9 1700100 07985] সব্বদাই আমাদের অন্নুসপরণ করিতেছে | 
এই জন্য “লীলার ছলে" অসীম আপনাকে প্রকাশ করে। হিমাদ্রির 
শিলালিপিতেও “নিরাসক্ত নিরাকাজ্ ধ্যানাতীত মহাযোগীশ্বরের” 
প্রেমের লীলারহস্যের ইঙ্গিত রহিয়াছে | কালঝোতের “অনস্ত. 
কলরোলের” মধ্যে “অস্রন্ত কোন গানের ছন্দে অদ্ভুত দোল” তুলিয়া 
চিরকাল এই লীল! চলিতেছে । 

“শিশু'র.যে কবিতাগুলি প্রায়' এই সময়ে লিখিত, তাহাদের 
মধ্যেও এতাদৃশ একটা উপলব্ধি আছে । কবির চক্ষে শিশু মানবক 
মাত্র নহেঃ তাহার জীবনেই অসীম সীমার নিবিড় সঙ্গ পাইয়াছে। 


১৩২ কবিগুরু 


জননীহৃদয়ের অসীম আকুতি শিশুকে পাইয়া সার্থক হইয়াছে; বিশ্বের 
সকল মাধুর্য্য, বিশ্বাতীত সৌন্দর্য্য শিশুর দেহে মনে জীবনে উছলিয়া 
উঠিতেছে। এই ভাবে শিশু আমাদের হৃদয়ে অসীমের রহস্যের ও 
মাধুর্য্যের অনুভূতি আনিয়া দেয়। সে নিজে ক্ষুদ্র ও দুর্বল হইয়াও 
অসীমের বিভূতিতে পরিপুর্ণ ; সংসার তাহাকে আকৃষ্ট বা বিচলিত 
করে না; তাহার শিশু-স্ুলভ কল্পনাতে বুদ্ধির অগম্য, 
সংসারাতীত সত্য রূপকথা বা স্বপ্নের আকারে প্রতিভাত হইতেছে, 
সৃত্যুও তাহার কাছে লুকোচুরি খেলা মাত্র । কবির মনে এই সময়ে 
যে উপলব্ধির আভাস আসিয়াছিল, তাহাই যেন শিশুর সততায় মূর্ত 
হইয়াছে । শিশুই কবির আদর্শ, সিদ্ধ মানবাত্মার চরম বিকাশ শিশুর 
জীবনেই কবি লক্ষ্য করিতেছেন । 

এইরূপে কবির হৃদয়ে বাস্তবাতিরিক্তঃ সাধারণ অভিজ্ঞতার অতীত 
একট! গৃঢাত্মার প্রতীতি জাগিয়া উঠিতেছে। কিন্তু মাত্র তাহার সুচনা 
হইয়াছে, তাহাকে এখনও জীবনসত্যের উপলব্ধির মধ্যে পাওয়া যায় 
নাই । শিশু কবির আদর্শ বটে, কিন্ত কবি নিজে শিশু মহেন; 
শিশুর জীবন ও অনুভূতির মাহাত্মা তিনি দূর হইতে অন্নুধাবন করিতে 
পারেন, কিন্তু তাহার অন্দরে কবির প্রবেশের অধিকার নাই । এখনও 
রাজপুরীর বাহিরে দাড়াইয়াই তাহাকে ভিতর বাড়ীর এশ্বরয ও 
আনন্দের ধারণা করিতে হয়। 


চু যুগ 
[ খেয়া শিশু ভোলানাথ, ] 


(১৯০৫--১৯২১) 
(বয়স ৪৪--৬০) 


“তন্দুদর্শং গৃঢ়মন্প্রবিষ্টং গুহাহিতং গহ্বরেষ্ঠং পুরাণম্‌ 
অধ্যাত্মযোগাধিগমেন দেবং মত্বা ধীরে হর্শোকৌ জহাতি 1৮ 
( কঠোপনিষৎ ) 


রবীন্দ্রকাব্যের ইতিহাসে আর একটা নৃতন যুগের প্রারস্ত হইল 
“খেয়া রচনার সময় হইতে । অনেক দিক্‌ দিয়া এই খুগই' রবীন্দ্র- 
কাব্যের সর্ধবাপেক্ষা গৌরবময় যুগ, রবীন্দ্রনাথের যে সমস্ত কবিতার 
জন্য তাহার জগৎ-জোড়া খ্যাতি তাহাদের অনেকগুলিই এই সময়ে 
রচিত হইয়াছিল । এই সময়েই তাহার কবিপ্রতিভার চরম বিকাশ 
ঘটয়াছিল এবং তীহার সাধনার উচ্চতম লোকে তিনি অধিরোহণ 
করিয়াছিলেন । দেহ ও মনের সম্পূর্ণ পরিণত অবস্থায় জরা-বার্ধক্যের 
আক্রমণের পুরের্ধ এই যুগের কাব্য রচিত হয়, রবীন্দ্রকাব্য বলিতে 
সাধারণতঃ আমরা যাহা বুঝি তাহার লক্ষণাদি এই যুগের কাব্যের 
সহিত-ই বিশেষ ভাবে জড়িত । 

রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতার প্রকৃষ্ট প্রকাশ হইয়াছে এই সময়ে 
রবীন্দ্রনাথ এখন আর “খোল খোল ছ্বার__রাখিওনা আর-_বাহিরে 
আমায় দীড়ায়ে” বলিয়৷ শুধু কাতর আবেদন করেন না, কিংবা 
“আমি উন্মনা হে, আমি ন্দূরের পিয়াসী” বলিয়া কেবল ব্যাকুলতা 


১৩৪ কবিগুরু 


প্রকাশ করেন না। কবি এখন রহস্যপুরীর ভিতর মহলের সন্ধান 
পাইয়াছেন, সেখানকার এই্বর্য্য তাহার দৃষ্টি গোচর হইয়াছে, সেই 
কচিৎ দর্শনের কথাই তাহার কাব্যে স্থান পাইয়াছে। লোকোত্তর 
উপলব্ধিই এখন তাহার কাব্যের উপজীব্য । উপনিষদে ““তন্দুরদর্শং 
গৃঢ়মন্ুপ্রবিষ্টং গুহাহিতং গহ্বরেষ্ঠং পুরাণম্” বলিয়া যাহার উল্লেখ করা 
হইয়াছে এবং তাহার যে যে লক্ষণের পরিচয় দেওয়া হইয়াছে, তাহাই 
এই যুগের রবীন্দ্রকাব্যের বিষয়বস্ত । “সোনার তরী'র যুগে রবীন্দ্রনাথ 
একবার অবাস্তবের দিকে ধাবিত হইয়াছিলেন, সে সময়ে তাহার কাব্য 
ছুব্রবোধ ও ধোয়াটে বলিয়া অনেকের কাছে প্রতীত হইয়াছিল । কিন্তু 
সে অবাস্তব ছিল একটা মায়িক ব্যাপার, মানবিক আকাতক্ষা ও 
কল্পনার স্যা্তি। * সেখান হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া কবি বিরাট 
বাস্তবের মধ্যে মহাসত্যের সন্ধান করিয়াছিলেন বা পাইয়াছিলেন। 
এবার যে বাস্তবাতীতের কথা তাহার কাব্যে স্থান পাইয়াছে, তাহা 
একটা গুঢ় আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ব্যাপার । যে জগতের সন্ধান এখন 
কবি দিতেছেন, তাহা কল্পনার জগৎ বা চির-পৌষিত কোন আকাতক্ষার 
জগৎ নহে । তাহা ছুর্র্শ হইলেও একান্ত ভাবে সত্য ; তাহা মায়! 
নহে, তাহা আমাদের “আপন মনের মাধুরী মিশায়ে” রচিত নহে। 


কবি বলেন,_-তখন 
«তোমায় সৃষ্টি কবব আমি 
এই ছিল মোর পণ। 
দিনে দিনে করেছিলেম 
তাবি আয়োজন । 
তাই সাজালেম আমাব ধুলো? 
আমার ক্ষুধাতৃষ্কাগুলো, 
আমার যত রডিন আবেশ, 
আমার ছুঃস্বপন |” 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_ চতুর্থ যুগ ১৩৫ 


ইহার পথ “ক্ষুরস্থয ধারা নিশিতা ছুরত্যয়া ছুর্গং” ৷ সেই দুর্গম পথে 
অভিসারের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথাই' এই ষুগের কাব্যে 

অভিব্যক্ত হইয়াছে । 
এই যুগের কাব্য সম্বন্ধে একটা অভিযোগ আছে। ইহা-ও 
ছবের্বাধ, এবং ইহাতে মানবিকতার অভাব আছে, এরূপ অনেকে 
বলিয়াছেন। এই অভিযোগের যে কোন কারণ নাই এমন নহে! 
জীবনেব স্থল অভিজ্ঞতার কথা এ সময়ের কাব্যে কম-ই আছে; যে 
“20018 8৪0৮9176079, 17018৮98180 2067” মানবাত্ার যে 
অভিনব অভিসারের কাহিনী কবি এখন বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা। 
সাধারণ জীবনের অভিজ্ঞতা ও সাংসারিক জ্ঞানের সহায়তায় অহ্বধাবন 
করা সম্ভব নহে । “নামিয়ে মুখ চুকিয়ে স্থখ যাবার মুখে যায় যারা” 
অর্থাৎ যাহাদের জীবনে লোকোত্তর অনুভূতির আকর্ষণ প্রবল হইয়া 
উঠিয়াছে তাহাদের পক্ষেই এই সমস্ত কাব্যের মর্মমগ্রহণ করা সম্ভব । 
অন্যান্য পাঠকের পক্ষে এই যুগের কাব্যের ভাবাবেগ একপ্রকার 
৪1)9,00%7-22186106 কিংবা হাওয়ার সহিত লড়াইয়ের উন্মাদনা মাত্র 
বলিয়া মনে হইতে পারে । সেই হিসাবে ইহা ছুবেরবোধ | নহিলে এ 
যুগের কাব্যের ভাষা প্রার্ল, কল্পনা সহজ, ভাব স্বচ্ছ। অনেক 
পরমাথিক রচনাতেই, যেমন রামপ্রসাদের কাব্যে ও বাউল-সঙ্গীতে, 
এই সমস্ত গুণ এবং তথাকথিত দোষও দেখা যায় ।% কিস্ত এই সমস্ত 
কবিতার স্বচ্ছ মুকুরে যে অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হইয়াছে, তাহা সাধা- 
রণের অজানা বলিয়াই তাহার রূপরেখা এত অস্পষ্ট বলিয়া মনে হয় । 
* রনীন্দ্রনাথ 'গীতাঞ্জলি' প্রভৃতি কাব্য রচনার সময়ে বাউল-সঙ্গীতের শিল্পপদ্ধতির দ্বার! 


অনেক সময় প্রভাবিত হইয়াছিলেন । কিছুকাল পূর্বে তিনি এই সম্পর্কে আলোচন! করেন 
এবং এ জাতীয় গীতও রচন! করেন । 


১৩৬ কবিগুরু 


গুটাত্বোধের কাব্য আমাদের দেশে আগেও লেখা হইয়াছে । 
কিন্তু সেই সমস্ত রচনার সহিত রবীন্দ্রনাথের রচনার পার্থক্য আছে । 
পুর্বকালে এই জাতীয় কাব্যে সম্প্রদায়গত বা শাস্ত্রগত কতকগুলি 
বিশেষ প্রতীক, প্রত্যয় ও ভাবের ব্যবহার কর! হইত, সুতরাং দীক্ষিত 
ব্যক্তির পক্ষে এ সকল রচনার মর্মগ্রহণ করা সহজ ছিল । অদীক্ষিত 
সাধারণ লোকের পক্ষেও এ সকল পারিভাষিক শবের অর্থ ও অভিধা 
একবার বুঝিয়া লইলে কাব্যের তাৎপর্য্য হৃদয়ঙ্গম কর! ছুরহ হইত 
না। কিন্তু রবীন্দ্রকাব্য সাম্প্রদায়িকতা-বজ্জিত ; দার্শনিক পরিভাষার 
তিরক্করণী সব্র্বতোভাবেই রবীন্দ্রনাথ পরিহার করিয়া চলিতেন। 
কাব্যকে তিনি সকল-সহুদয়-হৃদয়সংবাদী করিবার প্রয়াস-ই করিতেন, 
সহজ কল্পনা ও পাথিব রূপের মাধ্যমেই তিনি তাহার উপলন্ধিকে 
প্রকট করিবার চেষ্টা করিতেন । ফলে এই দাড়াইয়াছে যে অসাধারণ 
অনিদ্দি ভাবকে তিনি সাধারণ স্থৃনিদ্দিষ্ট প্রতিরূপ দিবার চেষ্টা করিয়া 
তাহার রচনা-কে এক হিসাবে অস্পষ্ট করিয়াই ফেলিয়াছেন । গৃচঢ়-কে 
পট, জটিলকে সরল করিতে গিয়াই রবীন্দ্রনাথ তাহাকে আরও যেন 
ছবেবোধ করিয়াছেন। যে সমস্ত কল্পনা ও প্রতিরূপ তাহার গুঢ়াত্ম- 
বোধক কাব্যে স্থান পাইয়াছে, তাহাদের সাধারণ ভাবান্ুষঙ্গের সহিত 
রবীন্দ্রনাথের সুন্মান্নভৃতির তেমন কোন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নাই ; কবি যেন 
অনর্থক সেই সমস্ত কল্পনা ও প্রতিরূপ লইয়া খেল! করিতেছেন, বা 
বিনা স্ততার মালা গাথিতেছেন বলিয়। মনে হয়। ইহাই এই সকল 
কবিতার অস্পষ্টতার অন্যতম কারণ । তাহার ফলে দ্রাড়াইয়াছে এই 
যে রবীন্দ্রনাথের গুট়াত্মবোধক' কবিতার খুব সুলভ অন্কুকরণ যথেষ্ট 
চলিতেছে, এবং সাধারণ পাঠকের পক্ষে খাটি ও মেকির পার্থক্য ধরা 
খুব দুর হইয়া পড়িয়াছে। কয়েকটা স্থলভ ভাব, কল্পনা ও এক 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৩৭ 


জাতীয় আধ্যাত্মিক ভান সংমিশ্রণ করিলেই 'গীতাঞ্জলি'র সমতুল্য 
কবিতার স্থষ্টি হইতে পারে, এইরূপ একটা ধারণা অনেকেরই মনে 
মনে আছে, এবং এই জন্যই “গীতাঞ্জলি'-মার্কা কবিতা ও গান হাটে 
বাটে সকলেই রচনা করিতেছে, লোকেও অশ্বথমার হ্যায় পিটুলির 
জলকে ত্রপ্ধ বলিয়া গ্রহণ করিতেছে । 

আন্ুষঙ্িক কারণেই এই যুগের রবীন্দ্রকাব্য সম্পর্কে মানবিকতার 
অভাবের অভিযোগ আসিয়াছে । মানবিকতার বাস্তবিক কোন অভাব 
এখানে নাই, এ সমর্ত কবিতাই “৪৭ 6০ ৮59 168৮5 09910 
0০07৪৮5 ““হ্দয়-রক্ত-রঞ্জনে” রভীন । কিন্তু এখনকার মানবিকতার 
পরিধি ব্যাপকতর ; কেবল সাংসারিক সুখ দুখে, কামনা বাসনা লহয়া 
ইহার কারবার নয়, স্বপ্ন বা কল্পনাবিলাসে-ও ইহা সীমাবদ্ধ নয়, 
তাহাদের ছাড়াইয়াও যে বিশাল ছায়াচ্ছন্ন অধ্যাত্ম অভিজ্ঞতার জগতে 
মানব চিত্ত পরিভ্রমণ করিয়া থাকে, যেখানে মানুষের চূড়ান্ত আক্মো- 
পলব্ধি ও. চরিতার্থতা সম্ভব, সেই জগতে প্রয়াণের অভিজ্ঞতা-ই 
প্রধানতঃ এই যুগের কাব্যে স্থান পাইয়াছে। অভিজ্ঞতা অ-লোক- 
সাধারণ হইতে পারে, কিন্তু মানবিকতার সত্য হইতে বিচ্যুত নহে । 
মানব হৃদয়ের স্পন্দন-ই এই সকল কাব্যের প্রাণ, এখানে কেবল 
তত্বের গ্রন্থন হয় নাই । 

এই যুগের কাব্যে আর একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার আছে। 
এখন তাহার কাব্যসাধনা যে দেবতাকে ঞ্রুববিন্দ্র রূপে গ্রহণ করিয়াছে, 
তিনি ঠিক পুর্ব পুর্ব যুগের “জীবন দেবতা”-ও নহেন, “বিশ্বদেব”-ও 
নহেন, যদিও জীবনদেবতা ও বিশ্বদেবের অনেক লক্ষণ ইহার মধ্যেও 
আছে । রবীন্দ্রকাব্যে তাহার হৃদয়দেবতার স্বরূপের ক্রমবিকাশ একটা 
চিত্তাকর্ষক আলোচ্য বিষয় । এই দেবতাকে তিনি বরাবরই “তুমি” 


১৩৮ কবিগুরু 


বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন, ইহাকে প্রণয়াস্পদ ও প্রেমাকাজ্ষী বলিয়া 
বিবেচনা করিয়াছেন, তাহার সাধনার অর্থ্য ইহার উদ্দেশেই বরাবর 
উৎস্ষ্ট হইয়াছে । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাধনার প্রকৃতি ও পদ্ধতি 
যেমন পরিবসত্তিত হইয়াছে, তাহার উপলব্ধির ও আধ্যাত্মিক প্রয়াসের 
যেমন ভাবান্তর ঘটিয়াছে, তেমনই তাহার হুদয়দেবতা-ও নব নব রূপে 
নব নব গুণ ও উপাধিতে ভূষিত হইয়া তাহার কাছে প্রকট হইয়াছেন । 
পৌরাণিক কাহিনীতে যেমন ভগবানের বারংবার নব কলেবর ধারণের 
ও নূতন নূতন অবতার রূপে আবিভূতি.হওয়ার কথা আছে, রবীন্দ্র 
কাব্যেও তদ্রুপ তাহার দেবতার বারবার করিয়া নব ভাবে প্রকট 
হইবার ইতিহাস আছে । এই ইতিহাসের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান 
রহিয়াছে এই যুগের কাব্যে । রবীন্দ্রনাথের এশী উপলব্ধি ও আন্তিক্য- 
বাদের প্রকৃষ্ট পরিচয়, তাহার দেবতার প্রকটতম অভিব্যক্তি “গীতাঞ্জলি? 
যুগের রচনাতেই পাওয়া যায় । 


একাদশ পর্ন (ভাব) 

[ “খেয়া” ] 

( ১৯০৫-৮ ) 

“ওরে আয়, 
আমায় নিয়ে যাব কেরে 
বেলাশেষের শেষ খেয়ায় |? 


যে গুট়োপলন্ধির ইতিহাস এই যুগের কাব্যে পাওয়া যায়, তাহার 
প্রথম অধ্যায় লিখিত হইয়াছে “খেয়া” কাব্যে । বাস্তবের তথা জাগতিক 
সত্যের তীর ছাড়িয়া দিয়া কবি অবানস্তবের তথা গুটাত্মবোধের দিকে 
খেয়ার পাড়ি দিলেন । “উৎসর্গ” পরের কবির প্রাণে ষে উন্মনা ভাব 
ও স্দূরের পিয়াসা জাগ্রত হইয়াছিল, তাহারই পরিণতি দেখিতে 
পাওয়া যায় খেয়া” পর্ধে ! করি বুঝিতেছেন যে তিনি জানা ও 
অজানার সীমারেখায় আসিয়া ফ্াড়াইয়াছেন, তাহার “দিনের আলো” 
ফুরাইয়াছে, ছায়াচ্ছন্ন “ঘুমের দেশ” তাহাকে আহ্বান করিতেছে। 
এখন তিনি “ঘরেও নহে, পারেও নহে”_উভয়ের মাঝখানে 
রহিয়াছেন, কিন্তু ঘরে আর ফিরিতে পারেন মা,ওপারের মায়া “কাজ- 
ভাঙানো গান” গাহিয়া তাহাকে সাংসারিক জ্ঞান ও লাভালাভের 
আশ্রয়তট হইতে অন্যত্র লইয়া! যাইতেছে । & তাহার কাছে এই 
আহ্বান এত প্রবল ছিল যে স্বদেশী যুগের অন্যতম নায়ক হইয়াও 
রবীন্দ্রনাথ এই সময়ে রাষ্ট্রনৈতিক আন্দোলনের প্রবল আবর্ত হইতে 


* এই সময়ে প্রথমে তাহার পিতৃবিক্বোগ এবং পরে তাহার প্রিয়তম সন্তান কনিষ্ঠ পুত্র 
শমীল্দের মৃত্যুতে ষ্ঠাহার উপলদ্ধি প্রভাবিত হইয়াছিলঃ এব্দপ ধারণা হওয়া স্বাভাবিক | 


১৪৩ কবিগুরু 


অবজর গ্রহণ করিলেন ৷ যেখাতে এখন রাষ্ট্রনৈতিক আন্দোলনের 
ধার! অগ্রসর হইল তাহা কবির কাছে সঙ্কীর্ণ ও পন্কষিল বলিয়া মনে 
হইল। তিনি দেখিলেন যে মানবতার মহত্তর আদর্শের সহিত তাহার 
সংযোগ নাই । রবীন্দ্রনাথ দেশের সম্মুখে কথায়, কাজে, গানে, 
বক্তৃতায় যে মহৎ রাস্থীয় আদর্শ উপস্থাপিত করিলেন, তাহা প্রশংসা 
পাইল, কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তাহার অনুসরণ কেহ করিল না। যে 
উন্মাদনায় দেশ মাতিয়া উঠিল, তাহার সহিত কবির আত্মা যোগ দিতে 
পারিল না। “অকুল-ভাসা তরীর আমি মাঝি_-বেড়াই ঘুরে অকারণের 
ঘোরে- তোমরা সবে বিদায় দেহ মোরে”, এই বলিয়া কবি স্বদেশবাসীর 
কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন । &% কবি বঙ্গদর্শনের সম্পাদনা ছাড়িয়া 
দিলেন, পারিবারিক নানা সমস্যার একটা ব্যবস্থা করিয়া সাহিত্যকন্মে 
নিবিষ্ট হইলেন, সাময়িক কোলাহলের উদ্ধে যে সত্যলোক রহিয়াছে 
তাহার “জ্যোতীরসমমৃতম্”-এর স্পর্শলাভ ও তাহার প্রচারই তাহার 
জীবনের ব্রত হইল । এখন হইতে রাজধানী কলিকাতার স্থলে 
বোলপুরের শাস্তিনিকেতন-ই তাহার জীবনের কেন্দ্র হইল । 

কবির এই যে নুতন জীবন আরম্ভ হইল তাহাতে এশী সত্তার 
সহিত কবির আত্মার ঘনিষ্ঠ সম্পক-ই' প্রধান ব্যাপার হইয়া দাড়াইল, 
“সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব”-_এ কথা তাহার 
কাছে প্রত্যক্ষ সত্য হইয়া উঠিল । এশী সত্তার সহিত মানবাতআ্মার 
সন্বন্ধ গৃটবাদী সাহিত্যের স্বপরিচিত রূপকের সাহায্যেই “খেয়ায়” 
বণিত হইয়াছে । কবি নিজে তরুণী, “বালিকা বধু”, এবং ঈশ্বর 
হইতেছেন প্রেমাস্পদ বর এরং তাহার উপর তিনি রাজাধিরাজ । 


* তবে রাষ্ট্রিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দেশের মুক্তি সাধনার প্রতি তিনি কখনও উদাসীন হন 
নাই : লেখায়* গানে বত্তৃতায় তিনি চিরজীবনই এই সাধনায় প্রেরণ! দান করিয়াছেন। 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৪১ 


এই খেয়া-গীতাপ্তলির যুগেই রবীন্দ্রনাথ তাহার রূপকনাট্য “রাজা? 
রচন। করেন, তাহাতেও মানবাত্মার সহিত ঈশ্বরের এই জাতীয় সম্পর্কই 
কল্পিত হইয়াছে । “খেয়া”য় মানবাত্মার সহিত ঈশ্বরের যে সম্পর্ক কল্পিত 
হইয়াছে, তাহার মধ্যে একটু বিশেষত্ব আছে। এই সম্পর্কের মধ্যে 
মিলনের পূর্ণতা "নাই; ঈশ্বরকেই একমাত্র প্রভু ও আশ্রয় জানিয়া 
তাহার কাছে আত্মসমর্পণ কবি করিয়াছেন, কিন্ত তাহাকে তিনি 
পুরাপুরি ভাবে পান নাই বা জানেন নাই, তাহার সম্বন্ধে একটা ভীত 
ভীত সঙ্কোচের ও রহস্যের ভাব রহিয়াছে । দূর হইতে তাহার বিভূতি 
ও মহিমা কথঞ্চিৎ দেখিয়া কবি অভিভূত হ'ন, সহসা কখন অজ্ঞাতে 
তার “পরশমধু” পাইয়া তিনি চমকিত ও ধন্য হ'ন। কিন্তু এই স্পর্শ 
তিনি পাইয়া থাকেন নিশীথের অন্ধকারে, ছুর্যোগ ও বঞ্ধার মুহুর্তে । 
ঈশ্বরের ক্ষমতা অসীম, তাহার লীলা-ও বিচিত্র ; আমাদের সাংসারিক 
বুদ্ধি ও বিচারের তিনি অতীত, তাহাকে আমরা হিসাবের মধ্যে কখনও 
পাই না); আমাদের আঘাত করিয়া রিক্ত করিয়া তিনি তাহার 
আবির্ভাব আমাদের কাছে প্রতিপন্ন করেন, কারণ কেবল আঘাতের 
বেদনাই আমাদিগকে আধ্যাত্মিক জড়তা হইতে উদ্ধার করিতে, 
আমাদের সাংসারিক মোহের তন্দ্রা ভাঙিয়া আমাদের প্রবুদ্ধ করিতে 
পারে । তাহাকে আমরা সর্বস্ব উৎসর্গ করিতে পারি, আমাদের অর্থ্য 
তিনি কি ভাবে গ্রহণ করিতে পারেন এবং আদৌ গ্রহণ করেন কিনা 
তাহা বুঝা যায় না । আমাদের হারছেঁড়া মণি রথের চাকায় গু'ড়া 
হইয়া যায়! তবুও তাহার উদ্দেশ্টে বক্ষের মণি ধুলায় বিসর্জন 
দেওয়াতেই আ্বাআ্মার তৃপ্তি ও সার্থকতা । 

এই জন্য “খেয়া, কাব্যে ত্যাগের মুল্য বিশেষ ভারে কীন্তিত 
হইয়াছে। আগেকার যুগে রবীন্দ্র-কাব্যে ত্যাগ অপেক্ষা ভোগের 


১৪২ কবিগুরু 


মাহাত্যযই বরং প্রচারিত হইয়াছে । কেবল “কড়ি ও কোমল" ইত্যাদি 
প্রথম যুগের কাব্যে নহে, পরিণত বয়সের “নৈবেগ্” প্রভৃতি কাব্যেও 
ভোগের গৌরব ব্যাখ্যাত হইয়াছে, “বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার 
নয়” ইহাই রবীন্দ্র-কাব্যের বাণী। “খেয়া*তে কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গী বিভিন্ন । 
যাহার কাছে অজানার আকর্ষণ প্রবল হইয়াছে, স্বেচ্ছায় যে “ঘাটের 
কিনারায়” আসিয়া বসিয়াছে, তাহার কাছে “রত্ব খোজা, রাজ্য ভাউা- 
গড়া” হইতে আরম্ভ করিয়া সব্ববিধ ভোগ ও ভোগবাসনা মিথ্যা হইয়া 
যায়। “খেয়া'র কবি সংসারবিমুখ, বৈরাগ্যসাধক | “তোমায় কেন 
দিই নি আমার সকল শুন্য ক'রে”-__ইহাই তাহার ছুঃখ ও পরিতাপ। 
“তনষ্টং যন্ন দীয়তে” এই ভাবই তাহার হৃদয়ে প্রবল। শুধু তাহাই 
নহে । “খেয়ার কবি উপলব্ধি করিয়াছেন যে জীবনে সার্থকতার 
সন্ধান যেমন ত্যাগের মধ্যেই পাওয়া যায়, বিশ্বের বিপুল কর্মপ্রবাহের 
সার্থকতার রহস্য-ও তেমনই আপাতপ্রতিম “অনাবশ্যক” অপচয়ের 
মধ্যেই হুনিহিত রহিয়াছে । আমাদের অভাব পুরণের জন্য বিশ্বক্রোত 
প্রবাহিত হয় না, আমাদের লাভ ক্ষতির হিসাব অন্রুসারে বিশ্ব- 
কর্তার উদ্দেশ্য সিদ্ধির পরিমাপ করা যায় না। 

সঙ্গে সঙ্গে কবি এই সময়ে উপলব্ধি করিতেছেন যে মানব আত্মার 
চরম সার্থকতার দিক্‌ হইতে ছুঃখের একটা! বিশিষ্ট মূল্য আছে । এই 
যুগে “ছুঃখ” নাম দিয়া রবীন্দ্রনাথ যে প্রবন্ধটি রচনা করেন, তাহাতেও 
এই কথা বলা হইয়াছে । ছুঃখের প্রভাবেই আমরা ঈশ্বরের সম্বদ্ধে 
সচেতন হই, তাহার বিভূতির সহিত আমাদের পরিচয় ঘটে। ছুঃখ 
হঠাৎ একটা ঝড়ের মত আমাদের জীবনে আবিভূতি হইয়া! একটা 
প্রলয় বাধাইয়া দেয়। যখন আমরা মোহে মগ্ন সেই সময়ে রুদ্র 
মুত্তিতে ঈশ্বর আমাদের কাছে দেখা দেন, তাহার দেই রৌদ্র রাপ 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৪৩ 


দেখিলে আর ভ্রান্তির বা মোহের সম্ভাবনা থাকে না। “ঝড়ের রাতে 
হঠাৎ এল ছুঃখরাতের রাজা”,__ইহাই ঈশ্বরের পরিচয়। তাহার 
দান “মালা নয়”, বজ্রের হ্যায় ভয়াল “তরবারি” । 

এই ভাবে 'ছুঃখ ও ত্যাগের মাহাত্ম্য পরিবীর্তন করিতে করিতে 
কবির মনে এই সময়ে যে জীবনাদর্শ প্রতিভাত হইয়াছিল, তাহার 
পরিচয় পাওয়া যায় “সব পেয়েছির দেশ” কবিতাটিতে । এই “সব 
পেয়েছির দেশ” আসলে সব-ছেড়েছি-র দেশ । সেখানে সাংসারিক 
এশ্বরধ্য-ও নাই, সাংসারিক বাসনাও নাই: ; কৃত্রিমতা সেখানে বিলুপ্ত, 
নিসর্গের শুচি শান্তিতে সে দেশ অভিষিক্ত । ভোগতৃষ্ণা একেবারেই 
নাই বলিয়াই সে দেশে স্থগভীর তৃপ্তি বিরাজিত । সেখানকার লোকে 
“সাজে ফেরে বিনা-বেতন”, তবুও তাহারা প্রত্যুষে হাস্তমুখে কাজ 
করিতে যায়, গান গাহিতে গাহিতে পথ চলিয়া থাকে । দূরের পান্থ 
হঠাৎ এক রজনীর জন্য এখানে আসিয়া ইহার স্বরূপ ঠিক বুঝিতে 
পারে না। কবি জীবনের বিচিত্র আশা নৈরাশ্য অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ 
“সারাদিনের শেষে” ত্যাগের খেয়া নৌকায় সাংসারিকতা ও গৃঢ় 
সাধনার মধ্যবর্তী ব্যবধান পার হইয়া এই দেশে পৌছিলেন, এবং 
“তারায় ভরা! আকাশতলে” পা ছড়াইয়া বসিয়া! তৃপ্ত ও ধন্য হইলেন | 


দ্বাদশ পর্ব (মহাভাব ) 
[ গীতাঞ্জলি” “গীতিমাল্য” “গীতালি? ] 
( ১৯০৮-১৯১৩ ). 
“কোলাহল তো বারণ হল 
এবার কথা কানে কানে । 
এখন হবে প্রাণের আলাপ 
কেবল মাত্র গানে গানে |” 


রবীন্দ্রকাব্যের কোন কোন পবের্7র ভাববৈশিষ্ট্য নির্দেশ করিবার 
জন্য “মহাভাব” কথাটি এই গ্রন্থে ব্যবহার করা হইয়াছে । “গীতার্জলি' 
পর্বের কাব্য সম্বন্ধে এই কথাটির প্রয়োগ সব্ববথা সুষ্ঠু বলা যাইতে 
পারে । মহাভাব বলিতে মহাজনের উপলব্ধির যে মৌলিক গুণ ও 
লক্ষণ নির্দেশ করিতেন, তাহা এই পব্রের রবীন্দ্রকাব্যে পুর্ণ মাত্রায় 
বিরাজমান । যে উপলব্ধি মানব চিত্তকে একান্ত ভাবে অভিভূত করে, 
সাংসারিক মনোবিকার হইতে চিত্তকে একেবারে মুক্ত করে, একটা 
স্বয়ং-সম্পূর্ণ রসলোক স্থপ্ি করিয়া তাহাতে আত্মার আশ্রয় রচনা করে, 
যাহার তীব্র মাধুর্য শিরায় শিরায় প্রবাহিত হইয়া একটা অলৌকিক 
উন্মাদনার উৎপাঁদন করে, নশ্বর দেহ ও পাথিক জীবনের পরিসরের 
মধ্যেই একটা স্বলেক স্যষ্টি করে এবং সবর্ধাপবর্গের ফল প্রদান করে, 
যাহা ঈশ্বরের সহিত মানবাত্বার শুধু সংযোগ নহে, পুর্ণ মিলন সংঘটন 
করে, তাহাকেই মহাভাব বলা যায়। গীতাঞ্জলি পর্ধেই এই সমস্ত 
গুণ রবীন্দ্রকাব্যে সমধিক পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়। যদি সাধকো- 
চিত অনুভূতি রবীন্দ্রনাথের কখনও হইয়া থাকে, তাহা এই সময়েই 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৪৫ 


ঘটিয়াছিল। তাহার অন্যতম প্রমাণ এই যে এখন রবীন্দ্রনাথ যত 
কবিতা রচনা করিয়াছেন তাহার প্রায় সমস্তই গান। সিদ্ধ পুরুষের 
স্পর্শে য্মন ধুলিমুষিও ব্বর্ণে পরিণত হয়, তেমনই এই সময়ে রবীন্দ্র- 
নাথের প্রতিভা যে কোন ভাবকে স্পর্শ করিলেই তাহা গীতে রূপায়িত 
হইত! “স্থুরগুলি মোর পায় যে চরণ, আমি পাই নে তোমারে”__ 
এই সময়েই যেন রবীন্দ্রনাথ সবরের ডানা মেলিয়া অবাধে অন্তরীক্ষের 
পরপারে প্রেমময়ের চরণ স্পর্শ করিতে পারিয়াছিলেন । যে স্বীয় 
সুষমা, মাধুর্য ও শান্তি এই সময়ের গানে পাওয়া যাঁয়, তাহা রবীন্দ্র- 
সাহিত্যেও দুর্লভ | 

রবীন্দ্রজীবনে এই সময়ে যে একটা মহৎ স্থপ্রিকর্ম চলিতেছিল, 
তাহার পরিচয় নানা রূপে প্রকট হয়! তাহার জাতীয়তা ও ভারতীয়- 
তার আদর্শ এখন ক্রমেই একটা বিশ্বজনীন ও বিশ্বকালীন আদর্শের 
সহিত একীভূত হইতে থাকে । তাহার মহত্তম উপন্যাস “গোরা'য়, 
তাহার ধধর্, “শান্তিনিকেতন শীর্ষক প্রবন্ধে, “শারদোৎসব' “প্রায়শ্চিত্ত 
“রাজা' “ডাকঘরঃ “অচলায়তন' "ফাল্তনী” নাটকে এই “বিশ্ববোধের” 
পরিচয় পাওয়া যায়। যে গভীরতা, উদারতা, মহত্ব ও শিল্পসৌন্দর্যয 
এখন রবীন্দ্ররচনায় ভাত্বর মহিমায় দীপ্ত হইয়! ফুটিয়া উঠে, তাহা দেশে 
বিদেশে স্বীকৃতি লাভ করে । এই যুগেই রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার 
লাভ করেন । 

“খেয়া” পবের্ব কবিহ্ৃদয়ের সহিত ঈশ্বরের পুর্ণ মিলন ঘটে নাই, 
তাহা! পুবের্বই বলা হইয়াছে । সে সময়ে কবি যেন কতকটা দূর হইতে 
অদ্ধপরিচয়ের অন্তরাল হইতে ঈশ্বরকে লক্ষ্য করিতেছিলেন, তাহাকে 
“মহভ্তয়ং বজ্তমুদ্তম্” রূপেই প্রায়শঃ উপলব্ধি করিয়াছিলেন 4 এখন 
কিস্ত কবি তাহাকে যেন ঘনিষ্ঠ ভাবে প্রেমলীলারস-সমুৎস্বুক প্রণয়ী 
ঘ--১০ 


১৪৩৬ কবিগুরু 


রূপে পাইতেছেন। পুর্রের ব্যবধান আর নাই, ঈশ্বর এখন কবির 
কাছে “নাথ” ও “বন্ধু” । তাহাকে লইয়া অভিসার, মিলন ও 
বিরহের পালা সবর্বদাই চলিতেছে । এই পালাগানের প্রত্যেকটি স্বর 
হইতে অম্তত রস ঝরিয়া পড়িতেছে, কোন পাথিব আবেগের জ্বালা 
তাহাতে নাই 1% 

বৈষ্ণব কবিদের প্রেমের কবিতার সহিত এই প্রেমগীতি-সমূহের 
একটা তুলনা করার প্রবৃত্তি স্বভাবতঃই হইতে পারে । উভয় ক্ষেত্রেই 
মানবাত্মার সহিত পরমাত্মার সম্পর্ক একপ্রকারের প্রণয়লীলা বলিয়া 
পরিকল্পিত হইয়াছে । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দেবতা বৈষ্ণব কবিদের 
“ম্যাম” নহেন। বৈষ্ণব কাব্যের শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকা রক্ত-মাংসের 
জীব, তাহাদের ব্যক্তিত্বে ও প্রণয়লীলার মধ্যে বাস্তবতা প্রগাট | 
শ্রীরাধিকা “ব্রজরমণীগণ-মুকুটমণি”, রমণীর দেহ ও মনের চরম মাধূর্ধ্য 
শ্রীরাধিকার মধ্যে ফুটিয়া উঠ্ভিয়াছে। শ্রীকৃষ্ণ “রসিকেন্দ্র-চুড়ামণি” ; 
যেমন তাহার অপরূপ রূপমাধুরী তেমনিই তাহার স্বনীগরোচিত 
গুণাবলী । রূপক ছাড়িয়া দিলে, শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকা পরিশুদ্ধ 
মানবতার জীবন্ত প্রতিমুত্তি, যদিও সেই মানবতা মাত্র একটি রসের 
অর্থাৎ মধুর রসের অভিব্যক্তি । মানব প্রণয়ের নানা ভাব ও অবস্থার 
বর্ণনাই বৈষ্ণব প্রেমকবিতার বিষয়বস্তু, তবে তাহাতে একটা দৈবী 
ভাবের ব্যঞ্জনা অতি স্থকৌশলে আরোপ করা হইয়াছে । “গীতাঞ্জলি 
প্রভৃতি কাব্যে কিন্ত কোন রক্তমাংসের চরিত্র অথবা পাথিব প্রণয়ের 
চিত্র নাই । একটা স্ক্ম উপলব্ধি তছচিত প্রতীক ইত্যাদির মাধ্যমে 


* অথচ কোন কোন মানবতাভিমানী সমালোচক "গীতাঞ্জলি" পর্ধের কাব্যকে সমাদর 
কবিতে কুষ্ঠা' প্রকাশ কবিয়াছেন* কারণ তাহাতে নাকি যথেষ্ট মানবিকতা নাই। একপ 
ধারণা একপ্রকার মনোবিকারের লক্ষণ | 


৯ শর ৯ ০০ এ সা ৬৯ অপ 





রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৪৭ 


প্রকাশিত হইয়াছে, কোনও কাহিনী বা ইতিহাস বা রূপক রচনার 
প্রয়াম করা হয় নাই। উন্মুখ মানব-হৃদয়ে ঈশ্বরান্ুভৃতির বিভিন্ন 
অন্ুভবগুলি কয়েকটি লঘু রেখার সমাবেশে ব্যঞ্জিত হইয়াছে, কোন 
রঙীন চিত্র অক্কিত হয় নাই । সেই হিসাবে গীতা্জলির গানগুলি 
কবি 91791195-র রচনার অন্বরূপ* এখানে ব্যঞ্জনার উৎকর্ষ আছে 
কিন্তু কোন নিদ্দিষ্ট রূপ ফুটিয়া উঠে নাই । অপর পক্ষে বৈষ্ণব 
প্রেমের কবিতাগুলি 198৪-র কবিতার অনুরূপ ; এখানে তীব্র 
ইন্দ্রিয়াহভূতির পরিচয় আছে এবং সেই অন্ুভূতি-ই একটা অসীমের 
আভাম আনিয়া দিয়াছে । 91)9]16য ও 719৪৪-র কাব্যের মধ্যে 
যেমন শিল্পপদ্ধতির পার্থক্য আছে, বৈষ্ণব কবি ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও 
তেমনই আছে । কিন্তু এই রীতি বা পদ্ধতির পার্থক্য হইতেই গুণাগুণ 
বা কৃতিত্বের পরিমাপ করা যায় না। স্থতরাং “গীতাঞজজলি'তে বৈষ্ণব 
কবিতার বাস্তবতা বা স্ুল মানবিকতা নাই বলিয়াই যে তাহার উৎ- 
কর্ষের লাঘব হইবে এমন কোন কথা নাই । তন্িন্ন এ কথাও স্মরণ 
রাখিতে হইবে যে যাহা স্বলভ, ত্তপ্রসিদ্ধ বা সর্বজনবিদিত নহে তাহাই 
যে মানবিকতার দিক্‌ দিয়া অকিঞ্চিতকর হইবে, এরূপ সিদ্ধান্ত করা 
অযৌক্তিক । ৭1)91195 ব। 737:09৬/01109-র ভাব সব্বসাধারণের পক্ষে 
গ্রহণ করা কঠিন, কিন্তু তাই বলিয়া তাহাদের কাব্যে মানবিকতার 
অভাব আছেঃ এ কথা বলা সঙ্গত. হইবে না। “গীতাগ্তলি' প্রভৃতি 
কাব্যের ভাব যতই স্ুশ্ম্ম হউক, তাহাতে মানব সত্যের কোন অপ্রতুলতা 
নাই । ূ 

কান্তাভাবে ঈশ্বরকে এখন উপলব্ধি করিলেও রবীন্দ্রনাথ মানব- 
প্রেমের মাত্র কয়েকটি ভাব এই উপলন্ষিতে আরোপ করিতে পারিয়া- 
ছেন। প্রণয়ীর ( ঈশ্বরের ) প্রেম লাভ করিবার সৌভাগ্য হইলেও 


১৪৮ কবিগুরু 


প্রণয়িনীর (কবি) সহিত তাহার একট ব্যবধান যেন থাকিয়াই: 
যাইতেছে ; তিনি সুমহান ও উচ্চস্থ, তাহার চরণতলে স্থান পাওয়া 
বাপাদস্পর্শ করাই প্রণয়িনীর যেন চরম লক্ষ্য। বহুদূরে তাহার 
আসন । তবে তিনি-ও মানব-প্রণয়িনীর সহিত মিলন খু'জিতেছেন, 
এই লীলাতে তাহারও আনন্দ । ঝড়ের রাতে তিনি প্রণয়িনীর উদ্দেশ্যে 
অভিসারে বাহির হন, বেদনা-দূতী তাহার সংবাদ দিয়া যায়, ছঃখের 
বরষায় তাহার রথ দরজায় আসিয়া থামে] তখন হয়ত বিরহ-বিধুরা 
হতভাগিনী প্রণয়িনী বনু প্রতীক্ষার পর আশাহত হইয়া মানব-সুলভ 
ছুব্বলতাবশতঃ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, প্রণয়ী কাছে আসিয়া শুধু কানের 
কাছে বীণা বাজাইয়া চলিয়া যান, তাহার মালার পরশ প্রণয়িনীর 
ভাগ্যে কদাচই মিলে । আবার কখনও ব1 প্রণয়িনীই অজান৷ পথ 
ধরিয়া অভিসারে বাহির হয় ।% 

এইভাবে বিবেচনা! করিলে বলিতে হইবে যে রবীন্দ্রনাথের ভগবৎ- 
প্রেমের মধ্যে রসের গাটঢুতা নাই, মিলনের পূর্ণতা নাই ; রবীন্দ্রনাথ 
মণিকোঠার ভিতরে কখনও প্রবেশ করিতে পারেন নাই । তবে সঙ্গে 
সঙ্গে এ কথাও স্বীকার করিতে হইবে যে “গীতাঞ্জলি'র ভগবৎ-প্রেমের 
মধ্যে অন্ততঃ আস্তরিকতার ও যথার্থ অন্নুভৃতির সত্য আছে; এখানে 
রবীন্দ্রনাথ তর্কযুক্তিকে বা চমত্কার কল্পনাকে উপলব্ধি বলিয়া ভ্রম 
করেন নাই, পাখিব অনুভূতিকে কৃষ্ণপ্রেমের ছাপ দিয়া চালাইতে চেষ্টা 
করেন নাই । 

গীতাঞ্জলি পরবে রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের আবির্ভাব “নব নব রূপের” 
মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন । কখন কখন ঈশ্বর অলক্ষ্য সঞ্চারে 


*এই যুগে রচিত “ডাকঘর? ও “রাজা? নাটক ছুইটিতেও এই জাতীয় উপলব্ধিব পরিচয় 
পাওয়া যাঁয়। 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৪৯ 


প্রাকৃতিক সৌন্দর্ধ্যে আবির্ভূত হন এবং কবির হৃদয়ে তীহার স্পর্শ 
দিয়া যান। মানুষের মধ্যে যে কর্মশিক্তির ক্রিয়া'অবিরত চলিতেছে, 
যে শক্তির প্রভাবে স্থষ্টি, স্থিতি ও প্রগতি সম্ভব হইতেছে, তাহাতেও 
তিনি প্রকট হইয়া থাকেন, এবং এই কর্মে আত্মনিয়োগ করিলেও 
তাহার সহিত মিলিত হওয়া যায় । “বিশ্বসাথে যোগে' তিনি “যথায় 
বিহার' করেন, সেইখানে তাহার সহিত আমাদের প্রাণের যোগ হয়? 
যখম তাহার “অভ্রভেদী রথের” রশি ধরিয়া আমরা আকর্ষণ করি, 
তখনই আমাদের আত্মনিবেদন সার্থক হয় । কিন্ত ঈশ্বরকে বিশেষ- 
ভাবে উপলব্ধি করা যায় মানবহ্দদয়ের স্ুপ্মতর সুকুমার বৃত্তির উদ্ধা- 
য়নের সাহায্যে । প্রধানতঃ সঙ্গীতের লোকাতিক্রমী ব্যঞ্জনার মধ্যেই 
কবি তাহাকে উপলব্ধি করিয়া থাকেন । এই জন্য গান-ই তাহার 
শ্রেষ্ঠ অর্থ্য, গানেই তাহার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ, এবং কবিহৃদয়ের-ও পরিপূর্ণ 
অভিব্যক্তি গানে । সকলভোল। আত্মহারা গভীর নিবেদন, ও আত্ম- 
বিসঙ্জনের প্রেমে-ও সেই উপলব্ধি হয়। কিন্তু এ প্রেম পাথিব নহে, 
ইহার সহিত কোন সাংসারিক অন্থরাগের সম্পর্ক নাই'। ইহা দময়ন্তী-র 
প্রেম নহে, যে প্রেম প্রণয়াকাজ্মী দেবতাকে প্রত্যাখ্যান করিয়! 
সাংসারিক জীবনের প্রণয়ীকেই প্রার্থনা করে সেই জাতীয় প্রেম নহে ; 
ইহ মীরাবাঈয়ের প্রেম, যে প্রেম সামাজিক সম্পর্কের স্বামী-কে না! 
চাহিয়া জগৎ-ম্বামীর স্বপ্নে বিভোর হয় ইহা সেই প্রেম। একটা 
অপাথিব আকাঙ্ক্ষা ও ব্যাকুলতা এই প্রেমের লক্ষণ । ইঈশ্বরান্ুভুতি-ই 
এই ব্যাকুল্তার কারণ, এবং এই' ব্যাকুলতাই তাহাকে মনে প্রাণে, 
পাইবার পথ । এই অন্নুভূতি জাগ্রত হইলে আমরা বুঝিতে পারি 
কি ভাবে সীমার মাঝে অসীম অহোরাত্র আপন স্থর বাজাইতেছেন । 
আমাদের সীমাবদ্ধ জীবনেও অসীমের স্পর্শ পাওয়া যায় নানা ভাবে 


১৫০ কবিগুরু 


নানা সময়ে অলৌকিকের ব্যঞ্জনাময় বিচিত্র অভিজ্ঞতার মাধ্যমে । 
আকস্মিকরূপে অপ্রত্যাশিতভাবে দেবতা আমাদের অভিজ্ঞতার জগতে 
আবিভূত হন ; কখনও বা স্বপ্নে, কখনও বা কঠোর বাক্তবের বেদনায় 
আমরা তাহার হত্তের স্পর্শ পাই । সেই স্পর্শ পাওয়াতেই মানব 
জীবনের চরম সার্থকতা । যখন সেই সার্থকতা সত্যই সম্ভব হয় তখন 
স্ংসারের ভয় ভাবনা, আশা-আকাজ্কা মিথ্যা স্বপ্নের মত অস্তহিত 
হয়, অনিবর্চনীয় আনন্দে দেহ-মন ভরিয়া উঠে, দেবতা ও ভক্তের 
মিলন-মাধূর্ধ্যই একমাত্র সত্য বলিয়া প্রতিভাত হয় । 

“নৈবেছ্ে'ওর সহিত গীতাঞ্জলি” ইত্যাদির তুলনা করার প্রবৃত্তি 
স্বাভাবিক । উভয় ক্ষেত্রেই দেখিতে পাই যে কবির হৃদয়ে একটা 
মহাভাব বিরাজ করিতেছে এবং ঈশ্বরের একটা সামগ্রিক উপলব্ধি 
তাহার হৃদয় পূর্ণ করিয়া রহিয়াছে । কিন্তু “নৈবেছে ভগবান্‌ বিশ্বের 
নিয়ামক, ধর্মের অধিষ্ঠাতা ও প্রয়োজক । তিনি তৎসবিতা, বরেণ্য ; 
“ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ” বলিয়া কবি তাহার কাছে প্রার্থনা 
করিতেছেন । “নবেছ্যে'র আদর্শ ভক্তিমিশ্র কর্মযোগ । 

গীতাঞ্জলি? ইত্যাদিতে কিন্তু ঈশ্বরকে অন্যভাবে দেখা হইয়াছে । 
তিনি কেবল বিজ্ঞানের চরম সিদ্ধান্ত, দর্শনের চূড়ান্ত প্রতিপাগ্, 
বাস্তবের অধিষ্ঠাতা নহেন | তিনি প্রেমিক, কবি, গুণী; তিনি মান্নুষকে 
চাহেন, তাহার প্রেমাধ্য গ্রহণ করেন । যাহার তছুপযুক্ত বোধ আছে, 
সে তাহাকে প্রিয়তম রূপেই পায় । মানবাত্বার সহিত তাহার লীলা- 
খেলা ও আদান-প্রদান সবর্াই চলিয়। থাকে! তাহার পুর্ণ অভিব্যক্তি 
বাস্তব সত্যের মধ্যে নহে, যদিও 'জীবনের অনেক ব্যাপারেই কোন না 
কোন একটা ইঙ্গিত তাহার দিকে আমাদের মনকে পরিচালিত করে । 
“গীতাঞ্জলি'র আদর্শ কর্মযোগ নহে, এক প্রকার অপাখিব রহস্য ও 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৫১ 
মাধুর্যে পরিপুর্ণ প্রেমযৌগ । ইহার দেবতা পার্থসারথি নহেন, তিনি 
গোপীজনবল্লভ ; ইহার ক্ষেত্র “ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র” নহে, ইহার স্থান 
ণিত্য বৃন্নাবন। 


ভ্রয়োদশ পর্ব (ভাবাভাব ) 
[ বলাকা”, “পলাতকা”, “শিশু ভোলানাথ' ] 
(১৯১৪-১৯২১ ) 


“ওরে যাত্রী, 
ধুসর পথের ধুলা সেই তোর ধাত্রী ; 
চলার অঞ্চলে তোরে ঘূর্ণাপাকে বক্ষেতে আবরি ? 
ধরার বন্ধন হ'তে নিয়ে যাক হরি' ৃ্‌ 
দিগন্তের পারে দিগন্তরে 1” 


গীতাগুলি পবেবই রবীন্দ্রনাথ তাহার সাধনার মোক্ষধামে উপনীত 
হইয়াছিলেন, এইরূপ একটা ধারণা হওয়া স্বাভাবিক । সেই সময়ে 
যেন তিনি “অমিয় সায়রে সিনান” করিয়া পরমার্থ লাভ করিয়াছিলেন, 
এবং সিদ্ধ পুরুষের হ্যায় বলিতে পারিয়াছিলেন, 

শুনব কি আর বুঝব কিবা, এই তো দেখি রাত্রিদিবা 

ঘরেই তোমার আনাগোনা, পথে কি আর তোমায় খুঁজি । 
কিস্ত যতই আমরা “মনে করি এই খানে শেষ, কোথা! বা হয় শেষ”! 
রবীন্দ্রনাথের সাধনার শেষ এখানেও হয় নাই, চিরকালই তাহা “নব 
নব পুব্বাচলে”র সন্ধানে অগ্রসর হইয়াছে । ইহার পর “বলাকা' 
রচনার সময় হইতে তীহার কাব্য-জীবনে আর এক পৰব্ধের স্থচনা 
হইল, “গীতাঞ্জলি ও 'গীতিমাল্যে'র মহাভাব কাটিয়া গেল, পুনশ্চ 
চক্রগতির ধারা অনুসরণ করিয়া একটা ভাবাভাব আসিয়া দেখা দিল । 
যে অলৌকিক মাধূ্য, সঙগীতি ও আনন্দের ঝঙ্কারে তাহার জীবন 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৫৩ 


ভরিয়া উঠিয়াছিল, তাহা মিলাইয়া গেল ; তাহার স্থলে ধ্বনিয়া উঠিল 
বাস্তবের ও বিশ্বের ভীম কল্লোল, ত্রন্দনের কলরোল, বিষশ্বাস ঝটিকার 
গর্জন ; “জীবন এবার মাত.ল মরণ-বিহারে 1” কোথায় উড়িয়া গেল 
সেই গানের সবরের আসন, কোথায় মিলাইয়া গেল সেই আনন্দময় 
সুন্দরের আবিভাব? সহসা যেন একটা প্রবল বশ্তার কআোতে দেবতার 
মন্দিরপ্রাঙ্ণ হইতে সযত্ব-রচিত পুষ্পাঞ্জলি ভাসিয়৷ গেল, ভূতল গগন 
একাকার হইয়া গেল, রহিল শুধু ঘন অন্ধকার, তীব্র ক্রোত, তরঙ্গের 
বেগ আর নিখিলের হাহাকার । ইহারই মাঝখানে “তরঙ্গের সাথে 
লড়ি' বাহিয়া চলিতে হবে তরী” এই কথা সার জানিয়া মানব আতা 
প্রাণপণে জীর্ণ তরীর পাল টানিয়া রাখিয়াছে, হাল আ্াঁকড়াইয়া 
ধরিয়াছে । কবি ভাবিয়াছিলেন “যোঝাধুঝি-ঘিটিয়ে পাব বিরাম 
খু'জি,_চুকিয়ে দিয়ে ধণের পু'জি-_-লব তোমার অঙ্ক”, এমন সময়ে 
এই বিপ্লব ঘটিয়া গেল। “আবার তোমার সভা হতে আসে যে 
আদেশ”; সে আদেশ আসিল নৃতনতর সাধনার জন্য; “নৃতম সমুদ্র- 
তীরে তরী নিয়ে দিতে হবে পাঁড়ি”__ ইহাই তাহার বাণী । এই বাণী-ই: 
নিরুত্ত হইয়াছে “বলাকা কাব্যে । 

এই ভাবে আরও কয়েকবার রবীন্দ্রকাব্যে “্বর্গ হইতে বিদায়ে'র 
পালা অভিনীত হইয়াছে, কবি অন্তরলোকের মাধুর্যের প্রতি পরাজুখ 
হইয়া বাস্তবের কঠোর সত্যের সম্মুখীন হইয়াছেন । বিশেষ করিয়া 
“কল্পনা” পবেরব এই জাতীয় মনোভাবের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় । 
কিন্তু “কল্পনা”য় কবি স্বপ্লোকের নন্দন হইতে অপসরণ করিয়া ছিলেন; 
আর “বলাকা"য় কবি ধ্যানলোকের শাস্তিন্বর্গ হইতে, ভক্তের ও দেবতার 
নিভৃত মিলন-মন্দির হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছেন ।% 


«রবীন্দ্র জীবনের এই পর্ব অনেক সময়ে “সবুজ পত্রের যুগ? বলিয়। উল্লিধিত হয়। “সবুজ- 


১৫৪ কবিগুরু 


কল্পনায় স্বপ্নভঙ্গের পর তিনি উপলব্ধি করিয়াছিলেন একটা ছুজ্জেয় 
কঠোর বাস্তব সত্য । তাহা আমাদের আকাজ্ষীকে বঞ্চিত এবং 
দুবর্বলতাকে নিগীড়িত করে এবং আশা নৈরাশ্ঠের উদ্ধে” একটা বৈরাগ্য- 
ময় বিশালতায় উন্নীত করে। “বলাকা'য় বাস্তব সত্যের সহিত 
আত্মার প্রেরণার কোন বিরোধ নাই ) 470 ৮7680007983, 270 
0090610119৮ ইহাই “বলাকা"র উপলব্ধি । উদ্ধে গগনচারী গরুডের 
ন্যায় “বলাকা'র কবির দৃষ্টি যেমন অন্তর্ভেদী, স্থদূরগামী ও সীমাহীন, 
তাহার প্রাণশক্তি-ও তেমনই অফুরম্ত । তিনি বিশ্বের ভাঙাগড়া, ছঃখ 
ক্লেশ, গ্লানি তাপ, অন্যায় অশান্তি, মৃত্যু ধ্বংস যেমন স্পষ্টচক্ষে দেখিয়া- 
ছেন, তেমনই নিজের জীবনেও জরা শোক, নিন্দা ক্ষতি, অপমান 
আবর্জনা প্রত্যক্ষ অন্তুভব করিয়াছেন | কিন্ত ইহাতে এবার তাহার 
উদ্বেগ, আকুলতা, অধীরতা, বেদনা-বোধ কিছুই হইতেছে না । কারণ 
তিনি এমন একটা মুক্তির বাণীর সন্ধান এই সময়ে পাইয়াছেন যাহার 
ফলে অন্তর ও বাহির, আদর্শ ও বাস্তব, আকাজ্ষা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে 
পূর্ণ সামগ্রস্ স্থাপিত হইয়াছে, শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক উপলব্ধি বাস্তব 
জীবনের দুঃখ, পাপ ও মৃত্যুর সত্যের দ্বারা ব্যাহত না হইয়া তাহার 
দ্বারাই পরিপুষ্ট হইরাছে। “সকল ছন্দ বিরোধের” এখন অবসান 
ঘটিয়াছে ; গীতাগ্তলি পর্ধধেও বাস্তবের কঠোর ও কুৎসিত স্পর্শ সম্পর্কে 
যে একটা কম্প্রতা, সক্কোচ ও কাতরতা ছিল সেটুকুও এখন নাই; 


পত্রে বধজ্রনাথেব যে এমন্ত প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হয তাহাতে এবং এই সময়কার “ঘরে বাইবে” 
চচতুবঙ্গ” “ট্রীর পা" গপযল! নম্বব? ইত্যাদি উপস্যাঁস ও গল্পে এই পর্কেব বিশিষ্ট দৃষ্টি ও অনুভূতির 
পরিচয় পাঁওযা যায়। তাহাব বিশ্ববোধও ক্রমশঃ বিস্তৃতি লাভ করে; তাহারই ফল [৪০০০- 
৪119 (জাতীয়তাবাদ ) সন্বদ্ধে ভাহাব ননতব ধারণ! । বিশ্বভারতী ও গ্রীনিফেতনের প্রতিষ্ঠা 
এই বিশ্ববোধের অন্ঠতম ব্যবহারিক পবিচয় | 


রবীন্দ্রকাব্যের ত্রমবিকাশ_চতুর্থ যুগ... ১৫৫ 


জগৎ-রহস্য এখন কবির কাছে একটা সহজ সত্য হইয়া দাড়াইয়াছে, 
সত্য সত্যই যেন এখন 
ছুবেরবোধ যা কিছু ছিল হয়ে গেল জল, 
মুক্ত আকাশের মত অত্যন্ত নির্মল । 
এখন আর মনে প্রাণে কোন অভাবের বোধ, কোন স্বপ্ত ব্যর্থকামতার 
₹শন, কোন আকুলতার ক্রন্দন নাই । এখন কবির প্রাণে আসক্তির 
রক্তরাগ-ও নাই, বৈরাগ্যের ধূসরতা-ও নাই ; একটা মহস্তর উপলব্ধির 
তীব্র ছ্যতিতে সমস্ত রং মিশাইয়া গিয়াছে, তাহার জ্যোতি-তে জল, 
স্থল, অন্তরীক্ষ আলোয় কালোয় একাকার হইয়া গিয়াছে, ভূভুব-্থঃ 
উদ্ভাসিত হইয়াছে । “বলাকা"র কবি অধ্যাত্মবৌধে যথার্থ ই খধিতুল্য | 
এই জীবন্দুক্তির সন্ধান রবীন্দ্রনাথ পাইয়াছেন “অকারণ অবারণ 
চলার” মধ্যে । প্রসিদ্ধ ফরাসী দার্শনিক 1397685০-এর প্রভাব কবির 
উপর পড়িয়া থাকিতে পারে, কিন্তু বোধ হয় শাস্ত্রোক্ত “চবৈবেতি” 
এই বাণীর মধ্যেই কবি তাহার এই উপলব্ধির সুত্র খু'জিয়া পাইয়াছেন। 
এই উপলব্ধির প্রেরণ! কবিকে সকল বাধা বিপদ্‌ তুচ্ছ করিয়া বিরাট 
ও অসীমের আহ্বানে জয়যাত্রার নির্দেশ দিয়াছে । মানব আত্মার 
চরম সার্থকতা কোন বিশিষ্ট স্ৃতব্নাং সীমাবদ্ধ সন্গীর্ণ মাধুর্য্যের মধ্যে, 
কোন বিশেষ উপভোগের মধ্যে নহে ; এমন কি জনা-মৃত্যু-ভয়-শোক- 
ক্ষুৎ-পিপাসা-বজ্জিত যে ব্বর্লোক*% মানুষের পরম লক্ষ্য বলিয়া চিরকাল 
স্বীকৃত হইয়া আসিয়াছে, সেই আদি-অন্ত-হীন দেশকালাতীত “তমসঃ 
পরস্তাৎ” অবস্থিত স্বর্গ-ও মানবাজ্মার মোক্ষ প্রদান করিতে পারে না। 
সেই স্বর্গের আকাজ্ষা আমাদের কেবল বঞ্চনাই করিতে পারে ; 
“ফিরেছি সেই স্বর্গে শূন্যে শুন্যে ফাকির ফাকা ফাহৃষ ।” মানুষের 
_ *কঠোপনিযৎ ১। ১ | ১২ 





১৫৬ কবিগুরু 


যে “শ্রেষ্ঠধন সে ত শুধু চমকে ঝলকে, দেখা দেয় মিলায় পলকে” ; 
“পথের বাঁকেই হঠাৎ” তাহার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, তাহাকে লইয়া 
ঘর-বাঁধা যায় না । এই জন্য “চলাচলের পথে” “রক্ত পায়ে রৌদ্র 
ছায়ে” ছুটিয়া অগ্রসর হওয়াতেই আত্মার চরম সম্পদ লাভ হয়। 
সমগ্র বিশ্বও এই চলার প্রশাসনেই বিধৃত এবং গগনচারী বিমানের 
হ্যায় অস্থালিত ও সাম্যস্থ রহিয়াছে ; “হেথা নয়, হেথা নয়ঃ অন্য 
কোথা অন্য কোন খানে” যাইবার জন্য একটা অদম্য প্রবৃত্তি বিশ্বের 
প্রাণশক্তিকে উদ্বদ্ধ করিতেছে, বীজান্কুর হইতে তরুশ্রেণী, পর্বত 
হইতে মেঘ-_সকলের মধ্যেই এই প্রবৃত্তি রহিয়াছে । সেই জন্যই 
এত পরিবর্তন ও ভাঙাগড়ার আোত পুথিবীময় চলিতেছে ; এবং 
তাহাতেই বিশ্বের সৌন্দর্য্য, শুঁচিতা ও স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ন রহিয়াছে । যদি 
মুহুর্তের তরে এই চিরন্তন আোতের প্রবাহ নিরুদ্ধ হয়, তখনই “উচ্িয়া 
উঠিবে বিশ্ব পুগ্ পুঞ্জ বস্তুর পর্বতে”, “অণুতম পরমাণু আপনার 
ভারে-_-সঞ্চয়ের অচল বিকারে-_বিদ্ধ হবে আকাশের মন্ম্মুলে_ 
কলুষের বেদনার শুলে ।” মানুষের অমর আত্মাও কোনও আকর্ষণে 
বা লোভে এক স্থানে, এক চিন্তায় এক আদর্শ বা অনুভূতিতে আবদ্ধ 
থাকিবার নহে । “দ্বীপ হতে দ্বীপান্তরে, অজানা হইতে অজানায়” 
তাহার গতি, এমন কি পাথিব প্রেম-ও তাহাকে বাঁধিয়া রাখিতে পারে 
না। যতক্ষণ এই সনাতন গতির ছন্দে আমাদের জীবন চলিতে থাকে, 
. ততক্ষণই “নাই শোক, নাই ভয়” । “যতক্ষণ স্থির হয়ে থাকি, 
ততক্ষণ জমাইয়া রাখি-_-যত কিছু বস্তভার”, “ততক্ষণ ছুঃখের বোঝাই 
শুধু বেড়ে যায় নৃতন নূতন” ; আর “যখন চলিয়া যাই সে চলার 
বেগে বিশ্বের আঘাত লাগে আবরণ আপনি যে ছিন্ন হয়,-বেদনার 
বিচিত্র সঞ্চয়__হতে থাকে ক্ষয়”। সেই সময়েই “তেন ত্যক্তেন 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৫৭ 


ভূজীথাঃ” বোধে আমাদের জীবন পূর্ণ ও পবিত্র ; কারণ, বিশ্ব-প্রবাহের 
অস্তভূ্ত চির-পরিবর্তায়মান বস্ত-বিশেষের প্রতি আসক্তি ও অক্ষম 
মুষ্িতে তাহাকে ধরিয়া রাখার প্রয়াস হইতেই পাপের স্ুচনা, তাহা 
হইতেই অভাব-বোধের সমুৎপাদ, তাহার জন্যই মৃত্যুভয়। কিন্তু 
বিষয়াসক্তির গুপ্ত প্রেমের পরবশ না হইয়া ঘরের কোণ ছাড়িয়া যে 
চলার শোতে আত্মসমর্পণ করিতে পারে, তাহার কাছে “মৃত্যু ওঠে 
প্রাণ হ'য়ে ঝলকে ঝলকে ।” মৃত্যু ঘষে সেই চির-চঞ্চল আোতের 
প্রচণ্ততম তরঙ্গ, তাহাতেই ঢেউ খাওয়া ও ডুব দেওয়াতেই যে অমর 
আত্মার তীব্রতম পুলক ; “মৃত্যু যে তার পাত্রে বহন করে-_অম্বতরস 
নিত্য তাহার তরে” । “অমুতের অধিকারের” জন্য আমরা উৎস্থক, 
কিন্ত তাহার স্বরূপ বুঝিতে আমরা ভুল করি । 
সে ত নহে সুখ, ওরে, সে নহে বিশ্রাম, 
নহে শান্তি, নহে সে আরাম । 

মঙ্গলশঙ্ঘখ, দীপাঁলোক ও প্রেয়সীর প্রেমে অমরত্বের প্রকাশ নাই 
ত্যাগ হইতে ত্যাগে এবং অবস্থার এক বিপর্যয় হইতে অন্য বিপর্ষ্যয়ে 
অবাধ ধাওয়! করিয়াই, এবং জীবনকে তুচ্ছ করিয়া মৃত্যুর গহন অন্ধ- 
কারে পাড়ি দিয়াই চিরষাত্রী মানব আত্ম! % নিজেকে সার্থক করিতে 
ও অমৃতের আন্বাদ পাইতে পারে, এবং এইভাবেই গতি-তরঙ্গের 
প্রঘাতে প্রঘাতে চির-রহস্তাময়ের প্রত্যক্ষ অনুভব লাভ করিতে পারে । 

“বলাকা” তীব্র বলিষ্ঠ উদ্যত উচ্ছল প্রাণশক্তির বিজয়-গাঁথা | এই 
প্রাণশক্তিকেই কবি যৌবন বলিয়াছেন এবং তাহাকে রাজটাকা 
দিয়াছেন । .তাহারই সবুজ নেশায় সমগ্র ধরণী বিভোর, ঝড়ের মেঘে 
তাহারই ভড়িৎ বিচ্ছবরিত। সে ছুরস্ত, প্রচণ্ড, প্রমত্ত; কিন্ত সে-ই 


এইখানে 8:৩৮৫ম:)৪-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যথেষ্ট মিল আছে। 








১৫৮ কবিগুরু 


জীবন্তঃ প্রযুক্ত, অমর । সে-ই মুক্তির একনিষ্ঠ সাধক ; সুখ, আয়ু 
ইত্যাদি সে তুচ্ছ জ্ঞান করে ; জীর্ণতার ও মোহের মারাজ্াল অক্রেশে 
সে ছিন্ন ভিন্ন করে। অগ্নি তাহার কবি+ স্থর্ধ্য তাহার মিত্র, সে সাগর 
পারের অক্লান্ত পাস্থঃ তাহার বাণী ঢেউয়ের পরে বিজযডঙ্কা বাজাইয়া 
মুক্তির সন্ধান ঘোষণা করে । 

গীতাঞ্জলি পব্রের দেবতা প্রেমের ঠাকুর» মাধুর্যযের, সৌন্দর্য্যের, 
সঙ্গীতের লীলারসে তাহার পরিচয় । “বলাকা'র দেবতা রুদ্র 
বিধাতা, _-সব্বনাশের মধ্যে তাহার পরিচয় মেলে, আরামের শয্যাতল 
হইতে আমাদের আহ্বান করিয়া তিনি গভীর নিশার ঝঞ্ধা-বিক্ষুন্ধ 
সাগর-তরঙ্গে তরী ভাসাইবার আদেশ দেন, তাহার বিষাণ মধ্যদিনের 
তপ্ত রৌদ্রে বিক্ষত চরণে পাষাণ পথে অগ্রসর হইতে আহ্বান করে, 
আমাদের হৃতসব্বস্ব করিয়া এবং আমাদের কোমল বৃত্তি ও স্বকুমার 
আকাঙ্কা-নিচয় দলিত মথিত করিরা তিনি নবজীবনের দীক্ষা দেন। 
কিন্ত বাহৃত; কঠোর হইলেও তিনি অন্তরে সেহপরায়ণ, আম্মাদের 
দুর্বলতার উপরে তিনি স্েহ-অশ্রু মোচন করেন, আমার উচ্ছ্খলতার 
উপর তিনি সৌন্দধ্যের স্পর্শ দান করেন । তিনি অনস্ত কাল ধরিয়া 
অপেক্ষা করিয়া আছেন, মানুষ যখন “নিজের জোরে” “নিজ 
মর্ত্যসীমা” চূর্ণ করিবে তখনই তাহার অমর মহিমা মানুষকে ধন্য করিবে । 

“বলাকা'র এই অপুর্ব উপলব্ধি প্রকাশ পাইয়াছে অভিনব এক 
ছন্দৌবন্ধে। কবি অনুভব করিয়াছেন যে “পুরানো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে 
ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না”, পুরানো ছন্দের বাধা ছাচ 
ঘুরাইয়া ফিরাইয়া তাহার এই অভিনব মুক্তিম্ত্রের রূপায়ণ করা 
যাইবে না। “বলাকা"য় তাহার কবি-প্রতিভা আবার একটা নূতন 
ছন্দের স্থষ্টি করিল; তাহার গতি গরুড়ের ম্যায় উধাও, অবাধ, 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৫৯ 


অক্লান্ত ; তাহা তানলয়বদ্ধ বীণালাপ নহে, তাহা! ঝটিকার বঙ্কার | 
অমিতাক্ষর অসম ছন্দে মিত্রাক্ষর সমাবেশ কত্রিয়৷ রবীন্দ্রনাথ “বলাকা'য় 
যে অপরূপ ছন্দোহিল্লোল স্থপ্ি করিয়াছেন, তাহার তুলনা পাওয়া 
কঠিন । এই জন্য শুধু “বলাকা"র ছন্দ বলিয়াই তাহাকে নির্দেশ 
করিয়া ক্গান্ত হইতে হয়। কর্ম ও সন্্যাসের যে অপুবর্ব সমন্বয় 
“বলাকা'র জীবন-দর্শনে দেখিতে পাওয়া যায়, তাহারই প্রতিফলন 
হইয়াছে “বলাকা'র ছন্দে পৃ্চ ও গগ্য রীতির অপরূপ সম্মিলনে | 
অনেক হিসাবেই “বলাকা রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কাবা । ছন্দের 
অপুব্ব মুক্ত গতি, ভাষার তীক্ষ ছ্যতি ও সাবলীল প্রবাহ, ভাবের 
প্রগাটতা-_ সমস্তই ইহাকে রবীন্দ্র-কাব্য-প্রবাহের শীর্ষে স্থান দিয়াছে। 
উপলব্ধির দিক্‌ দিয়াও দেখিতে পাই যে তাহার সাধনার কয়েকটি 
ধারা এইখানে মিলিত হইয়া এক মহাসঙম স্থষ্টি করিয়াছে । জীবনে 
ছুঃখের ও ত্যাগের প্রয়োজনীয়তা, বিচিত্র অভিজ্ঞতার মূল্য, প্রেমের 
মাহাত্ম্য, মুক্তির আবশ্যকতা, একান্তিক আদর্শনিষ্ঠা, ভৈরব বৈরাগ্যের 
গৌরব, এক অলৌকিক গুঢ় সত্তার সহিত নিজের আত্মার সংযোগের 
উপলব্ধি_ ইত্যাদি যত কিছু আদর্শ তিনি জীবনে নানা সময়ে অনুভব 
করিয়াছেন, তাহা সমস্তই এখানে পুর্ণ প্রকাশ লাভ করিয়া পরস্পরের 
সমন্বয়ে একতান স্থষ্টি করিয়াছে । “বলাকা"য় দার্শনিকের গভীর 
আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সহিত কবির নিবিড় হৃদয়াবেগের একত্র মিলন 
ঘটিয়াছে ; ভাব ও সত্য, কল্পনা ও আবেগ এক হইয়া গিয়াছে । 


র্‌ 


১৬০ কবিগুরু 


“বলাকা'র মূল ভাবই “পলাতকা'র কবিতাগুলিতে উদাহত 
হইয়াছে । এই: কাহিনীগুলি বাস্তব জীবনের টুকরা লইয়া রচিত 
হইলেও তাহাতে বাস্তবাতীত অজানার বোধ ও তাহাকে পাওয়ার জন্য 
মানব চিত্তের একট অস্ফুট আকাতক্ষা ঘটনা-পারম্পধ্যের ফাকে ফাকে 
ফুটিয়৷ উঠিয়াছে । কি ভাবে আমাদের জীবনে এই অজানা “চমকে 
ঝলকে, দেখ! দেয়, মিলায় পলকে” তাহারই দৃষ্টান্ত কবি 'পলাতকা'র 
দিয়াছেন । যাহারা মানব সমাজের কৃত্রিম বন্ধন ও প্রবৃত্তির বহিঃস্থ 
তাহাদের জীবনেই এই অজানার আকর্ষণ সব্বাপেক্ষা প্রবল ; এই 
জন্য কবির পোষা হরিণ অবলীলাব্রমেই তাহার প্রিয় সাথী কুকুর 
ছানার মায়া কাটাইয়া নিরুদ্দেশের আশে উন্মত্ত আবেগে ছুটিয়া বাহির 
হইল, হরীধারের ডাকে সে আলোক-কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিল । 
মানুষের সমাজে, বিশেষতঃ বাঙ্গালী জীবনে, নানাবিধ কৃত্রিম আদর্শ ও 
বৃত্তির প্রভাব এত বেশী যে তাহাদের মোহ কাটাইয়া৷ মুক্তির সন্ধান 
করা সাধারণতঃ অত্যন্ত ছুরহ, বাঙ্গালী মেয়ের পক্ষে ত প্রায় অসম্ভব । 
তবুও কদাচ ইহা সম্ভব হয়। এক ভুয়া আদর্শের প্রতি নিরর্থক নিষ্ঠা 
ও আত্ববলিদানের মোহ হইতে উদ্ধার পাইল মঞ্জুলিকা যখন তাহার 
পিতা নিল'জ্জ হৃদয়হীনত! সহকারে বৃদ্ধ বয়সে দার-পতিগ্রহ করি- 
লেন; সমাজনীতি ও আদর্শের প্রতি একান্ত বীতশ্রদ্ধ হইয়াই 'সে 
অজানার উদ্দেশে ঝাঁপ দিল, গৃহত্যাগ করিয়া পুলিনের সহিত স্বদূর 
ফরাকাবাদে ঘর পাতিতে গেল । বাঙ্গালীর ঘরে “লক্ষী সতী ভালো 
মান্নুষ অতি” বলিয়া ষে বধূর সুখ্যাতি ছিল, বাস্তবিক পক্ষে সে ছিল 
সংসাররূপিনী চামুণ্ডার বলির পশু; সংসার-যন্ত্রে দেহঃ মন ও আত্ম! 
নিরস্তর পিষ্ট হওয়ার পর সে মৃত্যুর দ্বারে আসিয়া! মুক্তির স্বাদ পাইল; 
জীবনের ওপারের “বিরাট মোহানা”য় “ভাড়ার ঘরের দেয়াল যত 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-- চতুর্থ যুগ ১৬১ 


একটু ফেনার মত” মিলাইয়া গেল। কিন্তু কেবল সামাজিক রীতি- 
নীতি নহে, আমাদের জীবনে বাক্তব সত্য সম্পর্কে যত কিছু ধারণা ও 
সংস্কার আছে, তাহ।ও অজ্ঞানতিমিরে আমাদের আত্মাকে অন্ধ করিয়া 
রাখিয়াছে ; তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় যে মানব হৃদয়ের গভীরতম 
অস্তস্ভল এবং বিশ্বের অস্তরাত্ার ভিতর হুইতে একটা অসহায় 
ক্রন্দন বাঁজিয়া উঠিতেছে, মনে হয় যে অন্ধকার সোপানপথে ভয়চকিতা 
বামি-র “হারিয়ে গেছি আমি” এই ত্রস্ত কাতর ভাষা আমাদেরই 
মর্মের বাণী । এইরূপে নানাভাবে বিরাট অজানা আমাদের স্ুল 
অভিজ্ঞতার মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে এবং তাহার সম্ধানই কবি 
“পলাতকা"য় দিয়াছেন । 


*“পলাতকা' রচনার পর তিন বৎসর গত হইলে “শিশু ভোলানাথের” 
কবিতা কয়েকটি লেখা হয়। ইতোমধ্যে দেশে রাষ্ত্রীয় আন্দোলনের 
প্রবল বন্যা বহিয়া চলিয়াছে, কবি পুৰশ্চ নানা দেশে বিদেশে ঘুরিয়! 
ফিরিয়া আসিয়াছেন, তাহার জীবনে ও সংসারে উত্তেজনা ও আন্দো- 
লনের অবধি নাই | কর্মের বন্ধন ও তর্কের জাল হইতে কবিচিত্ত 
সাময়িক ভাবে মুক্তির স্বাদ পাইল “শিশু ভোলানাথে”্র প্রত্যয়ে ॥ 
আপাতদৃষ্টিতে এই কবিতাগুলিকে রবীন্দ্রকাব্যপ্রবাহ|হুইতে বিচ্ছিন্ন 
শান্ত সায়র বলিয়া মনে হইলেও, আমলে “শিশু ভোলানাথে”র 
মধ্যেও “বলাকা"র আদর্শেরই প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায় । বলাকা 
ঘ-_১১ 


১৬২ | কবিগুরু 


ষে প্রাণোচ্ছল অনাসক্ত চঞ্চলতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছে, 
তাহার দৃষ্টাস্ত সাধারণ মানুষের জীবনে বড় একটা পাওয়া না গেলেও 
শিশুর জীবনে পাওয়া যায়। সে ভোলানাথের মতই নিরাসক্ত, 
ভোগের বন্ধনে সে আবদ্ধ নহে। যে খেলন! লইয়া তাহার খেলা, 
তাহাকেই ভাঙ্গিয়া চুরিয়া সে আনন্দে নৃত্য করে । দারিত্র্য তাহাকে 
দীন করে না, ধুলি তাহাকে অশুচি করে না, তাহার অন্তরে সর্বদাই 
অমৃত এশ্বধ্য বিরাজ করিতেছে । এইরূপে “বলাকা'র জীবনাদর্শ 
শিশু ভোলানাথের মধ্যে প্রকট হইয়াছে । 

কিন্তু শিশুর জীবনেও একটা রহস্যময় অজানার ডাক আসিয়া 
মাঝে মাঝে তাহাকে উদ্ভ্রান্ত করে ; ভোলানাথেরও নৃত্যচ্ছন্দে তাল 
কাটিয়া যায়, তপস্তায় বিশ্ব ঘটে । কখন কখন তাহার মা-কে অবলম্বন 
করিয়া স্সেহের যে বিরাট রহস্যলোকের স্থ্টি হইয়াছে, তাহাই 
অনুধাবন করিতে গিয়া তাহার চমক লাগে; তাহার মা অন্য কাহারও 
মা হইলেও যে এই স্সেহের প্রভাব হইতে মা ও শিশু কেহই মুক্ত 
থাকিত না তাহা সে অনুভব করে; বুদ্ধি দিয়া ব্যাখ্যা করিতে না 
পারিলেও একটা গভীরতর অনুভূতির বলে সে বুঝিতে পারে যে 
তাহার সহিত তাহার মায়ের সম্বন্ধ একটা চিরস্তন ব্যাপার, “বছুশত 
জনমের চোখে-চোখে কানে-কানে কথা” কিছুতেই কখনও মিথ্যা 
হইতে পারে না। এমন কি তাহার মা পরলোকগমন করিলেও মায়ের 
সত্তা সর্ধত্র বিস্তীর্ণ হইয়া আছে সে অন্থৃভব করিয়া থাকে, এবং এই 
অন্বভূতিই তাহাকে উদাস করিয়া একটা অতি-বাস্তব রহস্তে নিমগ্ন 
করে। অন্যান্য অভিজ্ঞতার মধ্যেও শিশু এই রহস্যের আভাস কখনও. 
কখনও পায় £ ইচ্ছামতী নদীর প্রবাহে, শীতের ভৃদ্ধ মধ্যাহেয এই. 
আভান সে অন্ুতব করে। এমন কি মাঝে মাঝে তাহার মা”কেই: 


রবীন্দ্রকাব্যের ভ্রমবিকাশ- চতুর্থ যুগ ১৬৩ 


যেন বছদুরের রহস্যময়ী বলিয়া মনে হয়, শিশুহ্‌দয় দিয়া কিছুতেই 
যেন সে মায়ের সীমা পায় না 1% 

এইরূপে দেখিতে পাওয়া যায় যে শিশু তোলানাথে'র মধ্যেও 
“বলাকা'র বাণী ধ্বনিত হইতেছে ; এখানেও কবি পরিবর্তনের চঞ্চল 
প্রবাহে আত্মসমর্পণ করিতেছেন এবং এক রহস্থলোকের আতাসের 
মধ্যে মুক্তির সন্ধান পাইতেছেন। 


বাস্তবিক কোন শিশুর মনে এইরূপ ধারপা! উদিত হয় কি না" দার্শনিক কবি নিজের লুপ 
অগুভূতি শির বেনামি-তে চালাইতেছেন কি না”-ইত্যাগি প্রশ্নের আলোচনা এই প্রসঙ্গে 
দিশ্ায়োজন। 


গম যুগ 
[ “পুরবী-- শ্যামলী? ] 
( খুঃ অঃ ১৯২৩-১৯৩৬ ) 
( বয়স ৬২-৭৫ ) 
“মাটির ডাক” 


“এই ভালো আজ এ সঙ্গমে কান্নাহাসির গঙ্গা যমুনায় 

ঢেউ খেয়েছি, ডুব দিয়েছি, ঘট ভরেছি, নিয়েছি বিদায় । 
এই ভালো রে প্রাণের রঙ্গে এই আসর সকল অঙ্গে মনে 
পুণ্য ধরার ধুলো মাটি ফল হাওয়া জল তৃণ তরুর সনে ।” 


“পুরবী” রচনার কাল হইতে রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনে আর একটা 
নূতন যুগের আরম্ভ হইল । ইহাই তাহার কবিজীবনের পঞ্চম ও 
উপাস্ত যুগ। তাহার জীবননাট্যে এই পঞ্চমাঙ্ক আবেদনের দিক্‌ 
দিয়া যেমন অপ্রত্যাশিত তেমনই চমকপ্রদ । এই যুগের স্মচনার 
পুর্বে কয়েক বছর ধরিয়া মনে হইতেছিল যেন রবীন্দ্রনাথের কাব্য- 
জীবনের ইতি হইয়াছে, “পলাতকা' প্রকাশের পর তাহার কাব্য- 
সরব্বতীও অন্তর্ধান করিয়াছেন । কয়েক বছর ধরিয়া রবীন্দ্রনাথ “শিশু 
ভোলানাথে'র কয়েকটি কবিতা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন কবিতা রচন! 
করেন নাই $ “এখন শুধু গঞ্ভ লিখি, তাও আবার কদাচিৎ”, এই 
সময়ে তিনি কথিকা, গল্প, প্রবন্ধ কিছু কিছু রচনা করিতেছিলেন, 
অথবা! পুরাতন কয়েকটি রচনাকে নুতন করিয়া নাট্যরূপ দিতেছিলেন । 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_পঞ্চম যুগ ১৬৫ 


মনে হইতেছিলগ যে তাহার শেষ কথাটি বলা হইয়া গিয়াছে, 
“বলাকা'তেই তাহার কবি-প্রতিভার শেষ ও মহত্তম বাণী তিনি জগৎকে 
শুনাইয়াছেন । 

লন নিরিনির হরি পলা বায 
একটা 1100181) 901101797 বা! অকাল-বসম্ত দেখা দিল । কোন 
কোন ব্যক্তির সম্বন্ধে শোনা যায় যে বার্ধক্যের চরম সীমায় পঁহছিয়! 
তাহারা পুনরায় যৌবনোচিত কোন কোন লক্ষণ ফিরিয়া পাইয়াছিলেন। 
তাহার কারণ কি তাহা নিণীতি হয় নাই; মোটামুটি বলা যায় যে 
তাহাদের স্বাস্থ্য বরাবরই অক্ষুপ্ন ছিল, প্রাণশক্তির সম্পদ্‌ অজস্র লাভ 
করিয়াও তাহা তাহারা অপচয় করেন নাই । রবীন্দ্রনাথের দেহ ও 
মন সম্বদ্ধেও সেই কথা. বল! যায়; অসাধারণ প্রাণশক্তি তাহাকে 
বিধাতা দিয়াছিলেন, "এবং তিনি তাহার অপব্যয় করেন নাই, উপযুক্ত 
অন্নুশীলনে তাহা উপচিত হইয়াছিল । কারণ যাহাই হউক, রবীন্দ্র- 
নাথের কাব্যজীবনে যে একটা “শেষ বসন্ত” এই সময় আসিয়াছিল, 
মনে তারুণ্য ফিরিয়া আসিয়াছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই" 
রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাহা বলিয়াছেন । “ভাহার যৌবন-বেদনারসে 
উচ্ছল দিনগুলি” আবার নূতন রূপে দেখা দিল; যে কবি এত দিন 
ধরিয়া! “রুদ্রের ভৈরব গান” গাহিয়া আসিয়াছেন তাহার রচনায় দক্ধ 
পঞ্চশর পুনজীবন লাভ করিল); “এ ধরারে_-জীবন-উৎসব-শেষে 
ছুই পায়ে ঠেলে-_মৃৎপাত্রের মতো যাও ফেলে” ইহাই. ধাহার আদর্শ 
ছিল, তাহার. রচনাতেই “বিপুলা এ পৃথিবীর” “মহা-একতান” প্রধান 
সত্য হইয়া উঠিল ; “অজানার” কবি আজ নিজেকে “পৃথিবীর কবি” 
বলিয়া পরিচয় দিলেন। কবি এখন আর “শ্মশানের বৈরাগ্য* 
বিলাসী” নহেন; তিনি “মহেন্দ্রেরে তপোভঙ্গ-দুত”। “বসন্তের 


৭৬৩৬ কবিগুরু 


বন্যাআোতে সন্যাসের অবসান” হইল, ““ম্ন্দরের জয়ধ্বনিগানে কবির 
পরাণে বাঁশি” বাজিয়া উঠিল । 

এই যুগের রবীন্দ্রকাব্যে নৃতন একটা জীবনাদর্শের প্রকাশ দেখিভে 
পাওয়া যায়। সেই আদর্শকে রবীন্দ্রনাথ “মানুষের ধন্মি বলিয়া 
অভিহিত করিয়াছেন, এবং বিলাতে ও এদেশে দার্শনিক বক্ততামালায় 
তাহা ব্যাখ্যা করিয়াছেন। “সোনার তরী" রচনার সময় হইতে 
রবীন্দ্রনাথের কাব্যে যে আদর্শ পরিশ্ফুট হইয়াছিল, তাহা এই সময়ে 
নৃতন একটা জীবনধর্ম্মের মধ্যে বিলীন হইয়াছে । “সোনার তরী, 
রচনার সময় হইতে রবীন্দ্রনাথ প্রধানতঃ কল্পলোক ও ধ্যানলোকের 
কবি। মানবজীবন ও পাধিব জগতের নানা অনুভূতি অবশ্য তাহার 
মধ্য জীবনের কাব্যের সহিত নিবিড়ভাবে জড়িত হইয়া আছে, কিন্তু 
তাহা-ই সেই সময়ের রবীন্দ্রকাব্যের মুখ্য প্রতিপাগ্ধ নহে । “অন্তর 
মাঝে” ও “জগতের মাঝে” যে ছ্যতি “অযুত আলোকে” কত রূপে 
ঝলসিয়া উঠিতেছে তাহার কথাই তিনি এতদিন প্রধানতঃ বলিয়া 
আসিয়াছেন ; মাতা, কন্যা, বধূ নহে, “নন্দনবাসিনী উর্রবশী”ই' তাহার 
কবিচিত্তকে প্রবুদ্ধ করিয়াছে ; রমর্গীকে রমণী হিসাবে তিনি কাব্যে 
স্থান দেন নাই* যখন সে কবির পাশে ক্ষণকাল আসিয়। তাহার চিত্ত 
“সেই রহস্য আভাসে” ভরিয়া দিয়াছে, তখনই সে রবীন্দ্রকাব্য 
আসন পাইয়াছে, “অদ্ধেক কল্পনা”য় গঠিত বলিয়াই কবির কাছে 
তাহার মুল্য । মানবজীবনের যে সমস্ত কথা ও কাহিনী তাহার কাব্যে 
স্থান পাইয়াছে, সেগুলি-ও বাস্তবের চিত্র হিসাবে নহে, এক রহস্থাসয় 
সত্তার প্রকটন হিসাবেই কবিকে আকৃষ্ট করিয়াছে । মাঝে মাঝে 
বাস্তব জগৎ তাহার কাছে তাৎপর্ধ্যময় বলিয়া মনে হইয়াছে, কখন, 
কখন “কিছু কিছু মর্ম তার” যেন বুঝিয়াছেন বলিয়া কবির মনে 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- পঞ্চম যুগ ১৬৭ 


হুইয়ীছে, “আমারে লইয়া যাও-_রাখিও না' দরে” বলিয়া তিনি 
আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছেন । কিন্তু ইহা সাময়িক উচ্ছাস ও ব্যাকুলতা 
মাত্র । আসলে রবীন্দ্রনাথ অম্ুত-সমান স্বপ্ন-মঙ্গলেরই কবি । জীবন- 
দেবতা, চিত্রা, বিশ্বদেব, অস্তরযামী, নটরাজ, রুদ্র ভোলানাথ প্রভৃতি 
নানা আখ্যায় কৰি বিভিন্ন সময়ে যে মহত্তর সত্তার পরিচয় দিয়াছেন, 
তাহার প্রকাশ, তাহার আভাস, তাহার সন্ধান-ই রবীন্দ্রকাব্যের 
এতাবৎ রিষয়বস্ত । বাস্তবাতীত একটা অতীন্ড্রিয় সত্তার মহিমা-ই 
তিনি কীর্তন করিয়া! আসিয়াছেন, যদিও বাস্তব জগৎ ও ইন্দ্রিয়কে 
সেই মহত্তর সত্তার উপলব্ধির সোপান বলিয়াই কবি বিবেচনা 
করিয়াছেন । সংসারের নানা অভিজ্ঞতার রদ্ধে রন্ধে যে একটা 
কল্পলোকের প্রতিধ্বনি তিনি বাজিতে শুনিয়াছেন, তাহাই তিনি 
কাব্যে ব্যক্ত করিয়াছেন | ইহা হইতে তিনি ফিরিয়া বাস্তব সত্যের 
অনুসরণ করার ইচ্ছা মাঝে মাঝে প্রকাশ করিয়াছেন বটে, কিন্তু তাহা 
করিতে পারেন নাই ৷ চিরদিনই তাহার দেবতার পায়েই তিনি অর্ধ্য 
নিবেদন করিয়া আসিয়াছেন, এবং সে-ই দেবতা তাহার অস্তর 
ব্যাপিয়া “জীবন-মরণ হরণ” করিয়া বিরাজ করিয়াছেন । “বলাকা, 
পরের অবশ্য একটা পরিবর্তন দেখিতে পাওয়া! যায় কবি তখন ছঃখ 
মৃত্যু ধ্বংস প্রস্ৃতি বাস্তব সত্যের সহিত তাহার অলৌকিক আধ্যাত্মিক 
উপলব্ধির সামপুস্য করিবার প্রয়াস করিয়াছেন । কিন্তু তখনও কবি 
সাধারণ মানবের স্তর হইতে বহু উর্ধে বিহার করিতেছেন, বাস্তবের 
ভীম কল্লোল দূর হইতে শ্রবণ করিতেছেন এবং আকাশচারী গরুড়ের 
হ্যায় তীক্ষ দৃষ্টি ও অনস্ত আবেগ লইয়া জীবন ও সত্যের পরিক্রমা 
করিতেছেন ৷. “বলাকা"তেও কবির “এখনও বিহার কল্প-জগতে 1” 

কত্ত এই যুগের কাব্যে দেখিতে পাই যে রবীন্দ্রনাথের দৃ্টিভজীর. 


১৬৮ কবিগুরু 


একটা মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। এখন আর তিনি বলাকার মত 
আকাশচারী অজানার সন্ধানী নহেন। মাটির ভাকে আজ তাহার 
উদাসীন আত্মা ঘরের দিকে ফিরিয়াছে “কাছেকে আজ পেলাম 
কাছে” এই তৃপ্তি তিনি লাভ করিয়াছেন, এতদিন “নিকট' তাহার 
কাছে সুদূর হইয়াছিল তজ্জন্য ভ্রম স্বীকার করিতেছেন । এখন তিনি 
সোজান্থজি বুঝিতে পারিয়াছেন যে তিনি “বৈশাখী মেঘ বাঁধন-ছাড়া'র 
সমজাতীয় নহেন, তিনি মাটির মানুষ, “পথহীন সাগর-পারের পাস্থ” 
বলিলে তাহার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় না। মানবজীবনের ও 
মানবহৃদয়ের সহজ সত্যই তাহার আশ্রয়। মানবস্থলভ অনুভূতির 
মধ্যেই যে পরম সত্য বিধৃত রহিয়াছে, ইহাই এ যুগে কবির অভিনব 
উপলব্ষি। “বলাকা'য় কবি বলিয়াছিলেন “আমার যে শ্রেষ্ঠ ধন সে 
ত শুধু চমকে ঝলকে, দেখা দেয় মিলায় পলকে”; আর এখন কবি 
বলিতেছেন যে “ধরণীর এক কোণে” “একটুকু বাসা-তে” “কিছু 
ভালোবাসা” দিয়! যদি জীবনের “ক-দিনের কাদা আর হাসা” ভরিয়! 
তুলিতে পারেন তাহাতেই তাহার চরম পরিতৃপ্তি লাভ হইবে । 
ইহাকেই তিনি মানুষের সত্য ধর্ম বলিয়া মানিয়া লইয়াছেন । 
“মধুময় পৃথিবীর ধুলি”__এই মহামন্ত্রেই তিনি চরিতার্থ জীবনের শেষ 
বাণী পাইয়াছেন। 

“মাহৃষের ধর্ম বা [9118101 ০? 719॥ শিরোনাম দিয়া রবীন্দ্র- 
নাথ যে বক্তৃতাগডলি দিয়াছিলেন, তাহাতে মানুষ ধর্মের যে প্রত্যয় 
ব্যাখ্যাত হইয়াছে, তাহার একটা বিশিষ্ট রূপ এই পঞ্চম যুগের রবীন্দ্র- 
কাব্যের জীবনাদর্শের মধ্যে পাওয়া যায় । বক্তৃতায় যে মানবধর্মের 
কথা কবি বলিয়াছেন তাহা রবীন্্রকাব্যের কয়েকটি শ্রপরিচিত 
উপলব্ষির উপর প্রতিষ্ঠিত। দেখানে রবীশ্রুনাথ বলিয়াছেন যে 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ--পঞ্চম যুগ ১৬৯ 


মাহষের জৈব প্রকৃতি ছাড়া একটা আত্মিক প্রকৃতি-ও আছে, 
তাহাতেই মানুষের স্বরূপের যথার্থ প্রকাশ । আত্মিক প্রকৃতির বিকাশের 
দ্বারাই মানুষ নিজেকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করিতে, সার্থকতা লাভ 
করিতে এবং “আনন্দীভূত” হইতে পারে । জৈব ও আত্তিক প্রকৃতির 
মধ্যে বাস্তবিক কোন বিরোধ নাইঃ জৈব আত্মিকের পরিপোষক, 
জৈবের পরিণতি আত্মিকে যেমন তরুর পরিণতি পুষ্পে ও ফলে। 
জৈব প্রকৃতিকে নিপীড়ন করিয়া কোন আধ্যাত্মিক লাভ সম্ভব নহে, 
আত্মিকের সহিত সংযুক্ত হইলেই তাহা মন্ুত্যত্বের বিকাশের সহায়তা 
করে। নিবৃত্তি নহে, প্রবৃত্তিই মনুষ্যত্বের সার্থকতার সাধক । অবশ্থ 
প্রবৃত্তির যে কোন প্রকাশ, যে কোন স্পৃহা বা অভিরুচি-ই যে 
প্রশংসার, জীবনে ত্যাগ সংযম বা আত্মদমনের যে কোন স্থান নাই, 
তাহা নহে। কিন্তু এই স্থান নির্ণাত হইতে পারে কোন বাহিরের 
আদর্শ বা নিয়ম অনুসারে নহে, কেবল আত্মার প্রেরণার দ্বারাই 
তাহার নির্ণয় হইতে পারে। যে প্রবৃত্তি শ্রেয়; তাহা মহামানবের 
কল্যাণের সহিত আমাদের যুক্ত করে, সঙ্কীর্ণ স্বার্থ ও অহঙ্কারের মধ্যে 
সীমাবদ্ধ করিয়া রাখে না; তাহা বিরোধের পথ ছাড়িয়া মিলনের পথে 
আমাদের লইয়া যায়, তাহা আমাদের মধ্যে একটা সবর্গত আনন্দের 
স্থট্টি করে, আমাদের আত্মিক উপলব্ধিকে স্ফুর্ত ও বিকশিত করে। 
ত্যাগ বা দমের অর্থ আংশিক আত্মঘাত নহে, তাহার অর্থ পূর্ণতর 
উপলব্ধির জন্য সার্থকতর পথে প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ । যে আত্মিক প্রকৃতি 
প্রতি মান্ুুঘের মধ্যে রহিয়াছে, তাহার দ্বারাই মানুষে মানুষে মিলনের 
স্ৃত্র রচিত হইয়াছে । এই অস্তনিহিত আস্তিক প্রকৃতি বস্ততঃ বিশ্ব- 
আত্মারই বীজ, এবং জীবনের অভিজ্ঞতার তাপে জৈব প্রকৃতির-রসেই 
ইহা! অঙ্কুরিত ও বিকশিত হয় এবং মহামানবের কল্যাণের দিকে ইহা 


৬৭০ কবিগুরু 


প্রসারিত হইয়া থাকে । এই বিশ্ব-আত্মা-ই বিশ্বদেবতা, ' ব্যক্তির 
মধ্যে তাহার যে আবির্ভাব তাহাই জীবনদেবতা, এবং এই জীবন- 
দেবতা-ই আমাদের আত্মিক প্রকৃতির কর্ণধার । 

মোটামুটি এই প্রত্যয় রবীন্দ্রকাব্যের সকল যুগেই পাওয়া -যায়ঃ 
কিন্তু তাহার রচনায় এক এক যুগে এক এক দিক্‌ সেই যুগের বিশিষ্ট 
অনুভূতির আলোকে পরিষ্ফুট হইয়াছে । কোন যুগে মানবসলভ 
প্রবৃত্তি, আবার কোন যুগে বিশ্বদেবতার উপলব্ধি তাহার কাব্যে প্রবল 
হইয়াছে । পঞ্চম যুগে রবীন্দ্রনাথের কাছে সুস্পষ্ট হইয়াছে মানব- 
হৃদয়ের প্রেম-প্রবণতা, বাস্তবের বৈচিত্র্যের মধ্যে অমর্ত্য লোকের 
ইঙ্গিত, জীবনের যুগ-যুগান্তরের অনুভব ও অভিজ্ঞতার মধ্যে একটা 
অলক্ষ্য সূত্রের সংযোগ | . তাহার দৃষ্টি এখন কল্পনার জগতে নহে, 
তাহার দৃষ্টি এখন বাস্তব পুথিবীর দিকে! কোন ধ্যানের ধন'কে 
তিনি খুঁজিতেছেন না, “ধূলির তিলক”ই তাহার কাম্য । জীবনদেবতা 
বা বিশ্বদেবতার সহিত মনোমিলনের জন্য তিনি উৎস্থক নহেন, সাধারণ 
মানবের “জীবনে জীর্বব ঘোগ করাস্ই এখন তাহার কাছে পরমার্থ 
বলিয়! প্রতীত হইতেছে । মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতা, প্রকৃতি এবং 
পারিপাস্থিকের মধ্যে যে সৌন্দর্য্য ও আবেদন রহিয়াছে, তাহাই এখন 
তাহার কাব্যের উপজীব্য । জীর্ণ দীর্ণ দেবতালয়ে দেববিগ্রহ না 
থাকিলেও তাহা শুধু সৌন্দর্য্যময় পরিবেশের জন্বাই এখন কবির কাছে 
পবিত্র । এখন দেবতা নহে+ মানব-ই তাহার কাছে সত্য ; ব্বর্গের 
অমৃত নহে, পৃথিবীর মধুই তাহার কাম্য । 

এই প্রসঙ্গে “কল্পনা” হইতে “নৈবেস্ক' পর্য্যস্ত কাব্যগুলির সহিত 
এই ফুগের কাব্যের একটা তুলনা করা যাইতে পারে । সে সময়েও 
কবি বাস্তব সত্য সম্বন্ধে সচেতন হইয়াছিলেন। কিন্তু “কল্পনা”, “কথা ও 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- পঞ্চম যুগ ১৭১ 


কাহিনী? প্রভৃতিতে কবি আদর্শনিষ্ঠ, জীবনের উর্ধে অবস্থিত একটা 
মহত্তর শক্তির স্পর্শ লাভের জন্য উন্মুখ ; পঞ্চম যুগে কবি বাস্তব- 
জীবনের বৈচিত্র্যকেই সত্য বলিয়া জানিয়াছেন, কোন বাস্তবাতীত 
সত্তার কল্পন! ভাহার মনকে উদ্ধন্ধ করে নাই। 'ক্ষণিকা'তে কবি 
“সত্যরে লও সহজে” এ কথা বলিলেও জীবনের বিচিত্র সত্যকে 
জানিবার ও গ্রহণ করিবার কথা সেখানে নাই, সাংসারিকতার প্রতি 
একেবারে বিমুখ হইয়া শিশির-বিন্টুর মত “শিখিল-বাঁধন” হইয়া 
অকারণ পুলকে স্পন্দিত হইবার উপদেশ আছে; এখানে কিন্ত 
“বিপুলা এ ধরণী”কে জানিবার ও তাহার জীবনের সহিত জীবন যোগ 
করিবার কথাই রহিয়াছে । “নৈবেছ্ে” যে কর্মযোগের কথা বলা 
হইয়াছে তাহা ঈশ্বরোপলব্ধির-ই একটা উপায় ; এই যুগের জীবনা- 
দর্শের মধ্যে কিন্ত কোন এঁশী সাধনার প্রেরণ! নাই, মহা-মানবের 
সহিত এক হইয়া নিবিড়ভাবে পৃথিবী-কে অন্নুভব করা ও মানব- 
জীবনের রস গ্রহণ করাই কবির কাছে এখন স্বধর্্ম ।% 


রঃ পাশ্চাত্য নানা মহাদেশে পরিভ্রমণ, সেখানকার জীবনাদর্শের সহিত সাক্ষাৎ পরিচয় 
আধুমিক বুরোপের চিন্তাখার! এই যুগে রধীন্রদাথকে কতটা প্রভাবিত করিয়াছিল, তাহা 
জালোচনার বিধয়। 


চতুদ্গশ পর্্ (ভাব) 
[ “পূরবী? এ 
“শেষ বসম্ত” 
“আজ যেন পায় নয়ন আপন 
নতুন জাগা । 
আজ আসে দিন প্রথম দেখার 
দোলন লাগা । 
এই ভুবনের একটি অসীম কোণ 
যুগল প্রাণের গোপন পন্মাসনঃ 
সেথায় আমায় ডাক দিয়ে যায় 
নাই জানা কে, 
সাগরপারের পান্থ পাখীর 
ডানার ডাকে ॥” 


যে অভিনব উপলব্ধির পরিচয় এই পঞ্চম যুগের কাব্যে পাওয়া 
যায়, তাহার তিনটি বিভিন্ন প্রকাশ দেখা যায় পর পর তিনটি পৰে । 
প্রথম পর্ব “পূরবী” প্রবাহিনী' “সুন্বর' “গীতমালিকা” (১ম) রচনার 
কাল অর্থাৎ খুঃ অঃ ১৯২৩ হইতে ১৯২৫ পর্য্যস্ত কয়েকটি বৎসর | 

এই: প্রথম পৰবেবে কবির নবোপলবন্ধ মান্ুষ-ধর্্ম প্রধানতঃ একটা 
রোম্যান্টিক আবেগ-বিহ্বলতার রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। এই: 
রোম্যান্টিক আবেগ মানবপ্রেম ও প্রাকৃতিক সৌন্বধ্যের অনুভূতির 
উপর প্রতিষ্টিত। যে সুন্দর আমাদের চারিদিকে প্রকৃতির রূপ, রস 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- পঞ্চম ঘুগ ১৭৩ 


ও গন্ধের মধ্যে এবং মানবহৃদয়ের প্রণয়বৃত্তির মধ্যে বিধৃত রহিয়াছে, 
তাহারই জয়গান কবি এখন করিতেছেন । যে ভোলানাথকে পুর্বে 
কবি দেখিয়াছিলেন ত্যাগ ও ধ্বংসের দেবতারূপে, সেই ভোলানাথ 
এখন “বন্দরের হাতে একান্ত পরাভব আনন্দে” যাল্া করিতেছেন । 
মদনভন্মে নহে উমামিলনেই কবি দেবাদিদেবের সত্য পরিচয় 
পাইতেছেন। তাহার তপস্তার উদ্দেশ্য মাত্র কৃচ্ছসাধনা নহে, 
“জ্যোতিশ্ধয় পাত্রটি স্ধার” সন্ধান-ই তাহার লক্ষ্য ; তপোভঙ্গেই 
তপস্তার পরিণতি ও সার্থকতা । এই ভাবে কৰি নব উপলন্ষির সহিত 
তাহার পূর্বতন আদর্শের সামপ্রস্ত করিবার প্রয়াস করিয়াছেন । 

এই' পর্বের প্রথম কাব্য “পুরবী'তেই এই. প্রয়াস বিশেষভাবে 
লক্ষিত হয়। “সাবিত্রী' প্রভৃতি প্রথম দিকের কয়েকটি কবিতায় 
“বলাকা পৰ্রের প্রভাব বর্তমান; পক্ষান্তরে “শেষ বস্ত' প্রভৃতি 
শেষের দিকের কবিতায় এই পর্ধবের নৃতনতর ভাব ও আবেগের 
পুরাপুরি প্রকাশ দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু মাঝেকার “আহ্বান” 
“ক্ষণিকা, "লীলাসঙ্গিনী” প্রভৃতি কয়েকটি কবিতায় পুর্ধতন ও নূতন 
উপলব্ধির সামঞ্জব্য করার চেষ্টা আছে; কবি এখন *লীলাসজিনী'র 
সহিত “গোপনরঙ্গিনী'র অভেদ অন্থুভব করিতেছেন, অমাবস্যার 
আধারের মধ্যেই আলোকের উৎস আবিষ্কার করিতেছেন, জন্মমৃত্যুর 
আধার শোতে ভাসিতে ভাসিতে কল্যাণী নারীর আহবানে আত্মাকে 
উপলব্ধি করিতেছেন । সমন্বয়ের যে ক্ষমতা রবীন্দ্রপ্রতিভার অন্যতম 
লক্ষণ “পূরবী'তে তাহার যথেষ্ট পরিচয় আছে ; এখানে কবির কণ্ঠে ষে 
“শেষ রাগিনীব্র-বীণ” বাজিয়াছে তাহাতে “বলাকা"র “ঝড়ের বঙ্কার” 
না থাকিলেও মানবতার একট! সুগভীর আবেদন ও জীবনের বিভিন্ন 
প্রবৃত্তির সামঞ্জন্ের প্রশান্তি আছে। 


১৭৪ কবিগুরু 


এই সময়কার কাব্যের আঙ্গিক-ও উল্লেখযোগ্য । “বলাকা”, 
'পপলাতকা'র অসম ও অমিতাক্ষর ছন্দ যেন আপাততঃ ত্যাগ করিয়া 
কবি ফিরিয়া গিয়াছেন স্ষম ও সম্মিত ছন্দের যুগে । নানা শোভন 
স্তবক ও স্বঠাম চরণ পুনরায় তাহার কাব্যের বাহন হইয়াছে । কখনও 
ঝঙ্ধারে, কখনও মন্ত্রে” কখনও কণনে তাহার কাব্য এখন মুখরিত । যে 
পুলক-হিল্লোলে এখন কবির চিত্ত আন্দোলিত তাহাই এই সময়কার 
ও পরবর্তী পর্বের ললিত-গীত-কলিত কল্লোলে ব্যক্ত হইয়াছে । 


পঞ্চদশ প্র 
( মহাভাব ) 
[মহুয়া-_পরিশেষ 7 
(খুঃ অঃ ১৯২৬-১৯৩১ ) 
( বয়স ৬৫-৭০ ) 


“পুরবী' পর্বে রবীন্দ্রকাব্যে যে “শেষ বসন্তে”্র সৌন্দর্য্য ফুটিয়া 
উঠিয়াছিল তাহারই পরিণত রূপ দেখা যায় পরবর্তী পর্র্বে। এই অময়ে 
পুনশ্চ নৃতন একটা মহাভাবের উপলন্ধির প্রকাশ হয়, কৰি প্রজ্ঞানচক্ষু 
দিয়া জীবন ও পৃথিবীকে দর্শন করেন । এই সময়ের রচিত কবিতাগুলি 
সঙ্কলিত হইয়াছে “মহুয়া' “বনবাধী', “বিচিত্রিতা” ও “পরিশেষ' এই 
কয়েকটি কাব্যগ্রস্থে! “বীথিকা'র কবিতাগুলিতেও এই পর্বের 
বিশিষ্ট অনুভূতি ব্যক্ত হইয়াছে । 

এই' সময়ে কবিচিত্তে যে নূতন উপলন্ধি জাগ্রত হইয়াছিল তাহার 
পরিচয় পাওয়া যায় কাব্য ছাড়াও অন্যান্ত স্থষ্টিকর্ম্ে। এই সময়ে 
তাহার রসসত্তার বিশ্ময়কর স্যষ্টি-_রবীন্দ্রচিত্রকলার সাধনা আর্ত 
হয়। বিদেশে নান! স্থানে তাহার চিত্রের প্রদর্শনী হয় এবং শিল্পি- 
সমাজে তাহার বিশেষ সমাদর হয় । এই সময়ে তিনি-ষে সমস্ত গান, 
উপন্তাস ( “যোগাযোগ” ও “শেষের কবিতা” ), নাটক ( “তপতী' ) ও 
গীতিনাট্য ( “কতুরক্র', “নবীন' ও “নটীর পুজা? ) রচনা করেন, তাহাতেও 
স্তাহার রঙ্গসত্বার সময়োচিত অনুরূপ গুণ দেখা যায়। এই পর্বে 
কৰি বারংবার বিদেশে ভ্রমণ করেন, আধুনিক জগতের ভাব, চিন্তা ও 


১৭৬ কবিগুরু 


জীবনধারার সহিত সুপরিচিত হন, সর্ধদেশে তাহার খ্যাতি প্রসারিত 
ও নুপ্রতিচিত হয় । তাহার 109: বক্তৃতামালাতে তিনি তাহার 
নব জীবনবেদ ব্যক্ত করেন । 

এই পরের মন্মকাণী--“জীবনের হেরিন্ মহিমা” । 

“আলোকিত ভুবনের মুখপানে চেয়ে নিনিমেষ 
বিস্ময়ের পাই নাই শেষ ।**" 
লভিয়াছি জীবলোকে মানবজন্মের অধিকার, 
ধন্য এই সৌভাগ্য আমার 1৮ 

“ধন্য আমি” এই মহাভাবই নানা ভাবে এই পর্ষধে প্রকাশিত 
হইয়াছে । 

এই: পব্ধের প্রধান কাব্য “মহুয়া” মানব-প্রণয়ের জয়গাথা, এবং 
এখানেই নূতন উপলব্ধির উল্লাস সম্পূর্ণরূপে স্ফ্ভ হইয়াছে | মানব- 
প্রেমের মধ্যেই এখন যেন কবি জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান খুঁজিয়া 
পাইতেছেন। জীবনের পথ হুর্গম ও মরুপথের ন্যায় তপ্ত হইলেও 
পরস্পরের হৃদযের ও মনের একাস্তিক সহযোগের বলে প্রণয়ি-যুগলের 
পক্ষে তাহা হাস্তমুখে স্য করা সম্ভব; তাহার] পরস্পরকে যখন পুর্ণ- 
ভাবে হৃদয় দিয়া চিনিতে ও জানিতে পারে, তখন জগতের রূপ 
বদলাইয়া যায়, সংসারের মরীচিকার পশ্চাতে ধাবিত হওয়ার কোন 
প্রবৃত্তি থাকে না, নানা রঙীন মিথ্যার কাচ দিয়া মন ভুলাইবার 
আবশ্যকতা থাকে না । “তুমি আছ, আমি আছি'__এই মহীয়সী বাণীর 
মন্ত্রশক্তির প্রভাবে আত্মা সপ্ীবিত হয়ঃ অপুর্ব গৌরবে চিত্ত ভরিয়া 
উঠে, প্রাণ ছুর্দম বেগে ছুঃসহতম কাজে অগ্রসর হয়, রুক্ষ দিনের ভুঃখেও 
শাস্তি বা সাস্বনার জন্য কাতরত কিংবা ভাগ্যের পায়ে ভিক্ষুকতা বয়ার 
প্রবৃত্তি থাকে না, এমন কি মৃত্যুর মুখে ঈড়াইয়াও কোন ছুবর্বলত! বোধ 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_পঞ্চম যুগ হণ 


হয়না । এই প্রেম “অভীঃ মন্ত্রেআমাদের দীক্ষিত করে, জীবন-' 
সত্যকে গ্রহণ করিবার উপযুক্ত দৃষ্টি ও শক্তি দেয় ; এই প্রেম পঞ্চশরের 
বেদনা-মাধুরী দিয়া বাসর-রাত্রি রচনার লোভ করে না, মুগ্ধ ললিত 
অশ্র-গলিত গীতের উপাদান দিয়া ধরণীতে স্বর্গ-খেলনা গড়িবার চেষ্টা 
করে না। এ প্রেম বলিষ্ঠ ও সাহসিক 7 সাধারণ প্রেমের শ্যায় ভীরু, 
দুর্বল ও কক্প্রবক্ষ নহে; ইহা স্পষ্টদর্শী, সামান্য প্রণয়ের হ্যায় অন্ধ 
নহে । এ প্রেম বন্ধন নহে, ইহা মুক্ত প্রাণের “বন্ধনহীন গ্রন্থি” । ইহা 
বিরহে ক্ষীণ নহে, ইহা বিচ্ছেদের মধ্যেও পূর্ণ ও আত্মপ্রতিষ্ঠ । ইহার 
নায়িকা মানস-্ন্দরী নহে* আত্মার লীলাসঙিনী ; ইহা “নিষ্ফল 
কামনা” নহে, ইহা! “বিপুল বিশ্বাস ।” পুর্ব পুর্ব যুগে ষে প্রেমের কথা 
রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছিলেন, তাহা এক প্রকারের মোহ অথবা কল্পনা! ; 
ন্বপ্লো হু মায়া হু মতিভ্রমো হ্ুঁ_এই জাতীয় একটা উপলব্ধি তাহার 
সহিত জড়িত আছে ; তাহা “আপন মনের মাধুরী”-র অথবা “ধ্যানের 
ধনের” জন্য একটা স্বতঃস্ফ,ত্ব আকর্ষণ । কিন্তু “মহুয়ার' প্রেম সত্য 
পরিচয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ; “স্বপনে দৌহে ছিন্থ কি মোহে”__এই 
জাতীয় মধুর কল্পনা-বিলাসের সহিত তাহার সম্পর্ক নাই । প্রেমের 
এই নবীন অন্ৃভৃতির সহিত বিজড়িত হইয়াছে নারীর ব্যক্তিত্ব ও স্থান 
সম্পর্কে নৃতন ধারণা । নারী অবলা, কোমলা রমণী, কেবল মাত্র 
গ্রীতি, সেবা, মাধুর্য ও মঙ্গল-স্পর্শে ই তাহার পরিচয়, এই সনাতন 
প্রত্যয় নারীর স্বাধীন সত্তা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি অপমানম্থচক ৷ নারী- 
কে দেবী, কল্যাণী, শ্রীও হ্রীরূপে কল্পনার মধ্যে নিহিত রহিয়াছে 
নারীর প্রতি একট! করুণা ও একটা হীনতার আরোপ | নারী সবলা, 
সংসারে আপনার ভাগ্য সে নিজেই জয় করিতে পারে, “বধুবেশে 
বাসরকক্ষে” যাওয়াই তাহার একমাত্র পথ নহে। পুরুষের প্রেমের 
ঘ- ০২ 


৩৪৮ কবিগুরু 


কাঙাল হওয়া তাহার পক্ষে অগৌরব, “বীরহস্তে বরমাল্য” লইয়া 
“মাথার গুন খুলি” বাঞ্ছিতকে সে স্বেচ্ছায় বরণ করিবে ৷ তাহার 
সৌন্দর্য্য মাধুর্য ইত্যাদি অলঙ্কারের জন্য নহে, তাহার অনির্ব্চনীয় 
আত্মিক মহত্বের জন্যই সে তাহার দয়িতের প্রেম ও শ্রদ্ধার পাত্রী 
হইবে । “আলো দিয়ে জ্বেলেছিহ্ন আলো” ইহাই হইবে তাহার 
শ্রেষ্ঠ গৌরব । 

নরনারীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রেম সম্বন্ধে যে আদর্শ মহুয়া 
প্রকাশ লাভ করিয়াছে, তাহাতে আধুনিক পাশ্চাত্ত্য আদর্শ ও 7167০- 
9161) প্রভৃতি কবির প্রভাব লক্ষ্য করা যায় । কিন্তু যে ভাবে রবীন্দ্র- 
নাথ এই প্রেমের সহিত নিসর্গ-সৌন্দধ্যের অন্বভূতির সংযোগ 
করিয়াছেন তাহাতে তাহার কবি-প্রতিভার স্বকীয়তা পরিস্ফুট হইয়াছে । 
যে প্রাণের পরিচয়, যে রোম্যান্টিক আবেগ কবি মানব-প্রেমের মধ্যে 
লক্ষ্য করিতেছেন, তাহা! নিসর্গের লীলা-র মধ্যেও তিনি দেখিতেছেন । 
ইহা সমাসোক্তি বা 190)900 118119,0 মাত্র নহে। মানুষের 
জীবন এবং দিগ.দিগন্তব্যাপী নিসর্গের মধ্যে তিনি একই: প্রাণশক্তির 
লীল! দেখিতে পাইতেছেন। এই প্রাণশক্তি “মৃত্তিকার বীর সম্ভান” 
বৃক্ষেও যেমন, স্বকোমল নীলমণি-লতাতেও তেমনি প্রকট হইতেছে । & 
বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে চলিতেছে একটা অনন্ত লীলা _নটরাজের নৃত্য | 
প্রতিটি লতায়, পাতায়, ফুলে একটা প্রাণশক্তি স্পন্দিত হইতেছে, 


* এইখানে স্মরণ বাখ] দবকাব যে ববীল্দ্রনাথের কাছে বৃক্ষ লত। ইত্যাদি প্রাণবান্‌ বলবা 
প্রতীত হইলেও তাস্াদের লইয়! একটা! সামগ্রিক পৃথক সন্ত'ব প্রত্যয় তাহাব এ সময়ে ছিল 
ন।। সেই হিসাবে ভাহাব উপলব্ধি ৮৬০:055/0:507) 1/670310 প্রভৃতির উপলব্ধি হইতে 
ধিতিন্ন | ০০২০ একদিকে ও ইত অন্যদিকে এক্প ধারণ] তাহার কিংবা ভারতীয় 
ধবিদের ছিল না| । বরং 917511৩%-র সহিত রবীন্দ্রনাথের ধারণা অনেকট! মেলে । 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- পঞ্চম যুগ ১৭৯ 


সকলে মিলিয়া এক বিশ্বব্যাপী আনন্দ-ঘন জীবনের ছন্দ গড়িয়া 
তুলিতেছে । দেহে মনে সেই ছন্দে যোগদান করিতে পারিলে মানব- 
আত্মার মুক্তানন্দলাভ হয়। এই ভাবে বাস্তবের সৌন্দর্য্যই এখন 
তাহার কাছে জীবনসত্যের উৎস রূপে প্রতিভাত হইতেছে । 


ষোড়শ পর্ন (ভাবাভাব ) 
( পরিশেষঞ্ণ ; পুনশ্চ শ্যামলী ) 
( খুঃ অঃ ১৯৩১-- ১৯৩৬ ) 
( বয়স-__-৭০-৭৫ ) 


“হে মানব, তোমার মন্দিরে 
দিনান্তে এসেছি আমি নিশীথের নৈঃশব্্যের তীরে 
আরতির সান্ধ্যক্ষণে ; একের চরণে রাখিলাম 
বিচিত্রের নর্মর্বাশি,_এই মোর রহিল প্রণাম 1৮ 


সপ্ততি-বর্ষ-পুত্তির পর রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনে আর এক পর্ধের 
সুচনা হইল । এই সময়ে কবিচিত্ত আশ্চর্্যরূপে নব নব ভাব ও শিল্প- 
কলায় আত্মপ্রকাশ করিতে আরম্ত করিল। ইহার কিছুকাল পূর্ব 
হইতেই কবি চিত্রকলার চর্চা আরম্ভ করিয়াছিলেন, এবং এই ক্ষেত্রে 
তাহার প্রতিভার মৌলিক শক্তির পরিচয় দিয়াছিলেন । এখন কাব্যেও 
তিনি নিজস্ব একটা নূতন ধারার প্রবর্তন করিলেন; কাব্যের ভাবের 
দিক্‌ দিয়াও যেমন একটা নৃতনত্বের সন্ধান দিলেন, আঙ্গিকের দিক্‌ 
দিয়াও তেমনি একটা অভিনব রীতির প্রচলন করিলেন । এই বয়সেও 
তাহার নব-নব-উন্মেষশালিনী প্রতিভার যে পরিচয় পাওয়া যায় তাহা 
সত্যই বিস্ময়কর । 

মোটামুটি ১৯৩১।৩২ হইততে ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দ পধ্যস্ত এই পর্ধের 
ব্যাপ্তি, এ কথা বলা যাইতে পারে । এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ “পুনশ্চ'ঃ 


উস, সত পপি 


* “পরিশেষ' যুগসঞ্চির কাব্য 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ-_পঞ্চম যুগ ১৮৯ 
“বীথিকা” “শেষ সপ্তক” পিত্রপুট” “শ্যামলী” প্রভৃতি কাব্য রচনা 
করিয়াছিলেন । এই পর্বের বিশিষ্ট ভাব পূর্ববরচিত “পরিশেষে"র 
কয়েকটি কবিতায় এবং পরবর্তী কালের “নবজাতক”, 'আকাশ-প্রদীপ', 
“সানাই'-র কয়েকটি কবিতাতেও *% পাওয়া যায় । তবে রচনাকালের 
হিসাবে “বীথিকা” কাব্যখানি এই পর্বের মধ্যে পড়িলেও তাহাতে এই 
সময়কার বিশিষ্ট অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গীর পরিচয় পাওয়া যায় না; 
“বীথিকা”র কবিতাগুলি পুর্বতন অর্থাৎ “মহুয়া” পর্ধের বঙ্কারের রেশ | 
যে “শেষ বসন্ত কবির জীবনে আসিয়াছিল, তাহারই পুষ্পবীথির 
কয়েকটি অবশিষ্ট কৃমুম লইয়া “বীথিকা"র মালা গ্রথিত হইয়াছে । 
এই পর্বে “পুরবী-মহুয়ার নৃতন দৃষ্টি বিস্তৃততর পরিসরের মধ্যে 
ব্যাপ্ত হইয়াছে । তাহার ফলে পুনশ্চ একটা ভাবাভাবের লক্ষণ ফুটিয়া 
উঠিতেছে। যে জীবন-সত্যের আহ্বানে কবি ধ্যানলোক হইতে বিদায় 
গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার পরিধি এতদিন সীমাবদ্ধ ছিল মানবপ্রেম ও 
নিসর্গ-লীলার মধ্যে | এখন তাহা প্রসারিত হইয়া মানবজীবনের বনু 
বিচিত্র অভিজ্ঞতার সহিত সমবিস্তার হইয়াছে। “পুরবী'র কবি অস্তমুখ, 
আবেগ-বিহবল ও উচ্ছ্াস-প্রবণ । “মহুয়ার কবি আত্মস্থ, রসসিদ্ধ, 
অভাবনীয়ের কিরণে তাহার মনপ্রাণ দীপ্ত। এখন কিন্ত কবির দৃষ্টি- 
কোণের ও মনোবৃত্তির পরিবর্তন হইয়াছে । তিনি এখন বহিমুখ, 
বাস্তব সত্যের দার্শনিক । এই পর্কেই যথার্থ 79818570 বা বাস্তবতা 
রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রকট হইয়াছে । এ্ধরিত্রী”র যে “মহা-একতান” 
“দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী”তে অহরহ ধ্বনিত হইতেছে, তাহাই: 
এবার কবি তাহার কুড়াইরা-পাওয়া “বিচিত্রের নর্মববাশিশতে বাজাইবার 
চেষ্টা করিয়াছেন । নিখিলের অন্থুভৃতি” কবির “সঙ্গীত-সাধনা-মাঝে 


* যথা, “এপারে ওপারে” “ইসটেশন? (নবজাতক )+ “অপঘাত' (সানাই ) 








১৮২ কবিগুরু 


“আপন আকুতি” ব্যক্ত করিয়াছে । কিন্ত এই অভিব্যক্তির মধ্যে 
কোন প্রচারের উদ্দেশ্য নাই । বাস্তবতার নামে অনেকে কোন 
কোন অবর্ধাচীন মতবাদ ও তাহার বিজ্ঞাপন চালাইতে চেষ্টা করেন । 
ইহা প্রকৃত বাস্তবতা নহে ; স্বিস্তৃত ও স্থগভীর জীবন-সত্যের প্রতি 
সশ্রদ্ধ প্রণতি বা তৎসন্বন্ষে যথার্থ জিজ্ঞাসা-র পরিচয় তাহাতে 
নাই ৷ প্রকৃত বাস্তববাদী দলীয় মতবাদের সম্কীর্তার অনেক উদ্ধে 
অবস্থান করিয়া থাকেন ; তিনি প্রচারক নহেন, তিনি জিজ্ঞান্ন ; তিনি 
একদেশদর্শী কিংবা স্থুলদৃষ্টি নহেন, তিনি যেমন সমদর্শী তেমনই 
অম্মদর্শী। তিনি কোন লোকধর্ন্মের পুরোহিত নহেন, তিনি জীবন- 
সত্যের দ্রষ্টা। সেই হিসাবে তান খষি ব! দার্শনিক | বর্তমান পর্বে 
রবীন্দ্রনাথ-ও এই অর্থে বাস্তব সত্যের দার্শনিক । তিনি যে মানুষের 
“সব চেয়ে ছুর্গম” “অন্তরালে” দৃষ্টিক্ষেপ করিয়াছেন এবং সেখানে 
অপুরর্বপরিচিত, ব্যাখ্যার অতীত, বিচিত্র সত্যের ইঙ্গিত পাইয়াছেন, 
ইহাতেই তাহার সার্থকতা__-এই কথাই কবি এখন অন্তুভব করিতেছেন । 
কোন অতিবাস্তব সত্তা বা সৌন্দর্য, কোনও জীবনদেবতা বা বিশ্বদেব 
এখন আর কবির প্রতিপাদ্ঠ নহে, “চিত্রা'-নৈবেছ্' গীতাঞ্জলি'-“বলাকা"র 
উপলব্ধি কবি এখন পিছনে ফেলিয়া আসিয়াছেন। বাস্তব জীবনের 
প্রত্যক্ষ অন্নুভৃতিই এখন কবির প্রেরণার উৎস। এইবার বিশ্বরূপ 
দর্শন করিয়া কবি উপলব্ধি করিয়াছেন, “অতি বৃহৎ বিশ্ব / অস্্ান 
তার মহিমা”/অক্ষুন্ধ তার প্রকৃতি 7/"*আমার সে নয়/, সে অসংখ্যের/ 
বাজে তার ভেরী সকল দিকে*জ্বলে অনিভৃত আলো,/ দোলে পতাকা 
মহাকাশে 1” তাহার “অর্থ কিছু” বুঝিবার কোন ক্ষমতা তাহার নাই, 
তাহার কোন ব্যাখ্যা বা অপব্যাখ্যা করার মত কোন ধৃষ্টতাও ত|হ।র 
নাই, নিজের কোন কল্পনা বা আদর্শ তাহার উপর আরোপ করিবার 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমঘিকাশ- পঞ্চম যুগ ১৮৩ 


প্রবৃত্তি তাহার নাই । তিনি এখন মাহ্ৃষের কবি ; মানুষের “পুলকে- 
বিষাদে-মেশা” দিনগুলি-ই এখন তাহার কাছে সত্য। মাবুষের 
“চেতনাসিঘ্কু-র ক্ষুব্ধ তরলের মৃদক্গগঙ্জন” ধ্বনিয়া উঠচিতেছে, “উন্মুখর 
অট্রহান্য সনে অতল অশ্রুর লীলা” মিলিয়া কলরল-রোল রণিয়। 
উঠিতেছে, “ছায়া রৌদ্র সে দোলায়-_অশ্রাস্ত উল্লোলে” ছুলিতেছে । 
কবি তাহারই রুদ্রতালে গান বাঁধিতেছেন, “অনন্তের আনন্দবেদনা” 
অনুভব করিতেছেন । তাহার সম্মুখে প্রসারিত “চিত্রকরের বিশ্ব 
ভুবনখানি” তিনি চরম সত্য বলিয়! মানিয়া লইয়াছেন, “ছু'বেলা সেই 
এ সংসারের চলতি ছবি” দেখাতেই এখন তাহার পরিতৃপ্তি। সেই 
সব ছবির মধ্যে কবি দেখিতেছেন একটা অজ্ঞাতপূর্র্, ব্যাখ্যার অতীত 
ব্যঞ্জনা । নব নব জিজ্ঞাসা, নব নব বিস্ময় তাহার মনে জাগিতেছে । 
দয়াময় ভগবান্কে কবি প্রশ্ন করিতেছেন 
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ুঃ নিভাইছে তব আলো, 
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি ভেসেছ ভালো! । 

ইহার হ্যা বা না কোনও উত্তর এখন তাহার দেওয়ার ক্ষমতা নাই | 
পূজোর ছুটির প্রীরন্তে “কাশের ঝালর-দৌলা শরতের শান্ত আকাশে” 
যখন “শহরের দাদন-দেওয়। দড়ি-বাঁধা ছাগল-ছানার নিক্ষল্স কান্নার 
স্বর” ছড়াইয়া পড়ে, তখন তাহার মধ্যে একটা ছুর্লক্ষ্য সঙ্গতির আভাম 
কবি পাইয়া থাকেন কিন্ত তাহার ব্যাখ্যা কবির বুদ্ধির অতীত। 
নারীপ্রেমবঞ্চিত পঁচিশ টাকা মাহিনার কেরাণী, প্রণয়-ঘন্দে পরাজিত 
কুরূপা তরুণী, একটা ছুরন্ত লক্ষমীছাড়া ছেলে, পিতৃবিরহে মুুর্ু 
বালিকা ইত্যাদি অতি সাধারণ নরনারীর মনোজগৎ কবির কাছে 
একটা অনাবিষ্কৃত বিরাট মহাদেশের হ্যায় রহস্যময় বলিয়া মনে 


* ইহার সহিত “বলাকা”ব ১১ সংখ্যক কবিতা-_“হে মোর হুন্দর'-_-তুলনীয় 





৩৮৪ কবিগুরু 


হইতেছে ।* অদৃষ্টের যে পরিহাসে ব্যর্থ প্রেমিকের প্রণয় নিবেদনের 
জন্য সমাহত পুষ্প পরিচারিকার কর্ণভূষণ হয়ঃ কিংবা ভাগ্যের যে 
নিচুরতায় পাড়ার নিরীহ কালো মেয়েটির জীবন ও যৌবন দলিত ও 
পিষ্ট হয় এবং “শাস্্মানা আস্তিকত।” ধুলায় উড়িয়া যায়, তাহার গৃঢ় 
তাৎপর্যয-ও কবির বোধাতীত । কেবল মানবজীবন নয়, বাস্তব জগতের 
পৃথিবী, চন্দ্র, শুক্রগ্রহ প্রভৃতি অতি স্থূল ও অতি বিরাট পদার্থের 
স্বরূপ হৃদয়জম করিতে গেলেও একটা অজ্ঞেয় সত্যের আভাস পাওয়া 
যায়। মানবসমাজের যুগযুগান্তরব্যাপী জীবনযাত্রার ইতিহাস, কিংবা 
ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিত্বের ক্রমবিকাশের ধারা অনুধাবন করিলেও 
একটা বচনাতীত অজ্ঞাত রহস্তের ব্যঞ্জনা ফুটিয়া উঠে । এই ভাবে 
“মন্থর তরী”র ন্যায় বাস্তবজীবন “নিরুদ্দেশে স্বপ্নেতে বোঝাই” হইয়া 
চলিয়াছে । সে স্বপ্ন কবিরও স্বপ্নাতীত ; তাহার উৎস কবির বিশ্বাস 
বা কল্পনা নহে, বাস্তবের মহান্‌ বৈচিত্র্য | 

শিজন্ব আদর্শ ও কল্পনা পরিহার করিয়া একান্তভাবে বাস্তব 
বৈচিত্র্যের মধ্যে প্রেরণালাভের প্রয়াস এই সময়ের কাব্যের রূপ ও 
রীতি-কেও প্রভাবিত করিয়াছে । রবীন্দ্রনাথ এই সময়েই বাংলা 
গগ্ভ-কবিতার স্যষ্টি করিরা বাংলা কাব্যের ইতিহাসে একটা যুগান্তর 
আনয়ন করিলেন । কবির কাছে এখন কোন পগ্যছন্দ, এমন কি 
“বলাকা”র ছন্দ-ও, তাহার নূতন অন্কৃভৃতির যোগ্য প্রকাশ মনে 
হইতেছে না। কারণ পদ্ভ মানেই এক প্রকার 1৪%52% বা রূপ- 
কল্পের অনুকরণ, অর্থাৎ কোন আদর্শের অন্বসরণ । কবি এবার 
স্বকপৌলকল্পিত সব আদর্শের সহিত সম্বন্ধ টুকাইয়া দিয়াছেন, ধরিত্রীর 
বস্ত-বৈচিত্র্ের প্রতি নয়নপাত করিয়া তাহার অনির্বচনীয় ও 
ধারণাতীত মাহাক্কোয মুগ্ধ হইয়া রহিয়াছেন । এই জন্যই গগ্ধ কবিতাই: 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ- পঞ্চম ক ১৮৫ 


এখন হইয়াছে তাহার কাব্য-সরম্বতীর বাহন! আজ আর “্ফুল- 
বাগানের ফুলগুলিকে” তোড়ায় বাঁধিবার কোন প্রয়াস তাহার নাই, 
“গাছের ফুলে ডালে-পালায় সব মিলিয়ে” যাহা পাওয়া যায় তাহাই 
তিনি চান। এই জন্য তাহার কাব্য এখন গগ্ভের স্বভাবোক্তি-কে 
অবলম্বন করিয়া লইয়াছে। এইরূপে ভাব ও ছন্দের সঙ্গতি এই; 
পবের্বের কাব্যে একটা এঁকতান সৃষ্টি করিয়াছে । | 


অন্তিম যুগ 
[ পপ্রাস্তিক'__“শেষ লেখা” ] 
( খুঃ অঃ ১৯৩৮-১৯৪১ ) 
€ বয়স ৭৭-৮০ ) 


“নিকটের ছুঃখদন্ব, নিকটের অপূর্ণতা তাই 
সব ভুলে যাই) 
মন যেন ফিরে 
সেই অলক্ষ্যের তীরে তীরে” 


রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনের শেষ যুগ আর্ত হয় তাহার সপ্ত সপ্ততি 
বর্ষ বয়সে । মোটামুটি বলিতে গেলে ১৯৩৮ হইতে ১৮৪১ খুষ্টাব্দের 
মধ্যে রচিত কবিতাগুলি এই যুগের মধ্যে পড়ে । প্প্রান্তিক' .কাব্যে 
এই পর্ধবের নৃতন স্ুরটি প্রথম ধরা পড়ে। জীবনের শেষ প্রান্তে 
পৌছিয়া কৰি যেন নৃতন একট৷ অনুভূতির স্পর্শ লাভ করিতেছেন, 
তাহার যেন নৃতন একটা উপলব্ধির জগতে পুনর্জন্ম হইতেছে । “প্রান্তিক' 
কাব্যের সবগুলি কবিতায় এই নূতন অনুভবের প্রকাশ হইয়াছে । 
“সেঁজুতি' হইতে 'জন্মদিনে'র প্রায় সমস্ত কবিতায় এবং “রোগশয্যা'য়» 
“আরোগ্য” ও “শেষ লেখা"-র সব কয়টি কবিতাতেই রী শেষ রাগিণী 
ধ্বনিত হইতেছে । 

এই সময়ে দেখিতে পাই যে চিরাভ্যত্ত রীতিতে আবার একটা 
নব ভাব রবীন্দ্রকাব্যে ফুটিয়া উঠিতেছে, পুরর্বতন পর্বের ভাবাভাবের 
বিরোধী একটা প্রতিক্রিয়া আরস্ত হইয়াছে! যে বান্তব-বৈচিত্র্য 


রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ__অস্তিম যুগ ১৮৭ 


পৃব্ব কবি-প্রেরণার একমাত্র উৎস ও জীবন-সত্যের একমাত্র অকৃত্রিম 
প্রকাশ বলিয়া তাহার কাছে প্রতীত হইয়াছিল, যাহার সহিত তুলনায় 
তাহার প্রান্তন কবিকর্্ম “শৌখীন মজুরি” বলিয়া তিনি মনে 
করিয়াছিলেন, তাহাকে ছাপাইয়। আর একটা বোধ ক্রমে ক্রমে 
তাহার মনে ফুটিয়া উঠিতেছে। মৃত্যুর সান্িধ্য এবং এই সময়ের 
বারংবার গুরুতর পীড়া ও তজ্জনিত অর্চেতন অবস্থার সহিত বিজড়িত 
বিশিষ্ট মানসিক অনুভূতি সম্ভবতঃ এই নূতন বোধের সহিত সম্পৃক্ত । 
যাহা হউক দেহে ও মনে একটা গুরুতর পরিবর্তন এখন কবি অনুভব 
করিতেছেন ; ইহজগতের প্রসারিত চিত্রপটের উপর যেন একট' 
অজানা আলোক, হয়ত বা ওপারেন আলো, আসিয়া পড়িতেছে, 
প্রতাক্ষের চেয়ে একটা অলক্ষ্যের বোধ যেন ব্রমশঃ প্রবল হইয়া 
উঠিতেছে। এই অপুর্ব আলোকের উৎস ও তাহার পরিচয় এখনও 
কবির অগোচর ; কবি তাহার আভাস মাত্র পাইয়াছেন এবং 
বুঝিয়াছেন যে ইহা! তাহার “ঠৈতন্যসীমা অতিক্রম করিয়! বহুদূরে রূপের 
অন্তরদেশে অপরূপ পুরে” অধিষ্টিত এবং সেই অবাউ অনসোগোচর 
রহস্যনিলয় হইতে উৎসারিত । এই আবির্ভাব এখন কবির মুখরতাকে 
স্তব্ধ করিয়াছে । এখন শুধু প্রত্যক্ষ অনুভবে উচ্ছ্বসিত গীতৎঘ্মী 
কবিতায় তাহার এই নব উপলব্ধির আভাস ও ইঙ্গিত ব্যক্ত হইতেছে । 

কবির বাস্তববোধ-কে আচ্ছন্ন করিয়া যে একটা অতীন্দ্িয় বোধ 
এই সময়ে প্রবল হইয়া উঠিতেছে, তাহার সহিত “সোনার তরী" অথবা 
“খেয়া” যুগের অলৌকিক উপলব্ধির মৌলিক পার্থক্য আছে । পূর্ব 
পুর্ব যুগের উপলন্ধি কবিরই নিজস্ব আকাজ্ষা ও প্রেরণার দ্বারা 
অন্ুপ্রার্বি ও পুষ্ট । যিনি কবির অন্তরতম, তাহার কথাই তিনি 
সেখানে বলিয়াছেন । জীবনদেবতা কিংবা বিশ্বদেবতা সে যুগের 


১৮৮ কবিগুরু 


রবীন্দ্রকাব্যের প্রতিপাদ্য, তাহার উপলব্ধিই কবির সে কালের 
সমস্ত রচনার মধ্যে পরিব্যাপ্ত । কিন্তু সেই “নিভৃত প্রাণের দেবতা” 
কবিরই আত্মিক অন্নুভব ও প্রেরণার প্রুববিন্দ্র । বস্তজগৎ নহে, 
কবিচিত্তই হ্ৃদয়-দেবতার সিংহাসন; কবির “বিকশিত বাসনার 
অরবিন্দ মাঝখানে”ই তাহার পাদপদ্ম স্থাপিত। কিন্তু যে অতীন্দ্রিয 
বোধ রবীন্দ্রকাব্যের শেষ পৰে প্রকাশ পাইয়াছে, তাহা কবিহৃদয়ের 
কামনার বিকার, অথবা তাহার কল্পনার কিংবা ধ্যান-ধারণার স্যষ্ট 
নহে। যে বাস্তব সত্য কবির চক্ষে পুর্বতন পরে প্রতীত হইয়াছিল, 
তাহারই যে অপর একটা দিক আছে, সেই উপলব্ধি-ই এই অভিনব 
অতীন্দ্রিয় বোধের মূলীভূত | বাস্তবের মধ্যে একটা অজ্ঞেয় ব্যঞ্জনার 
আভাস তিনি “পুনশ্চ' পর্ধে পাইয়াছিলেম, সেই আভাস এখন একটা 
নিশ্চয় প্রত্যয়ে পরিণত হইয়াছে । বাস্তবের বিচিত্র যবনিকা এখনও 
তাহার চক্ষের সম্মুখে প্রসারিত রহিয়াছে ; কিন্তু সে যবনিকার 
পশ্চাতে আলো জ্বলিয়াছে, দৃশ্যপটের চিত্রাবলী সেই অগোচর 
আলোকের আভায় নৃতন রূপে উদ্ভাসিত হইতেছে ; যবনিকা ঈষৎ 
আন্দোলিত হইতেছে, মনে হইতেছে এখনই বুঝি তাহা অপস্যত হইবে 
ও চির-আকাজিক্ত উজ্জল দৃশ্ঠ নয়নগোচর হইবে ; কিন্তু এখনও তাহা 
হয় নাই, উৎস্্ক কবি শুধু শুনিতে পাইতেছেন যে “অন্তরীক্ষে দূর 
হতে দূরে__অনাহত স্থরে'-'সোনার ঘণ্টা” ঢং ঢং করিয়া বাজিতেছে। 

মৃত্যুর দেহলিতে পৌঁছিয়া কবি এইভাবে পুনশ্চ একটা অলৌকিক 
উপলব্ধিতে অনুপ্রাণিত হইলেন। এই জাতীয় অনুভূতির প্রবণতা 
রবীন্দ্রনাথের মজ্জাপত, জীবনের শেষ লগ্নে তাহাই আবার প্রবল হইয়া 
উঠিল | পুর্ন পরবে তাহার মন বাস্তবমুখী হইয়াছিল, এখন তাহা 
পুনশ্চ অন্তমু্খী ও আত্মসচেতন হইল । এই নুতন উপলব্ধির 


রবীন্দ্রকাব্যের ভ্রমবিকাশ-_অস্তিম যুগ ১৮৯ 


আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশভঙ্গীরও পরিবর্তন হইল । এখন আর 
গগ্য-কবিতার ছন্দ নহে, পছ্যছন্দই কাব্যের বাহন । স্মিত অমিত্রাক্ষরঃ 
সাধারণ মিত্রাক্ষর ও বলাকার ছন্দেই এখন কাব্যরচনা চলিতেছে । 
শেষের দিকে সম্পূর্ণ মুক্তবন্ধ ছন্দে কবিতা রচিত হইয়াছে, কিন্তু 
উপকরণ পছ্েের পব্ব। যাহা আপাততঃ “ছন্দভাউ! অসঙ্গতি” মাত্র 
বলিয়া প্রতীত হয়, তাহার মধ্যেই “সারডের তান” তিনি এখন শুনিতে 
পাইতেছেন । এই “তানের” স্বাভাবিক প্রকাশ পছ্যছন্দে ৷ 


সপ্তদশ পর্তর (ভাব) 
(প্রান্তিক - সানাই ) 


( খুঃ অঃ ১৯৩৮-১৯৪০ ) 


কবিজীবনের অন্তিম যুগে রবীন্দ্রনাথের অন্তরে যে নৃতন উপলব্ধির 
আবির্ভাব হয়, তাহার প্রাথমিক প্রকাশ দেখা যায় “প্রান্তিক” “সৌঁজুতি” 
“আকাশ প্রদীপ", নবজাতক", “সানাই'--এই কাব্যগুলিতে । ১৯৩৮ 
সালের আগষ্ট মাসে যে দিন তিনি হঠাৎ অচৈতন্য হইয়া পড়েন, তাহার 
পরেই তিনি 'প্রান্তিকে'র উপনিষদৃ-তুল্য কবিতাগুলি রচনা করেন, 
ভাবে, ভাষায়, ছন্দে, অনুভূতিতে এই কবিতাগুলি পুবর্ব পবের্বর রচনা 
হইতে একেবারে পৃথক । মনে হয় ঘেন এই কবিতাগুলি কবির পুর্ব 
জীবনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির স্বাভাবিক পধ্যায়ভুক্ত নহে, কোন 
আকস্মিক দৈব প্রেরণা বা সহসা মানবচিত্তে দৈব আবির্ভাবই 
ইহার উৎস। 

মানুষের জগৎ হইতে কবির দৃষ্টি এখন একটা অতি-মানব অতি- 
পাথিব ছুর্লক্ষ্য সত্তার প্রতি আকৃষ্ট হইল । তিনিই পুষা, এ জন্মের 
অধিদেবতা, বাস্তবের তমিআ্ার অন্তর!লে সেই পুরুষ বিরাজমান, 
তাহাকেই কবি এখন দেখিতে চান। অভ্যাসের জাল ছি'ড়িয়া, 
তুচ্ছতার জীর্ণ উত্তরীয় ত্যাগ করিয়া কবির পথিক চিত্ত গভীর অদৃশ্য 
লোকের ইসারার অনুসরণে সম্মুখ দিকে “আত্মার যাত্রার পন্থ” ধরিয়া 
অনন্তের পাঁনে একা অগ্রসর হইতে চাহিল, পশ্চাতের নিত্য সহচর 
অকৃতার্থ অতীতের বন্ধন ছিন্ন করিয়া দুরে-চাঁওয়! আকাশের বংশীধবনির 
অনুগামী হইল । 


রবীন্দ্রকাব্যের ভ্রমবিকাশ-_অস্তিম যুগ ১৯১ 


তবে এই পরের বাস্তব জগতকে কবি একেবারে বিস্মৃত হইতে 
পারেন নাই, কিন্তু যে দৃষ্টি দিয়া তিনি পুর্বে অর্থাৎ “পুনশ্চ'-শেষ- 
সপ্তকে'র পর্বের বাক্তব-বৈচিত্র্য দেখিয়াছিলেন তাহার এখন পরিবর্তন 
হইয়াছে । মাঝে মাঝে সেই পুরাতন বোধ ফিরিয়া আসিলেও এখন 
তিনি মরণের অপর পারে বিরাট গৃঢ় রহস্যের সন্ধানে যাইবার জন্য 
উদ্বুখ । তাহার মন এখন “পরীর দেশের বদ্ধ হুয়ারে” হানা দিতেছে, 
সমস্ত জীবনটাই “একটা স্বপ্নের আয়োজন” বলিয়া মনে হইতেছে । 
যাহা তিনি খুঁজিতেছেন “সে রয়েছে সব প্রত্যক্ষের পিছে, নিত্যকাল 
সে শুধু আসিছে”। তাহারই উদ্ধেশে “পথিক চলিল একা--অচেতন 
অসংখ্যের মাঝে”। ঘরছাড়া চাকুরে পুরাতন বাসার মেয়াদ ফুরাইবার 
পর ষখন শেষ রাত্রে আত্মীয়-পরশহীন অজানা দেশের দিকে একা 
যাত্রা করে, তখন যেন এই জাতীয় অন্ুভবই সঞ্চারিত হয়। মনে 
হয় “এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি”্তে পাঁড়ি দিতেছে, “কামরায় গাড়িভরা 
ঘুম, রজনী নিঝুম 1” “চালায় যে নাম নাহি কয়-_-কেউ বলে যন্ত্র সে 
আর কিছু নয়।” তবুও তার হাতেই প্রাণমন সঁপিয়া দিয়া যাত্রী 
বিছানা পাতিয়া শুইয়া পড়ে, “ঘুমের ভিতর থাকে অচেতনে কোন্‌ দূর 
প্রভাতের প্রত্যাশা নিদ্রিত মনে” । বাস্তবের “ছন্দভাঙা অসঙ্গতি” 
ছাপাইয়া ধ্বনিত হইতেছে একটা তান, সেই তান একটা “বস্তুর 
অতীত-.-ইন্দ্রজাল” স্থপ্টি করিতেছে, সেই ইন্দ্রজালই এখন কবির 
কাছে চরম সত্যের আভাস বলিয়া মনে হইতেছে | এই শ্ত্র “ধীরে 
ধীরে কিছু খুলে দিয়ে যায়__ভাবী যুগ আরমভ্তের অজানা পধ্যায়”। 
এই: জন্য কবি “নিকটের ছুঃখদন্দ, নিকটের অপূর্ণতা” ভুলিয়া যান, 
“মন যেন ফিরে সেই অলক্ষ্যের তীরে তীরে” । 

এই পৰের্ধ কবির দৃষ্টি যে রোম্যান্টিক সে বিষরে সন্দেহ নাই। 


১৯২ কবিগুরু 


এখানে তাহার কাব্যের বস্তু যে সহজ বুদ্ধিতে “অনেকটা মায়া, 
অনেকট! ছায়া” বলিয়া মনে হইবে তাহা! তিনি জানেন £ “আমারে 
শুধাও যবে, এরে কভু বলে বাস্তবিক ?--আমি বলি, কখনো না, 
আমি রোম্যান্টিক ।” তবে এই রোম্যান্টিকতা হৃদয়াবেগের চর্চা 
নহে ; অলক্ষ্যের “আলো ছায়! ভাবনার প্রাণে খনে খনে (যে) 
আলিপন লেখে আর মোছে” তাহাই তিনি কবিতায় ধরিয়া রাখিবার 
চেষ্টা করিতেছেন । এই ক্ষণ গুলিই তাহার সারা জীবনের সঞ্চয়, 
চ99৪৮-র হ্যায় তাহার কাছেও এই পলাতক মুহূর্তগুলি “6০০ 11৮ | 
রোম্যান্টিক কবিরা যে ভাবে 41901. 10910:9 8170 8067 (সম্মুখে ও 
পশ্চাতে দৃষ্টিক্ষেপ করেন ), সে রকম প্রবৃত্তি কবির এই যুগেও আছে; 
তবে “1০৪৫০:০” হইল বাক্তবাতীত ও মরণাতীত অলক্ষ্য লোক আর 
€8691 হইল পশ্চাতের জীবন ; উভয়ই অনিক্রচনীয়ের আলোকে 
উদ্ভাসিত। অবচেতন সন্তার অন্তস্তলে এই অন্ৃভূতির উৎস। 


অষ্টাদশ পর্ন (মহাভাব ) 
( সেপ্টেপ্বর ১৯৪০--আগষ্ট ১৯৪১) 
[ রোগশয্যায় আরোগ্য, জন্মদিনে, শেষ লেখা ] 


রবীন্দ্রকাব্যের শেষ পব্রের রচনাগুলি সংগৃহীত হইয়াছে চারিটি গ্রন্থে 
_-রোগশধ্যায়* আরোগ্য” “জন্মদিনে “শেষ লেখা" । জীবনের শেষ 
বৎসরে অর্থাৎ ১৯৪০ অব্ের প্রায় মাঝামাঝি হইতে মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত 
কয়েক মাসে এইগুলি রচিত হয়। এই খানেই পাওয়া যায় রবীন্দ্র- 
নাথের জীবনব্যাপী সাধনার ও তাহার ধরন্মবোধের শেষ অবদান, তাহার 
শেষ কথা, তাহার চরম ও পরম উপলব্ধির বাণী। 

ইহার পুর্রের পবেরবে যে ভাবের আগম হইয়াছিল, তাহাই এখন 
পরিশোধিত ও প্রগাঢ় হইয়া মহাভাবে পরিণত হইয়াছে । “সন্ধ্যা- 
সঙ্গীতে'র ভাবাভাবে যে প্রবাহের উৎপত্তি, “শেষ লেখা"র মহাভাবে 
তাহার সমাপন | প্রত্যাসনন পর্ধে যে অলক্ষ্য সত্যের আভাম কবি 
পাইয়াছিলেন, তাহাই এখন দিব্য দৃষ্টির দ্বারা যেন তিনি প্রত্যক্ষ 
করিতেছেন । রবীন্দ্রনাথকে অনেক সময় খষি বলা হয়, এই পর্বে 
তিনি সেই আখ্যার সম্পূর্ণ ঘোগ্য হইয়াছেন মনে হয়। আকুলতা, 
আকাতক্ষা ও আগ্রহের স্তর তিনি অতিক্রম করিয়া আসিয়াছেন, যে 
চরম সত্য জীবন মরণের সীমানা ছাড়াইয়া “বিশ্বতো বৃত্বাত্যতিষ্ঠদ্বশাং- 
গুলং” তাহাকে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের দ্বারা জানিতেছেন । তাহার এই 
সময়কার অধিকাংশ কবিতাই বৈদিক স্ৃক্তের ন্যায় অনাড়ম্বর নিরলঙ্কার 
সুসংহত সংক্ষিপ্তসার ; পদ্ভের মূল প্রকৃতি বজায় থাকিলেও পছ্ভের 
বন্ধন এই কবিতাগুলিতে নাই, এখানেই পাওয়া যায় যথার্থ মুক্তবন্ধ 
প্ভের নিদর্শন | 


ঘ-১৩ 


১৯৪ কবিগুরু 


কবির এই সময়কার দৃষ্টি চরম সত্যের উদয়শিখরে স্ুষ্যের প্রতি 
নিবিষ্ট নিমেষনিহিত দৃষ্টি বা যোগস্থ তপস্বীর ধ্যানদৃষ্টি। তিনি যাহা 
প্রত্যক্ষ করিয়াছেন তাহা বোধ হয় রহস্যের সমাধান নহে, তাহা! 
হইতেছে রহস্তেরই নিবিড়তর ও ঘনিষ্ঠ অঙ্কৃভূতি । প্রথম দিনের সূর্য্য 
প্রশ্ন করিয়াছিল “কে তুমি” সে প্রশ্নের মেলেনি উত্তর” ; শেষ দিবসের 
সূর্যযও সেই প্রশ্ন উচ্চারণ করিল, কিস্তু এবারও “পেল না৷ উত্তর” 

ন তত্র চক্ষুগচ্ছতি ন বাগগচ্ছতি নো মনঃ। 
নবিদ্মো ন বিজানীমো যখৈতদনুশিষ্যাৎ ॥ 
( কেনোপনিষৎ_-১।৩ ) 

[ যেখানে চক্ষু গমন করে না, বাক্য গমন করে নাঃ মনও গমন 

করে না; (ব্রহ্ম কি) জানি না, যে প্রকারে ইহ! (্রক্ষমজ্ঞান ) 

উপদেশ দিতে হয়, তাহাও অবগত নই | ] 
উপনিষদের এই বচনে যে উপলব্ধির পরিচয় আছে, তদনুরূপ উপলব্ধি 
এখন কবির হইয়াছে । কিন্তু এই উপলব্ধি একান্ত ভাবে কবির নিজস্ব, 
তাহার সমগ্র জীবনের সাধনার ফল, ইহা শ্াস্ত্রোন্তির অন্ুবর্তন মাত্র 
নহে। 

১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষে কালিম্পঙডে থাকিতে কবি 
যখন পুনশ্চ সংজ্ঞাহারা হইয়া পড়েন, সেই সময়েই তাহার অবচেতন 
মনে এই মহাভাবের আবির্ভীব হয়, এরূপ কল্পনা অসঙ্গত না হইতে 
পারে । এই সময়কার অনেক কবিতাতেই “অতিৃত্যুমেতি” এই 
অন্নুভবের প্রকাশ দেখা যায়, ওপারের আলো প্রায় কবিতাতেই: 
আসিয়া পড়িয়াছে। মৃত্যু এখন যেন তাহার কাছে জীবন হইতে পৃথক 
কোন ব্যাপার নহে। জীবন ও মরণের মধ্যে একটা অলক্ষ/ ঘনিষ্ঠ 
সৃত্রের সংযোগ রহিয়াছে, “মৃত্যুর দক্ষিণ বাহু জীবনের কণ্ঠে বিজড়িত” 


রবীন্্রকাব্যের ত্রমবিকাশ-_অস্তিম যুগ ১৯৫ 


“বরের চরম দান” বহন করিয়া “মরণের বধূ” “যুগান্তরের পানে” 
চলিতেছে । এই চলার পথ শেষ হইবে-_হয়ত 
| যেথা নাই নাম, 
যেখানে পেয়েছে লয় 
সকল বিশেষ পরিচয়, 
. নাই আর আছে 
এক হয়ে যেথা মিশিয়াছে”_ 
যেখানে অখণ্ড দিন 
আলোহীন, অন্ধকারহীন»_ 
আমার আমির ধারা মিলে যেথা যাবে ক্রমে ক্রমে 
পরিপূর্ণ চৈতন্যের সাগরসঙ্গমে । 
এইভাবে তাহার নির্বাণ হইবে, নাঃ তাহার “বাহা আবরণ নানা রূপে 
রূপাস্তরে কালজআ্োতে” ভাসিতে থাকিবে, তাহা কবি জানেন না। 
আমাদের জ্ঞান ও বুদ্ধির অতীত যে মহাশক্তি বিশ্বজগৎ নিয়ন্ত্রিত 
করিতেছেন, তিনি “ছলনাময়ী” এইটুকু-ই কবি এখন নিশ্চয়রূপে 
জানিয়াছেন ; সেই মহাশক্তি তাহার “স্ষ্টির পথ বিচিত্র ছলনাজালে 
আকীর্ণ” করিয়া রাখিয়াছেন । “ভয়ের বিচিত্র চলচ্ছবি” সে পথের 
পাশে প্রসারিত। তবে এই ছলনা যে “অনায়াসে সহিতে* পারে 
এবং “সত্যের দারুণ মূল্য” লাভের জন্য “আমৃত্যু ছঃখের তপন্যা” করিয়া 
“মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ” করিয়া দিতে পারে, সে যে “শান্তির 
অক্ষয় অধিকার” পাইবেই-_এই বিশ্বাসই রবীন্দ্রনাথের সাধনার, 
শেষ কথা 1% 


* 73:০%12128-র :৩৪১১০৩ কবিতাটি এই প্রসঙ্গে শর্ব্য। 


পারিশিষ্ট 


বাংল! ছন্দে বরবীন্্নাথের মাধন। ৫ ছি 


রবীন্দ্রনাথের আজীবন কাব্যসাধনার সহিত তাহার ছন্দ-সাধন! 
অঙ্গাঙ্গিভাবে বিজড়িত | ছন্দ রবীন্দ্রকাব্যের বাহন মাত্র নয়, কাব্যের 
আত্মার মূর্ত প্রকাশ, কবির উপলব্ধির প্রতীক । “ছন্দে উঠিছে তারকা, 
ছন্দে জগ-মগ্ডল চলিছে" ; রবীন্দ্রনাথের মতে কবিচিত্তের ছন্দ-স্পন্দনের 
প্রভাবেই কাব্যের ভাব ও ভাষা আহ্ৃত হয়, কাব্যসত্তার স্থষ্টি সম্ভব 
হয়। রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-সাধনার ইতিহাস আলোচনা করিলে তাহার 
ভিতরেই তাহার জীবনসাধনা তথা কাব্যসাধনার স্মত্র লক্ষ্য করিতে 
পারা যাইবে । 





হা 


অতি অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন, কিন্তু 
“কবিকাহিশী?, “বনফুল” “ভগ্নহ্ৃদয়' “কিদ্রচণ্ড' প্রভৃতি বালরচনার মধ্যে 
যেমন রবীন্দ্রনাথের নিজন্য সাধনার কোন পরিচয় পাওয়া যায় না, 
তেমনই তাহার ছন্দ-সাধনারও কোন বৈশিষ্ট্য দেখিতে পাওয়! যায় না। 
তখন পর্যন্ত তিনি কবিপ্রসিদ্ধ মত ও ভাবের উপাদান সহযোগেই কাব্য 
রচনা করিতেছিলেন, এবং প্রচলিত ছন্দের বাধা পথেরই অন্নুসরণ 
করিতেছিলেন। রবীন্দ্রকাব্যের ও রবীন্দ্রছন্দের ইতিহাসে এই রচনা- 
গুলির কোন উল্লেখযোগ্য স্থান নাই'। 

রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব কাব্যান্ুভূতির প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় “সন্ধ্যা- 
সঙ্গীতে" এবং তাহার ছন্দ-সাধনারও প্রথম পর্বের সৃএপ|ও হয় “সন্ধ্যা- 


ংল! ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধন। ও সৃষ্টি ১৯৭ 


সঙ্গীতে । যে চঞ্চল রোম্যান্টিকতা,যে নৈরাশ্যমুখর ব্যাকুলতা,যে প্রকাশ- 
বেদনার দৈন্য “সন্ধ্যাসঙ্গীতের" লক্ষণ, তাহ! এই সময়কার ছন্দেও দেখিতে 
পাওয়া যায় । সনাতন রীতি ও প্রথার অন্থবর্তন না করিয়া কবি এখন 
নিজস্ব একটা সাধনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করিতেছেন, ছন্দেও 
একটা নৃতন কিছু করার প্রয়াস করিতেছেন, কিন্তু সে প্রয়াসের ফলে 
কোনরূপ সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন নাই | সনাতন পয়ার ও ত্রিপদীর 
শ্লোকে তিনি আর সন্তুষ্ট নহেন। ছোট বড় চরণ মিশাইয়া নৃতন 
রকমের শ্লোক রচনার চেষ্টা করিতেছেন, কখনও বা বিভিন্ন দৈখ্যের 
পর্ব সহযোগে চরণ স্থষ্টির প্রয়াস করিতেছেন, কিন্তু কোনটাই ঠিক 
দানা বাঁধিয়া উঠিতে পারিতেছে না, বুদ্ধদের মত সবই ভাসিয়া ভাসিয়া 
বহিয়া যাইতেছে । তাহার ললিত-গীত-উচ্ছ্বাসের যথার্থ প্রকাশ যেন 
কিছুতেই করিয়া উঠিতে পারিতেছেন নাঃ বিশেষতঃ যুক্তবর্ণ যেন পদে 
পদে তাহাকে ব্যাহত করিতেছে । কখনও তাহাকে ভাঙিয়া ছুটি ভিন্ন 
অক্ষর তৈয়ার করিতেছেন, কখনও বা শব্দের শুদ্ধ বানানের একটা 
কোমল সংস্করণের প্রতি আকৃষ্ট হইতেছেন। তবে কবি সিদ্ধিলাভ 
না করিলেও সাধনার স্ুত্রপাত যে হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই । 

প্রায় এই সময়েই-_“সন্ধ্যাসঙ্গীত' রচনার কিছু পুবের্__ভাহু" 
সিংহের পদাবলী” রচিত হয়। ব্রজবুলি-তে রচিত বলিয়া এই পদগুলির 
হয়ত বাংলা ছন্দের ইতিহাসে স্থান না হইতেপারে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের 
ছন্দ-সাধনার প্রবৃত্তি কোন দিকে, তাহার আভাস এইখানে কিছু কিছু 
পাওয়া যায়। যে ভাবে সুষম স্তবক রচনা এবং স্থকৌশলে হুন্য ও 
দীর্ঘ স্বরের সমাবেশ করিয়া রবীন্দ্রনাথ এখানে ছন্দ-স্পন্দনের স্যৃষ্টি 
করিয়াছেন, তাহাতেই তাহার উত্তরকালের ছন্দ-সাধনার গতি-নির্দেশ 
পাওয়া যায় । 


১৯৮ কবিগুরু 


রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব কাব্যসাধনার আরম্ভ হয় 'প্রভাত-সঙ্গীত” 
রচনার সময় | এই সময়ই দেখি যে একটা নৃতন দৃষ্টি দিয়া তিনি 
বিশ্বজগতৎ দেখিতে আরম্ভ করিয়াছেন । নেরাশ্যের স্থলে একটা 
আনন্দোজ্জল উপলব্ধি তাহার হৃদয় অধিকার করিয়াছে । এই 
সময়কার ছন্দ রচনাতেও কবির কতকগুলি নৃতন উপলব্ধির পরিচয় 
পাওয়া যায়। বাংলা ছন্দে পর্ধের গুরুত্ব এখন তিনি বুঝিয়াছেন, 
এবং মুল পর্ধ্য বজায় রাখিয়া কি ভাবে নূতন নূতন চরণ ও স্তবক 
রচনা করিয়া বৈচিত্র্যের স্থষ্টি করা যায়, নে তত্বটি তিনি হৃদয়ঙ্গম 
করিয়াছেন । তিন ও চার মাত্রার পৰ্ধাঙ্গ দিয়া সাত মাত্রার বিষম- 
মাত্রিক পব্ব তিনি বুল পরিমাণে ব্যবহার করিতেছেন এবং এই 
ভাবে তাহার উচ্ছল আনন্দ ছন্দে প্রকাশ করিতেছেন । 

কিন্তু যুক্তবর্ণের ব্যবহারে এখনও তিনি পটুত্ব লাভ করিতে পারেন 
নাই । কিন্তু অন্নকাল পরেই রচিত “কড়ি ও কোমলে" দেখিতে পাই 
যে যুক্তবর্ণ সহযোগে স্বযম ছন্দ রচনার কৌশল তিনি অধিগত 
করিয়াছেন, ছন্দ রচনায় তাহার কৃতিত্ব পুর্র্বাচার্যযগণের চেয়ে কোন 
ক্রমেই অল্প নহে। “কড়ি ও কোমলে”-ই দেখিতে পাই যে কৰি ছড়ার 
ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছেন, যদিচ এই ছন্দের সম্ভাবনা সম্পর্কে 
এখনও তিনি ততটা সচেতন হ'ন নাই । আট ও দশ মাত্রার দীর্ঘ 
পবর্ধ লইয়াই এই সময়ে তিনি পরীক্ষা চালাইতেছেন, এবং এই স্থৃত্রে 
দীর্ঘতর চরণ ও নৃতন “পরিপাটা' (9৪৮৮০) সহযোগে সনেটের একটা 
নূতন পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা করিতেছেন । 

€২) 

ইহার পরবত্তাঁ কাব্য “মানসী” রচনার কাল 'রবীন্দ্রকাব্যের 

ইতিহাসে একটা সন্গিক্ষণ। এই সময়েই তাহার কাব্য সম্পূর্ণ ভাবে 


বাংল! ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধন! ও স্্্ি ১৯৯ 


আত্মসচেতন ও আত্মপ্রতিষ্ঠ হইয়াছে । ছন্দেও এই সময়ে তিনি এক 
অভিনব ধারার প্রবর্তন করেন, এবং সেই ধারাতেই আধুনিক বাংলা 
কাব্যের শআ্োত প্রধানতঃ প্রবাহিত হইয়াছে । আধুনিক বাংলা 
মাত্রাবৃত্ত বা ধ্বনিপ্রধান রীতির অষ্টা রবীন্দ্রনাথ, এবং “মানসী? কাব্যেই 
ইহার স্বরূপ প্রথম বিকশিত হয়। এই রীতিতে প্রত্যেকটি হলস্ত 
অক্ষরকে (19860. 85118019 ) দীর্ঘ ব] দ্বিমাত্রিক ধরিয়া লইয়া 
কবি যুক্তবর্ণের ব্যবহার সমস্যার সমাধান করিলেন, এবং প্রায় নিশ্তরঙ্গ 
বাংল! পর্ব ও পর্বাঙ্গে ছন্দহিল্লোল প্রবর্তন করিলেন । “অতৃপ্ত যত/ 
মহত বাসনা/গোপন মন্্র/দাহিনী, //আপনা-মাঝারে/শুফ জীবন-/ 
বাহিনী//” তাহার কাব্যে পরিস্ফুট রূপ গ্রহণ করিল । 

কেবল বাংলা ধ্বনিপ্রধান রীতির প্রবর্তনই “মানসী'র ছন্দের 
একমাত্র উল্লেখযোগ্য লক্ষণ নহে । সনাতন তানপ্রধান ছন্দের 
ব্যবহারেও কবি এখানে অভূতপূর্ব কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন । 
বিশেষতঃ, “অহল্যা' ও “মেঘদূত' প্রভৃতি তানপ্রধান কবিতায় রবীন্দ্রনাথ 
মিত্রাক্ষর পয়ারের আধারে অমিতাক্ষর ছন্দ রচনা করিয়া একটা 
অভিনব ছন্দ-পদ্ধতির প্রবর্তন করিলেন । এতন্ডিন্ন নানা বিচিত্র 
“পরিপাটী'র স্তবকও এই সময়ে কবি রচনা করিতে আরম্ভ করিলেন । 
তাহার মধ্যে অনেকগুলিই পরে বাংল! কাব্যে লোকপ্রিয়তা অর্জন 
করিয়াছে । ধ্বনিপ্রধান ছন্দে ছয় মাত্রার পর্ধরের বিশেষ উপযোগিতাও 
কবি এই সময়ে আবিষ্কার করেন । 

মানসী'তে কবির যে ছন্দ-কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়, তাহাই 
পরবর্তী “সোনার তরী” ও “চিত্রা” কাব্যে বিকাশ লাভ করে। তধে 
এই সময়ে কবি অভিনব স্থষ্টিকর্্ম অপেক্ষা পুর্ব স্যষ্টির মধ্যে যেগুলি 
সার্থক, _পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা সেইগুলির প্রতিষ্ঠার দিকেই মলো- 


২০০ কবিগুরু 


যোগ দিয়াছিলেন। দশ মাত্রার পর্ব ও আঠার মাত্রার চরণের বহুল 
ব্যবহার এই সময়ের একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার_এবং অমিতাক্ষর 
মিত্রাক্ষরেই ইহার সার্থকতার পরিচয় পাওয়া যায়। ইহার পরে 
“চৈতালি”তে দেখা যায় যে, কবি সনাতন পয়ার প্রভৃতি ছন্দের দিকেই 
পুনরায় আকৃষ্ট হইয়াছেন, “চতালি'র ধীরোদাত্ত সবরের সহিত এই: 
ছন্দের সঙ্গতি আছে। পরবত্তাঁ কাব্য “কল্পনা"য় দেখিতে পাই যে, 
একটা বিদ্রোহ ও নব জীবনের বাণী ঘোষিত *হইতেছে, এবং তাহার 
প্রকাশ হইয়াছে প্রধানতঃ মিত্রাক্ষর ছন্দে । কিন্তু এখনকার মিত্রাক্ষর 
ছন্দ সনাতন মিত্রাক্ষরের ন্যায় নিস্তেজ ও নিঃস্পন্দ নহে, ইহার মধ্যে 
একটা অভূতপূর্ব “ভৈরব হরষ' ধ্বনিত হইয়াছে, ইহার ধ্বনিমাত্রিক 
ছন্দেও কোমলকান্ত কুজনের স্থলে “গুরুগঙ্জন' শ্রুত হইয়াছে, ইহার 
তানপ্রধান ছন্দে দেবকুমারের কোদণ্ড-টক্কীর ও “ঝঞ্ধার মঞ্জীর' বাজিয়া 
উঠিয়াছে। কোনও নৃতন ধারার প্রবর্তন এখানে নাই, কিন্ত পরিচিত 
পর্ব ও চরণ, অন্ুপ্রাস ও যুক্তাক্ষরের ব্যবহার করিয়াই বাংলা ছন্দের 
ব্যঞ্ুনাশক্তির চরমোত্কর্ষ কবি এখানে প্রদর্শন করিয়াছেন । যে 
যুক্তাক্ষরকে আগে ছন্দের নিগড় বলিয়া মনে করা হইত তাহা যে কি 
ভাবে ছন্দের ছ্যতিময় অলঙ্কারে রূপায়িত হইতে পারে তাহার প্রকৃষ্ট 
পরিচয় বোধ হয় পাওয়া যায় “কল্পনা'তে । সাবলীল স্বচ্ছন্দ গতির 
সহিত স্থসংহত শক্তির সমন্বয়ে “কল্পনা” ছন্দ-গৌরবে মহীয়ান্‌ হইয়াছে । 


(৩) 


রবীন্দ্রনাথের জীবন-সাধনা ও ছন্দ-সাধনার একটা নৃতন অধ্যায়ের 
আরম্ভ হয় “ক্ষণিক।' রচনার সময়ে । ক্ষণিকা'য় ঘে একটা অভিনব 
ক্ষণবাদ বা সহজিয়া বাদ জীবনধর্্ম বলিয়া গৃহীত হইয়াছে, তাহারই 


বাংলা ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও স্্টি ২০১ 


প্রকাশ দেখা যায় এই কাব্যের অভিনব ছন্দ-পদ্ধতিতে । যে “অকারণ 
পুলক” এই সময়ে কবির হ্ৃদয়মন অধিকার করিয়াছিল, তাহারই: 
স্বাভাবিক প্রতিরূপ দেখা দিল নূতন এক ছন্দ-রীতিতে । যে ছড়ার 
ছন্দ পুবের্ব কেবল মাত্র ছেলে-ভুলানো৷ পদ্, তন্ত্রমন্ত্র, খনার বচন এবং 
হাক্কা হাসি ও ব্যঙ্গ কবিতার বাহন মাত্র ছিল, তাহারই' মন্্কথাটি 
অধিগত করিয়া কবি উচ্চাঙ্গের কবিতায় নৃতন এক রীতি-_বলপ্রধান 
রীতির (9/258890. 70919) প্রবর্তন করিলেন । ছড়ার ছন্দের চরণ 
ও শ্লোক রচনার পরিধি ছিল অতি সঙ্গীর্ণ ; রবীন্দ্রনাথ বলপ্রধান ছন্দে 
নানা দৈধ্যের চরণ ও নানা “পরিপা্টার সবক রচনা করিয়া ইহার 
ব্যঞ্জনাশক্তিকে বহু গুণে বদ্ধিত করিলেন । “সরল হাসি, সজল 
চোখে'র কথ! এবং কবিহৃদয়ের গান স্বতঃস্ফরিত হইয়া এই ছন্দেই 
তাহাদের ভাষা খুঁজিয়া পাইল । 

ক্ষণিকা'র সমস্ত কবিতাই অবশ্য বলপ্রধান ছন্দে রচিত নহে, 
ধ্বনিপ্রধান ছন্দও এখানে আছে। কিন্তু এখানে কবি,যুক্তাক্রের 
স্বল্প ব্যবহার করিয়া নূতন বীতির সহিত সামঞ্জস্য বক্মা করিয়াছেন । 
“কল্পনা'র বঙ্কার ও হিন্দোল-“ক্ষণিকা'র মাত্রাবৃত্তে নাই । তানপ্রধান 
ও অমিতাক্ষর ছন্দের ব্যবহার “ক্ষণিকা'য় নাই । ক্ষণিকা'র পুলক- 
চঞ্চল অভিনব সহজবাদের সহিত তানপ্রধান ছন্দের ধীর গম্ভীর গতির 
সঙ্গতি থাকিতে পারে না । “গভীর সুরে গভীর কথা শুনিয়ে দিতে 
কবির কোন ইচ্ছা নাই, তাহার ভাব এখন লঘুগতি কথ্য ভাষায় ও 
চটুল ছড়ার ছন্দেই' ব্যক্ত হইয়াছে । ৰ 

কিন্তু ক্ষণিকা'র এই দৃষ্টি অল্পকালের মধ্যেই “নৈবেদ্যে'র বৃহত্তর 
উপলন্ধির মধ্যে মিশিয়া! গেল । “কে জানিত সেই ক্ষণিকা মুরতি দূরে 
করি দিবে বরষণ, মিলাবে চপল দরশন 1 ক্ষণিকা'র বিক্ষিপ্ত 


২০২ কবিগুরু 


উপলব্ধি গ্রথিত ও ঘনীভূত হইয়া একটা বিরাট আদর্শনিষ্ঠায় পরিণত 
হইল । তানপ্রধান ছন্দের গম্ভীর উদাত্ত স্বর আবার তাহার কাব্যে 
ধ্বনিত হইল, কিন্তু তাহার রূপ হইল পুর্বাপেক্ষা অনেক সরল । 
সনেট জাতীয় অনেক কবিতা তিনি এই সময়ে রচনা করিয়াছেন বটে, 
কিন্তু স্তবকের বৈচিত্র্যের দিকে বা ছন্দহিল্লোলের দিকে এখন তিনি 
আর বিশেষ মনোযোগ দেন নাই । নবেদ্যের এই সমস্ত ছন্দোগুণ 
পরবর্তী “স্মরণ “উৎসর্গ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থেও আছে । কবির রচনায় 
এখন তানপ্রধান, ধ্বনিপ্রধান ও বলপ্রধান__এই ত্রিধারা পাশাপাশি 
বহিয়া চলিতেছে । আবশ্যক মত তিন রীতিতেই তিনি কাব্য 
লিখিতেছেন,_-গম্ভীর উদাত্ত ভাবের জন্য তানপ্রধানে, সক্ষম অনুভূতির 
স্পন্দনের জন্য ধ্বনিপ্রধানে এবং স্বচ্ছ শ্বতঃস্কর্ত আবেগের জন্য 
বলপ্রধানে | | 

ইহার পর “শিশু” হইতে “গীতালি" পর্য্যস্ত রচনার সময়ে রবীন্দ্র- 
নাথের কাব্যে যে বাস্তবাতীত উপলব্ধি ও গুটাত্মবাদের পরিচয় পাওয়া 
যায়, তাহা প্রধানতঃ প্রকাশ পাইয়াছে বলপ্রধান রীতির ছন্দে। যে 
ছন্দকে পুর্ব্বে কেবল মাত্র লঘৃতাব ও রঙ্গবাঙ্গের উপযুক্ত মনে করা 
হইত, তাহাই যে রবীন্দ্রনাথের নিকট গৃঢ় সত্য ও আধ্যাত্মিক 
উপলব্ধির যোগ্য মাধ্যম বলিয়৷ প্রতিভাত হইল, ইহা৷ রবীন্দ্রকাব্যের 
একটা লক্ষণীয় ব্যাপার । বলপ্রধান ছন্দের সারল্য বোধ হয় তাহার 
কাছে মন্ত্রের ন্যায় আবেদন করিত, ইহার স্বরাঘাতের পৌনঃপুনিকতার 
মধ্যে তিনি বোধ হয় একটা অলৌকিক ইন্দ্রজালের প্রভাব অনুভব 
করিতেন । বলা বাহুলা, বেদের সংহিতা, বাইবেলের 78810)9 ও 
€০981১০15-এর সারল্যের মধ্যে এই জাতীয় একটা অলৌকিকতা আছে ; 
ধ্বনিপ্রধান ও তানপ্রধান ছন্দের যে বিপুল এশখর্যয আছে তাহা স্বভাবতঃ 


ংল] ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও স্ষ্টি ২০৩ 


মানবিক ও পাথিব, অলৌকিকের স্পর্শ তাহার মধ্যে ফুটিয়া উঠে না 
কবি হয়ত এইরূপ অন্নুভব করিয়াছিলেন । এই সময়ে তিনি তান- 
প্রধান ব! ধ্বনিপ্রধান ছন্দে কোনও কবিতা রচনা করেন মাই এমন 
নহে । কিন্তু যখনই কোন অপাথিব বা অলৌকিক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার 
কথা বলিয়াছেন, তখনই তাহার ভাষা হইয়াছে সরল, ভাব হইয়াছে 
যুক্তিবিরল, বর্ণনা হইয়াছে বাহুল্যবজ্জিত এবং ছন্দ হইয়াছে বলপ্রধান। 
এই প্রসঙ্গে “শিশু'র কবিতাগুলি বিশেষ ভাবে স্মরণীয় । কবির চক্ষে 
শিশু মানবক মাত্র নহে; সে সংসারাতীত সত্যের ধঁষ ; তাহার স্বপ্ন, 
কল্পনা সেই পরম সত্যের আভাস । এই জন্য যখনই কাব্যে শিশুর 
মনোভাব কবি প্রকাশ করিয়াছেন, অথবা যখনই তাহার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে 
কবি আসিয়াছেন, তখনই সরল ভাষায় ও বলপ্রধান ছন্দে তিনি কাব্য 
রচন] করিয়াছেন | 


(৪) 


ইহার পরে রবীন্দ্রনাথ “বলাকা রচনার সময়ে এক অভিনব 
ছন্দোবন্ধ স্যষ্টি করিলেন, তাহার আকৃতি ও প্রকৃতি এতই অপরূপ ও 
অভাবনীয় যে “বলাকার ছন্দ” ভিন্ন তাহার অন্য কোন সংজ্ঞা! অগ্াপি 
দেওয়া হয় নাই। ছন্দের পরিভাষায় ইহাকে মিত্রাক্ষরধুক্ত বিষম 
অমিতাক্ষর তানপ্রধান ছন্দ বলা যাইতে পারে । যতি ও ছেদের 
বি-যোগ করিয়া মধুন্থদন বাংলা তানপ্রধান ছন্দের সে সম্ভাবনা প্রথম 
আবিষ্কার করেন, তাহারই এক চরম অভিব্যক্তি হইয়াছে “বলাকা'র 
ছন্দে। মধুন্দনের অমিতাক্ষরে যতির দিক্‌ দিয়া এঁক্য এবং ছেদের 
দিক দিয়া আবেগবৈচিত্র্যের স্থ্টি করা হইয়াছে, এবং এই উভয় 
সঙ্কল্পের (10961 ) সমাবেশে মুরোপায় 00008051068] সঙ্গীতের 


২০৪ কবিগুরু 


হ্যায় একটা দোরোখা ছন্দের স্থ্টি হইয়াছে । কিন্তু এই দৌরোখা 
ছন্দের জটিলতা বোধ হয় আমাদের স্বাভাবিক রুচির সহিত তেমন 
খাপ খায় না। অথচ ছেদের অবস্থান-বৈচিত্র্য না ঘটাইতে পারিলে, 
ছাঁচে ঢালা ছন্দের কাঠামোতে কবিতা রচনা করিলে, আবেগের 
সহজ স্পন্দন ও বৈচিত্র্যের প্রকাশ করা যায় না। “বলাকা'র ছন্দে 
রবীন্দ্রনাথ যতির “পরিপাটা'কে ছন্দের ভিত্তি না করিয়া শুদ্ধ ভাব- 
প্রবাহের তরঙ্গের অন্নুসরণ করিয়া ছেদের-ই অবস্থান অন্থুযায়ী চরণ 
রচনা করিতে লাগিলেন, বিভিন্ন মাত্রার বিভিন্ন সংখ্যক পবর্ব লইয়া 
চরণ গঠন করিলেন, কেবল পরস্পর সন্নিহিত বা অদৃরস্থ চরণে 
মিত্রাক্ষরের আশ্লেয় রাখিয়৷ পন্যের ঝঙ্কার বজায় রাখিলেন । ফলে, 
ছেদ ও যতির বি-যোগ উঠিয়া গেল; ছন্দের গতি হইল একমুখী, তীব্র 
ও তরজ্ভঙ্গিল | মধুস্দনের অমিতাক্ষরে যে ০01002810051)651 গৌরব 
আছে তাহা রহিল না বটে, কিন্তু “পরিপাটী'র বন্ধন হইতে মুক্তি লাভ 
করাতে প্ৃগ্ঘছন্দে “তাণ্ডব ও তরল তালের আভাস ফুটিয়া উঠিল । 
মিত্রাক্ষরের ব্যবহার ও পরিপাী'র আভাস থাকার জন্য এ ছন্দকে 
ঠিক মুক্তছন্দ বল] যায় না; এ ছন্দে “পরিপাটি” ও মুক্তছন্দ উভয়েরই 
লক্ষণাদি থাকায় এখানে ছন্দের এক অভূতপূর্ব অর্ধনারীশ্বর রূপ 
ফুটিয়া উঠিয়াছে। “বলাকা'য় কবির উপলন্ধির যে বিরাট সমন্বয় 
ঘটিয়াছে তাহারই মূর্ত রূপ দেখা যায় “বলাকা"র ছন্দে। রবীন্দ্রনাথের 
ছন্দপ্রতিভার ইহাই বোধ হয় শ্রেষ্ঠ কীত্তি। 

“বলাকা"র দৃষ্টিভক্ষি ও উপলব্ধিরই অন্ধুবৃত্তি পাওয়া যায় পরবতী 
পলাতকা” ও “শিশু ভোলানাথ' কাব্যদ্বয়ে। কিন্তু “বলাকা'র ছন্দ 
এবং এই ছুই কাব্যের ছন্দের মধ্যে পার্থক্য আছে । আপাততঃ মনে 
হইতে পারে ষে, পলাতকা"য় “বলাকা'র মুক্তবন্ধ ছন্দের-ই অনুসরণ 





ংল1 ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও স্ষ্টি ২০৫ 


কর] হইয়াছে, কারণ, চরণের দেখ্যের কোন নিদ্দিষ্ট পরিমিতি নাই, 
কোন স্তবকের “পরিপাটীর আভাস নাই । কিন্তু সামান্য একটু 
বিবেচনা করিলেই দেখা যাইবে যে, “পলাতকা"র ছন্দ মুক্তবন্ধ নহে ; 
ইহার প্রত্যেকটি চরণ চার মাত্রার বলপ্রধান পরের গঠিত, এবং প্রতি 
পঁঙক্তিযুগল মিত্রাক্ষর ব্যবহারের দ্বারা আশ্রিষ্ট | “শিশু ভোলানাথ' 
কাব্যেও চার মাত্রার বলপ্রধান পর্ব ব্যবহৃত হইয়াছে, এবং সেখানে 
চরণের দৈর্ঘা নিরূপিত, জ্তবকের “পরিপা্টী'র স্পষ্ট ব্যবহার সেখানে 
করা হইয়াছে । 

“বলাকা"র ছন্দ স্থষ্টির স্বল্প পরেই যে কবি সমমাত্রিক ছন্দোবদ্ধে 
প্রত্যাবর্তন করিলেন, ইহা একটা লক্ষণীয় ব্যাপার । “শিশু 
ভোলানাথে"র ছন্দ অবশ্য “শিশু'র ছন্দেরই অনুরূপ, এবং যে কারণে 
কবি “শিশু'তে ছড়ার ছন্দ বা বলপ্রধান ছন্দ ব্যবহার করিয়াছেন, সেই 
কারণেই “শিশু ভোলানাথে" সেই ছন্দ প্রয়োগ করিয়াছেন । সহজ 
ভাষা, সরল ছন্দ-ই শিশুর মুখে শোভা পায়; তাহা ছাড়া এই 
সারল্যের মধ্যে একটা অলৌকিকতার আভাস আছে, তাহাও এই! 
সুত্রে ছড়ার ছন্দ ব্যবহারের অন্যতম কারণ । “পলাতকা"র কবিতা- 
গুলিতেও কবি সাধারণ জীবনযাত্রার কয়েকটি ঘটনা বিবৃত করিয়াছেন ; 
অসাধারণ একটা উপলব্ধির দীন্তি প্রত্যেকটি কবিতার পরিশেষে ফুটিয়া 
উঠিলেও এই আবিভাবের আধার লৌকিক জীবনের জাধারণ 
অভিজ্ঞতা, ইহার পাত্র-পাত্রীরা এক একটি শ্পরিচিত লোকচরিত্র | 
এইকারণেই রবীন্দ্রনাথ তাহাদের কথা ও কাহিনী লোক-ছন্দে বা 
ছড়ার ছন্দে রচনা করিয়াছেন ; কিন্তু ছড়ার ছন্দের স্তবক তিনি গ্রহণ 
করেন নাই, বিচিত্র দৈথ্যের চরণের পারম্পর্যযের মাধ্যমে জীবনের 
বাস্তবতা, বন্ধুরতা ও বিষম গতির ব্যগ্রনা করিয়াছেন । 


২১০৬ কবিগুরু 


বোধ হয়, আরও একটা গভীরতর কারণ আছে । “বলাকা'র ছন্দ 
অবশ্য রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-সাধনার শ্রেষ্ঠ মৌলিক কীত্তি, কিন্তু ইহা 
বোধ হয় তাহার একটা £০%? 0৪ 101০8 বা “অসাধ্য-সাধনি” ; ইহা 
তাহার তপোলন্ধ এইর্ধ্য, তাহার সহজ সম্পদ নহে । বিচিত্র অথচ 
সৃষম সৌন্দর্য্যের প্রতিই তাহার প্রবণতা, বিষম ছন্দ বা তাণ্ুব লীলা 
তাহার স্বধন্্ম নহে । তাহার জীবন-সাধনা ও ছন্দ-সাধনার ইতিহাসে 
বারংবার ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়| 

“যে সহজ তোর রয়েছে সমুখে 
আদরে তাহারে ডেকে নে রে বুকে; 
আজিকার মতো যাক যাক চুকে যত অসাধ্য-সাধনি_ 

অন্তরাত্মার এই বাণীই বার বার তাহার সাধনার পথে দিক্‌ পরিবর্তন 
ঘটাইয়াছে । 

রবীন্দ্রকাব্যের পরবর্তাঁ যুগের ইতিহাস হইতেও ইহার সত্যতা 
প্রতিপন্ন হয়। এই যুগের পরিব্যাপ্তি মোটামুটি ভাবে “পূরবী; 
রচনার সময় হইতে “বিচিত্রিতা” রচনার সময় পযন্ত, “পরিশেষে'র 
কয়েকটি কবিতাও এই যুগে চিত্ত । এই সময়ে কবির মনোজগতে 
একটা 100019) 901070)67 বা অকালবসন্তের আবির্ভাব ঘটে; 
মানবপ্রেম ও নিসগসৌন্দর্য্যের জয়গাখাই পুনশ্চ তাহার কাব্যের প্রধান 
উপজীব্য হয়। কোনও বাক্তবাতীত জন্তা নহে, বাস্তব জীবনের 
বৈচিত্র্যই এখন কবির কাছে পরম সত্য বলিয়া প্রতিভাত হয়। এই 
পরিবর্তনের পরিচয় কবির ছন্দেও প্রকট হইয়াছে। “বলাকা' 
ও পলাতকা'র বিষম ছন্দ এখন আর তাহার কাছে যথেষ্ট বলিয়। 
মনে হইতেছে না। “বলাকা'র ঝড়ের বঙ্কারের” স্থলে বাজিয়া 
উঠিয়াছে “শেষ রাগিণীর বীণ+। কবি ফিরিয়াছেন স্ষম ও স্মিত 


ংল] ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও স্্টি ২৮৭ 


ছন্দের যুগে__নানা! শোভন স্তবক ও সুঠাম চরণ পুনরায় তাহার কাব্যের 
বাহন হইয়াছে । এই যুগের কিছু কিছু কবিতা তানপ্রধান এবং কদাচ 
বল-প্রধান ছন্দে রচিত হইয়া থাঁকিলেও, ধ্বনিপ্রধান ছন্দ-ই এখন 
তাহার কবিতার প্রধান বাহন, এবং যে পুলক-হিল্লোলে এখন কবির 
চিত্ত আন্দোলিত, তাহা ধ্বনিপ্রধান ছন্দেরই “ললিত-গীত-কলিত- 
কল্লোলে' ব্যক্ত হইয়াছে । তবে যেখানে তীহার মননশীলতা ও 
চিন্তাসম্পদের পরিচয় আছে, সেখানে কবি তানপ্রধান ছন্দই ব্যবহার 
করিয়াছেন এবং অষ্টাদশ মাত্রার মিত্রাক্ষর অমিতাক্ষরই হইয়াছে তাহার 
বাহন । কদাচ ছুই-একটি' কবিতায় “বলাকা'র ছন্দের প্রয়োগ আছে ; 
সেখানে পুলক-হিল্লোলের পরিবর্তে ধ্বনিত হইয়াছে একটা বাস্তবাতীত 
অভিজ্ঞতার অথবা একটা বাজবদ্রোহী প্রেরণার স্বর ৷ রবীন্দ্রনাথের 
প্রত্যেকটি কবিতার মন্মবাণী তাহার ছন্দেই আত্মপ্রকাশ করিয়াছে” 
এ কথা রবীন্দ্রকাব্যের সব যুগেই সত্য 


(৫) 


ইহার পরে “পুনশ্চ “শেষসপ্তক' প্রস্তুতি কাব্যগ্রন্থ রচনার সময় 
রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-সাধনার ইতিহাসে একট বেপ্লবিক রীতির প্রবর্তন 
দেখা যায় । এই সময়ে তিনি গগ্যকবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন। 
“বলাকা'য় রবীন্দ্রনাথ যে ছন্দে কবিতা রচন। করিয়াছিলেন, তাহা 
বিষমগতি এবং পরিপাটার বন্ধন হইতে এক রকম মুক্ত হইলেও 
তাহা পছ্চছন্দ! তাহার উপকরণ পছযের পরব, পদ্ছন্দের নিদ্দিষ্ট 
রীতিতেই প্রত্যেটি পর্ব্ব সুগঠিত । কিস্ত এই: গগ্ভকবিতার উপকরণ 
পছ্যের পর্ব নহে, সাধ্বরণ গছের-ই এক-একটি 71:788০ বা অর্থবাচক 
শব্বসমষ্টি। এ ক্ষেত্রে পর্ধের বা পর্ধবাঙ্গের মাত্রা, যতির অবস্থান 


২০৮ কবিগুরু 


ইত্যাদি কোন প্রশ্নই উঠিতে পারে না। তবে গগ্ভকবিতায় 
এক-একটি পউ-ক্তি ও তাহার এক-একটি বিভাগের দৈধ্য ও গুরুত্ব 
হইতে ভাবের আরোহ ও অবরোহের পরিচয় পাওয়া যায়, এবং অন্য 
এক প্রকারের ছন্দের (7175%770 ) আভাস ফুটিয়া উঠে। পউ.ক্তির 
প্রত্যেকটি বিভাগে স্বাভাবিক উচ্চারণ-পদ্ধতি অনুসারে যে কয়েকটি 
শ্বাসাঘাত পড়ে, তাহার দ্বারা এক-একটি বিভাগের গুরুত্বের তারতম্যের 
ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কোনও নিদ্দিষ্ট “পরিপাটী” নহে, কেবলমাত্র 
ভাবপ্রবাহের গতির অন্বসরণেই পড.ক্তি ও নিভাগের টদর্্য নিরূপিত 
হইয়া থাকে । “পুনশ্চ, গ্রন্থের “ছুটির আয়োজন? বা “শেষ সপ্তকে'র 
“পঁচিশে বৈশাখ' প্রভৃতি রচনা গগ্যকবিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ । 

কিন্তু গগ্যকবিতা গঞ্ভের উপকরণে লেখা হইলেও তাহা কবিতা ; 
শুধু যে কবিতার বিশিষ্ট ভাব ইহাতে আছে তাহা নয়, কবিতার ভাব- 
রূপও গছ্ধকবিতায় আছে । ছন্দোময় গছ্য ও গগ্ভকবিতা এক নহে ॥ 
ছন্দোময় গছ্যের বহু উৎকৃষ্ট উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম “স্বদেশ' 
প্রভৃতি গ্রন্থে পাওয়া যায়। প্রকাশ্য সভায় তিনি যে সমস্ত ভাষণ 
দিয়াছিলেন, তাহাতেও অনেকে একটা বিশিষ্ট ছন্দোগুণ লক্ষ্য 
করিয়াছেন । কিন্তু গছ্যের ছন্দ ও গগ্যকবিতার ছন্দ এক নহে । গছ্ভ- 
ছন্দের গতি মূলতঃ কুটিল; কাব্যছন্দের তথা গদ্য কবিতার ছন্দ মূলতঃ 
সরল । গদ্যছন্দের এক-একটি আবর্ত হইতেছে এক-একটি যুক্তিময় 
বাক্য ; গ্ভকবিতার এক-একটি আবর্ত হইতেছে এক-একটি ভাবময় 
পউ.্তিঃ অনুভূতির এক-একটি ক্ষুদ্র উচ্ছ্বাস । গগ্যছন্দে স্তবক রচনার 
কোন প্রবৃত্তি থাকে না, গছ্ের বাক্য-পরম্পরায় গঠিত হয় এক-একটি 
অনুচ্ছেদ ; গগ্ভকবিতায় স্তবকের গঠনরীতি বা তাহার আভাস থ।কে। 
পঞ্ভের চরণের ন্যায় গগ্ভকবিতার পউ.ক্তিতে সাধারণতঃ দুইটি হইতে 


ংল] ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও স্যষ্টি ২০৯ 


চারটি মাত্র বিভাগ থাকে, ছন্দৌময় গগ্যে চারের অধিক বিভাগ প্রায়ই 
দেখ! যায়। গগ্যকবিতায় পগ্ভের সুস্পষ্ট “'পরিপার্টা, না থাকিলেও 
তাহাতে একট] অব্যক্ত তালের ইঙ্গিত আছে, ছন্দোময় গছ্যে স্বর 
থাকিলেও তাহাতে এরূপ কোন তালের আভাস নাই । ছন্দোময় গদ্য 
যুক্তির দ্বারা আর গগ্ভকবিতা অনুভূতির দ্বরে নিয়ন্ত্রিত । বাস্তব 
জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে রসান্ুৃভীতর যে সুক্ষ স্পন্দন আছে, কবি 
তাহারই আভাস গগ্যকবিতায় দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন, কিন্তু এখানে 
পদ্যছন্দের শাসন তিনি মানিয়৷ চলেন নাই । 

এইজন্য গগ্যকবিতা রচনা করা ( এবং ঠিক মত পড়া ) স্বকঠিন । 
রবীন্দ্রনাথের পগ্ঠছন্দের অন্রুসরণ করিয়া বু কবিই সাফল্য লাভ 
করিয়াছেন, কিন্তু তাহার গগ্ভকবিতার সার্থক অনুকরণ অগ্ভাপি কেহই 
করিতে পারেন নাই । পছ্যছন্দের একটা আদর্শ আছেঃ সে আদর্শের 
মধ্যে একটা সৌন্দয্য ও বৈচিত্র্য আছে সে কথ! সত্য, কিন্তু সে 
আদর্শের জগৎ বাস্তব জগৎ হইতে এক হিসাবে স্বতন্ত্র । ,সে জগতে 
আমাদের বাস্তব জগতের কথা উপাদান হিসাবে স্থান পাইতে পারে 
বটে, কিন্ত তখন সে কথায় অন্য রকমের একটা স্বর আসিয়া পড়ে, 
পরিচিত জগৎ অভিনব একটা স্থষ্িতে পরিণত হয় । কিন্তু বাস্তব 
জগতের যে একটা নিজস্ব অব্যক্ত স্বর আছে, গগ্ভকবিতায় তাহাই 
ধরিয়া রাখার চেষ্টা করা হয়। যে প্রেরণা হইতে পগ্যের উদ্ভব, 
তাহাতে গগ্ভকবিতা রচনা করা' যায় না । গগ্যকবিতার বস্তু পদ্যছন্দে 
ফেলিলে. শুধু তাহার রূপ নয়, তাহার রসও অন্যবিধ হইয়া যায় 
রবীন্দ্রনাথ নিজেই: বলিয়াছেন, অনেক কথা আছে যা কখনই মিলের 
কবিতায় লেখ! চলে না ।.'-গছ্ভেও নয়ঃ মিলেও নয়, একমাত্র গগ্ভ- 
কবিতাতেই যথার্থ সুন্দর ভাবে প্রকাশ হতে পারে এমন কথাও আছে। 
ঘ-”১৪ 


২৯০ কবিগুরু 


যখন গগ্যকবিতা লেখা হ'ত না, তখন সেগুলো লেখাই হ'ত না।"* 
সমস্ত ছবিটা বাদ দিয়ে এতটুকু ভাবরস ছেঁকে তুলতে হোতো, তাতে 
বাদ পড়ত অনেক ।..( পরিশেষ' কাব্যের ) “কিন্ু গোয়ালার গলি' 
অন্য কোন ছন্দেই চলত না,*."লিখলে সে একেবারে অন্য জিনিষ 
হোতো, এ জিনিষ নয় ।*."কবিতার মতো লাইন না বেঁধে গছ্যের 
মতোও ( গগ্ভকবিতা ) লেখা যেতে পারে, তবে পড়বার স্থববিধার জন্য 
ফাক দেওয়। চাই, গগ্ঠ-কবিতা৷ পড়া শক্ত 

যে সময়ে রবীন্দ্রনাথ গগ্ভকবিতা রচনা করেন, সেই সময়ের 
উপলব্ধির সহিত এই অভিনব রীতির একটা সামগ্জন্ট আছে । এই 
যুগের রবীন্দ্রনাথ বাস্তব সত্যের দ্রষ্টা ও দার্শনিক | যথার্থ :9811970 
বা বাস্তবতা এই সময়েই তাহার রচনায় প্রকট হইয়াছে । কোন 
অতিবান্তব সত্তা বা সৌন্দর্য্য এখন আর কবির প্রতিপাছ্ধ নহে, বাস্তব 
জীবনের প্রত্যক্ষ অন্ুৃভূতিই এখন তাহার প্রেরণার উৎস। তাহার 
“অর্থ কিছু” বুঝিবার কোনও ক্ষমতা তাহার নাই, তাহার কোন ব্যাখ্যা 
বা অপব্যাখ্যা করার মত ধৃষ্টতাও তাহার নাই, নিজের কোন কল্পনা বা 
আদশ তাহার উপর আরোপ করিবার প্রবৃত্তিও ্টাহার নাই । নিজের 
কল্পনা ও আদর্শ পরিহার করিয়া একান্ত ভাবে বাস্তব বৈচিত্র্যের মধ্যে 
কবি এই সময়ে যে প্রেরণা লাভ করিলেন, কোন রকম পদ্য ছন্দেই 
তাহার যোগ্য প্রকাশ হইতে পারে না। কারণ, পদ্য মানেই এক 
প্রকার রূপকল্পের অনুকরণ অর্থাৎ কোন আদর্শের অন্থসরণ । এই 
জন্য গদ্যকবিতাই এখন হইয়াছে তাহার কাব্যসরস্বতীর বাহন | 

(৬) 

জীবনের শেষ সীমায় মৃত্যুর দেহলিতে পৌছিয়া কবি পুনশ্চ একটা! 

অলৌকিক উপলন্ধিতে অনুপ্রাণিত হইলেন, প্রান্তিক হইতে “শেষ 


ংল]! ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও স্যৃষ্টি ২১১ 


লেখা” পর্য্যস্ত রচনার সময়ে তাহার কাব্যে এই উপলন্ধির পরিচয় 
পাওয়া যায়। বাস্তবের বিচিত্র ষবনিকা এখনও তাহার চক্ষের সম্মুখে 
প্রসারিত ; কিন্ত সে যবনিকার পশ্চাতে একটা আলোকের উন্ভাসন 
তিনি লক্ষ্য করিতেছেন । যবনিকা ঈষৎ আন্দোলিত হইতেছে, কিন্তু 
এখনও তাহা! অপস্যত হয় নাইন “অস্তরীক্ষে দূর হতে দূরে__অনাহত 
স্বরে'.সোনার ঘণ্টা” ঢং ঢং করিয়া বাজিতেছে, তাহারই একটা ক্ষীণ 
প্রতিধবনি এখন তিনি শুনিতে পাইতেছেন । ফলে বাস্তব তাহার কাছে 
“ছন্দভার্জা অসঙ্গতি" বলিয়া মনে হইতেছে, তাহার মন এখন বাস্তব 
ছাড়িয়া 'পরীর দেশে" গানের স্থুরের ডানা” মেলিয়া যাইতে উতম্বক। 
ইহার ফলে তাহার ছন্দ-সাধনাতেও একটা পরিবর্তন দেখা দিল। 
কবি পুনরায় বিচিত্র পদ্যছন্দে কবিতা রচনা করিতে আরম্ত করিলেন । 

জীবনের ও কাব্যসাধনার শেষ পবেরব যখন যোগীর দিব্যদৃষ্টি দিয় 
চরম রহস্য কবি প্রত্যক্ষ করিলেন, তখন আবার নূতন এক প্রকার 
ছন্দোবন্ধ তিনি প্রবর্তন করিলেন । ইহাতে গগ্ভকবিতার অবাধ গতির 
সহিত মিলিত হইয়াছে পদ্যছন্দের স্পন্দন । ইহার উপকরণ পগ্ভের 
পর, কিন্তু এই পব্ধের সমাবেশের মধ্যে পদ্ভের কোন রীতিই' নাই । 
মিত্রাক্ষরও নাই, কোন স্তবক বা “পরিপাটী'র আভাসও নাই । গগ্য- 
কবিতায় যে ভাবে অর্থসূচক শব্দসমষ্টির সমাবেশে এক-একটি পঙ্ক্তি 
গঠিত হয়, সেই ভাবেই এখানে পঞ্যের পর্বের সমাবেশে এক-একটি 
চরণ রচিত হইয়াছে । ইহাই যথার্থ £'99 9789 বা মুক্ত ছন্দ ; 
“বলাকা"র ছন্দে যাহার সুচনা, ইহাতেই তাহার পরিশেষ । “শেষ 
লেখার “তোমার স্থ্টির পথ. প্রভৃতি কবিতা ইহার উদাহরণ । মুক্তি- 
সন্ধানী কবির শেষ লেখা! যে মুক্তছন্দে রচিত হইবে, ইহাই বোধ হয় 
সমুচিত। 


২১২ কবিগুরু 


(৭ ১) 

রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-সাধনার যে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দেওয়া হইল তাহা 
হইতে রবীন্দ্রনাথের কবিমানসের মূল প্রবৃত্তি কি কি, সে বিষয়ে কিছু 
কিছু সিদ্ধান্ত করা যায়। রবীন্দ্রনাথ চিরজীবন-ই বিচিত্রের সন্ধান 
করিয়া গিয়াছেন। যাহা সনাতন ও চিরাচরিত তাহাকে তিনি 
আকড়াইয়া কখনই থাকেন নাই, নব নব রূপের সন্ধান-ই তিনি 
করিয়াছেন । কোনও প্রাচীন ছন্দোরীতি-ই তিনি সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ 
করেন নাই, সর্বদাই তাহাকে নৃতন একটা রূপ দিবার প্রয়াস 
করিয়াছেন । তিনি নিজে যাহা স্ষ্টি করিয়াছেন, তাহার মধ্যেও এক্য 
ও সৌধম্য অপেক্ষা বৈচিত্র্যই বিশেষ লক্ষণীয় । কিন্ত কোনও বিশেষ 
ছন্দোরীতি-ই তাহার প্রতিভার চরম অভিব্যক্তি এ কথা বল] যায় না । 
ঘে বিচিত্রের তিনি সন্ধান করিয়াছেন, নব নব রূপের মধ্যে তাহার 
আভাস লক্ষ্য করিলেও তাহার স্বরূপ তিনি কখনও প্রত্যক্ষ করেন 
নাই, তাহার মর্মমবাণী কোন বিশিষ্ট ছন্দোবন্ধে চুড়ান্ত ভাবে প্রকাশিত 
হয় নাই। “অজানা হইতে অজানায়, চিরকালই তিনি অগ্রসর 
হইয়াছেন । 

জীবনে ও ছন্দে রবীন্দ্রনাথ বৈচিত্র্যপন্থী হইলেও তিনি পুরাতনকে 
ঢালিয়া সাজাইবার চেষ্ঠা করিয়াছেন, তাহাকে নৃতন রূপ দিয়া 
ফুটাইবার চেষ্টা করিয়াছেন । সনাতন পয়ার, ত্রিপদী প্রভৃতি ছন্দো- 
বন্ধ, মধুস্দনের অমিত্রাক্ষর ও সনেট ইত্যাদি সকল কিছুর মুল তত্বকে 
তিনি নব ভাবে রাপায়িত করিয়াছেন, বিস্তৃততর পরিধির মধ্যে 
বিকশিত করিয়াছেন। যে আধুনিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দোরীতির তিনি 
প্রবর্তন করেন, তাহার সম্ভাবনা প্রাচীন ছন্দোরীতির মধ্যেই অস্তনিহিত 
ছিল । গগ্ভকবিতা-ই তাহার সবর্বাপেক্ষা বৈপ্লবিক স্যন্টি, কিস্ত তাহাতেও 


বাংলা ছন্দে রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও স্্টি ২১৩ 


পুরাতন ছন্দোবন্ধের অন্ততঃ একটা ভাবরূপ দেখিতে পাওয়া যায়। 
একেবারে সমস্ত রীতির এবং আদর্শ বা “পরিপাটা'র বন্ধন হইতে মুক্ত 
কবিতা বোধ হয় তিনি কখনই রচনা করেন নাই, তাহার তথাকথিত 
মুক্তছন্দও সম্পূর্ণ ভাবে “মুক্ত" নহে । “অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময়' 
মুক্তির সাধনাই তিনি করিয়া গিয়াছেন, শুধু জীবনে নয়, ছন্দেও । 
প্রাচীন রীতির বন্ধন হইতে তাহার ছন্দ উত্তরোত্তর মুক্তির দিকে 
অগ্রসর হইলেও তাহার ছন্দ সবর্ধদাই নব নব বিচিত্র রূপকল্পের প্রভাব 
স্বীকার করিয়াছে । যদি কোনও ছন্দকে রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট ছন্দ 
বলিতে হয়, তবে বোধ হয় “বলাকা'র ছন্দই সেই অভিধার যোগ্য । 
এখানে কোনও “পরিপাটা'র একটা বাঁধা ছাচ নাই, কিন্তু পচ্যের মুল 
উপকরণ আছে এবং বহু বিচিত্র চরণের ও স্তবকের আভাস ক্ষণে ক্ষণে 
ফুটিয়া উঠিয়া আবার নূতন কোন আভাসের মধ্যে বিলীন হইয়া 
যাইতেছে । আকাশমার্গে উড্টীন বলাকার হ্যায় এই ছন্দ মুক্তগতি, 
কিন্তু প্রাচীন পুথিবীর আকর্ষণ সব্ধদাই ইহার মধ্যে আছে। 
রবীন্দ্রনাথের জীবন্ুক্তির প্রতীক এই ছন্দেই যেন প্রকৃষ্ট ভাবে পাওয়া 
যায়। 

রবীন্দ্রনাথ যে সমস্ত নূতন নৃতন চরণ ও স্তবক সৃষ্টি করিয়াছেন, 
তাহার গঠনরীতি আলোচনা করিলে রবীন্দ্রমানসের আর একটা 
প্রবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়। নৃত্যচপল ছন্দের দিকে তাহার 
একটা বিশেষ প্রবণতা আছে। এইজন্য ত্রিপদীর লক্ষণাক্রাস্ত 
চরণের প্রত্তি তাহার একটা পক্ষপাত দেখা যায়। সম অপেক্ষা 
অসম বা বিষম গতি-ই তাহার রুচিকর। তিনি যে বহুবিধ স্তবক 
রচনা করিয়াছেন, তাহার মধ্যে যেগুলির বহুল ব্যবহার,_ সেগুলি, 
হয়, মধ্যক্ষামা, ন। হয়, জঘনচপলা । বলা বাহুল্য, নৃত্যছন্দের সহিত 


২১৪ কবিগুরু 


এই সমস্ত স্তবকের গঠনরীতির ও গতির একটা মিল আছে । ষে 
আধুনিক মাত্রাবৃত্ত পদ্ধতির তিনি প্রবর্তন করিয়াছেন, তাহাতেও 
পবেরধর মধ্যে দ্বিমাত্রিক অক্ষর সংযোজনার ফলে একটা নৃত্যের 
হিন্দোল ফুটিয়া উঠে । 

পরিশেষে বলা যাইতে পারে যে রবীন্দ্রছন্দের লক্ষণাদি বিচার 
করিলে মনে হয় তাহার প্রকৃতির মধ্যে একটা নারীস্থলভ প্রবণতা 
ছিল। এই মন্তব্যের মধ্যে রবীন্দ্রপ্রতিভা সম্বন্ধে কোন ছ্ব্বলতার 
ইঙ্গিত নাই । হয়ত সৌন্দ্যবোধ ও সৌন্দর্য্যস্যষ্টির দিক হইতে বিচার 
করিলে বলা উচিত যে, নারীপ্রকৃতির মধ্যেই মানবচিত্তের সুকুমার 
বৃত্তিগুলির মহত্তর বিকাশ ঘটিয়াছে। রবীন্দ্রছন্দের অন্গপ্রাসবাহুল্য, 
ঝঙ্কারমুখরতা, ন্ৃত্যচঞ্চলতা, উচ্ছাসপ্রবণতা, গতিলালিত্য, স্বরের 
তীব্রতা, আবেগের আরোহ ও অবরোহের ক্ষিপ্রতা ও আকস্মিকতা, 
শিহরণ ও দ্রুত স্পন্দন, বৈচিত্র্য-মুখিতা ইত্যাদি অনেকগুলি স্থল ও 
জম্ম লক্ষণ, একত্র মিলাইয়া বিবেচনা করিলে এই মতের সত্যতা 
প্রতিপন্ন হয়। রবীন্দ্রকাব্যে অন্থুভৃতির গভীরতা, ভাবের গাস্তীর্ধ্য, 
আদর্শের মহত্ব ইত্যাদি সমজ্জ গুণই. অবশ্য আছে, কিন্ত তাহার 
কাব্যের রূপ ও প্রকাশভঙ্গির যে স্বকীয়তা আছে, তাহা নারীস্থলভ । 
“যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী আপনি বিশ্বের নাথ করিছেন 
চুরি'__সেই ভাবই রবীন্দ্রনাথের ছন্দে ফুটিয়া! উঠিয়াছে। 





নির্ঘণ্ট 
€ বিষয়সন্চী ) 


ভনির্ধচনীয়ের উপলদ্ধি ৩১-৩৫ 
অলৌকিক অনুভূতি ৯৪-৯৬১ ১৮৭-৮৮ 
আনন্সাধন। ১৮-২০১ ১১৫-১৯১ ১২৫-২৬ 
ঈশ্বরবাদ ১২৩-২৪ 
এপিকিউরিয়ান্‌ ৯১৬ 
ওয়ার্ডসওয়ার্থ ৮১১ ৯৩? ১৭৮ পা, 
কীট্স্‌ ৯২১ ১৯৬০ ১৪৭ 
ক্ষণবাদ ১১৫ 
গগ্ভকবিতা ১৮৪-৮৫) ২০৯-১১ 
গুঢ়বাদ (70531151810 ) ১৩১-৩৬ 
গেটে ৪১১ ৭৮ 
চৈতম্যসত্! ৪৮-৫০ 
ছন্দসাধনা ১৯৭-২৯৪৫ 
ছন্দঃম্পন্দন ১৮-২০) ৩৫-৩৭১ ৫৭-৫৮০ ১১২ 
জীবনদেবত| ৩৩১ ৯৫১ ১০১-১০৪ 
টেনিসন্‌ ২৬৯ ২৭১ ২৮ 
ধশ্দমযোধ- দ্র" চৈতম্যাসত 
ধীসত্ত। ৪৩-৪৪ 
নবধর্ম ২১ 
পর্ব ৬০-৬৪ 
পর্ধব বিভাগ ৬৫-৭১ 
প্রেম ৯৯-১০ ০ 
বাস্তবত! (16511879 ) ১৮১-৮২ 
বিহারীলাল ৭৫ 
বেস ১৫৫ 
বৈষধব কাব্য ১৪৬-৪৭ 
৪৩-৪২ 


& সঙ্কেত সুত্র পা. ১ পাদটীকা 
দ্র" ১ ভ্রষ্টব্য 


ব্রাউনিঙ. ৯৪১ ১৪৭) ১৫৭ পা,, ১৯৬ পা, 
ভাব ₹৮-৫৯ 
ভাবাভার ৫৮-৫৯) ৬২১ ৭৭-৭৯ 
মধুদন ২০৫ 
মনখ্িতা_ দ্র ধী-সতা। 
মহাতাব ৫৮- ৫৯? ৬৩ 
মার্টিনিউ ১২৪ 
মানুষেব ধন্ম ১৬৬১ ১৬৮-৬৯) ১৭২ 
মেরেডিথ, ১৭৮) ১৭৮ পা. 
মুত্তছন্দ ২১২ 
মুক্তি ১৬, ১৮২১১ ৩১১ ৫৭১ ৯৪১ ১১৫১ ১১৮, 
১৫৫) ১৫৮ 
স্বড্যু ৩৫? ১৩০১ ১৪৭ 
বশীল্রছন্দের লক্ষণ ২১৫ 
রবীন্দ্রসঙ্গীত ২৮-৩৯১ ৪৬-৪৭ 
রসসতা ৪৪-৪৭ 
রসোপলব্ি-_দ্রৎ অনির্বচনীয়েব উপলব্ি 
রামমোহন ” ৪৩ 
বোমান্টিকতা ৪৯ 
শেলী ৪৭) ৯৩? ৯৪৭) ১৭৮ পা, 
সমন্বয় ১৫-১৭ 
সাধন? রবীন্জনাথেব ৯২, ৫২-৬৪ 
শনার ২৩) ৩৪ 
র দ্র” সমম্থয় 
সৌন্দর্্যামুভূতি ১৮০২০ 
ছভেগেল ₹৮ পাত ৭৩-৭৪১ ৯৩৯ 


নির্ঘণ্ট 


(গ্রন্থনা ) 

আত্মপবিচয় ৬০১ ৯৬ পা, পরিশেষ ৬৮ 
আবোগ্য ১৯৩ পলাতক! ১৬১-৬১) ২০৬ 
উৎসর্গ ১২৮-৩ৎ পুনশ্চ ৬৭) ৬৮ 
এতরেয়োপনিষৎ ৬৪ পা. পুরবী ৭৩) ১৭২-৭৪ 
কঠোপনিষৎ ৮১ পাঁ, ১৩৩, ১৫৫ পা. প্রভাত সঙ্গীত ৭৩) ৮৩-৮৪) ৮৯) ১৯৯ 
কথ! ও কাহিনী ১৯৫১ ১০৯ প্রশ্নোপনিষৎ ৬২ পা. 
'কবি-কাহিনী ৭৫ প্রান্তিক ৩৯) ৭৩, ১৮৬ 
কল্পন। ৬১; ৬৬১ ৮৯-৯১১ ১০৫-০৬১ বনফুল ণ৫ 
১০৮-০৯১ ২১ বলাকা ৬১, ১৫৩-৫৫) ১৫৮-৫৯১ ২০৪-২৪০৫) ২৪৭ 

কড়ি ও কোমল ৪৪ পাঁ.১ ৬৭১ ৮৬-৮৮১ ১৯৯ বীথিকা। ১৮১ 
কেনোপনিষৎ ৬২ পা.ঃ ১২৮১ ১৯৪  বৃহদাবণ্যকোপনিষৎ ১৮২ 
ক্ষণিকা ৫১১ ৭৩১ ১১৫১ ২০২ ভগ্মহদয় ৭৫ 
খাপছাঁড় ৩৯, ৫১ ভামুসিংহের পদাবলী ৭৫) গ৬ 
খেয়া ৬৭১ ৭৩, ১৩৩১ ১৩৯-৪৩ মহুয়া ১৭৬-৭৯ 
গীতাঞ্জলি, গীতালি, গীতিমাল্য ১৪৪-৫১ মানসী, ৬১১ ৮৯-৯১) ২০৪ 
চিত্র ৬৫১ ৬৬) ৬৭) ১০১-৯০৪। ১:%-১% রোগশযায় ৩৯) ১৯৩ 
চেতালি ১০৪) ১০৫ রুদ্রচণ্ড ৭৫ 
ছবি ও গাণ ৮৪ শিশু &১) ৬৭) ১৩১-৩২, ২৯৪ 
ছড়া ৩৯ শিশু তোলানাথ ১৬১-৬৩১ ২১৬ 
ছড়ার হবি ৪*, ৫১ শেষ লেখা ৩৯) ৬৫১ ১৯৩, ২১২ 
জন্মদিনে ৬৫১ ১৯৩ শেষ সপ্তক ৬৭ 
তৈত্তিবীয়োপনিষৎ ৪৩ পা. ৪৮ পা., ৫৪ পাঁ., সম্ধ্যাসঙ্গীত ৭৭-৭৯ 
৫৫ পা, ৭১ সোনাব তরী ৪৯) ৬৫) ৬৬) ৬৭) ৭৩) ৯৭) ১০৯ 

নৈষেস্ ১২১-২৬) ২০৩ মরণ ৯৩, 


১২৯ 
১৫৩ 
১৭৩ 
১৭৪ 
৯০১৯ 
১৯৪ 
২০২ 
২০৯ 
২১০ 
২১৫ 


নির্ঘন্টে. ১৯৫র অতিরিক্ত ঘে সং 
১ বিয়োগ করিয়া লইতে হইবে । 


পংক্তি 


শুন্ধিপঞ্জ 


অশুদ্ধ 
জগদাহুরনীশ্বরম্‌ 
কামহেতুকম্‌ 
উপলদ্ধি 
মহত্বম 
দ্দ্দ্ব 
ত্য 0৮ 9159115, 
প্রেমলীলা 
শুন্ধতার 
ইঞ্সিত 
নৃতম 
কৃচ্ছ 
মন্ত্রে 
বিষরে 
নিমেষনিহিত 
বিশেষ 
রসাহুভাত 
ট্‌কৃ 


ভাবাভার 


শুদ্ধ 
জগদাহুরণীশ্থরম্‌ 
কামহৈতুকম্‌ 
উপলব্ধি 
মহত্তম 
ভন্্ব 
এ 05901115, 
প্রেমশীল। 
স্তন্ধতার 
ঈশ্িত 


ভাবাভাব 


খ্যাগুলি আছে তাহা হইতে 


প্রথম সংস্করণ সম্পর্কে কম্সেকটি অভিমত 


“রবীশ্্কাব্যের মর্মবাণশঃ রবান্দ্রনাথের সাধনা এবং রবীন্ত্রকাব্যের ক্রমবিকাশ 
এই তিন পর্যযায়ের আলোচনায় অথ্যাপক অমহল্যধন রবাশ্দ্রকাব্যের মুল সুক্র- 
গুল যেমন নিপৃণভাবে বিশ্লেষণ করিয়াছেন, তেমনি রবীন্দ্প্রাতিভার ক্রম- 
বিকাশকেও তাঁহার সবদশর্থ কাব্যসাহিত্যের আলোচনার ভিতর দিয়া ধারাবাহিক 
ভাবে উদ-ঘাটিত করিয়াছেন । আলোচনার মমস্থলে সংল্ম একটি এতিহাসিক 
পারম্পর্য ধারা অনুসৃত হইলেও, আলোচনার ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে লেখক 
আগাগোড়া রসবিচারকেই মৃখ্য বস্তুরপে গণ্য করিয়াছেন-_তাহার ফলেই জড় 
তথ্যের ভারে অধ্যায়গুলি ভারাক্রান্ত হয় নাই ।*.*লেখক রসজ্ঞ, তাঁহার দৃষ্টি 
অর্ভমুখী, বিক্লেষণও প্রাণধর্মী-_-তাই সাহিত্য-সমালোচনার নিরাপত গণ্ডী 
অতিক্রম কারিয়া তাঁহার বইটি সত্যকার সৎ সাহিত্যের পণয়ে উন্নীত হইয়াছে । 
সমগ্রভাবে বইটির ভিতর দিয়া লেখকের যে জাগ্রত রসদৃস্টি ও বিচারশক্তি 
পাঁরস্ফুট হইয়াছে তাহা উচ্চ প্রশংসার যোগ্য । আশা করি রবীন্দ্-সাহিত্য- 
সমালোচনা বিষয়ক অন্যান্য বিশিষ্ট গ্রন্থগুলির সহিত অধ্যাপক অমহল্যধনের 
এই বইটিও বাংলা ভাষায় স্মরণীয় হইবে । --যুগাস্তর 


“অধ্যাপক অমুল্যধনের উদ্যম আভনব।**শতিনি আতি নিপুণ আলোচনায় 
প্রবৃত্ত হইয়াছেন ।.*"অমৃল্যধন বাবুর আলোচনা অতিশয় হদয়গ্রাহণ হইযাছে 1." 
এই গ্রন্থে রসিক ও জিজ্ঞাসুগণ ভাবিবার ও বুঝিবার অনেক বিষয় পাইবেন, 
সম্পৃণণ নূতন পথে রবীন্দ্রকাব্য লইয়া আলোচনার নানা ইঞ্গিত পাইবেন ও 
সাহস পাইবেন ; আমাদের এই দাগা বুলানোর দেশে চিস্তাশক্তির চিরদুভিকক্ষ 
দশায় সে বড় অল্প আশার কথা নহে।” - আনন্দবাজার পত্রিকা 


“রবীন্্রনাথকে লইয়া উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ অধ্যাপক অমুল্যধন মুখোপাধ্যায়ের 
কবিগুরু । অমহল্যবাবু**'অপর্ব বিশ্লেবণ বিচারের দ্বারা তাঁহার মর্মবাণী উদ্দ- 
ঘাটিত করিয়াছেন এবং তাঁহার বিচিত্র সাধনার সহিত সাধারণ পাঠকের পাঁরচয় 
সাধন করিয়াছেন ।” --শনিবারের চিঠি 


অধ্যাপক অমৃল্যধন মুখোপাধ্যায় প্রণীত 


আধুনিক সাহিত্য-জিজ্ঞাস৷ 
॥ বাংল। প্রবন্ধ সাহিত্যে একটি মুল্যবান সংষোজন ॥ 
মূল্য ৬০০ টাক। 
-_ কয়েকটি অভিমত-_ 
প্শ্রীযুক্ত অমুল্যধন মুখোপাধ্যায় বয়োপ্রবীণ এবং সাহিত্যের সমালোচক 
হিসাবে খ্যাতির অধিকারণ । বলা বাহুল্য, তাঁর এই খ্যাতির সংচনা রবশন্্াথের 
জীবদ্দশায় ) অন্তত ছন্দ বিষয়ে তাঁর অমুল্য গবেষণা তৎকালেই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত 
করেছে । তাঁর সমকালীন আধকাংশ সমালোচক যখন অতাঁত কীর্তি ও পুরনো 
ধারণার উদ্বৃত্তিতে মগ্ন, সেই সময়, আধুনিক কালে প্রাচশন ও নবীনের সার্থক 
সেতু-সম্ভাবনা তাঁর রচনা মেলে | বত্মান গ্রন্থ--আধুনিক সাহিত্য জিজ্ঞাসা 
--এক হিসেবে উল্লিখিত ধারণার পরিপরক ।৮*" 
“সাহিত্য-সমালোচনা কেবল বিচার নহে, “তাহাও এক প্রকারের সৃষ্টি, 
্রন্থকারের এই প্রাস্গিক উক্তি সমগ্র গ্রন্থটিতে আদর্শ হিসেবে ব্যবহৃত 1৮”-** 


“গ্রন্থকারের নিজেরই স্বীকৃতি ররেছে যে, তিনি সনাতন | তবে একালের 
সাহিত্যের রসগ্রহণে তাঁর আন্তরিকতা অনস্বীকার্য । বস্তুত তাঁর প্রসারিত 
দৃষ্টি, তাঁর ভাবনার অনুভবের ব্যাপ্ত থেকে এই আস্তরিকত্বা উৎসারিত। 
একালের সাহত্যপাঠে যে আনন্দ তিনি পেয়েছেন এবং কেন পেয়েছেন, তাই 
তিনি মুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।*"'জীবনের গভশরতম উপলব্ধি 
প্রকাশের বিচিত্র প্রয়াস হিসেবে তিনি একালের সাহিত্যকে সানন্দে গ্রহণ 
করেছেন । আসলে সাহিত্যের একটা খ্ুবর্প আছে তা তিনি মনে করেন 
না| বইটিতে তাঁর সাহিত্য-বিচারের যে পদ্ধাত প্রকাশিত তাতে মনে হয়, 
ধুপদের নানা গৌরব তাঁকে টানে, তবে টপপা ঠুংরশতেও তাঁর রুচি রয়েছে ।” 


|) 90901701121709 9617581968১ £270)63597 ০7 1757218518১ ১1000279267 
€775:267519 50973 ১০ 

৫৫, [২6980673০07 0933 ০0115001010) ৮/1]] 106 30০] 10% ১৩ ৮1205 
০9010011010 016 075 20805005 2955055 200 1015 2006000)05 ত170701312870 
(01 11067201765 0155 55525312085 ০৮5] 521500506105 01 761)8518 
110019015১5 0180085 19০9০05১ 5০৬৩1, ০1100152150. 19০1163 1560073১ 22৫ 
02575 21৩ 2, 6৮৮ 2170702350203 17709 10178151) 11062500015 81505 900৮5982£ 
00৩ 7090 50170013 01 01101019701 6186911, 0৩ 21001075255 0796 


01101015 [0:01061 25/216275 007 10110 220 17621 200. 200 021 
76৮5513 00৩ [১০০০ ০0: 1913 ০০০৮ 00৮ 213০ 163 03 27000 00৩ 6৩1১০: 
10052151106 01 116) 0586 ০0100191020 19 ০17212৩0 %/10 10000510, 5151015- 
02206, 1001)6 20000 061)6৮55 12 01515 00০০৮ 253 210 10521 2180 1583 
2190 [51900155046 170 0105 5989.%8 05052 10৮1৩৬%, 


[10106 25 11101071172 0176 00121005105 01 73201011001 210 012 2170 
1২2101091217207) 051101517 000720012 0910081 23 2, 018702050 2100 10), 2, 
২০ 23 2. ৬161 01 0017010 5017595 018 130117870 91827 2100 $৬1)1 00210) 
100 00৩5 ০0101257005 210 006 0301615 5506205555 218 0200002] 2971081)2,3- 
0108, 056% 9150 10151 05 (0101121800৩ ডারগানে 01 015586 200236505 00 2. 
০1056]: 101)05756270 08105 01 18162, ৃ 
যুগান্তরের সহ-সম্পাদক শ্রীনন্দগোপাল সেনগুপ্ত লিখেছেন__ 

“জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হঠাৎ এক-একজন মানুষের দেখা মেলে, যাঁরা হাতের 
কাজে যতটা ফোটেন, তাঁদের ভিতরের মানুষটা থাকে তার চেয়ে অনেক বড়। 
অধ্যাপক আ্রীঅমহল্যধন মুখ্যোপাধ্যায় এমনি একঞ্ন মানুষ | দেশী ও বিদেশন 
সাহিত্যে তাঁর বোধ ও বিদ্যা যতটা, সে তুলনায় লেখা তাঁর কতট-কু ?*"* 

সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর এই প্রবন্ধ সংগ্রহটি পড়ে প্রকৃতই আনন্দিত ও 
উপকৃত হয়েছি। সাহিত্যের মৃলতত্তঃ বা সাহিত্যধর্ম সম্বন্ধে যেমন এতে 
কয়েকটি গভশর চিন্তাপর্ প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে, তেমনি বাংলা সাহিত্য ও 
বিদেশ সাহিত্যের বিশিষ্ট অ্র্টাদের সম্বন্ধেও কয়েকটি সত্যিকার বিচারাত্মক 
প্রবন্ধ গ্রাথত হয়েছে । সাহিত্যে চিরস্তনতা বনাম আধুনিকতার দ্বন্ধ আজকের 
নয় এবং এ দ্বন্দের হয়ত ষোলো আনা সমাধানও কোনোদিন হবে না। কিন্তু 
অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এই দ্বন্বের আলোচনায় যে সুস্থ ও অপ্রমত্ত বিচারশক্কির 
পরিচয় দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অনেকের পথ দেখার সহায়ক হবে| বঙ্কিমচন্দ্র, 
িরিশচন্দ্রঃ দ্বিজেন্দ্রলাল, দেবেন্্নাথ সেন ও শরম্চম্্ব সম্বন্ধে এতদিনে ও আর 
নূতন কথা বোধ হয় কিছু বলার নেই। তবু বেশ দু-চারটি নুতন কথাই 
পেলাম মনে হল তাঁর রচনার মধ্যে । বানর্ডশ প্রবন্ধটিতে শুধু নূতন কথা 
নয়, একটু নূতন উপলন্ধিরও সাক্ষাৎ হল। একটা জিনিব যা বেশী মু্ধ 
করল, সে হল প্রবীণ অধ্যাপকের মননভঙ্গীর সজীবতা | যুগ ও জীবনের 
প্রবহমাণ ধারাকে নস্যাৎ না করে, দরদের সঙ্গে বুঝতে চেয়েছেন তিনি, এবং তাঁর 
[বিচার বয়সের কুয়াসামুক্ত, তাই নির্মল ও সত্যনিষ্ঠ।-' ূ 

«...লক্ষ্য করবার বিষয় প্রবন্ধগুতি কোথাও পাণুতম্মন্য হয়ে ওঠেনি, পাঠককে 
ছাত্র ব'লে ধরে নেওয়া হয়নি । “জিজ্ঞাসাটা” সাহিত্যের তত্ব অপেক্ষা সাহিত্যের 
রস গ্রহণের প্রতিই বিশেষ দৃষ্টি রেখেছে । ফলে প্রবন্ধগুি সৃষ্টিমলক এবং 
সাহিত্যের মধাদাসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। প্রবন্ধকার নিংসন্দেহে কৃতকার্য 
হয়েছেন ।”***